'মল্লিকা' ও আমার 'মল্লিকা রাণী' একটু চোখটা মেলে দেখো, ১২ টা বাজে (রাত) ওঠো৷ গালে চুম্বনের স্পর্শে মল্লিকা দেবী ঘুম ভরা চোখে তাকিয়ে বললেন—"মরণ! বলি বুড়ো বয়সে কি ভিমরতি হল?"

স্বামী সুর্নিমল বাবুর হাতে 'একটা লাল গোলাপ ', 'ক্যাডবেরির বড় প্যাকেট', 'শুভ বিবাহ বার্ষিকী' লেখা কার্ড দেখে সম্বিত ফিরিয়ে একগাল হেসে বললেন—"ঘুমের ঘোরে ভুলেই গেছি৷"

রসিক মানুষ সুর্নিমল বাবু মল্লিকা দেবীর কানের কাছে মুখ টা নিয়ে বললেন—"না হয় তুমি ৬৮,আমি ৭৫ তা বলে কি আমাকে রিটার্ন গিফ্ট টা দেবে না?"

লজ্জা রাঙা মুখে মল্লিকা দেবী "মরণ!" বলে আলতো করে সুর্নিমল বাবুর গালে চুম্বন্ দিয়ে নিজের মুখটা স্বামীর বুকে গুঁজে দিলেন৷৷

সুর্নিমল বাবু, মল্লিকা দেবীর থুথনিটা ধরে আস্তে আস্তে মুখ টা তুলে গান ধরলেন—"যখন প্রথম ধরেছে কলি আমার মল্লিকা বণে"—

স্বামীর মুখ টা দু-হাতে চেপে ধরে বলে উঠলেন—"আরে কি কর পাশের ঘরে মেজো খোকা-বউমা(সুপ্রতিম-মিতালি)ঘুমাচ্ছে,শুনতে পেলে লজ্জার আর শেষ থাকবে না৷"


ফিস্ ফিস্ করে সুর্নিমল বাবু বললেন—"৫০ বছর আগে যে অষ্টাদশী মেয়েটা লাল বেণারসী-তে,টোপোর মাথায়,চন্দন্ পরে পান পাতা সরিয়ে প্রথম দৃষ্টি বিনিময় করেছিল চির সজীব আমার সেই মল্লিকা-কে আবার দেখলাম"!

মল্লিকা দেবী সলজ্জ দৃষ্টি-তে মৃদু স্বরে বললেন—"মরণ!তুমি ও তো শিব ঠাকুর টির মতন রূপের ছটায় আমার মন চুরি করেছিলে৷"


পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে কখন দু-জনে ঘুমিয়ে পরলেন,সেই ঘুম ভাঙলো প্রতিদিনের মতো বড় বউমার (সুমিতা)আনা চা-য়ের কাপে৷রোজকার মতো বড় বউমা চা দিয়ে চলে গেল দেখে সুর্নিমল বাবু কে মল্লিকা দেবী বললেন—"বড় বউমা কি ভুলে গেল আমাদের এই দিনটার কথা?মেজো-ছোটো (সুচরিতা)কোনো বউমা এমন কি নাতনী-নাতিরাও (সাগরিকা-শুভম-শুভাশিষ) এখনো এল না,এই দিন টাই তোমার আনা চকলেটের ভাগ নিয়ে কাড়া কাড়ি করে কে কোনটা নেবে বলে,ওরাও ভুলে গেল?মেয়ে-জামাই(সুলেখা-অপু)তো ফোন করলোনা এখনও, ওরাও কি আমাদের ৫০ বছরের বিবাহ বার্ষিকী টা ভুলে গেল?"


তুমি বসো আমি একটু আসছি বলে মল্লিকা দেবী বসার ঘরের দিকে গিয়ে দেখলেন বড় ও ছোটো খোকা (শ্যামল-সুমিত)বসে চা-খাচ্ছে ,খবরের কাগজের পাতা ভাগ করে পড়ছে,আর তা নিয়ে আলোচনায় মশগুল৷মেজো খোকাও প্রতিদিনের মতো বাজার চলে গেছে৷ নাতনি-নাতি রাও যে যার মতো স্কুল-কলেজ-টিউশন্ চলে গেছে৷


দুই ছেলের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টায় ছেলেদের পাশে সোফায় গিয়ে বসে বললেন—"কি রে তোদের চা-খাওয়া হলো?"

দুই ছেলে "হ্যাঁ হলো" বলে যে যার ঘরে চলে গেল অফিস্ যাওয়ার উদ্দেশ্যে৷ রান্না ঘরে উঁকি মেরে দেখলেন তিন বউ রোজকার মতোন অফিসের ডাল-ভাত রান্নায় ব্যস্ত৷


তাদের এই বিশেষ দিনটি নিয়ে কারো কোন-রূপ মাথা ব্যাথা নেই দেখে চাপা দুঃখে মুখটা গোমরা করে, সুর্নিমল বাবু-কে গিয়ে বললেন—"এই বুড়ো-বুড়ির বিবাহ বার্ষিকী কারো মনে নেই!আমরাও হয়তো এবার বাতিলের খাতায় চলে যাচ্ছি,—আমরা তো কারোর বিবাহ বার্ষিকী,জন্মদিন ভুলি না৷সবাই কে উপহার দি,বাতের ব্যাথার কষ্ট উপেক্ষা করে সবার জন্য বিশেষ দিন গুলোতে ওদের পছন্দ সই রান্না করে দি,কই আমরা তো ওদের কোনো বিশেষ দিন ভুলি না,যখন সবাই ভুলেই গেছে,তুমি কাউকে আমাদের এই বিশেষ দিন টার কথা মনে করাবে না, এই আমার মাথার দিব্যি থাকলো৷"


বিকেল ৫টায় যথারীতি পাটভাঙা শাড়ি পরে স্বামি-স্ত্রী পার্কে হাঁটতে গিয়ে দেখলেন হাঁটার সঙ্গী-সাথিরা বিশেষ কেউ আজ আসেনি৷ শুধু পাশের বাড়ির মিত্র দা-বউ দি এসেছেন তারাও একটু হেঁটে আজ আসি বলে চলে গেল দেখে, মল্লিকাদেবী বললেন—"মিত্র দা- বউ দিও অভিনন্দন জানাতে ভুলে গেলেন!এবছর কেউ আর আমাদের অভিনন্দন জানালোনা৷"


বেশ হতাশা মাখা গলায় সুর্নিমল বাবু বললেন—"নিজের ছেলে-মেয়েরাই ভুলে গেল! আর ইনারা তো প্রতিবেশী৷"মল্লিকা দেবীর হাত দুটো ধরে বললেন —"চলো তোমার পছন্দের আইসক্রিম্ খাওয়া যাক"—৷


দুজনে আইসক্রিম্ খেয়ে বেশ কিছুটা সময় অতিক্রম করে যখন ঘড়ির দিকে দেখলেন প্রায় ৮ টা বাজে,দুজনে পার্ক থেকে বেরিয়ে পাড়ার মোড়ের মিষ্টির দোকান থেকে মিষ্টি কিনে লোক চক্ষুর আড়ালে একে অপর-কে খাইয়ে,বাকিটা বাড়ির বাকী সদস্যদের জন্য নিয়ে বাড়ি ফিরে বেল মারতে গিয়ে লক্ষ্য করলেন সদর-দরজাটা আধ-ভেজানো অবস্থায়,দুজনে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখলেন , সারা বাড়ি ঘুট-ঘুটে অন্ধকার৷

মল্লিকা দেবী ওখানে দাঁড়িয়েই হাঁক পারলেন—"বলি বাড়িতে কেউ নেই নাকি?দরজা খোলা,আলো জ্বালো নি ব্যাপার কি সব?"


মুখের কথা শেষ হতে না হতেই আলো জ্বলে উঠল—কিছু বোঝার আগেই সবাই মিলে এক সাথে 'শুভ বিবাহ বার্ষিকী ' বলে চেঁচিয়ে উঠলো৷নজরে পরলো সারা বাড়ি ফুল, আলোয় সাজানো,বানানো হয়েছে বিয়ের মন্ডপ৷ পুরোহিত মশাই আয়োজনে ব্যস্ত৷ একটু দূরে দাঁড়িয়ে মিত্র দা-বউ দি ও পার্কের বাকী সঙ্গী-সাথীরা,আর মল্লিকা দেবী-সুর্নিমল বাবুকে চারিপাশ থেকে ঘিরে আছে ছেলেরা-বউমারা ,মেয়ে-জামাই, নাতনি-নাতিরা৷৷


এসব আয়োজন দেখে আনন্দে মল্লিকা দেবীর চোখের জল দু-গাল বেয়ে নেমে এল৷আর কান্না গলায় বলে ফেললেন—"আমরা দুজনে তো ভেবেই ফেলে ছিলাম তোমারা সবাই ভুলে গেছ এই দিন টার কথা"৷


বড় বউমা জড়িয়ে ধরে বলল—"আপনি ভাবলেন কি করে মা, যে বটবৃক্ষ দের ছায়ায়,তাদের ভালোবাসায় আমরা এতদিন ধরে নিশ্চিন্তে সুখে সংসার করছি, তাদের জীবনের এত মূল্যবাণ দিনটাই ভুলে যাব!"


নাতনি কাঁধ দুটোয় হাত রেখে বলল—" চল ঠাম্মু তোমাকে নতুন বেণারসী,টোপর,চন্দন,গয়না,মালা পরিয়ে নতুন বউ সাজিয়ে নিয়ে আসি৷দেখবে দাদুনের দেখে তাক্ লেগে যাবে৷"

ওদিকে দুই নাতি বলল—"দাদুন তুমি আমাদের সাথে চলো ,এমন বর বেশে সাজাবো ঠাম্মু চিনতেই পারবে না৷"


সাজিয়ে-গুজিয়ে বর-কনে কে বিয়ের মন্ডপে হাজির করা হলো৷শঙ্খ-উলু ধ্বনির সাথে পুরোহিতের মন্ত্র উচ্চারণে শুভদৃষ্টি-মালাবদল-চার হাত এক সবশেষে সিঁদুর দান হয়ে বিবাহ কাজ সুসম্পন্ন হলো৷


নাতিদের ও নাতনীর আবদারে তাদের আয়োজিত কেক্ কাটাও হলো মোমবাতি নিভিয়ে, সবাই মিলে রাতের খাবার খেয়ে প্রতিবেশীরা বিদায় নিলে ,সদ্য বিবাহিত দম্পতি নাতনী-নাতিদের বাহারী ফুলে সাজানো বিছানায় গিয়ে বসলেন৷লাজুক মুখি মল্লিকা দেবীর গাল দুটো আলতো করে ধরে সুর্নিমল বাবু বললেন—"মল্লিকা সময় চলে যায় ,ভালোবাসা আর স্মৃতিরা থেকে যায়৷"


দু-বাহু তে মল্লিকা দেবী-কে আলিঙ্গন করে আবার গান ধরলেন —"যখন প্রথম ধরেছে কলি আমার মল্লিকা বণে৷"

"মরণ!" বলে মল্লিকা দেবী নিজের লাজুক মুখটা সুর্নিমল বাবুর বুকে গুঁজে দিলেন৷৷


সমাপ্ত:—

...............


bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.