আজ সকাল থেকে বিবির মনটা আনন্দে ভরে আছে ! যে মেয়ে ভোরে উঠতে নারাজ সেই মেয়েই আজ ভোর বেলায় নিজে নিজে উঠে পোড়েছে , মা -দিদিরাতো তাকে দেখে অবাক ! মা তো বলেই ফেললেন , " কিরে !কি ব্যাপার ……আজ এতো সকাল সকাল ? " বিবি হেসে উঠে বলে , " তোমার কি মনে নেই …আজ যে ছোটকাকা -ছোটপিসিদের আসবার দিন ,আর তো কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পোড়বে |" মা না জানার ভান করে বলে উঠলেন ……তাই নাকি ! মায়ের কথায় দাদা -দিদিরাও হেসে ফেলে |

বিবিরা ছয় ভাইবোন ……বড়দাদা নীলু বেশ কিছুদিন হোল দূর্গাপুরে একটা ভালো চাকরীতে যোগ দিয়েছে ,মেজদাদা স্বপ্ন সবে পাশ করে চাকরীর চেষ্টায় আছে আর ছোড়দাদা দীপু এখনও কলেজে |

বিবির বড়দিদি মিলিও চাকরী করে , মেজদিদি পলি কলেজে পড়ে আর বিবি এখনো স্কুলেই আছে | ওদের বাবা চাকরী থেকে বেশ কিছুদিন হোল অবসর নিয়েছেন| সংসারে এতগুলো মানুষ ……অনেক স্বাচ্ছন্দ্য না থাকলেও এই পরিবার নিজেদের না পাওয়াটা উপেক্ষা করে খুব আনন্দেই দিন যাপন করে |পাড়া প্রতিবেশীরাও এই পরিবারটিকে অত্যন্ত সম্মান করে ও ভালবাসে |

বিবির বাবা কুশলবাবু অতি সজ্জন ব্যক্তি ……বাড়ির বড় ছেলে হওয়ার দরুণ পরের ভাইবোনেদের সব ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন | বাবা -মা বহুদিন গত হয়েছেন , বোনেদের ভালো বাড়িতে বিয়ে দিয়েছেন , ভাইরাও আজ সুপ্রতিষ্ঠিত |তাঁর এই সুকর্মের কিছুটা ভাগ নিশ্চয়ই তাঁর স্ত্রী কুসুমদেবীকেও দেওয়া যেতে পারে |এককথায় এই চৌধুরী পরিবার সকলের কাছেই খুব প্রশংসনীয় |


এই দম্পতির সুকর্ম শুধু নিজেদের সংসারের মধ্যেই আবদ্ধ ছিলনা ,যেহেতু তাঁরা কলকাতা মহানগরীতে নিজেদের ছোট্ট একটা বাড়ি খুবই কষ্ট করে গড়ে তুলেছিলেন ……সেই হেতু গ্রামের বাড়ি সোনামুখীর যেকোনো মানুষই হোক বা স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই কোন আত্মীয়স্বজন অথবা ছেলে মেয়েদের বন্ধু-বান্ধব আবার স্বল্প পরিচিত যেকোনো মানুষ কোন বিপদে পোড়লে বা আনন্দের কোন সংবাদ বহন কোরে আনলেও তাঁদের বাড়ির দ্বার সব সময়ই উন্মুক্ত থাকে |কাউকে বড় ডাক্তার দেখাতে হবে বা কেউ কলকাতা থেকে পড়াশুনা করতে চায় অথবা পাত্রপক্ষ পাত্রীকে কলকাতা থেকে দেখতে চায় কিম্বা কেউ সন্তান সম্ভবা ……এদের সবার জন্যই এই চৌধুরী পরিবার সর্বক্ষণ উদার হস্ত |এই বাড়ির ছোট্ট পরিসরে থেকে কত যে মানুষ তাদের লেখাপড়া সাঙ্গ কোরলো তা হিসাব বর্জিত |পাড়া-প্রতিবেশী বা বন্ধু-বান্ধবদের ক্ষেত্রেও কুশলবাবু ও তাঁর স্ত্রী সমস্ত ব্যাপারেই মুক্তহস্ত |

এহেন সংসারে নিজের ছোটভাই ও ছোটবোনের সপরিবারে আগমন এতো মেঘ না চাইতে জল | সকাল থেকে চৌধুরী পরিবারে সাজ সাজ রব উঠে গেছে |অনেকদিন পর ছোটবোন বকুল দাদা-বৌদির কাছে আসছে …তাই ভোরবেলাতেই কুশলবাবু টাটকা মাছের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছেন |বকুল চুনোমাছের টক খুব ভালবাসে , ওদের কাতরাসে আবার চুনোমাছ একদমই পাওয়া যায়না……তাই এতো আয়োজন |ছোটভাইটা অবিবাহিত তারও ভালোমন্দ খাওয়া হয়ে ওঠেনা--মেসে থাকেতো !


ছোটভাই মুকুল ধানবাদে ভালই চাকরী করে কিন্তু কলকাতায় আরো ভালো কাজের আবেদনে সাড়া পেয়ে মৌখিক পরীক্ষা দিতে আসছে………নতুন চাকরীটা পেয়ে গেলে ভাইটাকে নিজের কাছে রেখে সংসারী করে দেবেন এমনটাই কুশলবাবুর ইচ্ছা |

বিবিদের বাড়িটা বেহালা অঞ্চলে একটু ফাঁকার দিকে আর বাড়িটার সবথেকে সৌন্দর্য ওদের বাড়ির সামনের বিস্তীর্ণ ' ঝিলটা '……!!! ঝিলটার চারপাশে বসার জায়গায় সন্ধ্যেবেলায় নানান মানুষের ভিড় দেখা যায় শীতকালে পরিযায়ী পাখীদের এটা মিলন ক্ষেত্র | পাড়ার ক্লাবের ছেলেরা এই ঝিলটাকে সংরক্ষণ করবার আপ্রাণ চেষ্টা করে |অনেককেই এখানে সাঁতারের হাতেখড়িও দেওয়া হয় |আবার মাছ ধরার নেশা আছে এমন মানুষরা নাওয়া খাওয়া ভুলে এখানে ছিপ নিয়ে প্রায়ই বসে থাকেন |সব মিলিয়ে চৌধুরী বাড়ির পরিবেশ অতি মনোরম |


দশটা বাজতে চলেছে -ঘড়ির কাঁটাতো নিজের নিয়মে এগিয়েই চলেছে | কুশলবাবু নানা রকমের টাটকা মাছ ,সব্জি , এমনকি কচি পাঁঠার মাংস নিয়েও তিনি উপস্থিত | তাঁর বাজারের বহর দেখে মনে হচ্ছে …তিনি যেন ভাই বোনকে একদিনেই সমস্ত পদের সমারোহে আবৃত করে ফেলবেন |বিবির মা ও বড়দি রান্নাঘরের কাজে ব্যস্ত আর মেজদি ঘর গোছানোয় | বিবি শুধু এঘর-ওঘর-ছাত-বাগান-বায়রে করে বেড়াচ্ছে……কোনদিকে তার খেয়াল নেই ……শুধুই তাদের আসার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে |কুশলবাবুর বড়ছেলেও কদিনের ছুটিতে বাড়িতে এসেছে তাই সে মেজভাই স্বপ্নকে নিয়ে ওদের আনতে হাওড়া গেছে |

এতো আনন্দের মধ্যে আবার এক বিপত্তি দেখা গেলো ……আজই টাইম কলের জল আসলনা |সবারতো মাথায় হাত ……বাড়িতে এতগুলো মানুষ …কারুর এখনো পর্য্যন্ত স্নান হয়নি,আবার অতিথি আগত ……কিযে করা যায় !!!

বিবীর ছোড়দা দীপু হঠাত্ মুশকিল আসানের মতন এক জল দেবার ভারী ধরে আনে …সে রাস্তার চাপাকল থেকে বাড়িতে জল ভরে দিয়ে যায় …এতে বাড়ির সকলে স্নান সেরে নেয় …তারপর ভারী আবার সব খালি জায়গাগুলো ভরে দিয়ে চলে যায় |এরপরই জানা যায় যে বিকেলের দিকে আবার কলে জল আসবে …কি একটা সারানোর জন্য সকালের জল বন্ধ ছিল ……খবরটা জানতে পেরে সকলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে | এইসব ঘটনার মধ্যেই কুশলবাবু চিত্কার করে বললেন ওঠেন , " এসে গেছে - এসে গেছে সব , " চৌধুরী বাড়ি নানা মানুষের কলকাকলীতে ভরে ওঠে | জলযোগ পর্ব শেষ হোলে কুশলবাবুর আদেশে বাকি সবাই স্নানের জন্য তৈরী হোতে থাকে |

দীপু হঠাত্ বায়না ধরে আমরা তিনভাই ও ছোটকা আজ ঝিলে স্নান কোরতে যাবো | কারণ দেখায় ……জলের অভাবের জন্য পাড়ার সব ছেলেরা ঝিলে স্নান কোরতে যাচ্ছে | দীপুর মা তার এই আব্দারে একদম মত দিতে পারেন না……তার কারণ একটাই ……তাঁর তিন ছেলে কেউই সাঁতার জানেনা …খালি ছোট দেওর মোটামুটি জানে | নীলু এবং স্বপ্ন মায়ের অবাধ্য হোতে পারেনা কিন্তু দীপুর জিদের কাছে অবশেষে তিনি হার মানেন |একটা মগ ও বালতি নিয়ে তারা ঝিলের দিকে অগ্রসর হয় |

পাড়ার অনেক ছেলে এবং চৌধুরী বাড়ির চার সদস্য গল্পে -হাসি -ঠাট্টায় মশগুল হোয়ে ওঠে ……আস্তে আস্তে সকলেরই স্নান পর্ব শেষ হোতে চলে আর ঠিক সেই সময়ই দুর্ঘটনাটা ঘটে যায় |স্বপ্ন তার স্নান সেরে ছোট ভাইএর অপেক্ষায় একটা পাথর ঘেঁসে দাঁড়ায় ……বেশ কিছুক্ষণ কাটার পর দীপুকে ডাকতে গিয়ে তার পাটা পিছলে যায় আর সে ঝিলের মধ্যে পড়ে যায় |সঙ্গে সঙ্গে সবাই মিলে ওকে উদ্ধার কোরে তোলে এবং পাশের একটা চাতালে শুইয়ে দেয় | পাড়ায় খবরটা তড়িত্ গতিতে ছড়িয়ে পড়ে ……চৌধুরী পরিবারের সকলে ছুটে আসে তাদের স্বপ্নময়ের কাছে কিন্তু ঈশ্বরের কি লীলা ……এরই মধ্যে যা ঘটার ঘটে যায় ……ডাক্তার এসে ওকে মৃত বলে ঘোষণা করেন ……সাঁতার না জানার জন্য ভয়ে তার হৃদযন্ত্র থেমে যায়|

নিয়তির অমোঘ আদেশে স্বপ্নময়ের জীবনের সব স্বপ্ন বৃথা হোয়ে যায় ………!!!!!!

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.