চতুরাশ্রম


[এ কাহিনী , কারো-কারো অতিরঞ্জিত , মনে হতে পারে । কিন্তু না , নির্মম সত্য । স্থান , কাল , পাত্রের নাম পরিবর্তিত এবং গল্পের প্রয়োজনে , কিছু কাল্পনিক সংলাপ ব্যবহার করেছি মাত্র । ]


পর্ব--১


সানাই অফিস থেকে ফিরে ‚ চেঞ্জ করে সবে সোফায় বসেছে |

ঠকাস করে চায়ের কাপটা টেবলে রেখে ‚ পাশের চেয়ারে বসল কুহু |

বাবা ‚ আজ যে একেবারে মেঘ না চাইতেই জল ? অন্যদিনতো বার তিনেক বলার পরে চা আসে | কি ব্যাপার কুহু ? মেজাজটা মনে হচ্ছে খুব একটা শরিফ নেই ‚ বললো সানাই |

না ‚ আমার কিছু হয়নি | এমনি ‚ চা তো দিতেই হবে ‚ তাই একেবারে দিয়েই বসলাম ‚ কুহুর জবাব |

আচ্ছা ? তা বুবলুটা কোথায় ? সাড়াশব্দ পাচ্ছিনা |

ঐতো ম্যাম চলে যাওয়ার পরে ‚ বলে এসেছিলাম ‚ এখন বসে কার্টুন দেখ ‚ এখন আর ঠাম্মির ঘরে যেতে হবেনা | ঠিক তোমার সাড়া পেয়েই ‚ দৌড়েছে ওঘরে ‚ গল্প গিলতে | একটু ঝাঁঝের সঙ্গেই বললো কুহু |

সানাই জিঞ্জেস করলো ‚ তা ঠাম্মির ঘরে গেছে বলে ‚ তোমার এতো রাগের কি আছে ?

সে আর তুমি কি বুঝবে ? ওখানে গিয়ে সেই বস্তাপচা ‚ ঠাকুরমার ঝুলির সেই বেঙ্গমা- বেঙ্গমী ‚ লালকমল -নীলকমল ‚ এইসব গল্প গুলো তোমার ছেলে ‚ জাষ্ট গেলে | বুঝলে ? গিয়ে দেখনা ‚ উনি হাত পা নেড়ে বলছেন ‚ আর তোমার ছেলে হাঁ করে গিলছে | রাগ করিকি সাধে ? মনের ঝাল খানিকটা ওগরালো কুহু |

আচ্ছা কুহু ‚ ঠাম্মাদের কাছেতো ‚ নাতি-নাতনীরা এইসব গল্প শুনতেই যায় | আমরাও ছোটবেলায় ‚ ঠাম্মির কোলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে রাক্ষস ‚ খোক্কসের গল্প শুনতাম |

এতে দোষের কি আছে ,আমিতো বুঝলাম না | আর ওরাওতো একে অপরকে ‚ এই সময়টুকু ছাড়া পায়না |

দেখ ‚ বুবলুতো সকালেই স্কুলে বেরিয়ে যায় | তারপর বাড়ী ফিরে চান ‚ খাওয়া ‚ ঘুম | বিকেলে হোমওয়ার্ক | সব সেরে ‚ এইতো কিছুক্ষণ সময় একটু ফ্রী হয়ে ঠাম্মির কাছে গল্প শোনে | বুবলুরও তো একটু এনটারটেনমেন্ট দরকার ‚ সেটা বোঝনা ?

আর মাওতো সারাদিন একাই থাকে | ঠাকুমা ‚ দিদিমারা ‚ নাতি নাতনীদের খুব কাছে পেতে চায় | একটু আদর ‚ আবদার পুরণ করতে ওরা ভালোবাসে ‚ সেটা বোঝতো ? কুহুকে বোঝালো সানাই |

কুহু এবার আরো ঝাঁঝিয়ে উঠল ‚ তোমার সঙ্গে কথা বলাই দায় | তুমি কি বোঝনা নাকি বুঝেও না বোঝার ভান কর ‚ জানিনা |

আমি তোমায় কি বোঝাতে চাইলাম ‚ আর তুমি কি বুঝলে ?

দেখ ঐ রুপকথার গল্প আর রাক্ষস- খোক্কসের গল্প ‚ কোনটাই বুবলুর স্কুলে কোন কাজে লাগবেনা |অকারণ এই আজগুবি গল্পগুলো মাথায় ঢুকে ‚ আরো ডাল হয়ে যাচ্ছে ছেলেটা |

বরং আমার মা যে ফেয়ারী টেলস ‚ ইংলিশ রাইমগুলো শোনায় ‚ সেগুলো ওর স্কুলে কাজে লাগে |

তোমার মায়ের জন্যে ‚ আমি , আমার মাকে আসতে বলতেও পারিনা | সেটাতো বোঝ ?

কেন ? আমার মা ‚ তোমার মায়ের সঙ্গে কি এমন করে যে ‚ তুমি তাঁকে আসতে বলতে পারনা | তুমিতো জানো ‚ আমার মা অত্যন্ত নিরীহ প্রকৃতির | কারো সাতে ‚ পাঁচে থাকেনা |

কুহু তাড়াতাড়ি কথাটা ঘুরিয়ে বলে ‚ না মানে ‚ এক জায়গায় দুজন বয়স্কা মানুষ থাকলেতো ‚ খরচও অনেক বেশী ‚ তাইনা ? দেখ সেই জন্যেই তো মায়ের এত কষ্ট জেনেও ‚ মুখ বুজেই থাকি |

কেন ‚ তোমার মায়ের কষ্ট কেন ? তোমার দাদা ‚ অতো ভালো ব্যাঙ্কের ,একাউণ্টে কাজ করে | আমার চেয়েও বেশী আর্ণ করে | তার মায়ের কষ্টের কারণটাতো আমার মাথায় ঢুকছেনা |

আহা ‚ তুমি দেখে বুঝতে পারোনা ? বৌদি একদম মাকে সহ্য করতে পারেনা |

সেটাইতো স্বাভাবিক ‚ এবার হেসে বললো সানাই ‚ তোমার মায়ের স্বভাবতো সবতাতেই খুঁত ধরা ‚ আর সব বিষয়ে সবজান্তার মত জ্ঞান দেওয়া |

তা সেটাতো সবাই সবসময় সয করতে পারেনা | নাকি ‚ তুমিই বল |

থাক ‚ আমার মাকে নিয়ে তোমার আর বিশ্লেষণ করতে হবেনা ‚ গাল ফুলিয়ে উত্তর দেয় কুহু |

এইসময় ‚ বুবলু এসে বাবার গলা জড়িয়ে বললো ‚ জানো বাবাই ‚ ঠাম্মিনা আজ লালকমল- নীলকমলের গল্পটা বললো | আমার খুউউব ভালো লেগেছে |

ছেলেকে জড়িয়ে ধরে ‚ সানাই বলে ‚ কুহু ‚ কথায় কথায় তো রাত হয়ে গেছে | এবার আমাদের খেতে দাও |

দিচ্ছি ‚ বলে কুহু দুপদাপ করে পা-ফেলে ‚ গজগজ করতে করতে রান্নাঘরের দিকে চলল |


পর্ব---২


আজ আবার অফিস থেকে ফেরার সঙ্গেসঙ্গেই কুহু এসে পিছনে দাঁড়ালো | তখন ‚ সানাই জামা প্যান্ট পালটাচ্ছে |

আবদারের গলায় কুহু শুরু করলো ‚ কিগো কিছু ভাবলে তুমি ?

অবাক হয়ে ‚ সানাই বলে ‚ মানে ? কি ভাববার কথা বলছো তুমি ? আমিতো মাথামুণ্ডু কিচুই বুঝলাম না |

ওহো ‚ তুমিনা ......কোন কথাটাকেই গুরুত্ব দিতে চাওনা |

প্লিজ কুহু ‚ পাঁচমিনিট ‚ এক্টু টয়লেট থেকে ফ্রেশ হয়ে আসি ‚ তারপর বলো | তুমি ততক্ষণ আমার চা-টা রেডী কর ‚ বলেই সানাই টয়লেটে ঢুকে গেল |

কুহু ‚ বেজার মুখে ‚ চা করতে গেল |

ফ্রেশ হয়ে আসতেই ‚ চায়ের কাপ নিয়ে এসে ‚ পাশেই বসলো কুহু |

সানাই পেপারটা খুলে চোখ বোলাতে বোলাতে বললো ‚ হ্যাঁ ‚ এবার বল ‚ তুমি কি বলছিলে |

সেই আবদেরে গলায় কুহু বলে ‚ সেই তোমাকে বলেছিলাম না কাল ‚ আমার মাকে এখানে এনে রাখবো ‚ সেকথাই বলছি |

হুঁ , তা এতে ভাবাভাবির কি আছে ? তুমিতো জানো যে এ বাড়ীতে ‚ তোমার কথাই শেষ কথা |

সেতো জানিই ,যে তুমি না করবেনা | কিন্তু তার আগে তোমার মায়ের একটা ব্যবস্থাতো করবে ? বলে উঠলো কুহু |

এবার একটু বিরক্ত হয়েই সানাই বলল ‚ দাঁড়ও দাঁড়াও ‚ আমার মায়ের ব্যবস্থা মানে ? কি বলতে চাইছো ‚ পরিস্কার করে বলতো |

দেখছোতো ‚ আজও বুবলু পড়ার পরেই ছুটেছে ঠাম্মার সেই গাঁজাখুরি গল্পগুলো গিলতে ‚ সেটাইতো বলতে চাইছি আমি |

এবার কুহু আরো একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে , শোননা ‚ আজকালতো কাগজে কত ভালো ভালো জায়গার বিজ্ঞাপন থাকে ‚ তুমি দেখনি ?

বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের জন্যে কত ভালোভাবে থাকার ব্যবস্থা করেছে সব | বেশ শান্ত পরিবেশে ‚ নিরাপদ আশ্রয় ‚ যাকে বলে আরকি |

বেশ গ্রাম্য পরিবেশেও আছে | সেখানে খরচও খুব বেশী না | তোমার মায়েরতো খুব গাছপালা পছন্দ | বেশ ওরকম কোন জায়গায়...........

সেকি কুহু ? তুমি এত ইনিয়েবিনিয়ে ‚ এতোক্ষণে মনের আসল ইচ্ছেটা প্রকাশ করলে , না ?

তুমি আমার মাকে বৃদ্ধাশ্রমে দেওয়ার প্ল্যান করছো ? তুমি কি করে ভাবলে ‚ আমি তোমার এই সাংঘাতিক আবদার মেটাব |

ওঃ সত্যি এইজন্যেই বলে স্ত্রীয়াশ্চরিত্রম , দেবা ন জানন্তি মনুষ্য কুতোঃ ?

আহা শোনইনা ‚ ওখানে ওনাদের দেখাশুনা করার জন্যে আলাদা লোক আছে ‚ নিয়মিত চেক আপ হয় | বাড়ীতে আমরা অতোটা করতে পারিনা | তুমি নিজের মনে একটু ভেবেই দেখনা | আমি কিন্তু প্রস্তাবটা ভালো দিয়েছি |

সানাই রাগটাকে চেপে শুধু বললো ‚ শোন কুহু ‚ আমি মায়ের একমাত্র সন্তান | ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছি | এই মা আমাকে ‚ জমানো টাকা দিয়ে কত কষ্ট সহ্য করে তিলতিল করে বড় করে তুলেছে | এই ফ্ল্যাটটা কেনার সময় ‚ মায়ের শেষ সম্বল যাকিছু ছিল ‚ সব আমার হাতে তুলে দিয়েছে |

আর আজ ‚ তুমি তোমার মাকে আনবে বলে ‚ আমার মায়ের ঘরটাকে খালি করে দিয়ে ‚ তাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাবে বলে ঠিক করেছ ?

তুমি কি ভেবেছ ? তোমার সব কথা রাখি বলে ‚ এই জঘন্যতম অপরাধটাও তুমি আমাকে দিয়ে করাতে চাইছ | ছিঃ ছিঃ ........করতে করতে উঠে মায়ের ঘরের দিকে চলল সানাই |

মায়ের ঘরের দরজায় এসেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সানাই ‚ দেখল ‚ মা অনবরত আঁচল দিয়ে চোখ মুচছে আর বুবলু ঠাম্মিকে গলা জড়িয়ে ধরে বলছে ‚ ঠাম্মি তোমার কি হয়েছে ? গল্প থামিয়ে দিয়ে তুমি এত কাঁদছ কেন ?

নারে ভাই কাঁদছিনা ‚ ঐ চোখে কি পড়েছে....... ভাই আজ ঘরে যাও ‚ আজ আর আমার গল্প বলতে ইচ্ছে করছেনা | আমার খুব কষ্ট হচ্ছে |

আচ্ছা ঠিক আছে ঠাম্মি ‚ তোমায় আর গল্প বলতে হবেনা | আমি তোমার গলা জড়িয়ে বসে থাকি ‚ তাহলে তোমার কষ্ট কমে যাবে |

নারে ভাই ‚ ঘরে যা | তোর মা জানতে পারলে আবার রাগারাগি করবে .........এই পর্যন্ত শুনে ‚ সানাই আর থাকতে পারলোনা |

ঘরে ঢুকে বললো ‚ বুবলু ‚ বাবা তুমি এখন একটু ঘরে যাওতো ‚ ঠাম্মির সঙ্গে আমার একটু কথা আছে |

আচ্ছা বাবাই ‚ আমি আসছি ‚ বলে বেরিয়ে গেল বুবলু |

সানাই এবার মায়ের গা ঘেঁষে ‚ মায়ের খাটে বসল |

কিরে ‚ কিছু বলবি ‚ বলে ছেলের মুখের দিকে চাইলেন মানসী |

দেখলেন ‚ ছেলের চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে পড়ছে | নিজের আঁচল দিয়ে চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে বললেন ‚ পাগল ছেলে |

মাকি কারো চিরজীবন থাকে ? কুহুতো ঠিকই বলেছে | ওর কথায় রাগ করছিস কেন ?

সত্যিইতো কুহুর মা কত কষ্ট পাচ্ছে ও বাড়ীতে | তুই ওর কথায় রাজী হয়ে যা | জানিসতো ‚ আমার কোন মোহ নেই |

তুই নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছিস ‚ তোর নিজের থাকার জায়গা হয়েছে | ব্যাস , এতেই আমি সুখী |

আমি ওখানে ভালো থাকবো | আর দাদুভাই ? ও দেখবি আম্মিকে পেয়ে ‚ কদিনপরে আমাকে ভুলে যাবে |

আর আমার এই পুরণো রুপকথার গল্প , সত্যিই হয়তো ওর মাথাটা খারাপ করে দিচ্ছে | ওগুলোতো ওদের স্কুলেও কোন কাজে লাগবেনা |

বরং ওর আম্মি ইংলিশ গল্প ‚ ছড়া শেখালে ‚ সেগুলো স্কুলে পরীক্ষার সময় দরকার হবে |

সানাই এবার মাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল | তার মানে ‚ তুমি কাল থেকে সবই শুনেছ ?

আমি তোমাকে ছেড়ে কি করে থাকবো ‚ সেটা বলে দাও মা |

শোন পাগল ছেলের কথা | তোরাতো আস্তে বলিসনি ‚ আমি কেন ‚ দাদুভাইও হয়তো শুনতে পেয়েছে | তবে শিশুতো ‚ ও ঠিক বোঝেনি ব্যাপারটা | আর আমাকে ছেড়ে থাকতে থাকতে অভ্যেস হয়ে যাবে দেখবি | তখন দিনান্তে আমার কথা ভাবার সময়ই পাবিনা |

ছেলে বড় হবে | তার পড়াশুনার চিন্তা ‚ তারপর সাংসারিক চিন্তা ‚ সব ভুলে যাবি বাবা | মন খারাপ করিসনা |এখন থেকে মনে করবি ‚ মা নেই.....

মাগো......... বলে চিৎকার করে কেঁদে দৌড়ে ঘরে চলে গেল সানাই |


bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.