ভগবানের দূত


ক্লাস ফোরের বৃত্তি ব্যাপারটা এখন আগের মতো আছে কিনা জানিনা তবে আমাদের সময় ছিল।আমার দাদা সুমন্ত, পড়াশুনোয় চিরকালই ভালো. তো সে রাজ্যস্তরে নবম স্থান দখল করে কলকাতায় প্রাইজ আনতে গেছিল।সেই সূত্রে আমার ওপর একটা প্রত্যাশার চাপ ছিল।

সবার মাথা কি একই নাকি?সব বিজ্ঞানীর ভাই বোনরাও বিজ্ঞানী হতেন?সে যাইহোক আমাকে স্বপ্ন দেখানো হয়ে গেছে যে তোকে পেতেই হবে আর সেইমতো কাজও শুরু হয়ে গেছে মানে ওই আর কি গুলিয়ে খাওয়ানো যাকে বলে।

স্কুল আমাকে স্বেচ্ছা নির্বাসন দিল,"স্কুলে আসতে হবেনা কিন্তু স্কুলে বৃত্তি আসা চাই।"দিনরাত বই নামক পাঁচন গিলতাম আর রাতে বাবার সামনে তাই বমি মানে যা পড়লাম উগরে দিতে হত।স্কুলের স্যার আমার ওপর ভরসা করেছিলেন কারন দুর্ভাগ্যবশত আমি তখন ক্লাসে প্রথম বা দ্বিতীয় হতাম।খুব মনে আছে রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ,নেতাজী রচনাগুলো ছিল উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের।পি আচার্য্য বামন দেব ভট্টাচার্য্য এঁদের লেখা জুড়ে জুড়ে তৈরী করেছিলেন আমার বাবা।বাবার গুঁতোনিতে তাই মুখস্ত করতাম।পরীক্ষাতে এসেছিল বিদ্যাসাগর।পড়েছিলাম কিন্তু সেটা আগের গুলোর মত ছিলনা।মনটা তখনই ভেঙ্গে যায়। ভূগোলে, কৃষির উন্নতি আর শিল্পের উন্নতির জন্য কি কি করা হয়েছে- খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল।আর খুব ভালো করে মুখস্তও করেছিলাম।আর দুটো প্রশ্নই এসেছিল।অনেকগুলোর মধ্যে থেকে চারটি করতে হবে।সেই মুহুর্তে গার্ড বললেন সময় বেশি নেই।ব্যাস আমিও ভাবলাম অত বড় লেখার সময় নেই অন্য প্রশ্ন লিখেদিলাম।বাবা আমার সাথে দুদিন কথাই বলেননি।

পড়াশুনো টা বরাবর বাবার দপ্তর ছিল।কিন্তু পরের পরীক্ষা গুলো মা ই দেখল।পরীক্ষা শেষে ফল বেরোনোর অপেক্ষা ,অনেক প্রত্যাশা আমার ওপর। স্কুলের রেজাল্ট আনতে গিয়ে জানলাম বৃত্তির রেজাল্ট ও বেরিয়েছে।মনে মনে ভাবছি ইস্ সবাইকে মুখ দেখাবো কি করে।স্যার এসে আমায় বললেন,"এতবছর ধরে গাধা পিটিয়ে ঘোড়া বানাচ্ছি রত্ন চিনতে ভুল করিনি তুই রাজ্যস্তরে সপ্তম হয়েছিস রে সুস্মিতা। কি হল জানিনা কেঁদে ফেললাম।উনি বুকে জড়িয়ে বললেন ,”পাগলি আনন্দের দিনে কাঁদতে নেই।এবছর স্কুলে রাজ্যস্তরে দুটো আর জেলাস্তরে তিনজন মোট পাঁচজনের নামে চিঠি এসেছে।তোরা কলকাতায় মহাজাতি সদন থেকে প্রাইজটা নিয়ে নিস।“ ওনাকে প্রনাম করে বললাম আশীর্বাদ করুন যেন এভাবেই এগিয়ে যেতে পারি....

রেজাল্টা দেখে চমকে গেছিলাম ভুত দেখার মতো।বাংলায় নিরানব্বই।নির্ঘাত ঘুমের ঘোরে খাতা দেখেছে।ইতিহাস ভূগোলে অষ্টাশি। বাবার আক্ষেপ ভূগোলের বোকামি টা না করলে আরও ভালো কিছু হতো।

দেখতে দেখতে প্রাইজ আনতে যাওয়ার দিন চলে এলো।মাঝের এই কদিনে নয় দশ বছরের শহরতলির মেয়ে সুস্মিতার মনে কলকাতাকে নিয়ে কল্পনায় অনেক জলছবি আঁকা হয়ে গেছে।আগে থেকেই ঠিক ছিল দক্ষিনেশ্বরের মন্দিরে পূজো দিয়ে দুপুর একটার মধ্যে মহাজাতিসদনে পৌঁছে যাব।পরিচিত ফটোগ্রাফার ওনাকে ফটো কাকু বলতাম।ওনাকে এই ঘটনার সাক্ষী হতে অনুরোধ করায় খুশী হয়ে কাকিমা, বনুকেও সাথে নেবেন বললেন।এদিকে আমাদের বাড়ির চারজন সাথে পাশের বাড়ির ভাই মোট আটজন। হইহই করে যাওয়া হবে।টুকটাক জিনিসপত্র যা নেওয়ার গুছিয়ে নেওয়া হলো।ঘড়িতে এ্যলার্ম দিয়ে শুয়ে পড়লাম ভোর চারটে তে ট্রেন তার মানে প্রায় তিনটে তে উঠতেই হবে।উত্তেজনায় ঘুমই আসছিলনা, আর কি... যা হওয়ার তাই।

দেরী করে ঘুম থেকে উঠে, ছোটাছুটি করে তৈরী হয়ে স্টেশনে গিয়ে দেখি ট্রেন চলে গেছে।ফটো কাকুর সাথে স্টেশনেই দেখা হওয়ার কথা ছিলো।কিন্তু স্টেশনে গিয়ে তাদের দেখলাম না।ফোনের চলটা সেসময় ছিলনা অগত্যা কাকুর বাড়িতেই হানা দেওয়া।কাকুর মা মানে ঠাকুমা বললেন ওরা অনেক আগেই চলে গেছে।তার মানে ওরা চারটের ট্রেনেই চলে গেছে।আমরা পাক্কা দেড়ঘন্টা অপেক্ষা করে পরের ট্রেনে হাওড়া হয়ে দক্ষিনেশ্বরে পৌঁছে গঙ্গায় স্নান করে পূজো দিলাম।রাস্তার ধারের হোটেলগুলোতে যখন ভাত খেতে গেলাম তখনই দেখলাম ঝুলকালি মাখা কালো মেঘে ঢাকা আকাশ প্রায় অন্ধকার।আমরা যখন খাওয়ার পর বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ালাম তুমুল ঝড় আর সাথে পাল্লা দিয়ে বৃষ্টি।বাস তো দূরের কথা আস্তে আস্তে রাস্তা, মধ্যাহ্নেই রাতদুপুরের মতো শুনশান হয়ে গেলো।প্রায় আধঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে আমরা একটা ট্যাক্সি পেলাম।আমাদের কাছে তখন ড্রাইভার কাকুকে ভগবানের দূত মনে হলো কারন তখন আমাদের অনেকটাই দেরী হয়ে গেছিল আর অনেকটা পথ যেতে হবে।

রাস্তায় যেতে যেতে ড্রাইভার কাকু বাবাকে জিগ্গেস করছিল আপনাদের বাড়ি কোথায় এখানে কোথায় এসেছেন কেন এসেছেন....আমি জানলা দিয়ে বৃষ্টি ভেজা কলকাতা দেখছিলাম আর ভাবছিলাম আমাদের ঢুকতে দেবেতো ভেতরে...ইশ্ কতো দেরী হয়ে গেলো।মহাজাতি সদন আসতেই আমরা লাফিয়ে লাফিয়ে যে যার মতো হাতের কাছের ব্যাগ নিয়ে নেমে পড়লাম।তখনও একইরকম ভাবে বৃষ্টি হচ্ছে।আমরা কাকভেজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি কারন হাজার খানেক লোক- ভিড় যেন উপচে পড়ছে।ঠেলাঠেলির মধ্যে ঠিক করে দাঁড়ানো যাচ্ছেনা।এর মধ্যেই মা আবিস্কার করলো তার সাইড ব্যাগটা নেই।আমাদের পাঁচজনই স্বীকার করলাম আমাদের কাছে নেই মানে ওটা ট্যাক্সিতেই রয়ে গেছে।

আমি ভয়ে কুঁকড়ে গেলাম কারন ওটা আমার কাছেই ছিল তাড়াহুড়োতে নেওয়া হয়নি।বাবার মুখের দিকে তাকালাম বেশ থমথমে।সুনামী আছড়ে পড়ার আগেই আ্যনাউন্স করলো ভেতর থেকে ,"ক্যান্ডিডেটরা ডকুমেন্টস নিয়ে ভেতরে এস"….ভেতরে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মডেল গুলো দেখতে দেখতে আমার বয়সী কচিকাঁচাদের লাইনে ঢুকে পড়লাম।ওখানেই রাজ্যস্তর আর জেলাস্তরের বাছাই পর্ব চলছে।কিছু লোক ডকুমেন্টস দেখছিল তাদেরই একজন আমার ডকুমেন্টস দেখে প্রায় ধরে বেঁধে স্টেজে তুলেদিল।দেখলাম আরও কয়েকজন ওখানে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে। তারপর রাজ্যস্তরের প্রথম থেকে দশম অবধি পরপর বসিয়ে দিল।বসে বসেই আমি বাইরের ঘটনাটা ভাবলাম।বাবা নিশ্চই চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছেন।যখন জানতে পারবে এটা আমি করেছি-- "উফ্ আজ দিনটাই খারাপ.. সকাল থেকে একটার পর একটা বাধা...কি ছিল ব্যাগে?....উম্ মমমম কিছু টাকা, মায়ের সাজগোজের জিনিস আর?....এবাবা বাড়ির সব চাবিই তো ওই ব্যাগে আর আজকের প্রসাদের ডালাটাও...শেষ.. আজ কপালে তোর কি আছে সে ভগবানই জানেন" ভাবতে ভাবতেই এসির ঠান্ডাতেও ঘেমে উঠলাম। যথাসময়ে প্রাইজ নিয়ে স্টেজ থেকে নেমে ভাবছি এতো লোকের মাঝে বাবা মা কে কোথায় খুঁজবো।দেখলাম ফটোকাকু।ক্যামেরাটা গলায় মানে আমার ছবি তুলছিল।

-কাকু তুমি এখানে!!!!

-আমাদের তো এখানেই আসার কথা ছিল।শুধু যা আগে পরে।

দেখলাম মা হেসে এগিয়ে এলো।মা কে দেখেই ভয়টা আবার জাঁকিয়ে বসলো ,এবার কোথায় যাবি সুষ্মিতা? তৈরী হয়ে নে।মনে মনে ভাবলাম, দোষটা স্বীকার করে নেব, বাবা কিছু বলার আগেই, শাস্তিটা যদি একটু কমে... বাবার কাছে গিয়ে বাবার দিকে তাকালাম সেই চোখে কোনো রাগ নেই, একটা গর্ববোধ কাজ করছে।সাহস সঞ্চয় করে বললাম,"বাবা,ব্যাগটা আমিই ফেলে এসেছি আসলে দেরী হয়ে গেছিল আর বৃ....মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে বাবা হারিয়ে যাওয়া ব্যাগটা দেখালো মুচকি হেসে।আমি এতটাই অবাক হয়েছিলাম যে কিছুক্ষন ব্যাগটা দেখে হাত বুলিয়ে দেখলাম সত্যি কিনা।...

বাবা বলতে শুরু করলো,

"তুই চলে গেলি ভেতরে ,আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে ভিজছি।সবাই খুব চিন্তিত, রাতে ফিরে ঘরে ঢুকবো কি করে...মায়ের প্রসাদটাও গেলো...এমন সময় তোর ফটো কাকুর সাথে দেখা ওরা ঠিক সময় পূজো দিয়ে এখানে চলে এসেছিল।"

-কিন্তু ব্যাগটা...!!!

-বলছি...ব্যাগের মায়া ত্যগ করে, গল্প করছিলাম সবাই হঠাৎ আ্যনাউন্স হলো,"মেদিনীপুর থেকে এসেছেন মেয়ের বৃত্তি আনতে, দক্ষিনেশ্বর মন্দির থেকে ট্যাক্সিতে উঠেছিলেন ,একটা ব্যাগ জমা পড়েছে উপযুক্ত প্রমান দিয়ে নিয়ে যান।"

একমুহুর্তের জন্য মনে হয় লটারি পেয়েছি।দৌড়ে গেছিলাম সেই ভগবানের কাছে কিন্তু ড্রাইভার তখন ব্যাগ জমা দিয়ে চলে গেছে।প্রমান হিসেবে প্রসাদ আর চাবির কথা বলতে ওরা ব্যাগটা দিয়ে দেয়।আমরা সেদিন রাত একটায় কল্পনার কলকাতার থেকে একদম আলাদা কিন্তু অনেক ভালো স্মৃতি নিয়ে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরেছিলাম।অতো রাতে এসে আর তালা ভাঙ্গতে হয়নি চাবি খুলেই ঢুকেছিলাম।শুধু আফশোষ ভগবানের দূত কে এতো কাছে পেয়েও হারিয়ে ফেললাম।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.