চোখ খুলে ঘড়িটা দেখেই মাথা গরম হয়ে গেল সুমির। ন’টা বাজে! কোনো মানে হয়! মা ডাকেনি কেন?

-“মা – ওমা - মা......” - চিৎকার করতে শুরু করল সুমি।

মাও ততোধিক জোরে “যাই – যাই” বলতে বলতে এসে হাজির হলেন সুমির ঘরে।

-“আমায় ডাকনি কেন? এতো বেলা হয়ে গেছে!”

-“ডাকিনি! সকাল থেকে ডেকে ডেকে মুখে রক্ত উঠে গেল! একবার এপাশ ফিরছিস আবার ওপাশ! কিছুতেই ওঠাতে পারছি না দেখে বাধ্য হয়ে এই খানিক আগে জলখাবার বানাতে গেলাম! যাকগে তুই হাত-মুখ ধুয়ে তাড়াতাড়ি আয় নয়তো কড়াইশুঁটির কচুরিগুলো সব ঠান্ডা হয়ে যাবে।”

খুব আসতে আসতে বিছানা থেকে নেমে শালটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিল সুমি। পৌষের শীত বলে কথা! বাইরে বেরিয়ে দেখল বারান্দার এককোণে জল তুলে রাখা আছে। সেদিকে এগোতেই ওর নজর পড়ল বুধিয়ার ওপর – উঠোনে বসে রুটি খাচ্ছে। ওকে দেখেই আবার মাথাটা গরম হয়ে গেল সুমির। নাঃ, আজ একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে। ভেবেছিল বাড়িতে কাউকে কিছু বলবে না। কিন্তু বড্ড বাড়াবাড়ি করছে ছেলেটা। এরপরও না জানানোটা বোকামি হয়ে যাবে। আজ প্রায় মাস তিনেক হল সুমি তার বাপের বাড়িতে। সে সন্তানসম্ভবা। মেয়ের প্রথম সন্তান তায় আবার জামাই বাইরে থাকে, তাই বাবা-মা তাকে শ্বশুরবাড়িতে রাখতে ভরসা পাননি। সে আসায় মায়ের খাটনি বহুগুণ বেড়ে গেলেও বাবা-মা নিশ্চিন্ত যে মেয়ে চোখের সামনে আছে। আর সুমির শ্বশুর-শাশুড়িও হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছেন কারণ ছেলের অনুপস্থিতিতে পোয়াতি বউমাকে নিয়ে থাকতে দুই বুড়োবুড়ি একটু ভয়ই পাচ্ছিলেন।

সুমির বাপের বাড়িতে এখন সুমির বাবা, মা, ভাই ছাড়াও অনেক লোক। এই সময়টায় তাদের ধান কাটা হয় বলে অনেক মুনিষ কাজ করে জমিতে যারা বাড়ির বাইরে, উঠোনের একপাশে একটা ঘরে থাকে। হঠাৎ দরকার পরলে তারাও আছে। বুধিয়াও সুমিদের মুনিষ। আজ প্রায় দশ বছর হতে চলল ও এই সময়টাতে সুমিদের জমিতে ধান কাটার কাজ করে। খুব খাটিয়ে ছেলে, গত বছর বিয়ে করেছে। সব থেকে অবাক করার ব্যাপার হল বুধিয়া আবার বাঁশীও বাজাতে জানে। কিন্তু এবার ওই বাঁশীই সুমির কাল হয়েছে। এবার এসে থেকেই বুধিয়া কেমন যেন একটা করছে। কাজে মন নেই, সবসময় কি যেন একটা ভাবে। মাসখানেক ধরে শুরু হয়েছে নতুন রোগ। সুমি ঘরের বাইরে বেরোলেই বুধিয়া হাঁ করে সুমিকে দেখছে। প্রথম প্রথম যখন সুমি জল খেতে গেলে বা হাত ধুতে গেলে বুধিয়া এসে বলতো – “বড়দি তুমি সরো আমি চাপকলটা টিপে দেই!” তখন সুমির কিছু সন্দেহ হয়নি। সুমি সেটাকে স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন এসে জিজ্ঞাসা করল – “বড়দি তুমি কবে খালাস হবে?” শুনে সুমি চমকে গেছিল। পরে সুমির মা এসে বোঝালেন যে বুধিয়া, সুমির কবে বাচ্চা হবে সেটাই জানতে চাইছে। সেদিন মনে মনে অল্প বিরক্ত হলেও ওকে কিছু বলেনি সুমি। কিন্তু গত কদিন ধরে খুব বাড়াবাড়ি করছে বুধিয়া। রাতে খেয়েদেয়ে সুমি যখন শুতে যাচ্ছে ঠিক সেই সময়ই বাবু বাঁশী বাজানো শুরু করছেন। আর এমন একটা সুর বাজাচ্ছে বারবার যে সুমি কিছুতেই রাতে ঘুমোতে পারছে না, ওর অস্থির অস্থির লাগছে। গতকালও সারারাত বাঁশী বাজিয়ে ভোরবেলা তিনি থেমেছেন তবে সুমি ঘুমিয়েছে। আর তো এটা চলতে দেওয়া যাবে না। কাল রাতেই সুমি ঠিক করে নিয়েছে যে আজ ও বাবার সাথে কথা বলবে।

-“বাবা!”

-“বল মা!”

-“বাবা তুমি বুধিয়াকে ছাড়িয়ে দাও!”

-“কেন রে? হঠাৎ?”

-“কারণ আমি বলছি তাই!”

-“তুই তো জানিস মা ও কতো খাটে! প্রায় দুটো মুনিষের কাজ ও একা করে। হ্যাঁ এবার একটু বেগড়বাই করছে বটে! কিন্তু তার জন্যে ছাড়িয়ে দেওয়াটা কি ঠিক হবে? এই সময় তো ও আর কোথাও নতুন কাজ পাবে না মা!”

-“সে তুমি ওকে যা মজুরী দাও তার থেকে কিছু বেশী দিয়ে দেবে। কিন্তু ওকে তাড়াও।”

-“কি হয়েছে সেটা তো বলবি আমায়!”

-“কি আবার হবে! তোমার ওই পেয়ারের বুধিয়ার লেজ গজিয়েছে! সারাদিন হাঁ করে আমায় দেখে, চাপকল পাম্প করে দেয়, রাতে বাঁশী বাজিয়ে শোনায়! আবার আমায় জিজ্ঞাসা করছে কবে খালাস হব! আমার কবে বাচ্চা হবে তাতে ওর কি?” – উত্তেজনায় হাঁপাতে থাকে সুমি।

ততক্ষণে ওর গলার আওয়াজে ঘর থেকে ওর মাও বেরিয়ে এসেছেন।

-“শুনছ! তুমি বুধিয়াকে বিদেয় করো না! আর তুই শান্ত হ’ মা। এসময় এতো উত্তেজনা ভালো না!”

-“আমি ওকে ডেকে পাঠাচ্ছি!”

-“আমি একেনেই আচি বড়বাবু।”

সুমি চমকে তাকিয়ে দেখল বুধিয়া বারান্দার এককোণে দাঁড়িয়ে আছে।

-“বড়দি ঠিকই বলচে বাবু! আমি বড়দিকে দেকি। বড়দির মত আমার ফুলমণিও পোয়াতি। একেনে আপনারা সব্বাই আচেন বড়দিকে দেকার জন্যি। আমার ঘরে কেউ নেই। ফুলমণির বাবাটা ভালো হলেও মাটা সুবিদের নয়। কে জানে ওকে কেমন রেকেচে! বড়দির সেবা করলে আমার মনে হয় আমি আমার ফুলমণির এট্টু সেবা করলাম। আর রেতে ওর কতা ভেবেই বাঁশী বাজাই বাবু। বুজতে পারিনি বড়দির কষ্ট হবে। তাইলে করতাম না। আমারে ক্ষমা দাও বড়দি!”

-“বাবা! ওর টাকাটা দাও।”

-“ও তো ক্ষমা চাইছে মা!”

-“তুমি ওর মজুরীটা দাও আর আরো ৫০০ টা টাকা আমাকে দাও এক্ষুণি।” – বাবাকে ধমকে উঠল সুমি।

বাবার হাত থেকে টাকাটা নিয়ে বুধিয়ার হাতে দিয়ে সুমি বলল

-“এই নে তোর মজুরী নিয়ে এখনই রওনা দে। ফুলমণির তোকে দরকার এখন। আর এই ৫০০ টা টাকা ফুলমণিকে দিয়ে বলিস ওর বড়দি দিয়েছে।”

টাকা কটা হাতে নিয়ে সুমিকে একটা প্রণাম করে যখন বুধিয়া চলে গেল তখন সুমিরও চোখের কোণে জল – কে জানে তার বরটা কি করছে? সে তো বাঁশীও বাজাতে জানে না।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.