হৈমন্তীর আজ মারাত্মক কাজের চাপ | দুটো মিটিং আজ | একটা হয়ে গেছে | আরেকটা হবে | মিটিংয়ের ফাঁকে লাঞ্চটা করে নেওয়ার জন্য হাতে ঠিক কুড়ি মিনিট সময় | আবার মুনাইকেও ফোনটা করার দরকার | স্কুল থেকে ফিরে কি খেল কে জানে | ক্যাফেটেরিয়াতে যাবার জন্য সবে পা বাড়িয়েছে হৈমন্তী, ফোনটা বাজতে শুরু করল | আননোন নাম্বার | ফোনটা ধরল হৈমন্তী, ভারী গলায় এক ভদ্রলোক, "হৈমন্তী বলছেন?" হৈমন্তীর "হ্যাঁ" শুনে ভদ্রলোক বলতে থাকলেন, " আমি রজতাভ ঘোষ বলছি | আপনার হাজব্যান্ডের ল-ইয়ার | মিস্টার মল্লিক ডিভোর্স চেয়ে কেস ফাইল করেছেন | ঠিক সময়ে আপনি নোটিশ পেয়ে যাবেন | আপনাকে প্রায়র ইনফরমেশন দেওয়া উচিত মনে হল, তাই ফোনটা করলাম ম্যাডাম | সরি টু ডিস্টার্ব | " হৈমন্তীর এখন রিয়্যাক্ট করার সময় বা সুযোগ কোনোটাই নেই | ক্যাফেটেরিয়াতে ঢুকে পড়ল সে. খেতে খেতে মুনাইকে ধরল ফোনে, "মাম্মাম, আমি ফিরে এসে আজকে ভাত খেয়েছি | ইলিশ মাছ দিয়ে | ঠাম্মি রান্না করেছিল তো | জানো আজ না ড্রয়িং ক্লাস-ওয়ার্কে আমি ভেরি গুড পেয়েছি | তুমি কবে আসবে মাম্মাম?" মুনাইয়ের ক্লাস ফাইভের বুদ্ধি শুধু তাকে এটা বুঝিয়েছে যে কোনো একটা কারনে তার মাম্মাম পাপার সাথে থাকছেনা | কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি তারা আবার একসাথে থাকবে | হৈমন্তী হালকা একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, " খুব তাড়াতাড়ি আসব মুনাই | তুমি কিন্তু নিজের খেয়াল রাখবে, ঠিকমত থাকবে | " কয়েক মিনিট কথা বলার পর নিজেকে একটু গুছিয়ে নিল হৈমন্তী | চোখদুটো মুছে নিল | রোজ এই সময় মা-মেয়ের একটু কথা হয় | আজ দু-মাস হল হৈমন্তী সম্রাটের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে | নিজের বাড়িটা তালাবন্ধ | ওখানে ফিরতে ইচ্ছে হয়নি | ভবিষ্যতেও ফেরার ঠিক নেই কোনও | আছে কোম্পানির গেস্ট-হাউসে | গেস্ট-হাউসটা ছেড়ে দেবে সামনের সপ্তাহে | একটা ফ্ল্যাট পেয়েছে সল্ট লেকেই | অফিস থেকে দশ মিনিট হেঁটে | সম্রাট এই সময় অফিসে থাকে | তাই হৈমন্তীর সাথে মুনাইয়ের কথাটা এখন হয় | মুনাইয়ের ঠাম্মির ঘুমাবার সুযোগ নিয়ে |

অফিস থেকে বেরতে সাড়ে সাতটা বেজে গেল | আজ আর ভাল লাগছেনা বাসে যেতে | একটা ট্যাক্সি ধরল হৈমন্তী | খুব বেশিক্ষণের পথ নয় | গেস্ট হাউসটা রাজারহাটে | উকিলের ফোনে তখন খুব একটা চাপ হয়নি | কাজের মধ্যে থাকলে চাপ হয়না | একা ট্যাক্সিতে কিন্তু সত্যিই একটু কুঁকড়ে গেল হৈমন্তী | সম্পর্কটা আর তাহলে লিগ্যালি রাখা গেলনা | একদিক থেকে ভালোই | কিন্তু এই দিনটা দেখার জন্যে কি ঘর বেঁধেছিল তারা | সম্রাট তাঁকে অনেক ভালবাসা দিয়েছে | কিন্তু আরও বেশি অপমান দিয়েছে | শেষের দিকে আর পারেনি হৈমন্তী, বেরিয়ে এসেছে | বেরিয়ে আসলেও মানসিকভাবে হয়তো এতটা ঘোষিত দূরত্ব ছিলনা, যতটা আজ এই ফোনটা বানিয়ে দিল | টপটপ করে জল পড়তে লাগল চোখ থেকে | ঠিক এইসময় সামনের সিটে বসা ড্রাইভারটা কেমন হালকা ধমক মেরে বলল, "একদম কাঁদবেনা ডোনা, তোমায় বারবার বারণ করা হয়েছিল এই বিয়েটা কোরনা | তুমি শোননি |" ততক্ষনে ট্যাক্সিটা গেস্ট হাউসের গেটের সামনে পৌঁছে গেছে | হৈমন্তী অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল, "কে আপনি?" ট্যাক্সিটা দাঁড়াল গেটের সামনে | ড্রাইভার ঘুরে তাকালো তাঁর দিকে | আশ্চর্য তো | চমকে উঠল হৈমন্তী |লোকটাকে হুবহু তাঁর বাবার মত দেখতে | "এত কান্নার কি আছে? এত দুর্বল করে তো তোমায় মানুষ করিনি | লড়তে শেখনি? নোটিশ আসবে তো আসবে | দেখা যাবে | যাও | খেয়ে নিয়ে ঘুমাও |" মন্ত্রমুগ্ধের মত ট্যাক্সি থেকে নামল হৈমন্তী | ট্যাক্সিটা একপাক ঘুরে চলে গেল | টলতে টলতে কোনওমতে ঘরে পৌঁছে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল হৈমন্তী | মাথায় তীব্র ব্যাথা করছে | এটা কি হল?

কেসের দিন ঠিক সময়ে পৌঁছে গেল হৈমন্তী | একটা উকিল ঠিক করে রেখেছিল | ব্যাপার একটাই | মুনাইয়ের পজেশন | সম্রাটের টাকার দরকার নেই তার | শুধু মুনাইকে দরকার | এমনিতে সমস্যা হতনা | কিন্তু সম্রাটকে যতটা চেনে হৈমন্তী তাতে সেও মুনাইকে ছাড়বে না | মেয়েকে খুব ভালোবাসে সম্রাট | কিন্তু হৈমন্তীর কি হবে? সমস্ত দুরাশা নিয়ে হিয়ারিং অ্যাটেন্ড করল সে | গোলমালটা ঠিক বেধেই গেল | সম্রাট পজেশন চেয়ে বসল | পরিস্থিতি এমন জায়গায় চলে গেল যে হৈমন্তীর কথা বলার শক্তি রইলনা | দু-পক্ষের উকিলের তর্কে এজলাস গরম | অপক্ষো থেকে হৈমন্তীর চরিত্র নিয়ে কথা উঠল | যাতে মুনাইয়ের পজেশন ধরে রাখা যায় | প্রমান হিসেবে বিশেষ কিছু যদিও দাখিল করা হলনা তবে একটা নতুন ডেটের অ্যাপীল হল ও-পক্ষ থেকে | জাজ ডেট দিয়েও দিলেন | বুঝে গেল হৈমন্তী | সম্রাট নোংরামো শুরু করে দিয়েছে | এখন পারলে ভুয়ো কাউকে নিয়ে এসে দাঁড় করাবে | আর বলবে এই লোকের সাথে হৈমন্তীর অন্য সম্পর্ক আছে | এটাকে প্রমান হিসেবে ব্যবহার করাটা বড় নয় | অনেক বড় ব্যাপার হল হৈমন্তীর চরিত্র নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করে তাকে অনেক দুর্বল করে দেওয়া | হয়তো মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে হৈমন্তী নিজেই পজেশন ছেড়ে দেবে | সল্ট লেকের ফ্ল্যাটে ফিরে এল হৈমন্তী | দরজা বন্ধ করেই নিজেকে সামলানো গেলনা | কান্না আর থামতেই চায়না | একটু শান্ত হওয়ার পর যখন একটু চা বসাবে ভাবছে তখন হঠাৎ ডোরবেলটা বেজে উঠল | দরজাটা খুলল হৈমন্তী | লোকটা একদৃষ্টিতে তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে | মুখটা অবিকল তাঁর বাবার মত | "বলেছি তো অত কাঁদবেনা | কেসে জিততে গেলে অনেকে অনেক উপায় নেয় | কিন্তু ডোনা তোমায় শক্ত থাকতে হবে | লড়তে হবে | দেখায় যাক না কি হয় |" হৈমন্তীকে কোনও কথা বলতে না দিয়ে হঠাৎ লোকটা অদৃশ্য হয়ে গেল | হৈমন্তী চমকে গেলেও আগের দিনের মত চমকালনা |

সকালে একদিন অফিসে ঢুকতেই একটা খবর পেল হৈমন্তী | তিন দিনের জন্য মিরিক যেতে হবে ইন্সপেকশনে | মানসিকভাবে যদিও খুবই বিপর্যস্ত সে তবু তাঁকেই যেতে হবে | এর মধ্যে দু-একবার সম্রাটের উকিলের ফোন এসেছিল | পরামর্শ দেওয়ার ভঙ্গিতে উনি প্রচ্ছন্ন হুমকিই দিয়েছেন যাতে হৈমন্তী মুনাইয়ের পজেশন ছেড়ে দেয় | হৈমন্তীও নরম-গরমে জবাব দিয়েছে | নিজের সমস্ত মনের জোর সম্বল করে লড়াইয়ের সঙ্কল্প করেছে | নিজের উকিলকেও সব জানিয়ে রেখেছে | এমন অবস্থায় তিন দিন বাইরে যাওয়াটা খুব চাপ | তবু দাঁতে দাঁত চেপে উঠে দাঁড়াল হৈমন্তী | বাগডোগরা থেকে বেরিয়ে খানিকটা গেলেই হাতের বাঁদিকে দার্জিলিং মোড় | সুকনা পেরিয়ে শিমুলবাড়ি টি এস্টেটের পাশ দিয়ে এগোতে থাকল গাড়ি | পাকদন্ডী ধরে উঠতে উঠতে হৈমন্তীর চিন্তা গুলো একটু যেন পুশ-ব্যাক সিটে এলিয়ে পড়ল | আদিগন্ত চা বাগানের পিছনে হাসছে কাঞ্চনজঙ্ঘা | মাঝে মাঝে একেকটা জনপদ পেরিয়ে যাচ্ছে গাড়িটা | নেপালি মহিলারা কমলালেবু নিয়ে বসেছেন | একসময় মিরিক ব্রাঞ্চে পৌঁছে গেল হৈমন্তী | ছোট ব্রাঞ্চ | লোকজন বেশি নেই | তবে হৈমন্তীদের কোম্পানি দেশের অন্যতম বড় স্টক ব্রোকিং কোম্পানি হওয়ায় এখানেও কাস্টমার বাড়ছে |

মোটামুটি বিকেল তিনটে অবধি কাজগুলো দেখে নিল হৈমন্তী | নতুন কাস্টমারদের ডেটাবেস, খুব বড় কাস্টমার কে কে আছেন সব বুঝে নিল | কাল এখানকার ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের সাথে বসতে হবে | সেলস টিমের সাথেও | তিনটে নাগাদ বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে উপরে উঠতে লাগল হৈমন্তী | এই রাস্তাটা ধরে উপরে ডানদিকে উঠলে বোকার মনাস্ট্রি আর বাঁদিকে উঠলে ডন বসকো চার্চ | হৈমন্তী বাঁদিক ধরল | রাস্তাটা চেনা | আগেও এসেছে সে | পথে একটা দোকান থেকে মোমবাতি আর দেশলাই কিনে নিল | খানিকটা উঠে চার্চে পৌঁছে একটু জিরিয়ে নিল হৈমন্তী | সাদা রঙের অপরূপ চার্চ | হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল | স্ক্রিনে মুনাইয়ের নাম | কাঁপা কাঁপা গলায় শুরু করল হৈমন্তী, "হাঁ, মাম্মাম বল |" মুনাই খুব অদূরে গলায় বলল, "মাম্মাম, ঠাম্মি কথা বলবে তোমার সাথে |" খুব অবাক হয়ে গেলেও নিজেকে শক্ত করল হৈমন্তী | মুনাইয়ের ঠাম্মি শুরু করলেন, "হৈমন্তী শোনো, আমি সম্রাটের সাথে কথা বলেছি | ও যেটা চাইছে সেটা ভুল নয়, কিন্তু যেভাবে চাইছে সেটা ভুল | আমি ওকে বলে দিয়েছি | মুনাই তার মায়ের কাছেই যাবে | আমি তোমার পাশে আছি | দরকার হলে কোর্টে যাব | " হৈমন্তীর দুচোখ জলে ভেসে যাচ্ছে | শত চেষ্টাতেও সে "আচ্ছা" ছাড়া আর কিছু বলতে পারলনা | ফোনটা শেষ হওয়ার পর যখন একটু হুঁশ ফিরল তখন খেয়াল হল চার্চের সিঁড়িতে একটা বুড়ো মত লোক বসে বেহালা বাজাচ্ছেন | বিকেলের আলোয় মিশে যাচ্ছে সেই মায়াবী সুর | ধোপ-দুরস্ত কোট-প্যান্ট পড়া লোকটা | হৈমন্তীর বাবা | হাঁটুর কাছে বসে পড়ল হৈমন্তী | বাবা মাথায় হাত রাখলেন | "জীবন তোমায় স্কোপ দেবে এটাই ধরে এগোনো উচিত ডোনা | লড়াই থাকবেই | একটা স্ট্রাগল শেষ হলে আরেকটা আসবে | কিন্তু অলওয়েজ পজেটিভ থাকবে | কলকাতায় ফিরে নতুন জীবন নিয়ে ভাবো | মুনাইকে নিয়ে ভাবো | গো, রিক্লেম ইওর লাইফ |" অবয়বটা অদৃশ্য হয়ে গেল |

চার্চে ঢুকে মোমবাতিটা জ্বালিয়ে দিল হৈমন্তী | বাবার জন্যে, মায়ের জন্যে, জেসাসের জন্যে, মাদার মেরীর জন্যে | সত্যি বাবা না থাকলে এই সাহসটা মনের ভেতরেই থেকে যেত | বাইরে আসতনা | সারি সারি চেয়ারের একটায় বসে পড়ল হৈমন্তী | হৈমন্তী রোজারিও | যাঁর খ্রীষ্টান পরিচয়ের জন্য সম্রাটের মা কোনওদিন তাঁকে মেনে নেননি | ছেলের জেদের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানলেও মন থেকে কোনওদিনই আপন মনে করেননি | আজ কিন্তু মুনাইয়ের ঠাম্মি হৈমন্তীকে সবকিছু দিয়ে দিলেন | মোমবাতিটার দিকে দেখতে লাগল হৈমন্তী | কেমন সুন্দর জ্বলছে | অনেকক্ষন ধরে | বাবার কথা ভীষণভাবে মনে পড়তে থাকল তাঁর | আসলে জীবনে কিছু মোমবাতি থাকে যারা অনেকক্ষন ধরে জ্বলে | অনেক আলো আর শক্তি ছড়িয়ে দেয় |

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.