মানায় না

মানায় না (১)

আজ মীরার ফুলশজ্জ্যা । ফুল ও সুগন্ধি মোমবাতির মধ্যে বসে ওর সুন্দর স্বপ্নের মত জীবনটার জন্য মনে মনে নীলুমাসি কে একবার ধন্যবাদ জানাল।

তখন মীরা সবে পিএইচডি করতে শুরু করেছে, পড়াশুনার চাপ টাও বেশি বইকি কম না, তার মধ্যে নীলুমাসি হাজির তার মেজননদ এর ছেলের জন্য বিয়ের সম্পর্ক নিয়ে। মায়ের প্রচুর মান অভিমানের পরে, প্রচন্ড বিরক্তবোধ নিয়ে, রবিবার দুপুরের ঘুম নষ্ট করে গেল সোহমের সাথে দেখা করতে, বলা উচিৎ তাকে বিয়ের জন্য ভদ্রভাবে নাকচ করতে। কিন্তু বিধী বাম, প্রথম নজরেই সোহমের সুপুরুষ চেহারা আর চশমার ওপাশের বুদ্ধিদীপ্ত চোখ দুটো বেশ কিছুটাই মীরার মন নরম করে দিয়েছিল, আর দুই ঘন্টা যে কিভাবে কেটে গেছিল বোঝেনি সে। সোহমের মা ও দিদি একদিন দেখা করে গেলেন, মীরার বাবা-মা আর নীলুমাসি মিলে একদিন সোহমদের বাড়ি থেকে ঘুরে এলেন। সোহমের মা তো মীরাকে এখনি নিজের বউমা বলে পরিচয় দিতে শুরু করলেন।

হইহই করে দুই পরিবার মিলে বিয়ের দিন ঠিক করা, কেনাকাটার মধ্যে মীরা আর সোহম এর প্রেম তখন মধ্যগগনে। মাঝে মাঝেই পেট টা ব্যাথা ব্যাথা করতো মীরার, বিশেষ পাত্তা দেয়নি, জল কম খাওয়া বা সামান্য পাচনক্রীয়ার সমস্যা মনে করে। সেদিন হঠাৎ দীপার সাথে ফোনে কথার মাঝে এত ব্যথা টা বেড়ে উঠল যে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতেই হল। ডাক্তার কিছু পরিক্ষানিরীক্ষার পর যা জানালেন, তাতে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ারই কথা। ক্যান্সার, পেটের, কেমো করাতে হবে, করালেও বাঁচার আশা ডাক্তার খুব জোরের সাথে দিলেন না, বেশ অনেকটাই ছড়িয়ে গেছে।

মীরা কেন, সবাই ভেবেছিল যে সোহম এবার ওকে ছেড়ে চলে যাবে, কিন্তু সবার আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করে সোহম মীরার আরো কাছে চলে এল।প্রায় প্রতি কেমোর দিন, চেক আপ এর দিন, সোহম এর উপস্থিতি যেন মীরার জীবনিশক্তি কে আর বাড়িয়ে তুলছিল। কয়েক মাসের লড়াই এর পর, জিৎ হল মীরার অদম্য বাঁচার ইচ্ছার, কিন্তু সে হারাল তার পিঠ ছাপিয়ে যাওয়া চুল, উজ্জল ত্বক ও সুন্দর দেহগঠণ। তবু সে সুখী যে তার কাছে তো সোহম আছে, আর কি চাই?

দরজা ঠেলার আওয়াজ এ মীরার সম্বিৎ ফিরল। সোহমের উপস্থিতি প্রতিমুহুর্তে যেন হৃদস্পন্দন বাড়িয়েই চলল। সোহম চুপচাপ এসে মীরার পাশে শুয়ে পড়ে জানাল যে সে খুবই ক্লান্ত, একটু ঘুমাতে চায়। মীরা কিছুটা হচকিত হলেও পরমস্নেহে সোহমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নিজেও ঘুমিয়ে পড়ে। এরপরে মাস দুয়েক কেটে গেল, মীরা বারবার সোহমের কাছে নিজের সোহাগ উজাড় করে দিতে চাইলেও সোহম যেন স্বচ্ছন্দবোধ করত না। কারন দিত যে অফিসের কাজে খুব ই ক্লান্ত,মীরা মনে মনে ক্ষুণ্ণবোধ করলেও সোহমকে বোঝার আপ্রান চেষ্টা করে যেত।

(২)

আজ মীরার জন্মদিন, ছুটি নিয়েছে ল্যাব থেকে, ইচ্ছা সে আজ সোহমের পচ্ছন্দের খাবার আনিয়ে রাতে সোহমের সাথে ক্যান্ডললাইট ডিনার করবে।

সোহমকে বেরোবার সময়ও মনে করে দিয়েছিল যেন রাতে তাড়াতাড়ি ফিরে আসে। বিকালে একবার সে ফোন করে মনেও করিয়ে দিয়েছে, সোহম বোধ হয় কাজের মধ্যে ছিল, ‘হু হা’ করে উত্তর দিয়েই ফোন কেটে দেয়। সন্ধে গড়িয়ে রাত হল, তবু সোহমের পাত্তা নেই, মীরা বার কয়েকবার ফোন করে, কিন্তু সে কেটে দেয় সমানে। চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল মীরার।

রাত সাড়ে ১১ টায় ডোরবেলের শব্দে দরজা খুলে মীরা দেখে সোহম, সম্পুর্ণ মাতাল অবস্থায়। চিরদিনের শান্ত মীরা রাগে ফেটে পড়ল, “এসব কি? তোমার ব্যাপার টা কি? বিয়েটা করলে কেন তুমি আমায়? আজ একটা দিন আমি তোমায় তাড়াতাড়ি আসতে বললাম, আর তুমি কিনা মাঝরাতে মদ খেয়ে...ছি!!”সোহম টলতে টলতে কোনরকমে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “ দুর শালী, নিজেকে আয়েনায় দেখেছিস? আমার মাথা খারাপ ছিল মহান হওয়ার ভুত চেপেছিল। ডাক্তার বলেছিল তুই টেঁসে যাবি, তুই তো দেখি যমেরও অরুচি। ততদিনে শালা মহান হওয়ার ফল পাচ্ছি, সবাই মিলে তোর সাথে চিপকে দিল, নিজেই বল তোকে আমার পাশে মানায়?”বলেই নেশার ঘোরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, নেশার ঘোর কাটল যখন তখন সকাল।মীরা চলে গেছে।

টেবিলের উপর লেবুর শরবত ও জলখাবারের সাথে আরো একটা জিনিস ছিল; একটা ছোট চিরকুট, তাতে লেখা,“আমি বড় কুৎসিত, তোমার পাশে আমায় মানায় না”

(৩)

৬ বছর পরে

মীরা বাড়ি ঢুকতেই রমার মা বলল, “আজ তোমার চিঠি এসেছে গো একটা”চিঠি টা অবহেলার ছলে খুলে যে হাতের লেখাটা দেখল, তা আরও একবার মীরার হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিল। এতবছরেও হাতের লেখাটা খারাপই রয়ে গেছে।

সোহম, যে একবারও মীরাকে ফিরিয়ে নিতে আসেনি, সেই সোহম ক্ষমা চেয়েছে; সোহম যে নির্বিবাদে ডিভোর্স পেপারে সই করে দিয়েছে, সেই সোহম মীরাকে ফিরে পেতে চেয়েছে; সোহম যে সহজেই মীরাকে ভুলে অন্য মেয়েকে নিয়ে সংসার পেতে নিয়েছিল ডিভোর্সের একমাসের মধ্যে, সেই সোহম মীরা কে একবার দেখতে চেয়েছে।

কিন্তু সুযোগ কোথায় বিশিষ্ট সমাজসেবিকা অধ্যাপিকা মীরা বোসের পিছনে তাকিয়ে দেখার, তিনি তো তিরবেগে আগে এগিয়ে চলেছেন। তবু কলম উঠিয়ে শেষবারের মত উত্তর লিখলেন,

“আমি বড় সুন্দর, আমার পাশে তোমায় মানায় না”

************************************************

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.