সৌভাগ্যবতী


এইচ এসের রেজাল্ট বেরোনোর আগেই নন্দিনীর জীবনের ফল বেরিয়ে গিয়েছিল বোধহয়, তাই শত ইচ্ছেকে বুকে দমিয়ে রেখে লালচেলি আর সিঁন্দুরের রাঙিয়ে নিতে হয়েছিল নিজেকে। মা বলেছিল, "এই তো ঢের পড়েছিস,এবার বাবাকে মুক্তি দে,বিয়ের পর শ্বশুরঘর গিয়ে পড়িস।আর তা ছাড়া মেয়েদের বেশীদূর লেখাপড়া শিখেই বা কি হবে,সেই তো ছেলে মেয়ের প্যান্ট পরিষ্কার করতে হবে"
কিছুক্ষণের মধ্যেই মা কে ভীষণ অচেনা লেগেছিল নন্দিনীর।
বাবা তো আগেই তাকে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জানাবার প্রয়োজন টুকু বোধ করেনি। তবুও চোখাচোখি হতে বাবা বলেছিল,"সুখী থাকবি মা,ছেলে সরকারি চাকুরে,তোর কোনো অভাব হবে না, চার লক্ষ টাকা দিয়ে সেরা বর খুঁজে এনেছি"
আর কিছু বলা যায় না,শুধু মেয়ে হয়ে কেন জন্ম দিয়েছিল ভগবান তার নিশ্বব্দ কৈফিয়ত চেয়েছিল দেওয়ালে টাঙানো নিশ্বব্দ ছবি গুলোর কাছে। কোনো উত্তর পাইনি নন্দিনী। যেমন পাইনি কিশোরের কাছে। নন্দিনীর বিয়ের কথা শুনে একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সে বলেছিল যে সে নিরুপায়, ছেলেদের জীবনে এস্টাব্লিশট হতে অনেক সময় লাগে। তার পথ দেখার চেয়ে বিয়ে করে শশুর ঘর করাই তার পক্ষে ভাল।
যতটা সহজ ছিল কিশোরের পক্ষে এটা বলা ততটা সহজ ছিল না নন্দিনীর তা মেনে নেওয়া। তবে তার বিচার চাইবে কার কাছে।
একদিন ভাল দিন দেখে বাগদান হয়ে গেল। হয়ে গেল টাকার লেনদেন। তবুও সবাই খুশি। কেউ জানল না যে নন্দিনী কি চাই। পরদিন সালোয়ার পরতে গিয়ে প্রথম বাধা দিল মা, "ওগুলো আর পরিস না, এবার থেকে শাড়ী পরা অভ্যেস কর"
বারো হাত শাড়ী যেন একটা অজগরের মত সারা শরীর পেঁচিয়ে ধরল নন্দিনীর,বল্লল তোমার মুক্তি নেই।
বিকেলে বাবা একটা খদ্দের দেখে বেচে দিল নন্দিনীর প্রিয় সাইকেল টাকে। সবাই বল্লল ওটা দিয়ে আর কি হবে বিয়ের পর নন্দিনী সাইকেল চালাবে নাকি,সে তো বরের বাইকের পিছনের সিটে সওয়ারী টুকু হবে মাত্র। তার ডানা রেখে কি লাভ। সাইকেল বিক্রির টাকাটাও যুক্ত হল বরযাত্রী দের আপ্যায়নের খরচের খাতায়। বিয়ে হল নন্দিনীর। সাত পাক ঘুরে, অগ্নি সাক্ষী রেখে। বিয়ে করে নতুন বউ সেজে প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি এল সে। শাশুড়ির পায়ে হাত রেখে প্রণাম করতেই শাশুড়ি আর্শিবাদ দিলেন, "সৌভাগ্যবতী হও।"
তখন কথাটার মানে বুঝতে পারেনি নন্দিনী, বুঝেছিল ফুলশয্যার রাতে। শিক্ষিত, সরকারী চাকুরে বর কে বন্ধু ভেবে বলেছিল তার মনের কথা, বলেছিল সে আরো পড়তে চাই।
নরম গোলাপ পাপড়ি মাড়াতে মাড়াতে আর নন্দিনীর সতীচ্ছদ রক্তে ভাসাতে ভাসাতে বর বলেছিল,"আর পড়ে কি হবে,
বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ঘর সামলাও।
চোখের কোন দিয়ে জল গড়িয়ে পড়েছিল নন্দিনীর। তবে তার কোন যন্ত্রনার তা কেউ বোঝেনি। পরদিন সকালে সবাই ভেবেছিল সে সৌভাগ্যবতী। বছর ঘুরতেই তার স্বপ্ন চাপা পড়ে মা হল নন্দিনী।
এক অনাবিল আস্বাদ। বুকে জড়িয়ে জুড়িয়েছিল তার জ্বালা।
লোকে বল্লল সে সৌভাগ্যবতী। নেশার অভ্যাস আগেই ছিল নন্দিনীর শিক্ষিত বরের, ছেলে হবার পর নন্দিনীর উপর তার যেটুকু শারীরিক খিদে ছিল তাও ফুরিয়ে এল। নন্দিনী অপাংক্তেয় হল। তার উপর চল্লল শারীরিক অত্যাচার। লোকে বল্লল এটা তার দোষ, সে তার সৌভাগ্য ধরে রাখতে পারেনি।
একদিন বিষ মদে প্রাণ গেল নন্দিনীর বরের। বিধবা হল সে। লোকে বল্লল তার নাকি কপাল পুড়ল। সরকার তাকে দিল বেশ কিছু টাকা আর একটা সরকারি চাকরী। স্বামীর সৌভাগ্যের ক্ষতিপূরণ বাবদ।
নন্দিনী কাজে যোগ দিয়ে আবারো শুরু করলো তার অসমাপ্ত শিক্ষা।
সে ভাবতে পারেনি লোকের দেওয়া সৌভাগ্যবতীর হওয়ার আর্শিবাদ এত দেরী করে কাজ করবে।এত দেরী করে পাবে তার মুক্ত আকাশ।


***************************

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.