পিছুটান

সামনের উইকেন্ডের বড় ছুটিটায় ফ্যামিলির সাথে নিউইয়র্ক যাওয়ার প্ল্যান করছে শুভজিৎ। তাই সকাল থেকে ল্যাপটপ নিয়ে হোটেল আর ফ্লাইটের বুকিং এর চেষ্টায় লেগে আছে ও।

‘শুভজিৎ সামন্ত’ একজন NRI, লন্ডনে একটা বড় বেসরকারি অফিসে চাকরি করে। এখানে তার ফ্যামিলি বলতে বউ জ্যানেট, ও ওদের একমাত্র ছয় বছরের মেয়ে রুচি। জ্যানেট এর বাবা, মা আমেরিকান হলেও ও বর্ণ অ্যান্ড ব্রট আপ লন্ডনেই। জ্যানেট আর শুভজিৎ একই অফিসে চাকরি করে। ওখান থেকেই প্রেম, শেষে বিয়ে।

এছাড়া দেশের বাড়িতে বাবা, মা থাকে দাদা, বউদির সঙ্গে।

অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও ফ্লাইটের বুকিং না পেয়ে মেজাজ টা খিঁচড়ে গেল শুভজিতের। পাশের ঘরে জ্যানেট রুচিকে ড্যান্স শেখাচ্ছে, ওদের এখন ঘাঁটিয়ে লাভ নেই।ল্যাপটপ বন্ধ করে ওদের সাতাশ তলা ফ্ল্যাটের বারান্দায় এসে দাঁড়ালো শুভজিৎ। বাইরে ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে।এই বৃষ্টি দেখতে খুব ভালোবাসে শুভজিৎ। বৃষ্টির পর মাটি থেকে ওঠা সোঁদা গন্ধটা ওর খুব ভালো লাগে। কিন্তু লন্ডনের মতো কংক্রিটের জঙ্গলে সে গন্ধ পাওয়া যায় না।

বৃষ্টি দেখতে দেখতে ওর নিজের ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে যায়। আগে এই বৃষ্টিতে ভিজে পাড়ার মাঠে ও কত ফুটবল খেলেছে। কতবার স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেছে ভিজতে ভিজতে। মনে পড়ে বর্ষায় ওদের পাড়ার পুকুরগুলো ডুবে গেলে কেমন ওরা বন্ধুরা মিলে মাছ ধরত। আর একটা জিনিস খুব মনে পড়ে এই বৃষ্টিতে, মা এর হাতের তালের বড়া।

শুভজিতের হঠাৎ খেয়াল হল ও অনেকদিন বাড়িতে ফোন করে না। পকেট থেকে মোবাইল টা বের করে ও বাড়িতে কল করল। ওপারে ফোন ধরল এক বয়স্ক মহিলা।

-- হ্যালো

-- হ্যালো মা?

-- শুভ! কি খবর বাবা? কেমন আছিস?বউমা কেমন আছে? আর আমার দিদিভাই, সে কেমন আছে?

-- আমরা সবাই ভালো আছি মা। তুমি আর বাবা কেমন আছ?

-- আমরা এই আছি বাবা। তোর বাবার শরীর টা একটু খারাপ হয়েছে ক দিন।

-- সে কি, কি হল আবার?

-- এই বুড়ো বয়সে যা হয় আর কি। তেমন কিছু নয়। তুই চিন্তা করিস না।

-- আচ্ছা। দাদা, বউদি, বুলাই এদের সবাই কেমন?

-- এরাও ভালই আছে। শুভ তোদের ওখানে বৃষ্টি হচ্ছে তাই না?

-- তুমি কি করে জানলে?

-- তোর গলা শুনে। তোর গলা শুনলেই আমি তোর মনের কথা বুঝতে পারি।

অবাক হল শুভজিৎ। হাজার মাইল দূরে বসা ওই বুড়ি, যার প্রতি ছেলে হিসাবে কোন দায়িত্বই শুভজিৎ পালন করেনি, সে তাকে এখনো এতো ভালো করে চেনে?

-- তোমার হাতের তালের বড়া গুলো খুব মিস করছি মা।

-- শুধু তালের বড়া পাগল?

-- তোমাকেও খুব মিস করছি মা।

-- আমারও তোকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে রে শুভ। দু বছর তোকে দেখি না। একবার আয় না বাবা।

ওপারে মায়ের ধরে আসা গলার অনুরণন শুভজিতের বুকেও হয়।

-- ছুটি পেলে যাবো মা। তুমি ভেবো না। আচ্ছা রাখছি, পরে আবার ফোন করবো।

ফোনটা কেটে দেয় শুভজিৎ। আসলে এক প্রকার পালিয়ে আসে মা এর কাছ থেকে। যে দেশ, যে পাড়া, যে বাবা, মা কে ও অনেকদিন আগে ছেড়ে এসেছে তাদের কাছে ফিরে যেতে আজ তার কেমন যেন সংকোচ হয়। ভয় হয় আবার যদি পিছুটানে আটকা পরে যায়।

বাইরে তাকিয়ে দেখে সে, এখন মুশলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। এই একটা জিনিস কখনো ভুলতে দেয়না তাকে সে কে, তার মাটি কোথায়। বৃষ্টির ছাঁট এসে লাগে ওর শরীরে। খুব আপন, খুব চেনা এই স্পর্শ। বৃষ্টির হাজারো ধারার জলবিন্দুর মধ্যে যোগ হয় আরও কয়েক ফোঁটা বিন্দু, যা শুভজিতের মনের মেঘ ভেঙে গড়িয়ে আসে তার গাল বেয়ে, আর মিশে যায় সেই হাজার ধারার মধ্যে কোথাও।

পিছন থেকে রুচি এসে জড়িয়ে ধরে বাবাকে।

-- ড্যাডি, হ্যোয়ার আর উই গোয়িং ইন দিস হলিডে?

মেয়েকে কোলে তুলে নেয় শুভজিৎ।একটা চুমু খেয়ে বলে-

-- উই আর গোয়িং টু মিট ইয়োর গ্র্যানি অ্যান্ড গ্রানপা। উড ইউ লাইক তো মিট দেম?

লাফিয়ে ওঠে রুচি।“ গ্র্যানি অ্যান্ড গ্রানপা। কতদিন দেখিনি”। শেষের বাংলা গুলো ভাঙা ভাঙা উচ্চারণ করে রুচি। শুভজিৎ ওকে একটু একটু বাংলা বলা শিখিয়েছে।

হেঁসে ওঠে শুভজিৎ। রুচি আনন্দে চীৎকার করে খবরটা ওর মা কে দেয়। বেরিয়ে আসে জ্যানেট।, সে ও বেশ খুশি ইন্ডিয়া যাবে শুনে।

“ কথা বলবে তুমি গ্র্যানির সাথে?” মেয়েকে জিগ্যেস করে শুভজিৎ। রুচি ডল পুতুলের মতো ঘাড় নাড়ে। বাইরে বৃষ্টিটা থেমে এসেছে। বাড়ি ফেরার আনন্দ পেয়ে বেসেছে শুভজিৎকে। ঘরে ফেরার এই টানটা অনেকদিন পর নতুন করে অনুভব করতে পারে শুভজিৎ। পকেট থেকে মোবাইল টা বের করে ফের আগের নম্বরটা কল করে-

-- হ্যালো, মা ......


bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.