পর্ব এক ঃ- অলস দিবানিদ্রা

সকালের পেপারটি বাড়দূয়েক খুঁটীয়ে পড়ে সতীশ যখন আরেক পত্তন ঘুম দেবার চেষ্টা করছে তখন সুচরিতা দুম দুম করে পা ফেলে ঘরের মধ্যে ঢুকল আর তাকে উদ্দ্যেশ্য করে বলল “ এই যে মহারাজ আবার কি ঘুমোবার তোরজোড় হচ্ছে নাকি? তুমি পারো বটে, সারাদিন এতো ঘুমাও কি করে? এখন চলো দেখি নীচে চলো কাজ আছে” কথা কটি বলে দিয়ে সে যেমন করে এসেছিলো আবার তেমন করেই চলে গেল। সতীশ একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ঊঠে দাঁড়াল আজ সকালে আর তার কপালে ঘুমানো নেই, অগত্যা গেঞ্জি ছেড়ে ভালো শার্ট আর প্যান্ট পড়ে নীচে নেমে এলো, নীতীশ টেবিলে বসে ব্রেকফাস্ট করছিল হেঁসে বলল “আজকের মর্নিঙটা বিশেষ গুড নয় মণে হচ্ছে” সতীশ বলল “কি আর করি বৌদির আদেশ সে তো মাতৃআজ্ঞ্যারই সমান, তা কি না মেনে পারা যায়?” দুজনেই হেঁসে উঠলো আর তখনই সুচরিতা এসে ঘড়ে ঢুকেই বলল একি তুমি এখনো রেডি হও নি যাও তাড়াতাড়ি মুখ হাত ধুয়ে ব্রেকফাস্ট করে নাও, আজ মিলিকে তুমি স্কুলে দিয়ে আসবে আমার অফিসে আজ একটা মিটিং আছে একটু তাড়াতাড়ি যেতে হবে” শেষের কথাগুলি সতীশের উদ্দেশ্যে, সে তাড়াতাড়ি মুখ হাত ধুয়ে ব্রেকফাস্ট করে নিলো। সারে আটটা নাগাৎ আপ লোকাল ছারে বজবজ থেকে ওদের বাড়ী নুঙ্গিতে বজবজের একটা আগের স্টপেজ, ষ্টেশন থেকে বড়জোর মিনিট পাঁচেকের রাস্তা, সুচরিতা আর মিলির মান্থলি করা আছে, সতীশ যখন টিকিট কেটে এসে দাঁড়াল তখন ট্রেনের ঘোষণা হয়ে গেছে সে মিলির হাত ধরে সুচরিতার পাশে দাঁড়াল। ট্রেন এলো, এতো ভীড় আর ধাক্কাধাক্কি যে কামরায় উঠতে গিয়ে নাজেহাল অবস্থা ওফ “বৌদি যে কি করে রোজ এই ছোটো মেয়েটাকে নিয়ে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করে!” ট্রেনে উঠে সতীশ দেখল যে সুচরিতা এই ভিড়ের মধ্যেও একটা বসার যায়গা পেয়েছে, আবার তার আর মিলির বসার জন্যও একটা যায়গা পাশে রেখেছে। সে হাত নেড়ে ডাকল “এইযে এইদিকে” সতীশ মিলির হাত ধরে ভীড় ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছিলো হঠাত কার সাথে ধাক্কা লাগলো আর সঙ্গে সঙ্গে তীক্ষ্ণ নাড়ি কণ্ঠের চীৎকার আর তার সাথে সাথে তীব্র ভৎষনা কানে এলো এর লক্ষ যে সে তা আর সতীশের বুঝতে বাকি রইলো না। সে তাড়াতাড়ি অন্য দিকে সড়ে যেতে গিয়ে আরেক ষণ্ডামার্কা লোকের সাথে ধাক্কা খেলো, লোকটা মুখে একটা অদ্ভুত শব্দ করে বলল “দাদা ঘুড়ীর মোতো একবাড় এদিক একবাড় ওদিকে ধাক্কা খাচ্ছেন কেন ঘুমের রেস এখনো কাটেনি নাকি?” ঘুম সতীশের সকালেই ভেঙেছিল এবার ছুটে গেল লজ্জায় তার কান লাল হয়ে উঠলো, মিলি ততক্ষণে তার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে মায়ের পাশে গিয়ে বসেছে সে সতীশকে ডাকল “কাকু এদিকে” সুচরিতা তরুণীটির দিকে তাকিয়ে বলল “কীছূ মনে করোনা ভাই ওর ট্রেনে বাসে চাপা অভ্যাস নেই তাই, ও জেনেশুনে তোমাকে ধাক্কা দেয় নি” মেয়েটি বলল “ঠিক আছে” আর একটু সড়ে দাঁড়াল। সতীশ মাথা নিচু করে সুচরিতার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে বলল “ মিলিকে কোলে নিয়ে বোশো” সতীশ মাথা নেড়ে না বলল তখন সুচরিতা তার হাত ধরে টেনে বসিয়ে মিলিকে তার কোলে বসিয়ে দিলো চুপি চুপি বলল “তুমি না বসলে অন্য কেউ বসে পড়বে” সতীশ সারাক্ষণ মাথা হেট করে বসে রইলো যেন তাকে ক্লাসে পড়া না পারার জন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছে, একবার ভাবল মেয়েটাকে একবার সরি বলবে কিন্তু মাথা তুলে তাকাতেই পারল না তার দিকে। সুচরিতা টালীগঞ্জে নামে, আর মিলির স্কুল বালিগঞ্জে সে নামর আগে সতীশকে বলে গেল সে যেন একেবারে মিলিকে নিয়ে ফেরে। বালিগঞ্জে নামার আগে সতীশ একবার আড়চোখে মেয়েটিকে দেখার চেষ্টা করল, সে এখন বসার যায়গা পেয়ে গেছে পরনে তুতে কালারের একটা চুড়িদার তার হাতায় আর নিচের দিকে গাড় হলুদ রঙের জড়ির কাজ করা গাড় হলুদ রঙের পায়জামা তার সাথে একটি হলদে সবুজ রঙের ওড়না। হঠাত উপর দিকে তাকিয়েই সতীশ থতমত খেয়ে গেল, মেয়েটি তারই দিকে দেখছে কি চোখ কবিতার বইয়ে সতীশ পড়েছে “কাজলনয়না হরিণী” সতীশের সারা গায়ে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল, সে চমকে উঠলো মিলি বলল “কি হয়েছে কাকু” কিছু না বলে সে মিলির হাতটা শক্ত করে ধরে অন্য দিকে তাকাল। বালিগঞ্জ এসে গেল সতীশ মিলিকে নিয়ে নেমে গেল, মিলি ক্লাসে ঢুকে গেলে সে স্কুলের সামনের মাঠের একটি বেঞ্চিতে বসে বসে ভাবতে লাগলো সত্যিই সে কোন কাজের নয়, সে ট্রেনে বাসে ঠিকমতো চড়তে জানে না, দু বছর হয়ে গেল গ্রাজুয়েশন পাস করেছে অথচ এখনো কোন চাকরি যোগার করে উঠতে পারেনি, নিতান্ত ভাবেই দাদা বৌদির উপর নির্ভর। দাদার যখন বাইশ বছর বয়স তখন বাবা মারা গেলেন দাদা সদ্য গ্রাজুয়েশন পাস করেছে সে চাকরি খুঁজতে লাগলো, সতীশের বয়স তখন আঠারো সে সবে হাইয়াড় সেকেন্ডারি পাস করেছে তার মনে হল এবার বুঝি তার পড়াশোনা বন্ধ করতে হবে বাবার সামান্য কিছু জমানো টাকায় আর কতদিন ও কতদিকের খরচ চলবে? কিন্তু দাদা বলল “না সতু পড়াশুনা শেষ করবে”। অল্পকয়েকদিনের মধ্যেই দাদা এক বেসরকারি অফিসে চাকরি জোগাড় করে নিল তারপর চলতে থাকল দাদার অসাধ্য সাধনের চেষ্টা, দিনের বেলা চাকরি আর বাড়ি ফিরে অনেক রাত অব্দি পড়াশোনা সরকারি চাকরি পাবার জন্য। সে চেষ্টা একদিন সফল হল, দাদা উনাইটেড ব্যাঙ্কে চাকরি পেলেন। বছরখানেক পরে মা মারা গেলেন, দাদা আর বৌদি নিজেরা দেখাসোনা করে বিয়ে করল ওরা দুজনে যেন মেড ফর ইচ আদার। তারপর থেকে দাদা আর বৌদিই বাবা আর মায়ের ঘাটতি পূরণ করে আসছেন সতীশের জিবনে সে কখনো নিজেকে অসহায় বোধ করেনি আজ পর্যন্ত, কিন্তু আজ এক অপরিচিত তরুণীর কাছে তাকে এমনি করে অপদস্ত হতে হল! আচ্ছা কি ভাবছে তার সম্বন্ধে সেই মেয়েটা, সে একেবারে অপদার্থ ট্রেনে বাসে চলতে পারে না, সামান্য সরি বলার ভদ্রতাটাও জানে না, আর লোফার ছেলেদের মত খালি মেয়েদের মুখের দিকে চেয়ে থাকে, উফ কি সাংঘাতিক! না তাকে অন্তত আর একবার মেয়েটার সাথে দেখা করতেই হবে, তাকে সরি বলতেই হবে, আর তাকে বলতে হবে যে সতীশ তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখছিল না। ধুর এসব কি ভাবছে সে, আর কে ওই মেয়েটা তাকে নিয়ে এত ভাবারই বা কি আছে! সামান্য তো একদিন ট্রেনে আলাপ, আলাপ! একে কি আলাপ বলা চলে। এসব ভাবতে ভাবতে সে কখন বেঞ্চিতে শুয়ে ঘুমিয়ে পরেছে সে নিজেই জানে না। তার ঘুম ভাঙল মিলির ডাকে, মিলির ছুটি হয়ে গেছে সে নিজে নিজেই ক্লাস থেকে বেরিয়ে এসে কাকুকে খুজে না পেয়ে শেষে এখানে এসে তাকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখেছে। সতীশ লজ্জায় মরে গেল সে তাড়াতাড়ি কথা ঘোরানোর জন্য মিলিকে বলল “ হ্যাঁরে মিলি তোদের স্কুলে আইস্ক্রিময়ালা বসে না?” মিলি তৎক্ষণাৎ হেঁসে উত্তরদিল“হ্যাঁবসে আমাকে আইস্ক্রিম কিনে দেবে?” “হ্যাঁ দেবো আর আমি নিজেও একটা খাবো” আইস্ক্রিমখাওয়া শেষ হলে সতীশ মিলিকে নিয়ে স্টেশনের দিকে রওনা দিল প্রায় পনেরো মিনিটের হাঁটা পথ, রিক্সা করতে হবে নাহলে দেরটার ডাউন লোকাল টা পাওয়া যাবে না।







পর্ব দুই ঃ- সাড়ে আটটার ট্রেন ফোর্থ কামরা

বাড়ি ফিরে থেকে সতীশের মনটা কেমন কেমন করতে লাগল, সত্যিই তো সে তো সারাদিন তেমন কোন কাজ করে না দাদা আর বৌদি দিনভর কত পরিশ্রম করে, বিশেষ করে বৌদি সকাল থেকে উঠে সবার জন্য খাবার বানানো, মিলিকে স্কুলের জন্য রেডি করা, দাদার জামা কাপড় অফিসের ব্যাগ সব গুছিয়ে রাখা, সবশেষে আবার নিজে অফিসের জন্য রেডি হওয়া। আবার অফিস যাবার সময় মিলিকেও স্কুলে নিয়ে যাওয়া উফ, এত পারে কি করে বৌদি! আর সে প্রায় সারাদিনই হয় ঘুমুচ্ছে নয় নভেল পরছে ডিসগাস্টিং। সতীশ ঠিক করল এবার থেকে সে ঘরের কাজে বৌদিকে হেল্প করবে, সন্ধ্যে বেলায় সুচরিতা বাড়ি ফিরলে সতীশ তার যাকে বলে ল্যাজে ধরল, “বৌদি জল এনে দি, বৌদি আটা মেখে দি, বৌদি মোরের দোকান থেকে তেলেভাজা এনে দি মুরি দিয়ে খাবে” ইতিমধ্যে নীতীশ ফিরে এসেছে সে ব্যাপার দেখে একটু ঘাবড়ে গেল, সুচরিতাকে আড়ালে ডেকে জিজ্ঞেস করল “ব্যাপার কি আজ হঠাৎ রাতে সূর্যোদয়” সুচরিতা হেঁসে সংক্ষেপে ব্যাপারটা স্বামীকে বলল। নীতীশ মিথ্যা গাম্ভীর্য দেখিয়ে বলল “হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল পার কর এনারে” সুচরিতা হেঁসে ঘরে ঢুকল আর ডাক দিল মিলি এই মিলি। সেদিন রাতে সুচরিতা নীতীশকে জিজ্ঞেস করল “হ্যাঁগো আমদের প্রথম দেখার কথা মনে আছে?” “মনে নেই আবার মার খেতে খেতে বেচেছিলাম কোথায় আমি উপকার করতে গেলাম আর তুমি চোর পকেটমার আরও না জানি কিসব বলে লোক জরো করে আরেকটু হলে আমায় গণধোলাই খাওয়াচ্ছিলে আর কি” “বা সব বুঝি আমার দোষ তুমি কি মুখে একবারও বলেছিলে যে আমার রুমালটা তুমি কুরিয়ে পেয়েছ সেটা দিতে এসেছ, খালি একটা হাত আগে করে পেছন পেছন আসছিলে, আর যা দেখতে ছিল তখন তোমায় ঠিক যেন গুন্ডা” “ ও আমি গুন্ডা আর তোমায় কেমন দেখতে ছিল ম্যাডাম” “খবরদার একদম আমার নামে উল্টোপাল্টা কথা বলবে না আমায় দেখতে বরাবরই ভালো” “ আহা আগে সোনোই না ঠিক যেন” “কি ঠিক যেন কি” “রুপকথার রাজকন্যা” “ ধ্যাত একেবারে অসভ্য” “ তা থাক সবাই সভ্য হয়ে গেলে কি আর চলে আমি না হয় একটু অসভ্যই থাকি” পরম শান্তিতে সুচরিতা নীতীশের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল, নীতীশও তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ঘুমিয়ে পড়ল। পরের দিন সকালে উঠে সুচরিতা সতীশকে বলল “ভাই আজ থেকে মিলিকে তুমিই স্কুলে নিয়ে যাবে আর নিয়ে আসবে তাতে আমাকে অনেকটাই সাহায্য করা হবে, কি পারবে না?” সতীশ বলল “খুব পারব তুমি একদম চিন্তা কোরো না বৌদি আজ থেকে মিলি আমার দায়িত্ব” সুচরিতা হেঁসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। আজ স্টেশনে গিয়েই সতীশ একটা মান্থলি কেটে নিল তারপর মিলির হাত ধরে আগের দিন যে যায়গা থেকে উঠেছিল সেখানে গিয়ে দাঁড়ালো। “স্টেশনে বড্ড ভির এর মধ্যে কি খুজে পাবো মুখটাও তো তেমন ভালো করে দেখিনি” ট্রেন এসে গেল মিলিকে নিয়ে সাতীশ উঠে পড়ল আজকে সে খুব সাবধানে উঠল, কারুর গায়ে ধাক্কা লাগল না। মিলিকে দেখে একজন মাঝবয়স্ক লোক বলে উঠল “এই যে কাকুমুনি এস এস তোমার সিট রাখা আছে, এটা সঙ্গে কে?” মিলি বলল “আমার কাকু” “ও তাই নাকি, আসুন দাদা আজ একটাই সিট রাখতে পেরেছি আপনাকে একটু কষ্ট করে দাড়িয়ে যেতে হবে ব্রেসব্রিজে আমাদের একজন নামবে তখন আপনাকে বসিয়ে দেবো” সতীশ বলল “না না ও বসলেই হবে” “ না না মানে আপনি আমদের মিলি কাকুমুনির কাকু আপনাকে না বসিয়ে আমরা ছাড়বোই না” সঙ্গে সঙ্গে তিন চারজন লোক হেঁসে উঠল যেন ভারি একটা রসিকতা হয়েছে। সতীশ বুঝল যে এরাই সেদিন বৌদি আর মিলির জন্য যায়গা রেখেছিল ডেলি পাসেঞ্জার হওয়ার কিছু সুবিধাও আছে, কিন্তু সে কোথায় তাকে তো দেখা যাচ্ছে না! তবে কি আজ আসে নি। হঠাৎ সতীশের চোখ এক কোণের জানালার পাশের সিটে গেল, জানলায় মাথা রেখে চোখ বুজে আছে সে পরনে আগুন রঙ্গা সারি চুলে ক্লাচার সামনের দিকে দু চারটি হাওয়ায় উড়ছে, কপালে কুমকুম দিয়ে আকা টিপ, চোখে টানা করে কাজল দেয়া, হয়ত ঘুমাচ্ছে। সতীশ মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগল, তার মনে একটা দারুণ আনন্দ আর ভীষণ আসঙ্কা একইসাথে বাজতে লাগল। পাঠকগণ যারা নিজের নিজের মনের মানুষকে খুজে পেয়েছেন, আর যারা পেয়ে হারিয়েছেন তারা ভালোমতোই বুঝবেন যে সতীশের মনে সেদিন ঠিক কি রকম অনুভুতি হচ্ছিল। হঠাৎ আওয়ায এল “এই যে ভায়া এবার বসুন আমি এবার নামব” সতীশ চমকে ফিরে দেখল যে মিলি যেখানে বসেছে তার ঠিকউলটো দিকে একজন লোক উঠে দাঁড়িয়েছেন তিনই ব্রেসব্রিজে নামবেন, তিনি মিলির দিকে চেয়ে বললেন “ তাহলে কাকুমুনি এবার চলি আবার দেখা হবে” মিলি একগাল হাসল, হাঁসির ফাকে তার একটা ফক্লা দাঁতও বেরিয়ে পরল। “মিলি দেখছি এই কামরায় খুব ফেমাস, সে কি ওই মেয়েটাকে চেনে নাকি! বা মেয়েটা ওকে?” বিকেলবেলা বাড়ি ফিরে সতীশ মিলিকে জিজ্ঞেস করল “মিলি তুই ওই আন্টিটাকে চিনিস?” “কোন আন্টি?” “ওই যে জানালার পাশে বসেছিল অরেঞ্জ কালারের সারি পরে” “কই আমি তো দেখিনি” সতীশ বুঝল এরা একে অপরকে চেনে না। পরেরদিন সতীশ একটু আগে আগে গেল মিলিকে নিয়ে স্টেশনে এদিক ওদিক দেখতে লাগল কিন্তু বৃথা চেষ্টা, ট্রেনে উঠে সতীশের মনটা ভালো হয়ে গেল আজও তাদের জন্য বসার সিট রাখা ছিল আর বসার সিটের ঠিক উল্টো দিকের রো তে মেয়েটি বসেছে ভিরের ফাকে মাঝে মাঝে তাকে দেখা যাচ্ছে সতীশ আড়চোখে তাই দেখার চেষ্টা করতে লাগল এদিকে ট্রেনের সেই ডেলি পাসেঞ্জার গ্রুপটা তার সাথে খাজুরে আলাপ জুড়ে দিল, কি কাজ করা হয় পড়াশুনা কতদূর এইসব গতানুগতিক প্রশ্ন। তারা যখন শুনল যে সতীশ পদার্থ বিদ্যায় মাস্টার্স করেছে আবার বি এড ও করা আছে, সুধুমাত্র মনের মত চাকরি পাচ্ছে না বলে করছে না তাদের মধ্যে একজন বলে উঠল না হে ভাই মনের মত চাকরি পাচ্ছি না তাই করব না, এটা ঠিক কথা নয়। তোমার যা কয়ালিফিকেসন তাতে ভালো ভালো যেকোনো প্রাইভেট স্কুল বা কোম্পানি তে হেঁসে খেলে ভালো মাইনের চাকরি পেয়ে যাবে দিনকাল আর আগের মত নেই, সুধু যোগ্যতা থাকলেই আজকাল আর কেউ ডেকে চাকরি দেয় না। এখন একটা কিছু জুটিয়ে নাও সাথে সাথে সরকারি চাকরিরও চেষ্টা করতে থাকো, পেয়ে গেলে আগেরটা ছেরে দেবে। “গায়ে পরে উপদেশ দেবার লোকের আর অভাব নেই দেশে” সতীশ উত্তরে সুধু একটু মুখ বন্ধ করে হাঁসার ভঙ্গি করল। কথা বলতে বলতে বালিগঞ্জ এসে গেল, সতীশের ভারি রাগ হল এই লোকগুলোর বকবকের জন্য আজ তাকে ভালো করে দেখাও হল না। সতীশ মিলিকে নিয়ে বালিগঞ্জে নেমে গেল, মেয়েটি তখন জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। বাড়ি ফিরে সতীশ ঠিক করে নিল কাল থেকে সে একটু আগে আগেই যাবে আর ফোর্থ কামরার ঠিক সেই যায়গাতেই উঠবে, মেয়েটা ঠিক কোন যাগা থেকে ওঠে তাকে দেখতে হবে। খিন একটা আশা তার মনে জাগল যে মেয়েটাও হয়ত তাকে লক্ষ্য করেছে আর তাই সেও ফোর্থ কামরার ওঠে নাহলে এত কামরা থাকতে ওইটাতেই কেন ওঠে! “মানব মনের এক অদ্ভুত চরিত্র হল যে সে যখন কাউকে পচ্ছন্দ করে বা ভালবাসে তার কেবলই মনে হয় যে উল্টো দিকেও একই ধারা বইছে, কেন বইবে না? আমি ভালবাসি সেও আমাকে ভালোবাসবে, বাসবে না কেন, আমার মধ্যে কমতি টা কি আছে! ইত্যাদি” ধিরে ধিরে সতীশের মনেও এরকম ধারনা হতে লাগল রোজ সে একই কামরায় ওঠে আর আড়চোখে সেই মেয়েটির দিকে দেখে। এইভাবে “সাড়ে আটটার লোকালের ফোর্থ কামরা” নামে সতীশের জীবনে একটা নতুন অধ্যায় জুক্ত হয়ে গেল, যদিও সে ভাবত ব্যাপারটা কেউ জানে না কিন্তু দাদা আর বৌদি মিলিকে স্কুলে ছাড়তে যাবার সময় সতীশের ব্যাস্ততা দেখে মুচকি মুচকি হাসত যা সতীশের নজরে পরত না।



পর্ব তিন ঃ- অতিতের ক্ষত

আজ প্রায় পনেরো দিন হয়ে গেছে সতীশ মিলিকে নিয়ে ট্রেনে করে যাচ্ছে, একই ট্রেন একই কামরা কিন্তু আজও মেয়েটির সঙ্গে কথা বলে উঠতে পারে নি। রোজই ভাবে আজ আলাপ করব, আর কিছু না হয় খালি নামটা__ কিন্তু কথা আর বলা হয়ে ওঠে না। এরপর একদিন সতীশের মনে হল সে যেন হাতে চাঁদ পেল সে যথারিতি মিলিকে নিয়ে নির্দিষ্ট যায়গায় উঠেছে, মিলিও তার ট্রেনের কাকুমনিদের সাথে গল্প জুরেছে। সতীশ খানিক আনমনা ছিল হঠাৎ চমক ভেঙ্গে দেখল যে সেই মেয়েটি তার পাশে দাড়িয়ে আছে, আজ সে বোধহয় বসবার যায়গা পায় নি। সতীশের মনে হল তক্ষনি তার সাথে কথা বলে কিন্তু পরক্ষনেই মনে পরে গেল চারিদিকে অনেকেই এখন তাকে চেনে, তারা কি ভাববে তাছারা মেয়েটি যদি পাত্তা না দেয় তাহলে কি অপমানটাই না হবে! এসব ভাবতে ভাবতে ব্রেসব্রিজ এসে গেল, সেই ভদ্রলোকটি বললেন “এইযে ভায়া এবার তোমার বসবার পালা” সতীশ কেমন যেন ঘোরের মধ্যে ছিল, “হ্যাঁ বসছি” বলে সিটে বসে পরল আর তার পরেই মনে হল কি বোকা সে! সে তো সিটটা মেয়েটিকে অফার করতে পারত আটলিস্ট সেদিনের অ্যাপোলজি হিসাবেও। বসে থেকেই তার মন উসখুস করতে লাগল, মেয়েটি যে বালিগঞ্জের পরে নামে তা সতীশ জানত, লেকগার্ডেন্স আসতেই সে উঠে পরে মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বলল আপনি বসুন আমি পরেরটায় নেমে যাবো। মেয়েটি গম্ভীর ভাবে তার দিকে তাকিয়ে বলল দরকার নেই ধন্যবাদ। সতীশের মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল সে মাথা নিচু করে সিটে বসে পরল তার কেবল মনে হতে লাগল পাশের লোকগুলো বোধহয় তাকে দেখে হাসছে “ কি লজ্জা ছি ছি”। সেদিন বিকালে বাড়ি ফিরে সে গুম হয়ে নিজের ঘরের খাটে পরে থাকল, সুচরিতা রাত্রে খাবার জন্য ডাকতে এসে দেখল ঘরের আলো নেভানো সে ডাকল “ভাই”। বার দুয়েক ডাকার পরে সতীশ সারা দিল ক্ষীণ কণ্ঠে, সুচরিতা জিজ্ঞেস করল “কি খাবে না?” সতীশ বলল না বৌদি সরিরটা ভালো নেই, তোমরা খেয়ে শুয়ে পর। সুচরিতা তার বিছানার পাশে এসে তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করল “কি হয়েছে?” সতীশ বলল পেটটা কেমন যেন গুলাচ্ছে বৌদি। সুচরিতা আর কিছু না বলে নীচে চলে গেল, তার এই দেবরটিকে সে ভালই চেনে তার মুখ দিয়ে কথা বার করানোর চেয়ে আয়নার সাথে কথা বলা ঢের সোজা। কিছুটা সে আন্দাজ করেছিল বাকিটা রাত্রে মিলির থেকে কৌশলে জেনে নিল। রাত্রে সে তার স্বামীর সাথে কিছু পরামর্শ করল, সকালে ব্রেকফাস্টের টেবিলে নীতীশ হঠাৎ বলে উঠল “শোনো রিতা তুমি তো কাল রাত্রে বলছিলে সতুর শরীরটা খারাপ তা আজ থেকে কয়দিন তুমিই মিলিকে স্কুলে নিয়ে যাও” সতীশের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পরল কিন্তু মুখে সে কিছু বলতে পারল না দাদার আদেশ বা অনুরোধ কোনটাকেই সে অমান্য করতে পারে না। সেদিন থেকে তার আবার অলস দিনযাত্রা সুরু হল, সবকিছুই আগের মতই আছে তবু যেন কিছুর কমতি আছে, জীবনের খানিকটা যায়গা যেন কেমন খালি খালি লাগে। দিন চারেক পর বৌদি বলল “ওফ আর পারি না বাপু একদিকে খাবার বানাও, মেয়েকে স্কুলের জন্য রেডি কর, নিজে অফিসের জন্য রেডি হও, মেয়েকে স্কুলে ছাড়তে যাও, আচ্ছা ভাই তোমার শরীর এখন ভালো হয়েছে? তাহলে মিলিকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া নিয়েয়াসাটা তুমি আবার শুরু করলে আমি একটু হাফ ছারার সময় পাই” সতীশের চোখ মুখ উজ্জল হয়ে উঠল সে বলল “হ্যাঁ বৌদি আমি এখন একদম ঠিক আছি মিলিকে আবার আমিই নিয়ে যাবো”




সুচরিতার সাথে লাবণ্যর আলাপ হয়েছে, এই চারদিনে মিলির সাথেও তার বেশ ভাব হয়েছে। সুচরিতা এখন নুঙ্গি থেকে ডাউন বজবজ লোকালটা ধরে নেয় সেটাই ঘুরে আপ শিয়ালদা লোকাল হয়ে যায়। এতে তার দুটি সুবিধা হয়েছে এক সে লাবণ্যর সাথে আলাপ করার সুযোগ পেয়েছে, দুই এখন আর ট্রেনে বসার জায়গার জন্য অন্য কারুর ওপর নির্ভর করতে হয় না। লাবণ্য মৌলালির কাছে একটি প্রাইমারি স্কুলে চাকরি করে, বেসরকারি স্কুল তবে মাইনে ভালো। তার বাড়িতে আছেন মা তার একটি ছোট ভাই সে কলেজে পরে আর লাবণ্য, লাবণ্যর বাবা বেশ কয়েক বছর হল মারা গেছেন। তখন লাবণ্য কলেজে পরে, তার মায়ের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরল, লাবণ্যর বাবা কাজ করতেন পোস্ট অফিসে সেই চাকরির সামান্য কিছু টাকা পেনশন, কি করে সংসার চলবে! লাবণ্যর ওপর কিন্তু ছিল তার বড় ভরসা, সে সেই ভরসার মান রেখেছে। কলেজ পাশ করে বেরিয়েই লাবণ্য নিজের চেষ্টায় এই চাকরি জোগাড় করেছে, তাও আজ বছর দুয়েক হয়ে গেল। আধুনিক যুগের তরুণ তরুণীদের মত লাবণ্যর জীবনেও প্রেম এসেছিলো কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময়ই। তুহিনকে দেখেই তার মনে হয়েছিল এর সাথে যেন অনেক আগের চেনাশোনা কোন আগের জীবনের সম্পর্ক। তারপর কলেজ পাশ করে বেরনোর পর তুহিন বিয়ের প্রস্তাব দিল, লাবণ্য বলল “হ্যাঁ তা তো করবই তবে আমার একটি ছোট কন্ডিশন আছে আমি বিয়ের পর চাকরি করতে চাই আর মাইনের টাকাটা আমি মাকে দেবো, বুঝতেই তো পারছিস বাড়ির অবস্থা”। তুহিন বলল কেন তোর ভাইতো হাইয়ার সেকেন্ডারি দিয়েছে এবার, আজকাল তো হাইয়ার সেকেন্ডারি কোয়ালিফিকেশানেও চেষ্টা করলে ভালো চাকরি পাওয়া যায় আর বিয়ের পর তুই যদি তোর বাড়ি নিয়েই সবসময় মেতে থাকিস তাহলে আমার বাবা মায়ের সেটা নাও পচ্ছন্দ হতে পারে” তিন বছরের সম্পর্ক ভেঙ্গে দিতে তিন মিনিটও সময় লাগেনি লাবণ্যর। তারপর থেকে ভাই ছাড়া তার জীবনে আর কোন ছেলে বন্ধুর যায়গা নেই, তার কি আর কোন বন্ধু আদেও আছে মা আর ভাই ছাড়া! সুচরিতার সাথে মাত্র চারদিনের আলাপ হলেও তাকে লাবণ্যর ভালো লেগেছে বেশ প্রাণখোলা অথচ দৃঢ় ব্যাক্তিত্ত সম্পন্ন বৌদিটি, লাবণ্য তাকে ডাকে সুচরিতাদি, এর মধ্যে একদিন মিলিকে কোলে নিয়ে তাকে বসবার যায়গাও করে দিয়েছে সে। লাবণ্যর জীবনের অনেক কথাই সে জেনে নিয়েছে অথছ লাবণ্য তার ব্যাপারে তেমন কিছুই জানে না! অথবা হয়ত সে জানতে চায়নি বলেই জানে না।

সকালে সুচরিতা সতীশকে বলল “ভাই আজ থেকে না একটু আগে ঘর থেকে বেরোবে আর ডাউন বজবজ লোকাল টা ধরে নেবে মিলি প্রায়ই বলে ও জানালার পাশে কোনোদিন বসতে পারে না ডাউন ট্রেন টা ধরে নিলে বজবজে লোক নেমে গেলে তোমরা পচ্ছন্দ মত সিট পেয়ে যাবে আর কাউকে সিটের জন্য বলতেও হবে না” কথাটা মন্দ না সতীশ ভাবল বজবজ থেকে ঘুরে ট্রেনটা যখন আপ লোকাল হয়ে নুঙ্গিতে আসে তখন ট্রেনে পা রাখার যায়গা থাকে না বসার সিটের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়, যদিও সে প্রায়দিনই মাঝপথেই বসার সিট পেয়ে যায় তবু ওই বয়স্ক লোকগুলোর কম্প্যানি তার ভালো লাগে না। সেদিন ট্রেনে উঠে সতীশ আবার থতমত খেয়ে গেল, মেয়েটিও নুঙ্গি থেকে থেকে ডাউন ট্রেন ধরে। বজবজে ট্রেন খালি হয়ে গেলে সে সতীশের উল্টোদিকের সিটে বসল। সতীশের মনে হল মিলিকে নিয়ে এখনি কামরা বদল করে নেয়, কিন্তু ততক্ষনে ট্রেনের হর্ন বেজে গেছে আর মিলিও জানালার ধারের সিটটি দখল করে বসেছে। হঠাৎ সতীশ লক্ষ্য করল যে, মিলি মেয়েটির সাথে বেশ গল্প জুরেছে। এই কদিনে মিলির সাথে তার মানে ভাব হয়েছে! মেয়েটি কিন্তু সতীশের দিকে একবারও চেয়ে দেখল না। ট্রেন থেকে নামার পর থেকেই সতীশের কেবল মনে হতে লাগল মিলিকে ওর নামটা জিজ্ঞেস করে, কিন্তু হায়! বিকালে বাড়ি ফিরে এমনকি রাত্রে শুতে যাবার আগে পর্যন্ত তার আর মিলিকে নাম জিজ্ঞেস করা হয়ে উঠল না। যদি মিলির কাছে ধরা পরে যায়? আচ্ছা কিসের ধরা, কিসেরই বা তার এত ভয় সে তো আর মেয়েটাকে ভালবাসেনা!

পর্ব চার ঃ- মনের টানাপোরেন

পরপর দু-তিনদিন এরকম চলল মেয়েটির নাম এখন সতীশ জানে, না মিলিকে সে জিজ্ঞেস করে নি ওদের দুজনের কথোপকথনেই সে জানতে পেরেছে মেয়েটির নাম “লাবণ্য”। এরপর একদিন ডাউন লোকালে উঠে সতীশ দ্যাখে লাবণ্য আজ আসে নি সে মনে মনে ভাবল হয়ত ডাউন ট্রেন ধরতে পারে নি, নুঙ্গি থেকে আপ লোকাল ধরবে। তার আনুমানই ঠিক হল, লাবণ্য সেই কামরাতেই উঠল সতীশদের কাছাকাছিই দাঁড়াল আর মিলিকে দেখে একটু হাসল মিলিও তার দিকে তাকিয়ে ফোকলা দাঁতে একগাল হেঁসে দিল। সতীশ তাকে আর বসতে বলল না, কি জানি আজও যদি সবার সামনে না বলে দেয়। পরের স্টেশনে খুব ভিড় হল কামরায় ধাক্কাধাক্কিতে একজন মাঝবয়সি লোক প্রায় লাবণ্যর গায়ের উপর এসে পরল লাবণ্য কিছুটা রেগে গিয়ে বলল “এই যে দাদা একটু সরে দাঁড়ান”। লোকটা অতি কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি করে বলল “গায়ে একটু ছোঁয়া লাগলে যদি ফোস্কা পরে তাহলে এই কামরায় ওঠেন কেন লেডিসে গেলেই তো পারেন একহাতে তো আর তালি বাজে না বুঝলেন কি না” লাবণ্য কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো কিন্তু পাশ থেকে বেশ কয়েকজন লোক কৌতুকের ভঙ্গি করে হেঁসে উঠল যেন ভারি একটা তামাশা হচ্ছে! লাবণ্যর চোখমুখ আরক্ত হয়ে উঠল, সে চট করে কিছু বলে উঠতে পারল না। সতীশের হঠাৎ ভারি রাগ হয়ে গেল ওই বদ লোকটার ওপর সে তাকে উদ্দেশ্য করে বলল “দাদা এটা তো আর জেন্টস কামরা নয় জেনারেল কামরা এখানে পুরুষ ও মহিলা উভয়ই উঠতে পারে” লোকটিও সহজে দমবার পাত্র নয় সে সতীশের দিকে চোখ পাকিয়ে বলল “কে ভাই, তুমি কি নতুন মাতব্বর নাকি?” সতীশের আজ মাথায় রাগ উঠে গেছিল যে সে আর চুপ করে গেল না সে বলল “তা আপনাদের মত গুনধর দাদারা থাকলে ভাইরা একটু আধটু মাতব্বর হয়ে যায় বইকি আর আপনাকে একথা জিজ্ঞেস করব না যে বাড়িতে মা বোন আছে কি না কারন আপনি হয়ত তাদের সাথেও এরকমই আচরন করেন, কাজেই এই প্রশ্ন করে সবার সামনে আমি ওনাদেরকে লজ্জায় ফেলব না” লোকটা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু সতীশের চেনা ডেলি পাসেঞ্জার গ্রুপটা ওই কামরাতেই ছিল একটু তফাতে তার হঠাৎ ওই লোকটির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল কি হয়েছে দাদা এত ঝগড়া ঝাটি কিসের? লোকটি বুঝল যে সতীশ দলে ভারী আছে তাই সে চুপ করে একটু তফাতে চলে গেল। সতীশ ডেলি পাসেঞ্জার গ্রুপটার দিকে তাকিয়ে একটা কৃতজ্ঞতাসূচক হাসি হাসল তারাও হেঁসে ঘার নাড়াল। আজব ব্যাপার সতীশ দেখল যাদেরকে সে ছাপোষা দশটা পাঁচটার অফিস কর্মী ছাড়া আর বেসি কিছু ভাবত না, তারা যথেষ্ট বুদ্ধিমান এবং সহানুভূতিশীল। লাবণ্য তখনো চুপ করে দাঁড়িয়েছিল সতীশ তার দিকে তাকিয়ে বলল “ আপনি আমার যায়গাটায় বসুন” তার এই কথাটুকুর ভেতরে এত আন্তরিকতা ছিল যে লাবণ্য আজ আর না করতে পারল না, সে মিলির পাশে বসে পরল। সে সতীশের দিকে তাকিয়ে বলল “ধন্যবাদ” সতীশ বলে উঠল “সরি ইয়ে মানে আজকের জন্য নয় সেদিনের ধাক্কাটার জন্য” লাবণ্য হেঁসে ফেলল, সতীশও বোকার মত একটু হাসল। লাবণ্য মিলির সাথে গল্প করতে লাগল আর সতীশ অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে দাড়িয়ে রইল। সেদিন বিকালে মিলিকে নিয়ে বাড়ি ফিরে সতীশের নিজের ওপর ভারী রাগ হল, কত কথা বলার সুযোগ ছিল আর সে কি বলল “ সরি” আর কি ক্যাবলা মার্কা হাঁসি বেশ হয়েছে এরপর আর লাবণ্য তার সাথে কথাই বলবে না এটা তো আর অষ্টাদশ শতাব্দী নয় একবিংশ শতাব্দী, আজকালকার মেয়েরা ক্যাবলা ছেলে একেবারে পছন্দ করে না। তবে আর যাই হোক ওই বদ লোকটাকে জব্বর দিয়েছে সে, নভেল পড়ার কিছু তো লাভ হয়েছে প্রয়োজনের সময় মুখে বুলি ফুটেছে তার। লাবণ্য বাড়ি ফিরে থেকে ভাবছে কেন আজ একজন অপরিচিত লোক তার সম্মান রক্ষা করতে এগিয়ে এল, তবে কি লোকটি তাকে... না না এসব কি ভাবছে সে আবার সেই মোহের মায়াজালে সে নিজেকে জড়াবে না সব ছেলেরাই একরকম নিজেদের স্বার্থে ঘা পরলেই সবাই অচেনা হয়ে যায়। এদিকে মিলি বাড়ি ফিরে কাকুর ট্রেনের দুঃসাহসিক জয়ের কথা মাকে ফলাও করে শোনালো, কেমন করে কাকু বদ লোকটাকে খুব করে বকে দিয়েছে। সুচরিতা হেঁসে মিলিকে কোলে করে দুলতে লাগল তার মনে এক সুন্দর আশা জেগেছে, লাবণ্যকে তার প্রথম দিনেই ভালো লেগেছিল সে জানে যে সতীশও মনে মনে তাকে পছন্দ করে এখন লাবণ্য যদি সতীশকে...।

সতীশ যথারিতি পরের দিনও মিলিকে নিয়ে ডাউন লোকাল ধরল আর লাবণ্যও তাই, লাবণ্য ভেবেছিল যে আজ সে একটু তফাতে থাকবে বেকার বেকার আলাপ পরিচয় বাড়িয়ে কি লাভ? তবু সতীশ তাকে দেখে এমন করে হাসল যে সে আর তফাতে যেতে পারল না। আজ কিন্তু সতীশ কথা বলল “কেমন আছেন?” “ভালো” “আপনি ভুঝি রোজ ডাউন টাই ধরেন?” “না তা রোজ সম্ভব হয়ে ওঠে না তবে প্রায় দিনই ধরি”। মিলি বসেছে জানালার ধারে সতীশ তার পাশে আর লাবণ্য ওদের ঠিক উল্টো দিকে। এরপর মিলি আর লাবণ্যর মধ্যে গল্প গুজব চলতে লাগল, সতীশ হঠাৎ বলে উঠল “আপনি যদি কোন দিন ডাউন লোকাল না ধরতে পারেন তাহলেও ক্ষতি নেই আমি সিট রেখে দেবো” বলেই তার ভয় হল একটু বেশি বলে ফেলল কি? তার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে এল, মিলি তার মুখের অমন দশা দেখে ফিক করে হেঁসে ফেলল তাই দেখে সতীশ রেগে গেল সে মিলিকে বলল “ এই দুষ্টু মেয়ে বড়দের কথার মাঝে হাঁসতে নেই জান না?” লাবণ্য প্রথমে একটু গম্ভীর হয়েছিল কিন্তু সতীশ আর মিলির কাণ্ডকারখানা দেখে হেঁসে ফেলল। সতীশের দিকে তাকিয়ে বলল আচ্ছা রাখবেন, ভালো কথা আপনার নামটাই তো জানা হয় নি “ আমার নাম সতীশ” সতীশ বলল লাবণ্য একটু হেঁসে বলল আমার নাম “লাবণ্য” সতীশই বলে উঠল কথাটা বলেই আবার ভয় পেয়ে গেল। লাবণ্য মুচকি হেঁসে বলল হুম, আবার মিলির সাথে তার কথোপকথন চলতে লাগল। ধিরে ধিরে আলাপটা পরিচয়ে পরিণত হল, সতীশের সাথে ভালো ভাবে পরিচয় হবার লাবণ্যর মনে হল যে এই ছেলেটি ঠিক যেন আর পাঁচজনের মত নয়, অনেকটা সংবেদনশীল, অনেকটা খোলা মনের, তারপরেই তার মনে হয় তুহিনের সময়ওতো একই রকম মনে হয়েছিলক কি হল শেষ পর্যন্ত? মায়ের শরীর দিন দিন খারাপ হচ্ছে, ভাইটার কলেজ এখনো শেষ হয় নি, এখন তার নিজের কথা ভাবার সময় নয়। যতই দিন যাচ্ছে সতীশ লাবণ্যর প্রতি আরও দুর্বল হয়ে পরছে তার মনে এক ক্ষীণ আশা বাসা বাঁধছে, হয়ত লাবণ্যও তাকে পচ্ছন্দ করে। একটা অসাধারন ব্যাক্তিত্ত আছে মেয়েটার, খুব প্রাণোচ্ছল অথচ দৃঢ় এতদিনের আলাপে এমন কোন কথা সে বলেনি যাতে সতীশের মনে বিন্দুমাত্র অসম্ভ্রম আসতে পারে তার প্রতি। সতীশ তো তার মনের হাল আর পরীক্ষা হলের মাস্টারমশাই হিসাবে পর্যবেক্ষণ করছে না, তাহলে সে দেখতে পেত যে লাবণ্যকে বিচার করতে বসে একশোয়ে একশ দেওয়াও এই মুহূর্তে তার কাছে খুব যুক্তিসঙ্গত। তাছারা লাবণ্য মেয়েটিও যথার্থই আর পাঁচটা মেয়ের থেকে আলাদা, তা বেচারা সতীশকেই বা আমরা সব দোষ দিই কি করে? সপ্তাহে মিলির পাঁচ দিন স্কুল থাকে সোম থেকে শুক্র, শনি আর রবিবার সতীশের দিন যেন আর কাটতে চায় না। সতীশ ভাবতে লাগল যে শনিবারটা কি করে বাড়ি থেকে বেরোনো যায়? হঠাৎ তার মাথায় এক আইডিয়া এল আচ্ছা চাকরির খোজ শুরু করলে কেমন হয়? গ্রাজুয়েশন পাশ করে বেরিয়েও তো প্রায় দু বছর হয়ে গেছে। সে রাত্রে খেতে বসে দাদা বৌদির কাছে কথাটা বলল। নীতীশ আর সুচরিতা চোখে চোখে কিছু ইশারা করে নিল, ব্যাপারটা সতীশেরও দৃষ্টি এরাল না সে খানিকটা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল। নীতীশ বলল “সে তো ভালো কথা কি বল রিতা তা ছাড়া তুই বড়ও তো হয়েছিস আর কতদিন দাদার ঘারে বসে খাবি?” সুচরিতা বলল “হ্যাঁ তা যা বলেছ আমি কোথায় ভাবি যে মিলির বিয়ের সব খরচ ভাইয়ের কাছ থেকে নেব” দাদা বৌদির রসিকতা ধরতে পেরে সতীশ বলল ওফ তোমরা পারও বটে। সেদিন রাত্রে এমনিভাবে হেসেখেলে খাবার সময়টুকু পেরিয়ে গেল।

পর্ব পাঁচ ঃ- মধুরেন সমাপয়েত

একদিন শনিবার ডাউন লোকালে সতীশকে ট্রেনে দেখে লাবণ্য বেশ আবাক হল, ধীরে ধীরে এসে তার পাশের সিটে বসল বলল “আপনি আজ এলেন যে আজ তো মিলির স্কুল থাকে না!” সতীশ একটু ইতস্তত করে বলল “না মানে একটু নিজের দরকারে জাচ্ছিলাম শিয়ালদা” নানান কথাবার্তা চলছিল দুজনের মধ্যে, সতীশ জিজ্ঞেস করল “আপনি কোথায় চাকরি করেন” লাবণ্য বলল “আমি আমহার্স্ট স্ট্রীটে একটা প্রাইভেট স্কুলে পড়াই” আর আপনি লাবণ্য জিজ্ঞেস করল, সতীশ খানিক্ষন থেমে একটু বিষণ্ণ হাসি হেঁসে বলল “কিছু করি না ঘরে বসে বসে দাদা বৌদির অন্ন ধ্বংস করছি তাই আজ চলেছি চাকরির খোঁজে”। সতীশকে এরকম ভাবে কথা বলতে লাবণ্য আগে কখনো দেখেনি, তার ভারী মায়া হল সে বলল “আপনার বাবা মা নেই?” “আজ্ঞে না দুজনেই গত হয়েছেন” “দাদা বৌদি কি আপনাকে...” লাবণ্যর কথাটা শেষ হল না সতীশ প্রতিবাদ করে উঠল “না না এতদিন ধরে বাবা আর মায়ের অভাব দাদা আর বৌদিই তো পূরণ করে আসছেন, সত্যি বলতে কি বাবা মা চলে যাবার পর তাদের অভাব কোনোদিনও বুঝতেই দেয় নি ওরা” তাহল... “পুরুষমানুষ তো, কতদিন আর পরমুখাপেক্ষি হয়ে জীবন কাটাবো?” এরপর নানান কথায় লাবণ্য জানতে পারল যে সতীশ যথেষ্ট শিক্ষিত, তার পদার্থ বিদ্যায় মাস্টার্স ডিগ্রি আছে আবার বি এড ও করা আছে। লাবণ্য বলল কোন চিন্তা করবেন না এত হাইলি কোয়ালিফাইড আপনি নিশ্চয়ই তাড়াতাড়িই কোনো ভালো চাকরি পেয়ে যাবেন। সতীশ বলল ভগবান করুণ যেন আপনার কথাই সত্যি হয় “হবে নিশ্চয়ই হবে আমি কোনোদিনও জ্ঞানত মিথ্যা কথা বলি না” ওরা দুজনেই হাসল। পরিচয় ধীরে ধীরে বারল তার সঙ্গে হৃদ্যতাও এমন হল যে কোনোদিন লাবণ্য না এলে সতীশের মনে হয় জীবনটাই বৃথা, আর সতীশের দেখা না পেলে লাবণ্যর মনে হয় যেন কিছু একটা বাদ গেছে আজকের দিনটা কেমন যেন খালি খালি লাগছে। এমনি করে আরও মাস ছয়েক কাটল, একদিন সতীশ লাবণ্যকে বলল “যদি কিছু না মনে করেন তো আমি কি আপনাকে তুমি বলে ডাকতে পারি?” লাবণ্য একবার সতীশের চোখের দিকে চোখ তুলে কিছুক্ষন দেখল তারপর মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে নারিয়ে সন্মতি প্রকাশ করল, সেদিন কেউই আর কোন কথা বলতে পারল না। এদিকে সুচরিতা মিলির কাছ থেকে কৌশলে সব খবরই নিচ্ছিল, সে হঠাৎ একদিন সতীশকে বলল “ভাই আজ আর তোমাকে মিলিকে স্কুলে নিয়ে যেতে হবে না আজ ওদের স্কুলে গার্জিয়ান মিটিং আছে আজ আমি ওর সাথে যাবো” সতীসের মনে হল আজকের পুর দিনটাই মাটি অগত্যা আবার একটা নভেল নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। সে দিনটা ছিল শুক্রবার, পরের দিন লাবণ্য এলনা সতীশের মন আরও খারাপ হয়ে গেল খানিক রাগও হল বৌদির ওপর। পরের দিন সকালে ব্রেকফাস্টের টেবিলে দাদা হঠাৎ একটা অদ্ভুত কথা বলল “হ্যাঁরে সতু বয়েস তো তোর বেড়ে যাচ্ছে আর তোর বৌদিও আর একা হাতে সব সামলাতে পারছে না তো আমরা তোর জন্য একটা মেয়ে দেখেছি, কথাবার্তা সব মোটামুটি ঠিক এখন তুই একবার ছবিটা দেখে নে তাহলে তাড়াতাড়ি শুভ কাজটা সেরে ফেলা যায়”। সতীশের মাথায় বাজ পরলেও বোধহয় তার মুখ এত বিবর্ণ হয়ে যেত না, প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে নিয়ে সে বলল “কিন্তু দাদা আমি তো বেকার, বিয়ে করে বউকে খাওয়াবো কি?” “সে চিন্তা তোকে করতে হবে না”। এরপর আর কোন কথা চলে না, সতীশ কোনরকমে খাওয়া শেষ করে মুখ হাত ধুয়ে উপরে চলে গেল। খানিক পরে সুচরিতা তার ঘরে এসে দেখল সে উপুর হয়ে খাটে শুয়ে আছে, সে বলল “এই যে ভাই তোমার হবু বউএর ফটো এনেছি একবার দেখে নাও তো পচ্ছন্দ হয়েছে কি না” সতীশ উপুর হয়েই জবাব দিল “বৌদি আমার শরীর টা খুব খারাপ লাগছে এখন আমি দেখতে পারব না” সুচরিতা খাটের কাছে এসে জোর করে তার মুখটা তুলে ফটোটা তার চোখের সামনে ধরল। আরে! এ কার ফটো? এ যে... আর বুঝতে বাকি রইল না তার এসব তার দাদা বৌদিরই কীর্তি। সুচরিতা বলল “শুক্রবার লাবণ্যর সাথে ট্রেনে কথা হয়, তার মত নিয়ে গতকাল আমি আর তোমার দাদা গেছিলাম লাবণ্যদের বাড়িতে ওর মায়ের সাথে কথা বলতে”। সতীশ ঝুকে তার বৌদির পায়ের ধুলো নিলো তারপর ছুটল নীচে দাদাকে প্রণাম করতে।

আজ সতীশ আর লাবণ্যর ফুলসজ্জ্যা লাবণ্য সতীশকে বলল “দেখ তোমাকে একটা কথা বলার আছে, আমি জানি এই সংসারে আমাদেরও কিছু কন্ট্রিবিউশন করতে হবে কিন্তু আমার মাইনের থেকে বেশ কিছু টাকা আমি মাকে দেবো বাকিটা বৌদির হাতে দেবো তুমি তো জানো আমার বাড়ির অবস্থা”। সতীশ লাবণ্যর মুখে হাত দিয়ে বলল “তোমার মাইনের পুর টাকাটাই তুমি তোমার মাকে দেবে, আমি আমার দাদা বৌদিকে খুব ভালো করে জানি ওদের টাকা দিতে গেলে অপমান করা হবে আর এমনিতেও আমি তহ খুব তাড়াতাড়িই ভালো চাকরি পেয়ে যাচ্ছি, আমাকে এমন একজন বলেছে যে জ্ঞানত মিথ্যা কথা বলে না” ওরা দুজনেই আবার হেঁসে উঠল। কথায় বলে প্রত্যেক সফল পুরুষের পিছনে একজন নারীর হাত থাকে, সতীশের পিছনে তো তিনজনের ছিল “এক স্বর্গত মা, দুই মাতৃসমা বৌদি আর লাবণ্য” সে কলকাতার এক উচ্চ বিদ্যালয়ে পদার্থ বিদ্যার শিক্ষকের চাকরি পেয়ে গেল। এখন ওরা দুজনে একই সাথে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করে, একদিন ট্রেনে একটা কলেজের ছেলে আর মেয়েকে খুনসুটি করতে দেখে লাবণ্য সতীশকে বলল “এই, আমাদের প্রথম দেখার কথা মনে আছে?” “মনে নেই আবার!” সতীশ বলল...।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.