‘ইংরাজির ১৩ই মার্চ, সালটা ছিল ২০১৩, ওই দিন সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। আমার বন্ধু, দাদা, আবার এক দিকে ছবিগুরু ও বটে,(ছবি তুলতে সেখা, সেই হিসেবে)-তার ফোন। হ্যালো বলার আগেই ফোনের ওপার থেকে চিরপরিচিত গলায় ভেসে এলো “কাল থেকে সপ্তাহ খানেক কোনো জরুরি কাজ আছে তোর?” আমি একটু ভেবে বললাম “না, ঠিক তেমন কিছু নেই, তবে.....” কিছু বলার আগেই কথা কেটে বলল “ওসব তবে টবে কিছু না, কাল সন্ধ্যায় তুই বাইরে যাচ্ছিস, ৫দিনের মতো ব্যাগ গুছিয়ে নে।” বলে কিছু বলার আগে ফোনটা কেটে দিল। আমিও খানিকটা হকচকিয়ে গেলাম। কোথায় যাব, কেন যাব, কিভাবে কাদের সাথে যাব! এসব ভাবতে ভাবতেই আবার ফোন বেজে উঠল। এবার একটা অচেনা নম্বর। হ্যালো বলতেই উল্টো দিক থেকেই এক অপরিচিত গলা বলে উঠল, “হ্যাঁ আমি শুভ্র বলছি, বাবাই দা তোর নম্বরটা দিল। তাড়াতাড়ি তোর কোনো ফটো আইডির ছবি তুলে মেইল করে দে। আর শোন, আমি এক্ষুনি তোকে এই নম্বর থেকে মেইল আইডিটা পাঠাচ্ছি।” ফটো আইডি কি হবে জানতে চাইলে শুভ্র দা বলল, “ট্রেন-এর রিজার্ভেশনের জন্য লাগবে।” ‘টাকা’ শব্দ টুকু শুনেই শুভ্র দা বলল, “আরে পাগল ওসব নিয়ে তোকে কিছু ভাবতে হবে না। শুধু বাড়ি থেকে স্টেশন অবদি পৌঁছানোর দায়িত্ব তোর। আরও টুকটাক মিলিয়ে মোট শ-তিনেক টাকা মতো হাতে রাখলেই চলবে, বাকি সমস্ত খরচ কম্পানির।” আমি কিছু একটা বলতে জাচ্ছিলাম, কম্পানি শুনেই বিষম খেলাম। শুভ্র দা ব্যপারটা বুঝে নিজেই বলে উঠলো, “আরে ধীরে, ধীরে আসলে ফেসবুকে ছাড়া তোর তোলা ছবি গুলো আমাদের কম্পানির পছন্দ হয়েছে। আর তাই কম্পানির তরফ থেকে তোকে মধ্যপ্রদেশের একটি বিয়ে বাড়িতে স্টিল ফটোগ্রাফার হিসেবে পাঠানো হচ্ছে। এর জন্য কম্পানির তরফ থেকে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, গাড়ি ভাড়া ছাড়াও তোর ক্যামেরা ভাড়া ও পারিশ্রমিক আলাদা পাবি। চল্ তবে এখন রাখি, অনেক কাজ আছে। আর তুই ওটা তাড়াতাড়ি পাঠা।” বলেই ফোনটা রেখে দিল। ফোনটা কাটার পর আমি যেন আমার কানকে বিশ্বাস-ই করতে পারছিলাম না। যাই হোক শুভ্র দা আর বাবাই দার কথা মতো কার্ডের ছবি মেইল করে, বাড়িতে সবাইকে জানিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম এবং পর দিন সন্ধ্যায় বাড়ির তৈরি লুচি তরকারি ব্যাগে ভরে বেরিয়ে পড়লাম সাঁতরাগাছি স্টেশনের উদ্দেশ্যে। সাহিত্য পরিষদ থেকে টাক্সিতে উঠতেই আমার ফোনে টিকিট চলে এল। এস থার্টিন বগীর ১৩ নম্বর সিটটা আমার জন্য বরাদ্দ করেছে রেল কতৃপক্ষ। টাক্সি ধীর গতিতে সীগনাল মেনে এগিয়ে চলেছে মানিকতলা থেকে ডান দিক নিয়ে সেন্ট্রাল এভিনিউ হয়ে এসপ্ল্যানেড-এর দিকে। সেখান থেকে ডানদিক নিয়ে রেডরোডে উঠতে একটু ফাঁকা রাস্তা পাওয়া যেতে ট্যাক্সির গতি বাড়ল। সেখান থেকে আমার গন্তব্য দ্বিতীয় হুগলীসেতু হয়ে সাঁতরাগাছি। হঠাৎ আমার খেয়াল হল আমি যেন একটু বেশিই ঘামছি শুধু তাই নয়, আমার হৃদ্-স্পন্দনতাটাও অস্বাভাবিক, বেশ কিছুটা বেশিই। ঠিক তার পরমুহূর্তেই বুঝলাম বা বলা ভালো আবিস্কার করলাম যেটা সেটা আর কিছুই নয়, এই যে আমি প্রথম বার একা এত দূরে কোথাও যাচ্ছি তাও আবার এত বড় একটা কম্পানীর স্টিল ফটোগ্রাফার হিসেবে, তার উপর আবার তারা নিজেরাই আমাক এত বড় একটা কাজের দায়িত্ব দিয়েছে, এসব মিশেই এক অদ্ভূত অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ মাত্র। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে কল্পনার জগতে হারিয়ে গেছিলাম কে জানে! সম্বিত ফিরল ট্যাক্সি ড্রাইভার-এর কথায়, “দাদা, পৌঁছে গেছি।” আমিও হাত ঘড়িতে দেখলাম সত্যি সময়ের বেশ কিছুটা আগেই পৌঁছেগেছি। ট্যাক্সি থেকে নেমে মিটার থেকে ১০ টাকা বেশি দিতে সে ট্যাক্সি ঘুরিয়ে হাঁসি মুখে বিদায় জানাল। আমি একটা চায়ের দোকান দেখে খানিকটা এগিয়ে গিয়ে আমার পছন্দের ব্র্যান্ড ছোট গোল্ড ফ্লেকের একটা বাক্স আর একটা বড় ভাড়ে চায়ের অর্ডার দিলাম। দোকানিও কিছুক্ষনের মধ্যেই অর্ডার এগিয়ে দিলো। আমি বাক্স থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরিয়ে তা থেকে একটা ধোঁয়ার রিং ছেড়ে গরম চায়ে ঠোঁট ভিজিয়ে আমার আগত ৫দিনের সংসার সম্পর্কে একটু ভেবে নিলাম। এরপর বিল মিটিয়ে পাশের একটি ওষুধের দোকান থেকে প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ কিনে নিলাম ভিন রাজ্যে যদি প্রয়োজন পরে, সেই ভেবে। সেখান থেকে স্টেশনে উঠে ট্রেনে নিজের সিট খুঁজে বসে বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দিলাম। আর বুঝলাম এরই মধ্যে ট্রেনও ছেড়ে দিয়েছে। এরপর চোখে মুখে জল দিয়ে ব্যাগ ঠিক জায়গায় রেখে বাড়ি থেকে আনা খাবার খেয়ে, হাত ধুয়ে নিজের সিটে শরীর এলিয়ে দিলাম। ট্রেনের দুলুনিতেই যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ঠিক মনে নেই। মাঝে একবার টিটির ডাকে ঘুম ভাঙল, ফোনে টিকিটের কপি দেখিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।

ঘুম ভাঙল পর দিন পঞ্চমারি স্টেশনের কিছু আগে। স্টেশনে পৌঁছে বাইরে বেড়িয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে এদিক ওদিক তাকাতেই চোখে পড়ল এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক ফোনে কথা বলতে বলতে আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। সামনে এসে আমার নাম ধরে সম্বোধন করলেন এবং যে কম্পানি আমাকে পাঠিয়েছে তাদের নাম এবং শুভ্র দার নাম বলতে আমি বুঝলাম যে উনি আমাকেই নিতে এসেছে। তার সাথে পারকিং-এর দিকে এগিয়ে গেলাম। একটি সাদা স্করপিয়র পিছনের দরজা খুলে আমার ব্যাগ তুলে দিয়ে মাঝের দরজা খুলে আমাকে গাড়িতে উঠতে বললেন। আমিও সিগারেট ফেলে গাড়িতে উঠে বসলাম। ভদ্রলোকটি নিজে ড্রাইভারের পাশের সিটে উঠে বসায় গাড়ি ছেড়ে দিল। মিনিট পাঁচেক চলার পর পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে উপরে উঠতে থাকলাম। এর মধ্যেই কথায় কথায় জানলাম সামনে ড্রাইভারের পাশে বসা ভদ্রলোক বরের ভাই। এরপর ঘণ্টা দুয়েক নানান কথা গল্পে কেটে গেল আর তার মধ্যে আমরাও এসে পৌঁছালাম বিয়ে বাড়ীতে। আমি গাড়ি থেকে নামার আগেই অন্য এক যুবক এসে আমার ব্যাগ নিয়ে গিয়ে ভিতরে রাখল। সাথে সাথেই গাড়ির আশেপাশে দেখলাম লোক জমে গেল বেশ কিছু। তাদের মধ্যে ছেলে-মেয়ে, আট থেকে আশি প্রায় সকলেই আছে। আমি প্রথমটায় একটু হকচকিয়ে গেলেও নিজেকে সামলে নিয়ে ভাবলাম তারা হয়ত অন্য কারোর সাথে আমাকে গুলিয়েছে। বড়ের ভাই এসে গাড়ির দরজা খোলায় বুঝলাম যে তারা কলকাতা থেকে আসা ফটোগ্রাফার দেখতে এসেছে। আমি একটু অবাক হলাম আর এর মধ্যেই বয়স আনুমানিক পঞ্চাশ-এর কোঠায় এক ভদ্রমহিলা বরনডালা সাজিয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন, তিনি নববধূ এর মতো বা রাজার রাজ্যভিষেক-এর মতো বরন করে বাড়িতে তুললেন। এরপর দ্ই বড়া, চাপাটি, আলু-কপির সব্জী, পনিরের তরকারি, গাওয়া ঘী-কাজু-কিসমিস-পেস্তা দিয়ে তৈরি গাজরের হালুয়া, রস মালাই জাতীয় মিষ্টি এবং পাঞ্জাবী মালাই লস্যি দিয়ে জামাই আদর-এর মতো প্রাতরাশ সারা হলে ব্যাগ সহ আমাকে আবার স্টেশন থেকে আসা গাড়ীতে উঠতে আনুরোধ করল। আমি এবার আর মাঝে না বসে সেখানে ব্যাগ তুললাম আর নিজে উঠলাম ড্রাইভারের পাশের সিটে, কারন এবার যিনি ড্রাইভার সিটে তিনি স্বয়ং হবু নতুন বর। তার থেকেই শুনলাম এবার আমাদের গন্তব্য তাদেরই পূর্ব নির্ধারিত হোটেলে। কথায় কথায় বর মহাশয় জানতে চাইলেন আমি বাইক চালাতে পারি কি না! আমিও ছোট করেই উত্তর দিলাম আমার দু-চাকা চালানোর ছাড়পত্র আছে। যদিও তার মেয়াদ আমার রাজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ইতি মধ্যেই আমারা হোটলের সামনে এসে পড়েছি। কালো পোশাকে মোড়া আমার বয়সী একটি ছেলে সেলাম করে গাড়ির দরজা খুলে দিল। আমি নেমে দেখলাম হোটেলের উপর একটি কালো ফলকে হোটেলের নাম লেখা। আর নামের ঠিক নীচে একই ভাবে তিনটি তারা আঁকা। এর মধ্যেই কালো পোশাকি ছেলেটি আমার ব্যাগটি তার পিঠস্থ করেছে। আমি একটু ভয়ে পেয়ে বললাম, ‘আরে কর কি! আমি নিচ্ছি।’ সে আমাকে বাঁধা দিয়ে বলল, ‘আপ হামারি ম্যহমান হ্যয় সাহাব, আপকো থোরাসা ভি তকলিফ নেহি হোনা চাহিয়ে। ডরনা নেহি, আপকা ক্যামেরা, লেন্স, সামান য্যয়সে কি ওয়সেহি রহেগা। আপ আন্দর আইয়ে মেরে সাথ্।’ বলেই সে হোটেলের ভিতরে চলে গেল। বর মশাইও গাড়ি ঘুড়িয়ে আমাকে বিদায় জানিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হওয়ায় আমি ছেলেটিকে অনুসরণ করে ভিতরে গেলাম। ছেলেটি একটি কোর্ট প্যান্ট পড়া ভদ্রলোকের সাথে কথা বলে চাবি হাতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকল। ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে দু-হাত তুলে স্বাগত জানিয়ে উপরের দিকে উঠে যেতে বললেন। বুঝলাম উনি হোটেল ম্যনেজার। ছেলেটি দেখলাম উপরে উঠে বামদিকে একটি ঘর খুলে দিয়ে ব্যাগ রেখে নীচে নেমে গেল। ঘরে ঢোকার সময় লক্ষ্য করলাম, ঘরটার নম্বর ‘তেরো’। দেখে একটু বিরক্ত হলেও ঘরে ঢুকে মনটা খুশিতে ভরে উঠল। ঘরে তিনটি একজন করে আরামে শোয়ার মতো সু-সজ্জিত বিছানা পরিপাটি করে গোছানো। প্রতিটি খাটের পাশে দুটি করে কাঁচের তাক, আর ঠিক তার নীচে একটি করে একটু বড় সাইজের টী-টেবিল, তাতে একটি করে টেলিফোন আর টাটকা সুগন্ধি ফুলে সাজানো ফুলদানি, আর টেবিল ল্যাম্প। দরজা দিয়ে ঢুকেই বাঁদিকের দেওয়াল জোরা কাচের জানালা দিয়ে হোটেলের সামনে বড় রাস্তাটা দেখা যায়, তার পাশেই মাল গাড়ি যাওয়ার লাইন পাতা। খানিক দূরে উচুঁ টিলা জাতীয় পাহাড়। ঠিক জানলার বিপরীতে একটি বড় কাঠের আলমারি তিনটি ভাগ করা। খাটের নিচের দিকে মানে পা-তলার দিকে একটি বড় সাইজ-এর দেওয়াল টিভি। আলমারির প্রতিটি ভাগে নরম তুলোর একটি করে মাথার এবং পায়ের বালিশ, একটি করে চাদর ও কম্বল। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই মনে হল এক্ষুনি যেন সব ভেদ করে নীচে পরে যাব। তবে তা আর হল না। সিলিং-এ চোখ যেতেই দেখি প্রতিটি খাটের উপর এক একটি করে পাখা লাগানো, আর সিলিং জোড়া খান আষ্টেক লাইট, আর একটা এসি। আর প্রতিটি খাটের মাথার কাছে খান পাঁচেক সুইজ ও দুটি করে ফাইভ পিন প্লাগ সকেট বিশিষ্ট সুইজ বোর্ড। বলাই বাহূল্য ঘরের প্রতিটি বস্তুই অত্যাধুনিক। তবে বাথরুমটা ঘরের বাইরে, বেরিয়ে ডানদিকে। সবে সিগারেট ধরিয়ে দুটো টান দিয়েছি, অমনি দরজার বেল বেজে উঠল। আমি উঠে বসে একটু বিদেশি কায়দায় বললাম ‘কাম্ ইন্’। দেখলাম যেই ছেলেটা আমাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে ঘর অবদি পৌঁছে দিয়ে গেছিল সে হাতে একটা সুন্দর সাদা তোয়ালে, সাবান, শ্যাম্পু নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে ওগুলো আলমারির নিচের ড্রয়ারে রেখে পকেট থেকে একটা চাবি বের করে হাতে দিয়ে বলল, “সাদিওয়ালি সাহাব নে আপকে লিয়ে ভেজা হ্যয়। আপ যবতক রহেঙ্গে ইয়ে আপকা পাস হি রাখনে কে লিয়ে। কাহিভি পয়দল যানেকা যরুরত নাহি। ট্যাঙ্ক ফুল হ্যয়।” বলে সে একটু হাঁসল। আমার কিছুটা অবাক লাগলেও মনে মনে ভাবলাম শুধু এটারই অভাব ছিল, তাও মিটল। সে আবার বলল, “আভি কুছ লেঙ্গে সাহাব? খানা-চায়ে-কফি-ইয়া ড্রিঙ্কস্ বাগেরা কুছ!” আমি হেঁসে মাথা নেড়ে বললাম, ‘না’।“আগর কুছ জরুরত পরে ত ল্যন্ড লাইন সে একশ তেরা ডায়াল করকে বাতাদেনা।” আমি হুম বলায় সে চলে গেল। বাথরুমে স্নান করে বেরিয়ে ভাবলাম এক কাপ কফি দিয়ে যেতে বলি, ভেবেই হঠাৎ মনে পড়ল ‘১১৩’ মানে আবার ১৩! দরজা খুলে ঘরে ঢুকেই দেখি আমার টেবিলে একটা চাপা দেওয়া কফি মগ।ছুঁয়ে বুঝলাম ভিতরে কিছু গরম পানিও আছে, হয়তো কফিই আছে, কিন্ত আমি তো শুধু ভাবলাম, আর এর মধ্যেই! হঠাৎই অনুভব করলাম ঘরটা যেন একটু বেশিই ঠান্ডা। সব থেকে কম তাপমাত্রায় এসি চললে যেমন হওয়া উচিত ঠিক তেমন। ভাবতেই এসির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, একি! এসিও বন্ধ। তাহলে! আর ঘরের বাইরেও তেমন ঠাণ্ডা নেই। তবে এ-কি হলো! তবে কি এত খাতিরদারির পর শেষে ভূতুরে হোটেলে তুলল! আমি এমনিতে খুব একটা ভীতু না হলেও এসবের মাঝে কেমন যেন এক অনুভূতি হল। দেখলাম গায়ের রোম গুলো সোজা হয়ে উঠছে। মনে হল সেগুলো যেন শরীর থেকে আলাদা হতে চাইছে। এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎই মনে পড়ল ছোটো বেলায় শুনে ছিলাম ভূত নাকি আগুন ভয় পায়। সেই ভেবে ফস্ করে একটা সিগারেট ধরিয়ে ভূতের দেওয়া কফি ভর্তি কফি মগ্ টা নেব বলে হাত বাড়িয়েছি অমনি হঠাৎ ই মোবাইল ফোনটা বিছানা থেকে স-শব্দে পড়ল মার্বেল পাথরের মেঝেয়, আর সাথে সাথেই ব্যাটারি কভার সব ছিটকে গেল এদিক ওদিক। ফোনটা তুলে দেখলাম স্ক্রিনটা আস্ত আছে। খাটের নীচে থেকে ফোনের পিছনের খাপটা আর টেবিলের তলা থেকে ব্যাটারিটা কুরিয়ে মুছে ফোনে লাগিয়ে ফোনটা অন করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু অন হওয়ার আগেই অদ্ভুত ভাবে কাঁপতে শুরু করেছে ফোনটা। তবে কি এই ভাবেই বাস্তবে ভূত আসে নাকি! এবার কি তবে আমার ভবলীলা সমাপ্ত! ভাবতেই সারা গায়ে শিহরণ খেলে গেল। হঠাৎ-ই কম্পমান অবস্থায় স্ক্রিনে একটা অদ্ভুত নম্বর ভেসে ওঠে, বুঝলাম ফোন এসেছে। তবে কি বিদেশি চলচ্চচিত্রের মতো ভূতের ফোন! এসব ভাবতে ভাবতে সাহস করে ফোনটা ধরে হ্যালো বলতেই এক আপরিচিত গলায় আমার নাম শুনে এবার যেন গলা আরও শুকিয়ে গেল। তার পর......! তার পরের ঘটনা মনে পরলেই আজও হাঁসি পায়।’’

এতক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধ হয়েও এসবই আমি শুনে যাচ্ছিলাম। এবার আমার রিজার্ভেসান সিটের উল্টো দিকে বসা ভদ্রলোকের হাঁসিতে আমি বাস্তবে ফিরলাম। আমি বোকার মতো জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কেন!’। তিনি আরও জোর হেঁসে উঠে বললেন, ‘ফোনে যা কথা হয়েছিল তার মর্মার্থ এই যে- অফিস থেকে আরও দুজন ফটোগ্রাফার পাঠানো হয়েছে, একজন ভিডিও আর অন্য জন কে ড্রোন চালানোর জন্য। আমার স্নান করার আওয়াজ পেয়ে তারাই রিসেপসন থেকে ডুব্লিকেট চাবি নিয়ে দরজা খুলে এসি চালিয়ে বসে ছিল। সময় দেখে আমার স্নান শেষের দিকে বুঝতে পেরে তারাই তাদের জন্য দু কাপ ও আমার জন্য এক কাপ কফি অর্ডার করে এবং কফি আসতে দেরি হওয়ায় তারা এসি ও ঘরের দরজা বন্ধ করে নিচে দোকানে কিছু স্ন্যাক্স আনতে যায়। নীচে নামার সময় ওয়েটারকে কফি হাতে উঠতে দেখে তারা তাদের কফি তুলে নেয় এবং ওয়েটারের হাতে চাবি দিয়ে আমার কফি ঘরে রেখে চাবি রিসেপশনে জমা করে দিতে বলে এবং তারা দোকানে গিয়ে শুভ্র দার থেকে পাওয়া আমার নম্বরে ফোন করে জানতে চেয়েছিলো আমার জন্য কিছু আনবে কি না! প্রথমবার রিং হয়ে ফোন সুইচ্ অফ্ হয়ে যায়, এবং খানিক বাদে আবার ফোন করায় আমি ফোন ধরি।’ এসব শুনে নিজেকে একটা ‘ইডিয়্ট’ এর থেকে বেশি কিছু মনে হয় নি আর নিজের উপর খুব হাঁসি পেয়েছিল। আসলে বিষয়টা হয়েছিল তারা খানিক আগেই বেরনোয় এসির হাওয়ায় ঘরটাকে ক্রিত্তিম ভাবে অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা করে রেখে ছিল, তার উপর ওয়েটার সবে কফি রেখে বেরনোয় এখনও কফি বাবাজি ঠাণ্ডা হওয়ার সময় পায়নি, আর তার উপর ফোন ভাইব্রেট মোডে থাকা কালীন ফোন আসায় ফোনটিও স-কম্পে স-শব্দে নীচে পরে আত্মহত্যা করতে যায়। এরপর বেচারার প্রাণ ফেরার আগেই আবার ফোন আসায় হ্যাঙ্গ করে বসে। আর ভূত বাবাজিরা সাতে-পাঁচে না থেকেও দোষ পরে তাদের ওপর।’ বলেই তিনি আবার হা হা করে হেঁসে উঠলেন। আমিও সুযোগ পেয়ে ফিক করে হেঁসে উঠে বললাম, ‘আমিও তাই ভাবছিলাম, তিন তারা হোটেলে আবার ভূত এল কোথা থেকে। তাও নাকি এই বিংশ শতাব্দীতে নাকি ভুতের অস্তিত্ব।’ কথাটা শোনাতেই হঠাৎই তিনি অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, ‘কেন ভাই! ভূতেদের কি থাকতে নেই?’ আমি তার কথার মানে না বুঝলেও মনের অবস্থা বুঝে বললাম, ‘কিছু মনে করবেন না, আপনার ভাবনাকে ছোট করা আমার উদ্দেশ্য না, তবে কখনো কিছু চাক্ষুষ প্রমান পাইনি বলেই ঠিক মেনে নিতে পারিনা। আপনি এসবে বিশ্বাস করেন নাকি?’ এবার উনি মুচকি হেঁসে বললেন, ‘আমিও তোমার মতোই ভাবতাম, তবেই ওই রাতের পর থেকে মানি।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোন রাত?’ উনি এবার একটু গম্ভীর ভাবেই বললেন, ‘নিজের খুন হতে দেখেছো কখনো?’ আমি এবার একটু বিস্মিত হয়েই জিজ্ঞেস করলাম, ‘মানে!’। উনি আবার বলতে শুরু করলেন, ‘আর বলোনা ভাই, সে রাতের সেই বিভৎস্য দৃশ্য আজও আমায় ঘুমাতে দেয়না। সারা দিন কাজের পর হোটেলে ফিরে দেখি তিন জনের কাছেই সিগারেট শেষ। ফেরার পথে পাশেই একটা দোকান খোলা থাকতে দেখেছিলাম। রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। আমি আর সময় নষ্ট না করে ওদের হাত মুখ ধুতে বলে বেরিয়ে পড়লাম সিগারেট কিনতে। আর সেই হল আমার কাল।কিছু দূর যেতেই কানে একটা চাপা গোলমালের আওয়াজ এলো। খানিক এগিয়েই দেখলাম, একটি আলো আঁধারি গলিতে কতকগুলি ছেলে একটি লোককে নির্মম ভাবে মাড়ছে। আমি খানিকটা ভয় পেয়ে গেলাম। কি করব বুঝতে পারছি না, ঠিক এমন সময় হঠাৎ একটা বীভৎস শব্দ। আধমড়া লোকটি রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। সব শেষ।’- বলে উনি একটি থেমে চোখের জল মুছলেন। আমি ওনার মনের অবস্থা বুঝলাম, তবুও কৌতূহল বশত জিজ্ঞেস করেই ফেললাম- ‘হুম, সত্যি বড় প্যথেটিক্। কিন্তু মৃত ব্যক্তি আর ভূত তো এক নয়!’ উনি চোখ মুছতে মুছতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা তুলে বললেন, ‘সেই সময় ওদের একজন আমাকে দেখতে পেয়ে ধাওয়া করলো, আর তার পিছনে বাকিরা। খানিক পরেই আবার একটা গুলি আর সাথে সাথেই একটা ভারি কিছু আছড়ে পড়ল মাটিতে। আর ঠিক কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই একটা শিশি ভাঙার আওয়াজ। আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি কেউ একজন মুখ থুবড়ে পরেছে রাস্তায় আর চারপাশটা ভেসে যাচ্ছে রক্তে, আর ছেলে গুলো তাকে গোল করে ঘিরে কিছু একটা বলাবলি করছে। এবার আমার আর ভয় করল না। আমি ওদের সামনে এগিয়ে গেলাম, গিয়ে দেখি যে যেমন পারছে দেহটিকে লাথি-ঘুসি মাড়ছে আর সাথে অকথ্য ভাষায় গালাগাল... এর মধ্যেই আরেক জন আরও তিনটি গুলি করল দেহটিতে। আর এক জন পায়ে করে উল্টে দিল মানুষটিকে। তার মুখটা আমার চোখে পরতেই চেনা লাগল,-“আরে একে তো আমি চিনি, এ তো সেই যাকে আমি আজ সকালেও হোটেলের রুমে দেখেছি। এমনকি যত বার আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছি ততবার একেই তো দেখেছি। এটা যদি আমি হই, তবে আমি কে?” এসব ভাবতে ভাবতেই জায়গাটা ফাঁকা হয়ে গেলো। সারা রাত দেহটার পাশে বসে রইলাম আমি। কত কুকুর বিড়ালে এসে শুঁকে গেলো। কেউ কামড়াল, কেউ খামচালো, কেউ আবার এক পা তুলে...। পর দিন সকালে পুলিশ এসে লাশ পাঠাল ময়না তদন্তের জন্য। রিপোর্ট এলো, গুলি করে খুন করা হয়েছে। বডিতে মোট ১৩ টা বড় ক্ষত চিহ্ন, আর ছোট খাট অসংখ্য। আর আজও আমি সেই চিহ্ন গুলো বয়ে বেড়াই।’ কথা শেষ করেই সে তার টুপি আর জামা খুলে দিল। আমি দেখলাম, তার মাথায় গুলি এফোঁড়-ওফোঁড় করে গেছে। বুকটা ঝাঁঝরা করে দিয়েছে বুলেট গুলো। ঘাড়ের কাছ থেকে খানিকটা মাংস তুলে নিয়েছে কেউ, আর দেহের মাঝ বরাবর কালো সেলাই-এর দাগ। সে একটু সরতে চোখে পড়ল সে যে সিটে বসে আছে তার নম্বরও ‘১৩’। এরপর আমার আর কিছু মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরল দেখলাম আমি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে, আর চারিদিকে গোল করে ঘিরে আমার বাড়ির লোক আর গুটি কয়েক নার্স...।



‘সমাপ্ত’

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.