#মুক্ত-বিহঙ্গ

#দেবদত্তা-ব‍্যানার্জী

( ১ )

বন্ধ জানালার কাচের গায়ে বৃষ্টির ফোটা গুলো পরে কত রকমের ছবি আঁকছিল, সেদিকে তাকিয়ে সাইড লোয়ার বার্থে শুয়ে ছিল নীল। বাইরে বৃষ্টির বেগ একটু কমেছে। চলন্ত ট্রেনের স্লিপার ক্লাসের জানালা দিয়ে চুইয়ে অল্প জল ঢুকছিল, কাগজ দিয়ে কিছুটা আটকানো গেছিল। কাগজ গুলো জলে ভিজে গেছে। নীল আকাশ একরাশ ঘন কালো মেঘে ঢেকে আছে ঠিক নীলের জীবনের মত।
নীলের জীবনও ঘন কালো মেঘে ঢেকে গেছে।
নীল সেসব কথাই ভাবছিল শুয়ে শুয়ে।


আস্তে আস্তে ট্রেনটা শিয়ালদা স্টেশনে ঢুকছিল। যাত্রীদের মধ্যে একটা ব্যস্ততা...... সবাই আগে নামতে চায় এসময়। নীলের কোনো ব্যস্ততা নেই। এই বৃষ্টিতে নেমে কোথায় যাবে ও জানে না। কলকাতার এই জনঅরণ্যে ও কোথায় যাবে কি করবে ভেবে পায় না।
কলকাতায় এক সময় পড়াশোনা করলেও আজ বহুদিন নীল হিমাচল প্রদেশের ছোট্ট একটা গ্রাম ছিটকুলে কর্মরত। প্রায় তিনবছর পর বাড়ি ফিরেছিল নীল। বাবা মা কয়েক বছর আগেই গত হয়েছিল, কাকার সংসারেই শেষ কয়েক বছর কাটাতে হয়েছিল ওদের দু ভাই বোন কে।চার বছর আগে বোনের বিয়ে দিয়ে ঝাড়া হাত পা নীল চলে গেছিল পাহাড়ে, এক বন্ধুর সাথে হোটেলের ব‍্যবসা করতে। গত তিন বছরে আর বাড়ি আসা হয় নি। এবার একটু ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছিল। আর এসেই এত বড় খবরটা জানতে পেরেছিল।
আস্তে আস্তে নিজের ছোট ব্যাগটা নিয়ে প্লাটফর্মে নামে সে। এই বৃষ্টিতে কোথায় যাবে ভেবে পায় না। একটা চেয়ারে বসে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে নিজের অতীতে ফিরে যায় সে।

ডুয়ার্সের এক ছোট্ট চা বাগানে কেটেছিল নীলের ছোটবেলা। বাবা কাকা দু জনেই চা বাগানের কর্মী। নীল ওর কাকাতো ভাই লাল আর বোন তিয়াস চা বাগানের কোয়াটারেই হেসে খেলে বড় হয়েছে। নীল ছিল সবার বড়। মাধ্যমিকের পর মা হঠাৎ মারা গেছিল। তারপর বাবা ওকে কলকাতা পাঠিয়েছিল পড়ার জন্য। এক দুর সম্পর্কের পিসির বাড়ি থেকে দু বছর পড়ার পর ও হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়তে বাইরে চলে গেছিল। তখন তিয়াস পড়ে ক্লাস টেনে, আর আর লাল উচ্চ মাধ্যমিক দেবে। সেই সময় বাবাও চলে গেল। রুগ্ন চা বাগানে কাকা খুব কষ্ট করে টিকে ছিল। বাগানের অবস্থা দিন দিন আরো খারাপ হচ্ছিল। মায়না ঠিক মত দেয় না। বোনাস নেই। সব সুবিধা বন্ধের মুখে। কাকা খুব কষ্টেই সংসার টাকে টানছিল । বাবা মা এর অভাব কাকিমা কাকা বুঝতে দেয় নি কখনো। লাল সেই সময় পড়া ছেড়ে একটা ব‍্যবসায় ঢুকেছিল। একবছর পর সেটাও ছেড়ে দিয়ে নেশা করতে শুরু করেছিল বন্ধুদের সাথে থেকে। বাড়িও আসত না। বাগান তখন প্রায় বন্ধের মুখে। কাকার চাকরীটা কোনভাবে টিকে ছিল। সবাই সবসময় একটা দুশ্চিন্তায় থাকত। চাকরী গেলে অতবড় কোয়াটার ছেড়ে কোথায় যাবে কাকা তাই ভাবত সব সময়। কোয়াটারের বাগানে প্রচুর সবজি হত। কত রকম ফলের গাছ ছিল। কাকিমার পোষা প্রচুর হাঁস মুরগি ছিল, আর ছিল দুটো গরু। বাগানে রেশনটা তখনো পাওয়া যেত বলে খাওয়ার সমস্যা ততটা ছিল না। কিন্তু চাকরী গেলে যে সব যাবে, মাথা গোজার ঠাঁইটাও যাবে এই চিন্তায় কাকা কেমন হয়ে গেছিল।
এমন সময় মালিক আর তার দুই ছেলে এসেছিল বাগানে। কয়েকদিন ছিল। তিয়াস তখন কলেজে সবে ঢুকেছে, টাকার অভাবে নীল পড়া ছেড়ে ফিরে এসেছিল বাগানে।চাকরীর খোঁজে এদিক ওদিক ঘুরছিল। লালের কোনো খবর নেই। আগে মাঝে মাঝে আসত।একমাসের উপর বাড়ি ছাড়া সে।

তিয়াস কে বাগানেই দেখেছিল দিগন্ত। বাগানের মালিক অলকেশ বাবুর বড় ছেলে। কথাও হয়তো হয়েছিল কিছু। হঠাৎ করেই অলকেশ বাবু কাকা কে ডেকে পাঠানোয় সবাই ভয় পেয়ে গেছিল। নীল একটু জোর করেই সাথে গেছিল সেদিন। মালিকের বাংলোয় এর আগেও বহুবার তলব হয়েছে তনয় বাবুর , কিন্তু এ বার এক অজানা আশংকার মেঘ সবার মনে........

নীল আর তনয় বাবুকে সাজানো ড্রইংরুমে বসিয়ে বেয়ারা গেছিল খবর দিতে মালিক অলকেশ চৌধুরী কে। অন‍্য এক কাজের লোক সরবত দিয়ে গেল। একটু পরেই দিগন্তকে নিয়ে অলকেশ বাবু এসেছিলেন। একটা দুটো বাগানের কথার পর আসল কথায় এলেন উনি। তিয়াসকে দেখে ওনার ছেলে দিগন্তের দারুণ পছন্দ হয়েছে, ওনারা তিয়াসকে পুত্র বধূ করে ঘরে তুলতে চান এটাই বলার জন্য ডেকেছিলেন।

সাধারণত বাগানে মালিক-পক্ষর সাথে কর্মচারীদের এক বিশাল দূরত্ব থাকে, সেখানে এমন প্রস্তাবে চমকে উঠেছিল নীল। বোন তার সত্যিই সুন্দরী, তাই বলে বিদেশে পড়া কলকাতা বাসি দিগন্তর মত ছেলে ওকে পছন্দ করে বিয়ে করতে চাইবে........, একটু কেমন লেগেছিল নীলের।

অলকেশ বাবু ওদের আরো জানিয়েছিলেন তিয়াসের সাথে দিগন্তের কথা হয়েছে। তিয়াসের এ বিয়েতে আপত্তি নেই। তনয় বাবু একদিন সময় চেয়ে নিয়েছিলেন একটু ভাবার জন্য। এর পর অলকেশ বাবু নীলকে নিয়ে পরেছিলেন। ওনাদের নানারকম ব‍্যবসা। নীল হোটেল ম‍্যানেজম‍্যান্ট করতে করতে ছেড়ে দিয়েছে শুনে তক্ষুনি ছেলেদের সাথে আলোচনা করে ওনাদের লাটা-গুড়ির কাছে এক রিসোর্টে ওকে জয়েন করতে বলেছিলেন। তনয় বাবুকেও বলেছিলেন যতদিন আর চাকরী আছে নিশ্চিন্তে থাকতে। ভর পেট খাইয়ে রাতে ওদের ছেড়েছিলেন। ওনার আর দিগন্তর অমায়িক ব্যবহারে তনয় বাবু মুগ্ধ হলেও নীলের মনে একটা কিন্তু থেকেই গেছিল।

বাড়ি এসে তিয়াস কে ডেকে নীল প্রথম জিগ্যেস করেছিল দিগন্তর কথা, বোন তার বরাবরই লাজুক, কম কথা বলে। দিগন্তর সাথে এবার বাগানেই পরিচয় হয়েছে জানিয়েছিল তিয়াস। বিয়ের কথা শুনে উত্তর না দিয়েই চলে গেছিল অন‍্য ঘরে। কাকিমা পরে বলেছিল একটু ভাল করে খোঁজ নিতে ওদের সম্পর্কে। এত বড়লোক পরিবারে বিয়ে দেওয়ার মত সামর্থ্য তাদের নেই। লালের এদিকে কোনো খবর নেই। এই বিয়ে হলে নীলের চাকরী ও কাকার চাকরীর একটু আশা আছে। অন‍্য দিকে তিয়াসের ভবিষ্যৎ ........

তনয়-বাবু একদিনে আর কি খবর নিতেন, পরদিন বাগানের বড়বাবুর সাথে আলোচনা করেছিলেন। বড়বাবু নগেন কাকু তিয়াসকে ভীষণ ভালোবাসতেন। সব শুনে তিনি বলেছিলেন দিগন্ত ভাল ছেলে। ওর ছোটভাই বিদেশ যাচ্ছে পড়াশোনার জন্য। শাশুড়ি নেই। দিগন্ত ওদের ব‍্যবসাকে বিভিন্ন দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। তিয়াস ভাল থাকবে ওখানে।

বিকেলে তিয়াস বাগানে দোলনায় বসে ছিল। এই দোলনা বাবা একসময় বানিয়ে দিয়েছিল তিনভাই বোনের জন্য। নীল আস্তে আস্তে গিয়ে বসেছিল ওর পাশে। অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর নীল বলেছিল -"তুই কি খুশী বোন? "
তিয়াস ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিল সেদিন। কত ছোটবেলার কথা মনে পরছিল নীলের। বোনকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল তুই চাইলেই এ বিয়ে হবে। তিয়াস বলেছিল সে পড়াটা শেষ করতে চায়। বিয়ের পর কি ওরা পড়াবে ?

পরদিন আবার অলকেশ চৌধুরীর ডাকে ওরা গেছিল ওনার বাংলোয়। তনয়-বাবু বলেছিলেন তক্ষুনি তিনি বিয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি নন, তিয়াস ও পড়াটা শেষ করতে চায়, ছোটবেলা থেকে ও মিশনারি স্কুলে পড়েছে, যথেষ্ট ভালো রেজাল্ট করলেও টাকার অভাবে ভাল কোনো কলেজে পড়তে পারে নি ও.......

ওনার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে অলকেশ বাবু বলেছিলেন পড়াশোনায় ওনাদের আপত্তি নেই। ওদের শিক্ষিত মেয়েই চাই যাতে দিগন্তকে ব্যবসার কাজে সাহায্য করতে পারে। ও কনভেন্টে পড়ছে বলেই ওনার ওকে পছন্দ। ওকে প্রয়োজনে কলকাতার কলেজে ভর্তি করা হবে। আর তনয়-বাবুকে অভয় দিয়ে বলেছিলেন যে বিয়ের সব খরচ উনি করবেন। খরচ নিয়ে ভাবতে না। যদি সবাই রাজি থাকে পরের সপ্তাহে বাগানের মন্দিরেই বিয়ে হবে। উনি কলকাতায় গিয়ে পার্টি দেবেন।

অনেক আলাপ আলোচনার পর পরের সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে তিয়াসের বিয়ে হয়ে গেছিল দিগন্তর সাথে। সমবয়সী বন্ধুরা ওকে দেখে হিংসা করেছিল, শুভাকাঙ্ক্ষীরা আশীর্বাদ করে বলেছিল ও সৌভাগ্যবতী। কাকা কাকিমা যতটুকু পেরেছিল করেছিল, লালকে কোথাও পাওয়া যায় নি। বিয়ের পর অলকেশবাবু ওদের নিয়ে কলকাতা ফিরে গেছিলেন। সেখানে নলবনে বিশাল করে পার্টি দিয়েছিলেন উনি, আবার ক্যালকাটা ক্লাবেও বন্ধু বান্ধব নিয়ে সব বড় বড় মন্ত্রী ও বিজনেস ম‍্যগনেটদের নিয়ে আলাদা পার্টি দিয়েছিলেন। নীল মাত্র দুবার তিয়াসকে ফোন করেছিল এই কদিনে। আর তিয়াস মাত্র একবার ফোন করেছিল। ও ওখানে সদা ব‍্যস্ত বৌরানী........

পরের সপ্তাহে ওরা মালয়েশিয়া চলে গেছিল মধুচন্দ্রিমায়। তনয়-বাবু আর নীল বুঝতে পেরেছিল অপূর্ব সুন্দরী কনভেন্টে পড়া তিয়াসকে ওরা নিজের করে নিলেও তাদের থেকে তিয়াস জীবনের মত দুরে চলে গেছিল। কিছুদিন পর নীল লাটা-গুড়ির দিগন্তিকা রিসোর্টে কাজে যোগ দিলেও বোনের বরের রিসোর্টে কাজ করতে ওর সন্মানে লেগেছিল। ও এক কলেজের বন্ধুর ডাকে হিমাচল চলে গেছিল কয়েক মাস পর। এরপর একবার কলকাতায় গেছিল বোনের বাড়ী। কারণ তখন আর সে ওদের কর্মচারী ছিল না।

খবর না দিয়ে প্রথম দিন যাওয়ায় বোনের দেখা পায় নি। ও নাকি কলেজের পর পড়তে যায়। কাজের লোকেরা বৌরানীর ভাইকে জলখাবার খাইয়েই বিদায় করেছিল। দিগন্ত আর অলকেশ অফিসে ছিলেন। ফোনেও তিয়াসকে পাওয়া যায় না। শিয়ালদার কাছে এক সস্তার হোটেলে উঠেছিল নীল সেবার। রাতে দিগন্তর সাথে কথা হয়েছিল, সেইমত পরদিন সকালে দীর্ঘ সাতমাস পর বোনের দেখা পেয়েছিল নীল।

তিয়াস আরো সুন্দর হয়েছিল এই কয়মাসে। কিন্তু একটা বিষণ্ণতা ওকে ঘিরেছিল যেন। হাসিটাও বড্ড চোখে লাগছিল। দাদাকে যত্ন করে বসিয়ে খাইয়েছিল ছোট বোন। ও ভাল আছে বলে আশ্বস্ত করেছিল দাদাকে।কাকা কাকিমার খোঁজ নিয়েছিল। নীল ভেবেছিল বোনকে ফোন না করার কথা জিগ্যেস করবে। কিন্তু ওর মাপা কথা আর বিষন্ন চাউনি তে কথা হারিয়ে গেছিল নীলের।এত বৈভবের মধ্যে বোনের মন খারাপের কারণ বাপের বাড়ির সাথে দূরত্ব এটাই ভেবে নিয়েছিল নীল। তাই আর ওসব বলে নি।

অলকেশ চৌধুরীর সাথে দেখা হয়েছিল সেদিন। এক দু কথায় উনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বোনের বড়লোক শ্বশুর বাড়ি গরীব ভাইয়ের বেশি আসা উচিত নয়‌ মালিক-পক্ষের সাথে ওদের একটা দূরত্ব রাখাই উচিত। ও কোথায় কি করছে সে সব খোঁজ নেওয়া উনি প্রয়োজন বোধ করেন নি।

বোনকে ফোন করা এরপর আরো কমে গেছিল। তিয়াস ও ফোন করত না বিশেষ।


bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.