সদ্যমৃতা মায়ের কাছে ছেলের চিঠি

মায়ের কাছে ছোট্ট ছেলের চিঠি

শ্রী চরণেষু মা,

তুমি কেমন আছো মা ? তোমার শরীর ভালো তো ? এই নিয়ে আটটা চিঠি হল, কিন্তু একটারও কোনও জবাব দিলে না কেন? তুমি কি এখনো আমার উপরে রাগ করে আছো ? আমি জানি যতই রাগ করো না কেন, তোমার বিল্টুর চিঠি তুমি ঠিক পরবে! আমি বলছি তো আমি আর দুষ্টুমি করব না, আর জ্বালাবো না তোমাকে, তুমি ফিরে এসো মা ! এই চিঠিটারও উত্তর না পেলে আমিও আর চিঠি লিখব না, তখন দেখবে, আমার মতো তোমারও কষ্ট হবে । তখন আমি রাগ করে থাকবো, তোমার চিঠিরও কোন উত্তর দেব না, আর তুমি যখন থাকতে না পেরে আমাকে খুঁজতে আসবে, আমি দূর থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে তোমাকে দেখব, আবার যখন কোথাও খুঁজে না পেয়ে তুমি কাঁদতে বসবে, আমি দৌড়ে এসে তোমার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ব।

জানো মা, আমি ভালো আছি, এখন অনেক অনেক ভালো আছি, এখন আর আমার কোন দুঃখ নেই। এখন আমি আগের মত দুষ্টুমিও করি না, যবে থেকে জ্যেঠিমা বলেছে, আমার দুষ্টুমির জন্য তুমি চলে গেছ, তবে থেকে একদম দুষ্টুমি করা বন্ধ করে দিয়েছি, হ্যাঁ, তবে মাঝে মাঝে মনের ভুলে হয়ে যায়, কত্ত ভাবি, যে আর দুষ্টুমি করব না, কিন্তু করার সময়ে কিছুতেই আর মনে রাখতে পারি না । কে জানে কেন ? আসলে আগে তুমি মনে করিয়ে দিতে, কিন্তু এখন আর কে মনে করাবে বল !

রোজ আকাশে, উত্তরদিকের কোণায়, একটা নতুন তারা দেখতে পাই ক'দিন ধরেই, খুব একটা চকমকে নয়, তবু তার কেমন যেন সবুজ আভা আছে। মনে পড়েছে তোমার? সেই যে, বাড়ির বাগানের উত্তরদিকের খোলা জায়গাটায় যেদিকে তুমি নারকেল দড়িতে আমার স্কুলের ছোট্ট ছোট্ট জামাকাপড় মেলতে, সেই দড়ির উপর দিয়ে কাঁঠাল গাছটার পাশ দিয়ে ঐ আকাশে, প্রতিদিন আমি তাকে দেখতে পাই। জ্যেঠিমা বলেছে, ঐ তারাটা নাকি তুমি! আরো বলেছে, যারা সবাই নিজের খুব প্রিয় হয়, তারা সবাই নাকি একদিন ঐ আকাশের তারা হয়ে যায়! আরো বলেছে, ঐ যে সবুজ রঙ, সেটা তোমার শাড়ির । ঐ যে ছিঁড়ে গেলেও যে শাড়িটা পরে থাকতে আমার জন্য, কারণ শাড়িটার গন্ধ আমার বড় ভালো লাগত। আর ওটা যে দপ দপ করে সেটা নাকি আমার পাগলামি দেখে তোমার চোখ টিপে হাসিটা।

তাহলে বাবাকে কেন আমি ঐ আকাশের তারদের মাঝে দেখ তে পাই না? বাবাও তো আমার মনের অনেক কাছের লোক ছিল! বাবা তো তোমার অনেক আগেই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আমি কি আর এখনো তোমাদের বিল্টুসোনা আছি বল ? জানো মা, এই বছর স্কুলে গেলে আমার ক্লাস ফোর হয়ে যেত ! আগের বারের রেজাল্ট তো তুমি দেখতেই পেলে না, জানো আমি ক্লাসে তৃতীয় হয়েছিলাম, আর অঙ্কে তিন নম্বরের জন্য একশো হয় নি ! কিন্তু কি আর করব বল, এখন তো আমি আর স্কুলেও যাই না, তুমি নেই বলেই তো আর ভয়ে জ্যেঠু আমাকে আর স্কুলে পাঠালো না। বলেছে, কে দেখবে স্কুলে দুষ্টুমি করলে, তার চেয়ে জ্যেঠিমার হাতে হাতে কাজ করে দিলে অনেক ভালো হবে। কিন্তু আমার যে স্কুলে যেতে ভালো লাগে মা ! তুমি কেন ফিরে আসছ না, আমি যে আকাশ, অর্নব, অনিন্দিতা, সায়ন্তনদের খুব মিস করি মা, কেন আসছ না তুমি ?

আমি ভালো নেই মা, আমি একটুকু ভালো নেই, জানো মা সেদিন জ্যেঠু আমায় লাঠি দিয়ে মেরেছে ? আমি একটু পেপারটা ছিঁড়ে ফেলেছিলাম বলে ! আমি স্কুলে যেতে চাই মা, তুমি ফিরে এসো। এখন আমার বালতি করে জল টানতে টানতে হাত ব্যাথা হয়ে যায়, তবু এত বড় বাগানে জল দেওয়া শেষ হয় না, কিন্তু তুমি যখন ছিলে তখনতো এসব আমাকে করতে হত না। আমি রোজ স্কুলে যেতাম আর কত মজাই না করতাম সবার সাথে। বাড়ি ফিরে তোমাকে যখন বলতাম সব, তুমি শুধু হাসতে । এখন আর কেউ আমার কথা শুনতেও চায় না।

এখন আমি তো কোন দুষ্টুমি করি না, তবু জ্যেঠু আমায় বকে, আর মারে। আমি তো আগে এত দুষ্টুমি করেছি, কই তুমি তো কখনো আমায় মারো নি? বলল, মা-বাবা চলে গিয়ে আমাদের ঘাড়ে ফেলে গেছে তোকে। জানো জ্যেঠু খুব রেগে গিয়েছিল সেদিন , নেহাত জ্যেঠিমা আমাকে কোলে করে নিয়ে চলে গিয়েছিল, তা নাহলে কি হত কে জানে !

আমার তোমার উপরে খুব রাগ হয়েছে জানো ? এরকম করে কেউ চলে যায় ? প্রথমে বাবা আর তারপরে তুমি ! তোমরা কেউ আমাকে ভালোবাসো না আজ আমি জানি। তুমিও বদলে গেলে শেষে? বাবা তো কবেই আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে কোন অচিনপুরে! বাবাও নাকি আমাকে খুব ভালোবাসত! ব্যাঙ, ভালোবাসত ! কই, তুমি যে বলতে শুধু আমাকেই নাকি ভালোবাসো। ভালোবাসলে বুঝি আমাকে ফেলে চলে যেতে হয় !

তোমার এই ছোট্ট বিল্টুসোনা আজকে বুঝতে শিখেছে মা। তুমি আসলে বাবাকেও খুব ভালোবাসতে না? তাই কি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছ বাবার কাছে? তাই যখন বাবার ঐ ফটোর তলায় বসে নিজে অঝোর ধারায় কাঁদছিলে, তখন বুঝেছিলাম, বাবাকেই তুমি ঢের বেশী ভালোবাসো, নিজেও তো তাই আজ তার পাশে আজ নতুন ছবিতে সেজেছ। এখন আমি খেলতেও যেতে পারি না, জ্যেঠিমার কাজের খুব চাপ তো, তাই আমি না থাকলে আবার সব কাজ তাড়াতাড়ি করে শেষ করে টিভি দেখতে পারবে না।

আমি ভালো নেই মা'গো, সত্যি করে বলছি আমি ভালো নেই, আমি জানি ঐ আকাশের তারা তুমি কিছুতেই হতে পারো না, তবু কেন জানি না, রাতের আকাশে যখন ঐ তারাটাকে দেখি, আমার তোমার কথাই সবচেয়ে মনে পড়ে। মনে হয় যেন তুমি আমায় দেখছ, তুমি আমায় আদর করছ । আমার খুব ভালো লাগে ঐ তারাটার দিকে তাকিয়ে থাকতে । সব কিছু কেমন বদলে গেছে। সেদিন কে অনির্বাণ জিজ্ঞসা করছিল, আমি আবার কবে থেকে স্কুলে যাব ? আমি হেসে বললাম, যবে আমার মা আবার ফিরে আসবে, আমি সেদিন থেকে আবার স্কুলে যাব । আমি রোজ সেই দিনটা গুনি, কবে আসবে তুমি ফিরে মা? কেন তুমিও আমায় ছেড়ে গেলে মা ? আমি কি এতোই দুষ্টুমি করতাম ? আর গেলে যখন আমায় সাথে করে নিয়ে গেলে না কেন?

দেখেছ, কত কথা লিখে ফেললাম, অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেল, এক্ষুনি চিঠিটা রাস্তার মোড়ের ডাকবাক্সে না ফেললে পিওনকাকু তো আর নিয়ে যাবে না, যাই গিয়ে দিয়ে আসি । পিওন কাকুকে রোজ জিজ্ঞাসা করি যে আমার নামে কোন চিঠি এসেছে কিনা, কিন্তু, প্রতিবারই বলে যে তোমার কাছ থেকে নিয়ে আসতে ভুলে গেছে। তুমি কিন্তু এবারে মনে করে চিঠিটা দিয়ে দেবে পিওনকাকুকে। আবার এক্ষুণি জ্যেঠিমা আটা মাখার জন্য আমাকে ডাকবে, জল দেবার জন্য।

তবে এটাই কিন্তু শেষ চিঠি, এটার উত্তর না পেলে আমি কিন্তু খুব রাগ করব। তুমি ভালো থেক মা, আমিও আরো ভালো থাকার চেষ্টা করব।

ইতি,

তোমার বিল্টু সোনা

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.