অমিত আর ওর মা দুজনের সংসার। অমিত অনেক গুলো কাজ করে সর্বদা নিজেকে ব্যস্ত রাখে। বিভিন্ন রকম কাজ রাতে আবার একটা কমপ্লেক্সে নাইট গার্ডের কাজ। ও একটু বেশি পয়সা রোজগার করতে চায়। কেননা ও জানে বিয়ে করলে অনেক পয়সা দরকার হয়। তাই ও উদয়াস্ত পরিশ্রম করে। এখন ওর বয়স চব্বিশ-পঁচিশ হবে। মা বিয়ের কথা বললে ও বলে দাঁড়াও একটু গুছিয়েনি। ওর বাবার শুধু দু কামরার একটা ঘর রেখে গেছে।তাও শরিকি বাড়ি বাথরুম কমন হওয়ায় সকাল থেকেই লাইন পড়ে। ও চায় কষ্ট করে একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট কিনতে নিজের সম্পূর্ণ নিজের উপার্জনের পয়সায়।

ও মা কেও জানায়নি ওর স্বপ্নের কথা। অমিতের আরও একটা নেশা আছে গল্পের বই পোড়া। রোজ রাতে যখন ডিউটিতে যায় তখন ও বই পড়ে। রোজ রাতে একটা একটা করে গাড়ি এসে ও গাড়ি নম্বর ও লোকের নকাম লিখে রাখেখাতায়। ওর পার্টনার রিক; ও গেট খুলে দেয়। সেদিনের কথাটা মনে পড়লেই গাঁয়ে কাঁটা দিইয়ে ওঠে। সকাল থেকেই আকাশের মুখটা ভার । কিন্তু এক পস্লাও হয়নি তাই আদ্রতা ছিল চরম।

অমিত রাতে ডিউটিতে যাবার জন্য একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ল। আর কি বৃষ্টি, সরজমিনে আকাশ ভেঙে পরেছে।রিক বলল, আমি ভাবলাম অমিত ডা তুমি হয়ত আসবেনা।

অমিত বলল না রে আমি জানতাম বৃষ্টি আসবে তাই একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলাম দেখছিস না টাইমের আগেই এসে গেছি। রিক বলল, ওরা তো চলে গেল তাড়াতাড়ি। বৃষ্টি এলে যেতে পারবেনা বলে, কটায় গেল ওরা? এই সাত্তার সময়। চা খাবে অমিত দা , রিক বলল। হ্যাঁ খাবো, বেশি করে দুধ দিইয়ে করবি কিন্তু। অমিত চা করতে বলে বই বার করে নিয়ে পড়তে বসল। রিক চা নিয়ে এল। দু জনে বসে চা খেয়ে তারপর অমিত রিক কে বলল নে একটু ঘুমিয়ে নে, বাইরে বৃষ্টি এখন আর গরম নেই। গাড়ি ঢুকলে তোকে ডেকে দেব।রিক বলল, ঘুমাতে বলছ তোমার নিজের স্বারথে।আমি এখানে থাকলে তোমার পড়ার অসুবিধা হবে তাই বলছ আমি জানি ।জানিস তো জানিস কি আছে।জানিস তো লোকের ভালো চাইতে নেই।

অমিত এবার বই পড়ায় মন দিল।আর রিক পাশ ফিরিয়ে ঘুমিয়ে পরল।এভাবেই ছলতে লাগল।বৃষ্টি আরও জোরে পড়তে লাগ্ল।রাত এগারোটা বাজে,এবার ডাক্তার সোমের গাড়ি,এটাই ওনার স্ম্য।রিক উঠে খুলে দিল।

ডাক্তার বাবুর নাম ও গাড়ির নম্বর নোট করে লাগল। রিক ফিরে এসে বলল, অমিত দা ডাক্তার বাবু এই প্যাকেটটা তোমায় দিল। অমিত দেখল একটা খাবারের প্যাকেট অনেক গুলো মিষ্টি আছে তাতে । ডাক্তার বাবু মাঝে মাঝেই দিইয়ে থাকেন অমিতকে।রিক আর অমিত দু টো করে খেল বাকিটা অমিত ওর মায়ের জন্য রেখে দিল। তারপর দশ মিনিট পর পর একটা করে গাড়ি আসতে থাকল। এভাবেই চলল রাত একটা অবধি। সবার টাইম আর গাড়ি নম্বর নোট করে রাখল। এবার এসে রিক বলল অমিত দা প্রায় সবাই এসে পড়েছে।এবার আমি ঘুমাতে যাই আর কেউ এলে আমাকে ডেকে দিও। আমি বললাম ঠিক আছে তুই এবার শুইয়ে পড়। এতক্ষণ বড় বিরক্তি হয়েছে এবার পড়ায় মন দেওয়া যাক। গল্পটা এত ভালো যে দেরি করতে ইচ্ছে করছে না। পড়তে পড়তে অমিত পড়ার মধ্যে ডুবে গেল। হঠাৎ সম্বিত ফিরে এল। গেটের বাইরে গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে গাড়িটার আলো জ্বলছে আর নিভছে। রিককে ডাকতে গিয়ে দেখি ও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ।তাই ডাকতে ইচ্ছে করলনা । আমারও কেমন গাঁ টা ভার হয়ে এল আবার মনে হল এত রাতে তো কেউ আসেনা।তাহলে কে এল এত রাতে কিন্তু যেতে তো হবেই এবার রিক কে ডেকে নিলাম একা যাওয়া ঠিক হবে না।

রিক খুব বিরক্ত হয়ে বলল “ কেন ডাকছ অমিত দা এখন তো কেউ আসেনা। আমি জানি তো অমিত বলল। কিন্তু দেখনা বাইরে একটা গাড়ি দাড়িয়ে আছে। আলো টা জ্বলছে আর নিভছে মনে হয় ডাকছে। ঠিক আছে চল দেখছি বলে রিক উঠে পড়ল সঙ্গে নিল ওর লাঠিটা । এই ক্যাম্পাসে অনেক বড় লোকের বাস তাই কেউ যদি ডাকাতির মতলবে আসে তাই নিজের সেফটির জন্য লাঠিটা নিয়েছে। গিয়ে ছোট গেট খুলে গাড়ির সামনে যেতেই ভদ্রমহিলা গাড়ি থেকে নেমে এসে বলল খুব বিপদে পড়ে এসেছি ডাক্তার সোমের কাছে। খুব বিপদে পড়েছি আমাকে ওনার কাছে যেতে হবে। অমিত তখন বলল দেখুন ম্যাডাম এত রাতে আমি ওনাকে ডাকতে পারব না ওনার নাম্বার থাকলে আপনি ওনাকে ফোন করে নিন।না ওনার নাম্বার টা আমার কাছে নেই আপনার কাছে থাকলে দিন না। আমার কাছে ল্যান্ড লাইন নম্বর রুম সার্ভিসের জন্য। ওটা এখন বন্ধ আছে সকালের আগে চালু হবে না এমন সময় অঝরে বৃষ্টি এল ,আমি বললাম আপনি ভিতরে এসে অপেক্ষা করুন সকাল হতেও বেশি দেরি নেই। কিন্তু আমি যে অপেক্ষা করতে পারবনা আমাদের গাড়িটা অ্যাক্সিডেন্ট করেছে আমি বাবাকে সি অফ করতে গিয়েছে বৃষ্টির কারনে মাঝ রাস্তায় গাড়ি উল্টে যায় কোন রকমে আমাদের গাড়ি থেকে বার করে হাসপাতালে ভরতি করা হয়েছিল ।আমার অবস্থা বিশেষ গুরুতর না হলেও বাবা এখন আই সি ইউ তাই হার্টে চোট পেয়েছে অবস্থা গুরুতর উনি আমার বাবার হার্ট অপারেশন করেছিলেন তাই...অনার সাথে জরুরি দরকার। তাই অগত্যা ছুটে আসা। অমিত এতসব শোনার পর ম্যাডামা আপনি ঠিক আছেন তো । হ্যাঁ আমি ঠিক আছি । আচ্ছা এতক্ষণ ধরে কথা বলা সত্ত্বেও আপনার নাম জানা হল না আমার নাম মহুয়া। আপনি এখানে একটু রেস্ট নিন ।এই ভোর হয়ে এসেছে আমি দেখে আসি ডাক্তার বাবু হয়ত ঘুম থেকে উঠে পড়েছেন আসলে উনি তো রোজ সকালে মর্নিং ওয়াকে যান।অমিত ডাক্তার বাবুর ফ্ল্যাটের ডাক্তার বাবু বেরিয়ে এলেন “কে এত সকালে?” অমিত কি কোন বিপদ হয়েছে? আমি এই মর্নিং ওয়াকের জন্য রেডি হচ্ছিলাম। অগত্যা তুমি ??

হ্যাঁ ডাক্তার বাবু আপনি আসুন বলছি একজন ভদ্র মহিলা আমাদের রিসেপশানে কাল রাত থেকে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে ওনার বাবা হাসপাতালে ভর্তি। আসুন ডাক্তার বাবু এই তো উনি! কোথায় অমিত কেউ তো এখানে নেই ! কাল রাত থেকে এখানে ছিলেন আমি ওনাকে এখানে বসতে বলে আপনাকে ডাকতে গেলাম।হ্যা উনি ওনার নাম বলেছিলেন মহুয়া ভট্টাচার্য । নাম শোনা মাত্রই ডাক্তার বাবু কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন আর বিড় বিড় করে বলতে লাগলেন মৌ তুই আমার সাথে দেখা করতে এসে ছিলিস মা । আমিত হতবাক ডাক্তার বাবুর দিকে তাকিয়ে রইল । ডাক্তার বাবু চোখের জল মুছতে মুছতে বলতে লাগলেন আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগের কথা সেদিন ও এমনি ঝড় বৃষ্টি । ও আমায় বন্দর থেকে রিসিপ করতে গিয়েছিল। আমি বাইরে থেকে সেদিন ফিরছিলাম। ফেরার সময় গাড়ির কাঁচটা কিছু দেখা যাচ্ছিল না বাইরে টা ধোয়ায় আচ্ছন্ন । আমি মৌ কে বলি সাবধানে চালা কিন্তু ও শোনেনা বলে মা বাড়িতে অপেক্ষা করছে অভি এসেছে বাপি তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে, অভি ওর হবু বর। বিলেত ফিরত ডাক্তার ...বার বার ফোন আসছিল আমাদের দেরি দেখে চোখের অলক্ষ্যে সামনে একটা গাড়ি এসে পড়ে ... ভিজে রাস্তায় গাড়ি স্কিট খেয়ে মারে পাশের ডি ভাইডারে তারপর চোখের সামনেটা অন্ধকার আবছা চোখে দেখি মেয়ের মাথা দিইয়ে রক্ত গড়াচ্ছে জড়ানো গলায় বললাম তোর কোথায় লেগেছে মা তারপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলি । এরপর যখন জ্ঞান ফিরল দেখি দেখি হাসপাতালের বেডে শুইয়ে মাথায় সেলাই পড়েছে ব্যাথা অনুভব জিজ্ঞাস করলাম ডাক্তার বাবু আমার মেয়ে মৌ ও কেমন আছে ও কোথায় দেখছি না তো ওকে ...ডাক্তার বাবু বলুন আপনি চুপ কেন বাইরে রমলা অভি তোমরা চুপ কেন কোথায় মৌ ... রমলা কেঁদে উঠল হাউ হাউ করে হাস্পাতালে আসা মাত্র ওর রক্ত ক্ষরণ বারে ডাক্তার রা শেষ চেষ্টা করে ও ওকে বাঁচাতে পারেনি। কাছে গিয়ে দেখি মৌ ঘুমিয়ে আছে কথা বলছে না বাপির সাথে আড়ি করেছে। অমিত তুমি ওকে দেখেছো কেমন আছে ও কি বলল তোমায় আমার কথা নিশ্চয়ই জিজ্ঞেস করছিল কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পরলেন সোম বাবু ।

আমার এখন ও বিশ্বাস কাল রাতের দেখাটা কি আদৌ সত্যি সত্যি কি ভূত বলে কিছু হয় । কাল যা দেখলাম যা শুনলাম তার বাস্তবিক রুপ মিলছে না মিলবে না । ঘটনা টা অলৌকিক বললে মিথ্যে হবে... সত্যি কি অচেনা একজন।

জয়দীপ রায়

৯৮৭৪৫৯৪৪৬১



bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.