আক্ষেপ


তখন কলেজে এর ২ন্ড ইয়ার, সাল ২০১১ . পরীক্ষা শেষ , ঠিক করলাম কলকাতা ঘুড়বো , কলকাতা কে জানবো . ব্যাস পকেটে সামান্য টাকা নিয়ে ট্রেন এ শিয়ালদাহ তার পর পায়ে হেটে কলকাতা ঘোরা, এই ছিল আমাদের রুটিন . বাগবাজার , শ্যামবাজার , শোভাবাজার রাজ্বাড়ি , আলিপুর zoo কিছুই বাদ রাখিনি. অবশেষে জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ি . পকেট এ দুই বন্ধুর মিলিয়ে ৫০ - ৬০ টাকা . শিয়ালদাহ থেকে হেঁটে গিয়ে পৌঁছালাম জোড়াসাঁকো এর ঠাকুর বাড়ি . ঠাকুর বাড়ি ঘুড়ে বেড়িয়ে বাইরে থেকে ছোট্ট ক্যামেরা বের করে ছবি তুলছি হঠাৎ পিছন থেকে একজন বললেন আমার একটা ছবি তুলে দেবেন? দুই বন্ধু ঘুরলাম বয়স প্রায় ৬০ এর কাছাকাছি মনে হলো . ঠাকুর বাড়ির দালানে বসে ঠোঙায় মুড়ি খাচ্ছেন, মুখে হাসি নিয়ে আমাদের দিকেই তাকিয়ে . আমরা ছবি তুললাম তার ওনাকে দেখলাম খুব খুশি হলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন আমরা ওনাকে ছবিটা দিতে পারবো নাকি . অভ্ভাস মতো ই- মেইল এড্রেস চেয়ে বসলাম . হেসে বললেন "হাঁ আর দুমাস পরে অবসর নিচ্ছি চাকুরী জীবন থেকে , তার পর কম্পিউটার টা শিখবো. " একটু খারাপ লাগলো শুনে প্রায় ৩০ বছর পরিবারের কাউকে দেখেন নি , গ্রাম এ ইলেকট্রিক নেই ঐ চিঠি মারফৎ কথা . বললেন পরিবারের আরো অনেক কথা , ওনার পরিবার ছবি টা দেখলে খুব খুশি হবে . আমাদের খুব ইচ্ছা থাকলেও ওই সময় ছবিটা দেওয়া সম্ভব ছিল না .মনে মন দু বন্ধুই একটু কষ্ট পেয়েছিলাম হয়তো . এর পর আমাদের কথা শুনলেন , আমাদের নাম , আমার কি করি , কোথায় থাকি , আমাদের কলকাতা ঘোরার গল্প সব শুনলেন মন দিয়ে , আমাদের ওনার থেকে জোর করে মুড়িও খাওয়ালেন , দুই বন্ধুই খুশি হলাম , এরকম মানুষ এর আগে আমার দেখিনি. সন্ধ্যে হয়ে গেছিলো আমাদের বাড়ি ফেরার সময় হয়ে এসেছিলো , দুই বন্ধ বিদায় চাইলাম ওনার কাছে . অবাক করে দিয়ে একটা ১০০ টাকার নোট আমাদের হাতে দিতে চাইলেন , আমরা হাঁ করে মুখ চাওয়া চাওয়ি করছি , বেশ জোরের সাথে নিতে অস্বীকার করলাম আমরা , বললেন "আমি তোমাদের বাবার মতো এটা নিলে আমি খুশি হবো." পকেট এ টাকার যা অবস্থা ছিল তাতে টাকা টা পেলে অনেক কিছু করতে পারবো , তাও আমরা অস্বীকার করলাম , এবার একটা ৫০ টাকার নোট জোর করে আমার পকেট এ গুঁজে দিয়ে বললেন - "কিছু খেয়ে বাড়ি ফিরে যেও". মনে মনে দুজনেই খুশি হলেও সেটা আর প্ৰকাশ করলাম না. বিদায় নিলাম সেই মানুষ তার থেকে , ঠাকুর বাড়ির বাইরে বেরিয়ে দুই বন্ধু আনন্দে কি করবো বুঝে উঠতে পারলাম না. পরামর্শ করে এক সিগারেট এর প্যাকেট কিনলাম. তারপর ট্রাম ধরে সোজ বাগবাজার ঘাট. বসে দুই বন্ধু মনের সুখে সিগারেটে টান দিলাম আর অদ্ভুত মানুষ টিকে নিয়ে আলোচনা করছি , আজ আর বাড়ী ফেরার যেন ইচ্ছেটাই চলে গেছিল দুজনের , হটাৎ আমি বন্ধু কে বললাম "কাকুর নাম টাই জানা হলো নারে ."
দুই বন্ধুই চুপ চাপ বসে রইলাম , উনি নিজের খাবার থেকে খাওয়ালো , টাকা দিলো , সেই টাকা আমরা আনন্দ করছি অথচ ......

নাহ এর পরে অনেক বার গেছি জোড়াসাঁকো তে , আর কোনো দিন দেখতে পাইনি . আস্তে আস্তে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি জীবনে অথচ এই আক্ষেপ টা আজও দুই বন্ধুর রয়ে গেছে. তার শেখার ইচ্ছা , জীবন এ লড়াই করে পরিবার থেকে দূরে থাকা সব কিছুই দুই বন্ধু কে আজও অনুপ্রেরণা দেয় .

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.