বাড়িটার সামনে এসে থমকে দাঁড়ালো সংগ্রাম। প্রতিদিনই এখানে এসে থেমে যেতে হয় ওকে। যতো জোরেই হাটুক না কেনো, এইখানে এসে আপনা আপনিই ওর পায়ের গতি কমে যায়!

বাড়িটার দোতলার ছোট্ট বারান্দার দিকে তাকালো সংগ্রাম। প্রতিদিনের মতো আজও সেখানে বসে আছে মেয়েটা।

আজকে একটা সাদা সালোয়ার কামিজ পরে আছে মেয়েটা, সাথে একটা কালো ওড়না। মুগ্ধ হয়ে মেয়েটাকে দেখতে লাগলো সংগ্রাম। মেয়েটাও ওর দিকে তাকিয়ে আছে।

অনেক কষ্টে মেয়েটার ওপর থেকে নজর সরালো সে, তারপর হাঁটা শুরু করলো। আজ কয়েক সপ্তাহ ধরেই এমনটা হচ্ছে ওর সাথে।

হাঁটতে হাঁটতে একবার ফিরে তাকালো সে, মেয়েটা এখনো ওকে দেখছে!

***

একমনে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে বসে ভাবছে সংগ্রাম। অনেক কিছু নিয়েই ভাবতে চাচ্ছে কিন্তু সব চিন্তা-ভাবনা বারবার ওই মেয়েটাতে এসেই থেমে যাচ্ছে।

দু-সপ্তাহ হলো নতুন এই এলাকাতে এসেছে সংগ্রাম। প্রথম দিন সন্ধ্যাবেলা হাটতে গিয়েই চিপা গলির মধ্যের ওই দোতলা বাড়িটার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার মোহে কারারুদ্ধ হয়ে পড়েছে সে।

নাটক বা সিনেমার নায়িকাদের মতো অতো সুন্দরী নয় মেয়েটা। তবে কি যেনো আছে তার মধ্যে, ওর দুটো চোখের মধ্যে! এক দৃষ্টিতে যখন মেয়েটা ওর দিকে তাকায় তখন সংগ্রামের কেমন যেনো ভয় ভয় লাগে, বেশীক্ষণ দাঁড়াতে পারেনা সেখানে, হেটে চলে আসে।

প্রতিদিন বাড়ি ফিরে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, যে আর কখনো ওই বাড়ির সামনে যাবেনা ও। কিন্তু পরের দিন সন্ধ্যাবেলা হাটতে বের হলেই ওর পা দুটো ওকে ঠিক ওই বাড়ির সামনেই নিয়ে যায়।

জীবনে কোনো পিছুটান নেই সংগ্রামের। আর সেজন্যই হয়তো জীবনটা খুব বেশী একঘেয়ে লাগতো ওর কাছে। কোনো এলাকাতে বেশীদিন থাকা হয়না। যাযাবরের মতো ঘুরতেই বেশী ভালো লাগে ওর।

কিন্তু গত দু-সপ্তাহে কি যেনো একটা করে দিয়েছে মেয়েটা! এখন সংগ্রামের সাদাকালো জীবনে একটা টিমটিমে বাতির মতো হয়ে গেছে সে। যেটার জন্য একটু হলেও জীবনে রঙ এসেছে সংগ্রামের!

এই অনুভূতিটাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবে সেটা বুঝে পাচ্ছেনা সংগ্রাম!

আচ্ছা, ও কি মেয়েটার প্রেমে পড়েছে? জীবনে কখনো প্রেম করেনি ও। সত্যি বলতে কি, সেই সুযোগ হয়ে ওঠেনি তার।

নাটক সিনেমা দেখে সে প্রেমের সংজ্ঞা যতটুকু বুঝেছে তা হলো, প্রথমে কাউকে ভালো লাগা তারপর যেনোতেনো ভাবে তাকে পটিয়ে নেওয়া, অতঃপর চুটিয়ে প্রেম এবং সর্বশেষে বিয়ে। মানে প্রাপ্তিটা এখানে একটা আবশ্যক ব্যাপার।

এই ব্যাপারটাতে খটকা লাগে সংগ্রামের। ওর কাছে মেয়েটাকে পাওয়ার চেয়ে প্রতিদিন তাকে দেখার আকাঙ্খাটাই বেশী। ওর মনে হয় মেয়েটার দৃষ্টির এক অপার্থিব জালে আটকা পড়েছে ও, যেখান থেকে বের হতে আর ইচ্ছা করছে না।

এসব ভাবতে ভাবতেই ফজরের আজানের শব্দ কানে এলো ওর, প্রায় ভোর হয়ে এসেছে।

ঘুমিয়ে পড়লো সংগ্রাম।

***

মেয়েটা সংগ্রামকে দেখছে, সংগ্রামও তাকে দেখছে। পশ্চিম আকাশে সূর্য তখন অস্তগামী।

আজকে বেশ কয়েকটা জিনিস লক্ষ্য করেছে সংগ্রাম। বাড়িটা বেশ পুরনো, জায়গায় জায়গায় প্ল্যাস্টার খসে গেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে কেউ নিজের সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে বাড়িটা কোনোমতে বানিয়েছে বাড়িটা।

বাড়িটার একতলার সবগুলো জানালা বন্ধ। মনে হয়না ওখানে কেউ থাকে।

উচ্চকণ্ঠে গানের শব্দ শুনে ঘুরে তাকালো সংগ্রাম। পাড়ার দুটো উটকো মাস্তান টাইপের ছেলে এগিয়ে আসছে। চেহারাতে স্পষ্ট ফুটে রয়েছে কাউকে পরোয়া না করার ভাবভঙ্গি।

সংগ্রামকে অবাক করে দিয়ে বাড়িটার সামনে দিয়ে চুপচাপ হেটে চলে গেলো ওরা। দোতলার বারান্দার মেয়েটার দিকে একবার তাকালোও না! ওদের হাবভাব দেখে মনে হলো যেনো ওখানে কেউ দাঁড়িয়েই ছিলনা!

আবার মেয়েটার দিকে তাকালো সংগ্রাম। ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে মেয়েটা। পুরো শরীর কেমন যেনো শিরশির করে উঠলো সংগ্রামের।

***

বেশ কয়েকদিন ধরে ব্যাপারগুলো খেয়াল করলো সংগ্রাম। পাড়ার কোনো বখাটে ছেলে মেয়েটাকে উত্ত্যক্ত করেনা! এমনকি ওই বারান্দার দিকে তাকিয়েও দেখেনা! এমনকি ওই গলি দিয়ে যারাই যায়, তারা কেউই মেয়েটার দিকে তাকায় না। যেনো কেউ খেয়ালই করেনা যে মেয়েটা ওখানে দাঁড়িয়ে!

প্রতিদিন সন্ধ্যার সময়ে ওইখানে দাঁড়িয়ে থাকে মেয়েটা। ওর কি অন্য কোনো কাজ নেই?

হুট করে সংগ্রামের মনে হলো, হয়তো ও ছাড়া আর কেউ মেয়েটাকে দেখতে পায়না!

***

আজকে সংগ্রাম ঠিক করে এসেছে যে সে মেয়েটার সাথে কথা বলার চেষ্টা করবে। কিন্তু প্রায় দশ মিনিট হয়ে গেলেও কিছুই করতে পারেনি সে।

মেয়েটার এক দৃষ্টিতে দেখছে ওকে। ওই দৃষ্টির ভিতরে একটা কি যেনো আছে! সংগ্রাম চেষ্টা করেও কিছু বলতে পারছে না। ওর বার বার মনে হয়, মেয়েটা দৃষ্টিতে ওকে সম্মোহিত করে ফেলে!

মেয়েটা কি আসলেই অলৌকিক কিছু? কোনো অশুভ শক্তি? যার ডাকে সাড়া দিতে প্রতিদিন সংগ্রামকে চলে আসতে হয়?

সংগ্রাম শুধু জানে মেয়েটাকে একদিনও না দেখে থাকতে পারবেনা ও।

প্রাচীনকালে আফ্রিকার মাসানি উপজাতি এক অদ্ভুত দেবীর উপাসনা করতো। যার নাম ছিলো ‘কিতুয়া’। এই দেবীর উদ্দেশ্যে প্রতি পূর্নিমা রাতে মানুষ বলি দিতে হতো।

আজব ব্যাপার হলো, যাদের বলি দেওয়া হতো তাদের জোর করে ধরে নিয়ে আসা হতোনা, দেবীর ডাকে তারা নিজেরাই চলে আসতো সম্মোহিতের মতো।

১৯২০ সালে পল হাবার্ট নামে একজন ইংরেজ শিকারী নিজের চোখে মাসানিদের এই রিচুয়াল দেখেন। দেশে ফিরে একটি সংবাদপত্রের কাছে নিজের এই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছিলেন তিনি।

এই মেয়েটাও কি তেমন কিছুই নাকি? আর চিন্তা করতে পারেনা সংগ্রাম।

ভালো লাগছে না সংগ্রামের। এই এলাকা ছেড়ে চলে যাবে ও। মেয়েটার মায়া ওকে কাটাতেই হবে। ওকে এসব মানায় না।


***

আজ রাতেই এলাকা ছেড়ে চলে যাবে সংগ্রাম। আর কখনো আসবে না। তাই শেষবারের মতো মেয়েটাকে দেখতে এসেছে ও।

প্রতিদিনের মতোই বারান্দাতে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। তাকিয়ে আছে সংগ্রামের দিকে।

সংগ্রামের মনে হচ্ছে ওর সময় থেমে গেছে, সবকিছু থেমে গেছে।

হুট করে সংগ্রামকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটা ঘরের ভিতর ঢুকলো। এই প্রথম ওকে ঘরে ঢুকতে দেখলো সংগ্রাম!

***

ঘুমাচ্ছিলেন আমিনা বিবি। এই সময়ে সাধারনত ঘুমিয়েই থাকেন তিনি।

“মা, এই মা ওঠো,” এই বলে মাকে ঘুম থেকে জাগাতে লাগলো ইরা।

“কি মা?” কোনোমতে ঘুম জড়ানো গলাতে উত্তর দিলেন আমিনা বিবি।

“একটা ছেলে মা, একটা ছেলে! প্রতিদিন আমাকে দেখে, অন্যদের মতো আমাকে দেখে মুখ ঘোরায় না। প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা আমাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকে ও। আমি ওর বন্ধু হবো মা। তুমি চলো,” বললো ইরা।

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আমিনা বিবি। দুবছর হলো মারা গেছেন তাঁর স্বামী আসগর হোসেন। তারপর থেকে ইরাকে নিয়েই তাঁর সংসার। ইরা মানসিক ভারসাম্যহীন, জন্ম থেকেই! ছোটো থেকেই এজন্য ওকে পাড়ার ছেলেমেয়েরা এড়িয়ে চলে। এমনকি কেউ ওর সাথে ঠিকমতো কথাও বলেনা। এখনও মানুষ ওকে খুব একটা ভালো চোখে দেখেনা।

“চলো মা, দেখি ছেলেটাকে,” এই বলে বিছানা থেকে উঠলেন তিনি।

সংগ্রাম দেখতে পেলো একজন বৃদ্ধা মহিলাকে নিয়ে বাইরে বেড়িয়ে এলো মেয়েটা। আঙ্গুল দিয়ে সংগ্রামকে দেখাচ্ছে সে আর মহিলার সাথে কথা বলছে, কথা বলতে বলতে মাঝে মাঝে লাফিয়ে উঠছে। সংগ্রাম বুঝতে পারলো মেয়েটা মানসিক ভারসাম্যহীন!

***

“কি বলিস রে মা, ওখানে তো কেউ নেই!” অবাক হয়ে বললেন আমিনা বিবি।

“না মা, ওইযে ছেলেটা আমাকে আর তোমাকে দেখছে,” হাসতে হাসতে বলে উঠলো ইরা।

“আমি তো কাউকেই দেখছি না।”

“মা দেখো, ছেলেটা মিশে যাচ্ছে... হাওয়ায় মিশে যাচ্ছে!”

“কি বলিস রে মা! আমি তো কিছুই দেখিনা!”

***

নীচে থেকে ওদের কথা শুনতে শুনতে মুচকি হাসছিলো সংগ্রাম আর নিজেকে বিলীন করে দিচ্ছিলো হাওয়ার মাঝে।

“ইরা! খুব সুন্দর নাম তোমার!” মিশে যেতে যেতে বললো সংগ্রাম। ইরা শুনতে পেলো কিনা সে জানে না।

অবাক হয়ে সংগ্রামের মিশে যাওয়া দেখতে লাগলো ইরা।

সবকিছু নেই হয়ে গেলো বাকি রয়ে গেলো শুধু চোখদুটো, যে চোখদুটোতে মিশে রয়েছে রাজ্যের বিষন্নতা। আর কিছুক্ষণ পর তাও হারিয়ে গেলো!



bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.