(১)

বেহালার বহুপুরাতন ঐতিহ্যবাহী মিত্র পরিবারের দালানবাড়িতে বেশ অনেকদিন ধরেই চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ । কাঠামো,খড়, মাটি, ছাঁচ, রং তুলি, আর মৃতশিল্পীর নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তিলে তিলে জীবন্ত হয়ে উঠছে দুর্গাপ্রতিমা । হাতে আর বেশিদিন সময় নেই, আর মাত্র একটা মাস তারপরই মহালয়া আর তার সপ্তাহখানেক পরেই মহাষষ্ঠী-দেবীর বোধন ।

বিখ্যাত মৃতশিল্পী মলয় বসু প্রতিবছরের ন্যায় এবারেও মিত্র বাড়ির দালানে বসে দিনের পর দিন একনাগাড়ে নিজের সম্পূর্ণ সৃষ্টিকে ঢেলে দিয়ে তৈরি করে চলেছেন এবাড়ির সাবেকি মা দুর্গার মূর্তি । যদিও এর জন্য যথাযোগ্য পারিশ্রমিকও পান তিনি । সেই কোন ১৯৬০ সাল থেকে এ বাড়িতে এ পুজো প্রচলিত আর সেই তখন থেকেই এ বাড়ির মূর্তি গড়ার দায়িত্ব

মলয়ের বাবার, তখন অবশ্য ছোট্ট মলয় বাবার সহযোগিতায় পাশে থাকত । বর্তমানে প্রায় দশবছর হল তিনি মারা যাওয়ায় মলয় তার বাবার কাজে হাত দিয়েছে । হাতের কাজ তার বাবার মতই নিখুঁত, ছোট থেকেই বাবার পাশে বসে তুলির টান রপ্ত করেছে সে ।

--বলি ও মলয়, এবার একটু হাত চালা বাপু । পুজো যে আর বেশি দেরি নেই.......

মনিমালা দেবী হাঁকলেন । ইনি হলেন এই মিত্র বাড়ির গিন্নি মা । শ্বশুর শ্বাশুড়ী গত হয়েছেন বহুদিন, বাড়ির সমস্ত দায়ভার এখন তার, কাজেই এ বাড়িতে একমাত্র দাপট এখন তারই । স্বামী প্রতাপরঞ্জন, এক ছেলে সন্দীপ, পুত্রবধূ শ্রী আর দুই মেয়ে সুমি ও রুমিকে নিয়ে তার ভরা সংসার ।

বেলা গড়িয়ে গোধূলি নেমেছে আকাশ জুড়ে । রান্নাঘর থেকে বিস্কুট সহযোগে চায়ের কাপপ্লেট হাতে নিয়ে মনিমালা চলেছেন স্বামীর ঘরে এমন সময় সহসা দোতলার বাথরুম থেকে ওয়াক ওয়াক বমির শব্দে চমকে উঠলেন তিনি । হাতের কাপখানি নামিয়ে রেখে দ্রুত উঠে গেলেন সিঁড়ি দিয়ে ওপরে........

(২)

--এখন বমি পাবে, গা গোলাবে, মাথা ঘুরবে, ঝাল খেতে মন চাইবে, মাছের গন্ধ সইবে না, ঘুম পাবে, এমন আরো কত কি হবে গো মেয়ে, সবে তো শুরু । এইসময় একটু এসব হয়, ভয় পেও না । তোমাকে পইপই করে বলছি একটু দুধ খাও, ফল খাও তা না যতসব আজেবাজে জিনিস খাওয়া । কত করে বলছি বলো তো, অত তেঁতুল খেও নাকো...তা কে শোনে কার কথা । যাই করো আর তাই করো, নাতি আমার একেবারে সুস্থ চাই এই আমি বলে দিলুম মেয়ে ।

--নাতি ! তুমি কিকরে জানলে যে নাতিই হবে ! আমার তো তোমার মত একটা মেয়ে চাই ।

--মেয়ে ! ধুর বোকা, এ বাড়িতে আশীর্বাদ আছে প্রথম সন্তান ছেলেই হয় । তোমাদেরও ছেলেই হবে দেখ, নইলে বংশরক্ষা হবে কিকরে গো ! মুখাগ্নি করবে কে ! এ বাড়ির ছেলের হাতে নবমী পুজোর দিন মা দুর্গার পায়ে বলি অর্পণ হয় । এ যে তথাকথিত নিয়ম, এর ব্যাঘাত আজ পর্যন্ত স্বয়ং মা দুর্গাও পর্যন্ত কোনদিন ঘটতে দেননি ।

হ্যাঁ এই হল মিত্র বাড়ির একমাত্র ছেলে সন্দীপের সদাহাস্যময়ী মিশুকে স্ত্রী- শ্রী । বর্তমানে সে দুমাসের অন্তঃসত্ত্বা । মনে প্রাণে একটি ছোট্ট দুর্গা চায় তার কোল আলো করে । কিন্তু শ্বাশুড়ীমার ভয়ে বেশি কিছু আর বলতে পারেনা সে ।

(৩)

একদিকে মিত্র বাড়ির দালানে মা দুর্গা একটু একটু করে মাটির প্রলেপ মেখে তৈরি হচ্ছেন বাপের বাড়ি আলো করবেন বলে আর ওদিকে মাতৃগর্ভে ছোট্ট ভ্রূণটি বেড়ে উঠছে তিলে তিলে মায়ের নিশ্বাসে প্রশ্বাসে । মায়ের অপরিসীম যত্নে ইতিমধ্যেই তার শিরদাঁড়া এবং মস্তিষ্ক নিজস্ব আকার পেতে শুরু করেছে, হৃদপিন্ড ধীরে ধীরে ধুকপুক করতে শুরু করেছে, হাত পা একটু একটু করে বাড়ছে এমনকি আঙ্গুলগুলিও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে, যৌনাঙ্গ তার প্রকৃত গঠন আয়ত্ব করতে শুরু করে দিয়েছে ।

ভ্রূণের সাথে তাল মিলিয়ে মাটির দুর্গাপ্রতিমাটিরও এক একটি খাঁজ নিপুণ হয়ে উঠছে শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় । প্রতিমার উচ্চতা আকাশছোঁয়া, প্রায় কুড়ি ফুট.....। তবে ভ্রূণও পিছিয়ে নেই সেও কিন্তু এখন রক্তের দলা থেকে পরিবর্তিত হয়ে প্রায় এক ইঞ্চির মত লম্বা হয়ে গেছে ।

স্বামীর আদরে, শ্বাশুড়ী শ্বশুরের যত্নে, আর ননদদের সাথে প্রথম মা হওয়ার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে নিতে তিন মাস হয়ে গেল দেখতে দেখতে । তবে শ্রী-য়ের বড় মন খারাপ, তার পেট এখনো উঁচু হয়নি, আর পেটের ভিতরের শিশুটি এখনো নড়েচড়ে জানান দেয়নি তার উপস্থিতি । খুব সাবধানে পা চেপে চেপে হাটে শ্রী এখন । ওদিকে শিল্পীও প্রতি মুহূর্তে বিভিন্ন কোণ থেকে খুঁজে দেখেন তার তৈরি মূর্তি জীবন্ত রূপ পেল কি না । আর মাত্র অল্প কিছুদিনের অপেক্ষা...... এবারে শুরু রং তুলির পালা ।

(৪)

আজ মহালয়া । ভোরে রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহালয়া পাঠের সাথে সাথে মৃৎশিল্পী মলয় বসুর তুলির টানে কালো এবং সাদা রং দিয়ে আঁকা হয় দেবীর ক্রোধান্বিত চক্ষুদ্বয় । ঘট স্থাপনের মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের শুভ সূচনা হয় ।

মা দুর্গার বাপের বাড়ি আসা আজ প্রকাশ্যে ঘোষিত হল । নিজের জন্মদাত্রী মাকে কাছে পাওয়ার আনন্দে মা দুর্গা আজ যেমন খুশি, মাতৃগর্ভে ছোট্ট ভ্রূণটিও আজ ঠিক সেরকমই খুশি । হ্যাঁ খুশি তো হওয়ারই কথা...... আজ যে তার তিন মাস সম্পূর্ণ হল । সে জানে ভ্রূণের জীবনচক্রে প্রথম তিনমাস হচ্ছে সব থেকে বেশি সচেতন সময়কাল, আর আজ তা উতরে গেছে মানে তার জন্মদাত্রীকে খুব দ্রুতই দেখতে পাবে সে ।

ভ্রূণটি এই কদিনেই বেশ একটু লম্বা হয়ে গেছে, প্রায় তিন ইঞ্চি । তার বাহ্যিক যৌনাঙ্গ এখন পুরপুরি তৈরি সে ছেলে না মেয়ে সেটি প্রমাণ করার জন্য ।

এদিকে আর মাত্র সাত দিন বাকি মায়ের মর্ত্যে আগমনের । মিত্র বাড়িতে তাই আজ থেকেই শোরগোল পড়ে গেছে । সকাল সন্ধ্যে প্রচুর জিনিস আসছে, আসছে পুজোর সামগ্রী, আসছে নতুন পোশাক, আসছে রঙিন আলো, আর আসছে অনেক অনেক আত্মীয়স্বজন ।

(৫)

মিঃ চৌধুরী, মিত্র বাড়ির ফ্যামিলি ডক্টর, ওনার পরামর্শেই সন্দীপ আজ শ্রীকে নিয়ে চলেছে ওনার নার্সিং হোমে । করানো হবে শ্রীয়ের আল্ট্রা সোনোগ্রাফি । হৃদস্পন্দন প্রবল গতিতে বাড়ছে শ্রী-র, দুপুরে মহালয়ার মহাভোগও ঠিকমত গলা দিয়ে নামেনি তার । ভয়টা বেশ চেপে বসেছে মাথায়, বাচ্চাটা সুস্থ আছে তো... তার নিজের শরীরে কোন খামতি নেই তো... ইত্যাদি নানান প্রশ্নে ওর হৃদয় আক্রান্ত ।

শাড়ির বাঁধন আলগা করে পেট উন্মুক্ত করে শুয়ে পড়ে শ্রী । যন্ত্রের মুখে লাগানো বলটিতে ভাল করে একটি আঠালো তরল পদার্থ লাগিয়ে তলপেটের ওপর সেটিকে বেশ জোরে চেপে ধরে মনিটরে চোখ রাখেন সোনোলোজিস্ট । নোট করে নেন বেবির সমস্ত মুভমেন্ট । এই প্রথমবার শ্রী শুনতে পায় তার আগত সন্তানের হৃদস্পন্দন, তার দু চোখে উপচে পড়া জল আর ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি....সে এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ।

নার্সিং হোম থেকে ওরা বাড়ি ফেরে রিপোর্ট আর ডাক্তারের বক্তব্যের একরাশ অপেক্ষা নিয়ে ।

শ্বাশুড়ী মায়ের কড়া আদেশ পাঁচ মাস না হলে যেন কাকপক্ষীতেও টের না পায় এ খবর ।

কাজেই অগত্যা মনের ভিতর এত বড় খুশির খবর চেপে রেখে ওরা দুজনেই আত্মীয়দের ভিড়ে মিলেমিশে যেতে লাগলো ।

(৬)

আগামীকাল মহা ষষ্ঠী । গোটা বাড়িতে আলোর রোশনাই । দালান সেজে উঠেছে মস্ত বড় প্রতিমার সৌন্দর্যে । কিন্তু আজ সন্ধ্যা থেকেই যেন মনিমালা দেবীর মুখটি কেমন থমথমে । শ্রী কে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে তিনি জানিয়ে দেন শীঘ্রই নার্সিং হোম যেতে হবে তাকে ।

মিঃ চৌধুরী তাদের বহু পরিচিত ফ্যামিলি ডক্টর কাজেই অন্যায়ের হাতে নিজেকে বিক্রি করে দিতে তার বিন্দুমাত্র সময় লাগেনি..... মোটা টাকার বিনিময়ে মনিমালা দেবীকে তিনি জানিয়ে দেন, শ্রীর গর্ভে আছে এক কন্যাসন্তান ।

তিনি তাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ....এ বাড়িতে প্রথম সন্তান পুত্রই হয়.....কাজেই এর মৃত্যু অনিবার্য ।

মনিমালা দেবীর কড়া আদেশ, তার ছেলে এবং বাকি কাউকেই যেন এসবের কিছু জানানো না হয় । সন্তান, অথবা সংসারের মঙ্গলের মধ্যে যে কোন পথ একটি বেছে নেওয়ার দোটানায় শ্রী হয় জর্জরিত । অনর্গল ঢাকের আওয়াজে চাপা পড়ে যায় এক মায়ের কান্না, হাহাকার, আর্তনাদ ।

একে একে পেরিয়ে যায় ষষ্ঠীর অকাল বোধন, সপ্তমীর নবপত্রিকা, সন্ধ্যারতি, অষ্টমীর ত্রিনয়নীর গান, ইত্যাদি নানান আচার অনুষ্ঠান । মনিমালা দেবী কোমর বেঁধে দেবীর বন্দনা করছেন । মনে তার ভক্তি উছলে পড়ছে । লোকজন শুধু তার বাহ্যিক নমনীয়তাই দেখতে পেল.... অন্তরের মলিনতা কিন্তু কারোর চোখে বাঁধা পড়ল না । একদিকে তিনি প্রবল শক্তিশালী মহিষাসুরমর্দিনি মাকে প্রসাদ উত্সর্গ করছেন, অপরদিকে সেই তিনিই দুর্বল কন্যা ভ্রূণটিকে সমূলে উচ্ছেদ করার ছক কষছেন....অথচ কেউ ঘুণাক্ষরেও চিনতে পারল না মুখোশের আড়ালের মনিমালা দেবীকে......কি অদ্ভুত এই

সমাজ ।

(৭)

অষ্টমীর রাতে দু চোখের পাতা এক করতে পারলো না শ্রী । বড্ড কষ্ট হচ্ছে তার । আগামীকালের কথা ভেবে তার গা শিউরে উঠছে । হ্যাঁ আগামীকালই তো নবমী । শ্বাশুড়ীমা স্পষ্ট জানিয়েছেন, কাল সকালে যখন সন্দীপ নিজে হাতে প্রথানুযায়ী মায়ের পায়ে বলি অর্পণ করবে ঠিক সেই সময়ের ফাঁকেই শ্বাশুড়ীমার সাথে নার্সিং হোমে যেতে হবে তাকে ।

নিজেকে অদ্ভুত রকমের পাপী বলে মনে হয় শ্রীর । আর সবথেকে বেশি কষ্ট হচ্ছে সন্দীপকে কথাটা না জানাতে পারার জন্য.....এক এক সময় মনে হচ্ছে এক নিশ্বাসে সবটা উগলে দিতে সন্দীপের সামনে কিন্তু আবার পরমুহূর্তেই চোখে ভেসে উঠছে মায়ের প্রতি সন্দীপের নিখাদ ভালবাসার ছবি, সন্দীপ কি আদৌ বিশ্বাস করবে সে কথা ! !

(৮)

নবমীর সকাল :

নার্সিং হোমের অপারেশন টেবিলে শুয়ে আছে শ্রী । বুকটা জোরে জোরে ধড়ফড় করছে । বাইরে লাল আলোর দিকে তাকিয়ে অপেক্ষায় মগ্ন মনিমালা দেবী ।

ওদিকে মিত্রবাড়ির দালানে ঢাকের বাদ্যিতে সকলের কান ঝালাপালা, সকলে বলির জন্য প্রস্তুত । ঠাকুরমশাই পুজো এবং আরতি শেষ করে সন্দীপকে আহ্বান করলেন ।

ডক্টর চৌধুরী এগিয়ে এলেন, তার দুহাতে গ্লাভস্, মুখে মাস্ক, পাশেই যন্ত্রপাতির ট্রে নিয়ে দাঁড়িয়ে এক অল্পবয়সী তরুণী । এবং তারপর.........

বিভিন্ন রকম সব ডাক্তারি যন্ত্রপাতির সাহায্যে মাত্র তেরো সপ্তাহের ছোট্ট ভ্রূণটিকে টেনে বের করার লড়াই শুরু হয় । মনে হয় ভ্রূণটি ব্যাথা পেয়েছে, যন্ত্রের খোঁচা খেয়ে অনেকটা ভিতর দিকে গুটিয়ে গেছে । তাকে এখন শিশুও বলা চলে, কারণ সে এখন স্পর্শ অনুভব করতে শিখেছে.... তার শুধু হাত পা আঙ্গুলই নয় বরং নিজস্ব ফিঙ্গারপ্রিন্টও হয়েছে । আত্মরক্ষার জন্য পা দিয়ে ঠেলে দিল যন্ত্রটিকে, যেন লুকোচুরি খেলছে, কিছুতেই ধরা দেবে না সে, সে যে বাঁচতে চাইছে প্রাণপণে । আমবিলিকাল কর্ডটিকে ভয়ে জড়িয়ে ধরে আছে সে তার সর্বশক্তি দিয়ে । কিন্তু অবশেষে শেষ রক্ষা আর হল না.... জোর করে একে একে ছিঁড়ে বেরিয়ে এল তার দুটো অতি ছোট্ট পা, দুটো অতীব সূক্ষ হাত, প্রায় গোলাকার একটি মাথা, এবং সব শেষে বাকি শরীর । পাশে রাখা ট্রের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলো শ্রী । যেন গোটা একটি মুরগীছানাকে অনেক টুকরো করে কাটা হয়েছে.....

লাল রক্তমাখা ছিন্নবিছিন্ন মাংসদলাগুলি দপদপ করছে মাঝে মাঝে ।

গলার কাছে দলা পাকিয়ে ওঠা কষ্টটা কান্নারূপে বেরিয়ে এলো অঝোরে ।

ওদিকে পৈতৃক নিয়মানুযায়ী দেশি মোরগ খুঁজে আনা হয়েছে মিত্র বাড়িতে । সন্দীপ নিজেহাতে সেটিকে মায়ের পায়ে বলি দিয়েছে । গলাটি কেটে আলাদা পড়ে আছে, কাটা অংশ দিয়ে ক্রমাগত রক্ত ঝরছে । মৃত্যুর পরেও মৃত মোরগটির মাংসল শরীর যেন থরথর করে কাঁপছে ।

বলিস্থান রক্তে ভেসে যাচ্ছে । সন্দীপের দু হাত রক্তমাখা ।

(৯)

শ্রীয়ের যৌনাঙ্গ ভেদ করে পা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে লাল টকটকে রক্তের ধারা । মোরগটির সাথে সাথে আজ কন্যাভ্রূণটিরও বলি হয়ে গেল । মা কি তবে গ্রহণ করলেন এ বলি !

অবশেষে এলো বিজয়া দশমী । একদিন পেরিয়ে গেল হতভাগ্য শ্রী হারিয়েছে তার কন্যাভ্রূণটিকে । গলা দিয়ে খাবারের দানাও আর নামছে না তার ।

ওদিকে মিত্র বাড়ির সকলের আজ মন ভার । একে একে অপরাজিতা পুজো, ঠাকুর বরণ, সিঁদুরখেলা সম্পন্ন হল ।

দুরে দাঁড়িয়ে শ্রী দেখতে পায় বিসর্জনের মুহূর্তে অলৌকিক ভাবে, মায়ের মূর্তির দু গাল ছাপিয়ে বেরিয়ে আসছে অশ্রুধারা.... এ তবে কিসের কান্না, বিদায়ের নাকি আবার একটি ছোট্ট দুর্গার তার মায়ের কোলে না আসতে পারার ! মা দুর্গার রাগী চোখ দুটি শ্রী কে যেন বলছে...."তুই পাপী, তুই লোভী, তুই সংসারের লোভে সন্তানকে মেরে ফেলেছিস....তুই খুনি । ভালোই করেছিস আমাকে মেরে ফেলে, এই নোংরা সংকীর্ণ সমাজে আমি যে আর ফিরতে চাইনা । তুই নারী জাতির কলঙ্ক, তুই অসুর দমন করতে পারিসনি...তুই দমন করেছিস দুর্গাকে...."

(১০)

--একি আপনি এখনো এখানে বসে আছেন যে ! মিসেস মিত্র...মিসেস মিত্র..... ডক্টর চৌধুরী আপনাকে রেডি করতে বলেছেন । চলুন ও.টি রেডি । আপনার পোশাক বদলে পেশেন্ট অ্যাপ্রনটি পড়ে নিন । বেশি দেরি করা চলবে না ম্যাম.... ডক্টর চৌধুরী অপেক্ষা করছেন আপনার ।

নার্সের ডাকে সম্বিত ফেরে শ্রীর । ওহ্ এতক্ষণ তবে দুঃস্বপ্ন দেখছিল সে । নবমী তবে এখনো পেরোয়নি, তাহলে তো এখনো তার পেটের ভিতর জীবিত আছে কন্যাভ্রূণটি ।

সেই কখন থেকে ডক্টরের কেবিনের দেওয়ালে লাগানো একটি ভ্রূণের ছবি দেখছিল সে । ছোট্ট ছোট্ট হাত পা আঙ্গুল ঠোঁট চোখ কান নাড়ি সব দেখছিল খুঁটিয়ে.....আর সেটা দেখতে দেখতেই হারিয়ে গিয়েছিল মাতৃত্বের মায়াজালে । শুনতে পাচ্ছিল অ্যাবোর্ট করে ফেলে দেওয়া ভ্রূণের আর্তনাদ । সে যেন চিত্কার করে বলছে... "মা আমি মহিলা ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেন হতে চাই, আমি ম্যারাথন জিততে চাই, আমি ক্যারাটে কিড হতে চাই, আমি কোরিওগ্রাফার হতে চাই, আমি অনেক পড়াশুনা করে অনেক বড় মানুষের মত মানুষ হতে চাই । ও মা, আমাকে মেরে ফেল না মা..........."

ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে লম্বা একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে অবচেতন মনে বিড়বিড় করে বলতে থাকে সে........

--হ্যাঁ আমাকে যেতে হবে, যেতেই হবে আমাকে । আর দেরি করা চলবে না ।

বলতে বলতে দরজার দিকে পা বাড়ায় শ্রী, নম্র ভীত শ্রীয়ের মধ্যে আজ কোথা থেকে যেন পাহাড়সম মনোবল ভর করেছে, যেন জেগে উঠেছে এক নতুন শক্তিরুপেণ 'শ্রী' যে আজ মহিসাসুরমর্দিনি মা দুর্গার ন্যায় তার সন্তানের মঙ্গলকর্মে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ।

হনহন করে বেরিয়ে যেতে থাকে সে ডক্টরের কেবিন থেকে । শ্বাশুড়ীমা কে সে যেন আজ দেখেও দেখলো না । মনিমালা দেবীও শত চেষ্টা করেও আজ রুখতে পারলেন না শ্রী কে । তার দাপট আজ মাতৃস্নেহের কাছে হার মানতে বাধ্য হল । শ্রী শুধু বলল......

--আমি পারব না মা, আমি পারব না, ভদ্রতার মুখোশের আড়ালে একজন খুনি হয়ে বেঁচে থাকতে আমি পারব না । এই সন্তান যতটা তোমাদের বংশের তার চেয়ে ঢের গুণ বেশি আমার গর্ভের । কাজেই আমার সন্তানের জন্ম মৃত্যু নির্ধারণ করার অধিকার একমাত্র আমার । আমি চলে যাচ্ছি, তবে আমি ফিরব, আমি ফিরব আমার এই কন্যা সন্তানকে নিয়ে, যেদিন ও বড় হয়ে সফলতার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছবে সেদিন আমি ফিরব । সেদিন সত্যিই বলি হবে, বলি হবে তোমাদের এই কুসংস্কার আর সংকীর্ণ মনোভাবের । মা দুর্গা কখনোই তার কন্যাসন্তানের মৃত্যু কামনা করতে পারেন না....তিনি যে মা, তিনিও যে একজন নারী ।

হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন মনিমালা দেবী ।

বিজয়ী শ্রী এগিয়ে যায় তার নতুন গন্তব্যস্থলের উদ্দেশ্যে । হয়ত অন্য কোন শহরে......

মোবাইল হাতে তুলে মেসেজ টাইপ করে শ্রী । তাতে লেখা.....

--তোমার কাছে যেমন তোমার মা দেবীসমান ঠিক তেমনি আমিও আমার কন্যাসন্তানটির কাছে জীবনদাত্রী । তাই তোমার মায়ের কথামত তোমাদের বংশের কল্যাণের জন্য নিজের মাতৃত্বকে মেরে ফেলতে পারলাম না । জানি তুমি বিশ্বাস করবে না তাই নিজেকে প্রমাণ করার বৃথা চেষ্টা আর করলাম না । ভাল থেকো । আমি চলে যাচ্ছি । খোঁজার চেষ্টা কোরো না ।

কিন্তু নাহ্ সে মেসেজ পৌঁছোয়নি সন্দীপের কাছে । ডিলিট বাটন টিপে আবার পুরোটা মুছে ফেলে শ্রী । সে পারেনি একজন মা হয়ে অন্য একজন মা কে তার সন্তানের চোখে নিচে নামিয়ে দিতে । বাকি জীবনের লড়াইটা সে একাই লড়বে তার দুর্গাকে বুকে আগলে । এখানেই তার উদারতা ।


পরদিন বিজয়া দশমী । বিসর্জনের মুহূর্তে জলের অতলে ডুবতে ডুবতে মা দুর্গার মুখে ফুটে উঠলো বিজয়ী হাসি । শান্তিতে বিদায় নিল মা......রেখে গেল শ্রীয়ের মত হাজার হাজার মহিসাসুরমর্দিনিকে । ঘরে ফিরিয়ে দিয়ে গেল অসংখ্য কন্যাভ্রূণদের যারা হয়ত হতে পারে ভবিষ্যতের দেশের গৌরব ।

--সমাপ্ত--

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.