রাগ দরবারী


রিমঝিম বর্ষাধারা নিয়েই আজ সকাল হলো। চোখ খুলে বর্ষা দেখে শ্রাবনধারায় স্নান করে সবুজ প্রকৃতি আরও সতেজ সবুজ হয়ে যেন হাসিমুখে তাকে সুপ্রভাত জানাচ্ছে। হোক আজ সুপ্রভাত। ১৮ বছর আগে শ্রাবনের এই বর্ষামুখর দিনেই সে পৃথিবীর আলো দেখেছিল, কিন্তু মায়ের কোল পায় নি। বাবার কোল থেকেও থেকে গেছে বঞ্চিত। শ্রাবনের সেদিনের ঘনঘটা তার জীবনের সাথে যেন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে গেছিল।

" উঃ "...কোমরে হাত দিয়ে ব্যথায় কাতর হয়ে সোফার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো বনিতা।নিউজ পেপার থেকে চোখ তুলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইলো সাগর। বনিতার চোখে মুখে ব্যথার ছাপ দেখে " মা, শিগগির এসো ", চিৎকার করে রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত সতীদেবীকে ডেকে উঠলো।ষাটোর্দ্ধ সতীদেবী রান্নায় ব্যস্ত ছিলেন। ছেলে দশটার মধ্যে খেয়ে অফিসে বেরোবে। ডাক শুনে গ্যাস অফ করে তড়িঘড়ি ড্রইংরুমে হাজির হলেন। পুত্রবধূ বনিতা এই প্রথম প্রেগন্যান্টএল। ডক্টরের হিসেবে আরও পাঁচদিন পরে ডেলিভারি ডেট। কিন্তু বনিতার মুখের দিকে চেয়ে আর হাবভাব দেখে ছেলেকে তাড়াতাড়ি গাড়ী বের করতে বললেন। নিজে কিছু জরুরী জিনিশপত্র নিয়ে তৈরী হয়ে গেলেন। সকাল থেকে আকাশে ঘনঘটা। মাঝেমাঝেই বিদ্যুতের চমক আর আওয়াজ চমকে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে তেড়েফুঁড়ে বৃষ্টি আসবে। একবার আকাশের দিকে একনজর তাকিয়ে গাড়ীর চাবি নিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে যায় সাগর। সতীদেবী বনিতাকে ধরে আস্তে আস্তে নামিয়ে আনলেন। গাড়ীতে উঠে স্টার্ট দেওয়ার মুহূর্তে গর্জে উঠলো মেঘ। মা বললেন," গাড়ী সাবধানে আর আস্তে চালিও সাগর "। অঝোরধারায় বৃষ্টি নামলো। বনিতা দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা সহ্য করার চেষ্টা করছে। কড়...কড়... কড়াৎ...কর্কশ আওয়াজ করে কাছেই কোথাও বুঝি বাজ পড়লো। বনিতা চমকে শাশুড়িমায়ের কাঁধে এলিয়ে পড়লো। সস্নেহে জড়িয়ে ধরলেন পুত্রবধূকে সতীদেবী। সাবধানে গাড়ী চালিয়ে নার্সিংহোমে পৌঁছালো তারা। গাড়ী থেকে নেমেই মাকে নামতে বলে বনিতাকে ধরে নামাতে যায়। অর্দ্ধচেতন চোখবোজা বনিতাকে দেখে ঘাবড়ে যায় সাগর। ছুটে গিয়ে স্ট্রেচারের ব্যবস্থা করে নিয়ে আসে। বনিতাকে নার্সিংহোমের ভেতরে এনে ডক্টর সিংকে খবর দেয়। তাঁর আন্ডারেই এতদিন চেক আপ করাতো বনিতা। তিনি এসে বনিতাকে দেখেই তাড়াতাড়ি ওটিতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। " ডক্টর, ভয়ের কিছু নেই তো?" ব্যাকুল স্বরে জিজ্ঞেস করে সাগর। ডক্টর কোন জবাব না দিয়ে ওটিতে ঢুকে পড়লেন। মাথায় হাত দিয়ে বারান্দার চেয়ারে বসে পড়ে সাগর। পাশে বসে কাঁপা কাঁপা হাতে মা ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে নির্বাক সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন।

প্রায় দু' ঘন্টা পর নার্স এসে নবজাত শিশুকে সতীদেবীর কোলে দিয়ে বললো," মা, ঘরে লক্ষ্মী এসেছে"। সাগর ব্যগ্র হয়ে জিজ্ঞেস করে," বনিতা কেমন আছে? " নার্স কোন জবাব না দিয়ে চলে যায়। ডক্টর সিং বেরিয়ে আসেন, " সরি সাগর, বনিতাকে আমাদের মাঝে ধরে রাখতে পারলাম না।" প্রবল ঝড়ে উপড়ে যাওয়া গাছের মত সাগর মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। আর সতীদেবী কোলের শিশুকে বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন।

দরজায় আওয়াজ শুনে চমকে চোখ মেলে বর্ষা। এতক্ষণ চোখ বন্ধ করে সে তার দিদার মুখ থেকে শোনা ১৮ বছর আগেকার ঘটনায় হারিয়ে গেছিল। সবকিছু যেন তার চোখের সামনে ঘটে যাচ্ছিল। এখন দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে দিদা আর তাঁর পেছনে কাজের মেয়ে প্রমীলাদি চায়ের ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে। " এসো দিদা, ভেতরে এসো", দুর্বল স্বরে বর্ষা দিদাকে ডাকে। প্রায় মাসখানেক টাইফয়েডে ভুগে সবে সেরে উঠেছে সে। সতীদেবী এসে বিছানায় বসলেন," শরীর কেমন লাগছে মা এখন?" বর্ষা কিছু না বলে দিদার কোলে মুখ গুঁজলো। তাকে জন্ম দিয়েই মায়ের চলে যাওয়া বাবা কিছুতেই মেনে নিতে পারে নি। তীব্র বিতৃষ্ণায় তার মুখও দেখে নি বাবা আজ পর্য্যন্ত। এই দিদায় মাহারা আর বাবা থেকেও না থাকা বর্ষাকে পরম স্নেহ আর মমতা দিয়ে এত বড়টি করে তুলেছেন।

সাগর আকাশে মেঘের ঘনঘটা দেখতে দেখতে ১৮ বছর পেছনে চলে যায়। আজ আবার সেই ২৮শে শ্রাবন। এই দিন তার পরম প্রাপ্তির সাথে চরম বিচ্ছেদের দিন। তার প্রিয়তমা জীবনসঙ্গিনী তাকে চিরদিনের জন্য ছেড়ে চলে যায় আজকের দিনে। যে দিনটা খুশীর আলোতে ঝলমল করে ওঠার কথা সেই দিনটাতে হঠাৎ করে যেন গ্রহণ লেগে যায়। গাঢ় অন্ধকারে ডুবে যায় সাগর। আর এই অপরাধের জন্য সম্পূর্ণ দায়ী করে বসে নবজাতিকাকে। আজ পর্য্যন্ত মাফ করতে পারে নি।

সময়ের প্রলেপে ক্ষত ভরে আসছে। মাঝমাঝে মন নরম হয়ে যায়.... কার মত হয়েছে সে.... মা? না বাবা? মন দ্বন্দ্বে দ্বিধা হয়। একবার বুকে জড়িয়ে ক্ষমা করে দেওয়ার ব্যাকুলতা জাগে। আজ তার জন্মদিন। আজ সাগরের দানব মনটা মানব মনের কাছে হার মানে বুঝি।

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.