হতভাগীর জীবন


( পর্ব - ১)

নীলিমার বিয়ে হয়েছিল এক মস্ত ধনী পরিবারে। স্বামী ব্যাবসায়ী। তার শ্বশুর সংসার ও ব্যাবসার সমস্ত দায়িত্ব সুযোগ্য পুত্রের হাতে দান করে অবসর জীবনযাপন করছিলেন। বাড়ির বাইরের কোনো কাজের জন্য তাকে যেমন কোনোদিন যেতে হয়নি, তেমনি বাড়ির কোনো কাজ তাকে করতে হয় না। বাড়িতে দুজন পরিচারিকা ছিল, তারাই সমস্ত কাজ করতো। স্বামী, সন্তান, শ্বশুর-শ্বাশুরী নিয়ে তার সুখের সীমা ছিল না। আদরের একমাত্র বৌমার কোনো কষ্ট হতে দিত তার শ্বশুর-শ্বাশুরী। তাদের মতে বৌমা ঘরের লক্ষী, সে বাইরে গেলে লক্ষীও যে বাড়ির বাইরে চলে যাবে। নীলিমাকে ঘিরে সমস্ত দিন আনন্দে মেতে থাকতো তারা। কিন্তু হতভাগীর কপালে এত সুখ চিরদিন টিকলো না। তখন নীলিমার দ্বিতীয় সন্তানের বয়স ছয় মাস। একদিন সকালে তার স্বামী জানায় তার কাশির সঙ্গে রক্ত উঠছে। পরীক্ষা করে ধরা পড়ে তার ম্যালিগন্যান্ট লাংস ক্যানসার হয়েছে। অল্প বয়স থেকে প্রচন্ড সিগারেট খেতেন তিনি। বোধহয় সেই কারণেই হয়েছিল। এই ঘটনায় পরিবারের সকলের মুখে যেন কালো ছায়া নেমে আসে। ক্যানসার নিরাময় অসাধ্য। তবুও প্রথাগত নিয়ম অনুযায়ী রুগীর চিকিৎসা শুরু হয়। শুরু হয় কেমোথেরাপি। যেখানে সেখানে অজস্র অর্থ ব্যায়ে নিঃশেষ হয়ে যায় গচ্ছিত সম্পত্তি। তারপর হাত পড়ে ব্যবসার পুঁজিতে। কিন্তু তাতেও শেষ চেষ্টার অর্থ জুটলো না। নিরুপায় হয়ে দোকান বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু তার স্বামী সুস্থ হয়ে উঠলো না। প্রায় এক বছর পর সমস্ত সঞ্চিত সম্পত্তি নিঃশেষ করে, পরিবারকে সর্বশান্ত করে বিদায় নেয় সে। দীর্ঘ দিন অসুস্থ সন্তানের পেছনে ছুটে বৃদ্ধ বাবা-মাও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এখন তাদেরও চিকিৎসার প্রয়োজন। কিন্তু চিকিৎসা যে করবে, হাতে টাকা কোথায় ? সবই তো ঢেলেছে স্বামীর পেছনে। দুবেলা দুমুঠো খাবার জোটেনা, আবার চিকিৎসা। বাধ্য হয়ে পাড়ার একটি বাড়ির পরিচারিকার কাজ করতে থাকে সে। সেখান থেকে যে বেতন পায় তাতে রুগীর পথ্য কিনতেই ফুরিয়ে যায়। ফলে ছেলেদের পড়াশুনার উপকরণ আর যোগান হয়ে ওঠে না। বড়ো ছেলেটির বয়স দশ বছর। সে পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে কাজ করে। নীলিমার বড়ো সখছিলো তাকে ডাক্তার বানাবে। ছোট ছেলে যেকোনো দিন মেঝেতে নামেনি আজ সে সারাদিন ধূলায় গড়ায়। প্রায় বছর খানিক পর তার শ্বশুর-শ্বাশুরী মারা গেলে তিনতলা ভিটেবাড়ি বিক্রি করে বাপের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয় সে।

( পর্ব - ২ )

নীলিমার শ্বশুরবাড়ি থেকে বাপের বাড়ির দূরত্ব যথেষ্ট। বাড়ি থেকে বেরিয়ে বেশ খানিকটা পথ পায়ে হেটে যাওয়ার পর বাস ধরে স্টেশনে পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে ট্রেনে প্রায় আটঘন্টার রাস্তা। সেখান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার প্রশস্থ নদী অতিক্রম করে তার বাপের বাড়ি। এত দূরের পথ, তার ওপরে বাড়ি থেকে বেরোতে দেরি হয়েছে তার। সমস্ত গুছিয়ে বাড়ি থেকে বের হতেই বিকাল তিনটে। কাঁধে দুখানা বড়ো ব্যাগ, কোলে ছোট ছেলেটি। এত দূরের পথ হেটে যেতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল তার। পোশাক ঘামে ভিজে গিয়েছে। চুল উস্কোখুস্কো। মুখে আভিজাত্যের ছাপ বিশেষ নেই। বড়ো ছেলেটি খালি হাতেই পথ চলছিল। মায়ের কষ্ট দেখে সে বললো "মা, আমাকে বড়ো ব্যাগটা দাও"। নীলিমা বললো "না থাক। তুমি নিজে চলো। তুমি নিতে পারবে না"। সে বললো "পারবো মা। তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে। ঘেমে গিয়েছো তুমি"। সে বড়ো ব্যাগটি নেওয়ার জন্য টানাটানি করলে নীলিমা তার ছোটো ব্যাগটি দেয়। সেটিকে ঘাড়ে ঝুলিয়ে কোনোক্রমে বাসস্ট্যান্ডে এসে পৌঁছায় তারা। সেখানে দাঁড়িয়ে নীলিমা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলো সে হাঁপাচ্ছে। গায়ের জামাটি ঘামে ভেজা। ছেলের মুখের দিকে মন খারাপ হয়ে গেল তার। ছেলেকে কাছে টেনে শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিল। হাত দিয়ে মাথার চুল ঠিক করে দিতে দিতে বললো "তোকে বললাম ব্যাগ নিতে হবে না। তাওতো শুনলি না। কত কষ্ট হচ্ছে তোর"। সে বললো "তাতে কী হয়েছে মা ? ভাইকে কোলে নিয়ে এত বড়ো বড়ো ব্যাগ টানতে আরও বেশি কষ্ট হতো তোমার। তুমিওতো ঘেমে গিয়েছো"। নীলিমা ছেলের গালে হাত বুলিয়ে বললো "আমার কষ্টে তুই এত কষ্ট পাস ! তুইতো ছোট। ওতো ভারী ব্যাগ টানা তোর পক্ষে সম্ভব নয়। মা হয়ে কী করে তোর কষ্ট দেখি বল ?" চোখে জল চলে এলো নীলিমার। শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে সে। ছোট ছেলেটি মায়ের কোল থেকে নেমে টলে টলে দু-এক পা হাটছিলো। পাশের পাকুড় গাছের হাওয়ায় তাদের শরীর প্রায় জুড়িয়ে এসেছে। এমন সময় বাস আসতে দেখে ছেলেকে কোলে তুলে নেয় নীলিমা । দুখানা বড়ো ব্যাগ থাকায় বাসের কন্ডাক্টর একদম পেছনের সিটে জায়গা দেয় তাদের। বাসের করে যাতায়াত তার একদম পছন্দ হয় না। শরীর খারাপ হয়, বমি হয়, সমস্ত দিন মাথা ভার হয়ে থাকে। তার ওপরে একদম পেছনের সিটে ঝাঁকুনি আরও বেশি। তবু নিরুপায় হয়ে উঠতেই হলো। সন্ধ্যা সাতটায় ট্রেন শেষ ট্রেন। যে করেই হোক ওই ট্রেন ধরতেই হবে। এই বাস ছেড়ে দিলে অসুবিধা হয়ে যাবে। বাসটি বেশ ভালোই আসছিল। কিছুদূর আসার পর বাসটি হটাৎ থেমে যায়। কিছুক্ষন আগে এখানে ঝড় হয়েছে সেকারণে গাছ ভেঙে রাস্তা বন্ধ হয়ে আছে। গাছ সরিয়ে আবার বাস ছাড়তে প্রায় এক ঘন্টা দেরি হয়ে গেল। অনেক্ষন আগেই সূর্য অস্তগিয়েছে। তার হাতেও ঘড়ি নেই। সে ভাবতে শুরু করলো ট্রেন হয়তো সে পাবে না। পাশের এক ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলো "ও দাদা, কয়টা বাজে এখন ?" তিনি বললেন "প্রায় সাতটা"। সে মনে মনে ঠিক করে নিলো, ট্রেন হয়তো সে পাবে না তবে কেউ না কেউ ওই ট্রেন ধরার জন্য ওই স্টেশনে নামবেই। তার সাথে গল্প করেই রাত কাটিয়ে দেবে সে। কিছুক্ষন পরে বাস থেকে নেমে ছোটো ছেলেকে কোলে নিয়ে পাগলের মতো ছুটতে থাকে স্টেশনের দিকে। প্লাটফর্মে উঠে দেখতে পেলো কোনো একটা ট্রেন প্লাটফর্ম ছেড়ে বহুদূর চলে গিয়েছে। শুধু তার পেছনের অংশটুকু ছাড়া বাকি কিছুই নজরে আসছে না। ট্রেনটিকে দেখে তার মুখে কালো ছায়া নেমে এলো। পাশে দাড়িয়ে থাকা একজনকে জিজ্ঞাসা করলো "দাদা, শিলিগুড়ি যাওয়ার ট্রেন কখন ?" সে বললো "এইতো চলে গেল। আজ আর ট্রেন নেই। কাল সকাল আটটায় আবার ট্রেন আছে"। কথাটা শুনে নীলিমার বুকের মধ্যে ধড়াস করে উঠলো। পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখলো ওই বাস থেকে সে ছাড়া আর কেউ নামেনি। প্লাটফর্মেও বেশি লোক নেই। যারা আছেন, তারা কেউ দূরযাত্রী বলে মনে হলো না তার। ব্যাগ প্লাটফর্মে রেখে একটি গাছের নিচে বসলো তারা। রাত দশটার পর একটি ট্রেন এলে প্লাটফর্ম একদম নির্জন হয়ে গেল। নীলিমার কেমন ভয় হতে শুরু করলো। ছোট প্লাটফর্ম, রেল পুলিশ দুজন আছেন ---- তারাও রাত দশটায় প্লাটফর্ম নির্জন হলে সেখান থেকে চলে গেল। প্লাটফর্মে বেশি লাইটপোস্ট নেই। কেবলমাত্র টিকিট কাউন্টারের সামনের লাইটটি জ্বলছে। সে ভাবলো সেখানে গেলে হয়তো নিরাপদে থাকতে পারবে। ব্যাগ নিয়ে সেখানে গিয়ে বসে তারা। তবু সেখানেও কোনো লোক নেই। টিকিট কাউন্টার অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। নীলিমা বিধবা হলেও তার বয়স চৌত্রিশের বেশি নয়। আর্থিক অনটনে আভিজাত্যের ভাব চলে গেলেও যৌবনের ছাপ ঠিক ফুটে ওঠে। তার রূপের ছটা আজও কোনো যুবককে আকৃষ্ট করবে। এরকম নির্জনে তাকে কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে না দিলেও, তার সর্বনাশ করার লোকের অভাব নেই। কেউ তাকে স্ত্রী হিসাবে মেনে না নিলেও তার সাথে দেহ-সুখ মেটাতে অনেকেই ছুটে আসবে। চারদিক ঘন অন্ধকার, কিছু দেখার উপায় নেই। দূরে কুকুরে ঘেউ-ঘেউ করছে। নীলিমার কেমন যেন ভয় হতে শুরু করে। ছোট ছেলেকে কোলে নিয়ে সেখানেই বসে পড়ে সে। বড়ো ছেলেটি একটি চাদর বিছিয়ে মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। কিন্তু নীলিমার চোখে ঘুম এলো না।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.