মুক্তি


শ্রীদীপের সাথে তন্নীর প্রেমটা চলেছিল এক বছর.. একটা বন্ধুর জন্মদিনের পার্টিতে প্রথম দেখা,তারপর কারণে অকারণে অনেক দেখা.. বন্ধুত্ব থেকে প্রেম..খুবই কমন ব্যাপারটা... !.......এই এক বছরে তন্নী শ্রীদীপকে দেখে একটা কথাই মনে হয়, 'ছেলেটা ভালো, কিন্তু একটু পসেসিভ !..এই আর কি !..' ..আসলে বড্ড ভালবাসে তো !..তাই একটু বেশি চিন্তা করে....... এই যেমন সেইদিন যখন পার্কএ দেখা করতে গিয়েছলো ও ,সেইদিন একটা স্লিভলেস টপ পরেছিল.. সেই দেখে ছেলে তো একেবারে পাগল , নিজের জ্যাকেটটা খুলে তন্নীকে পরিয়ে দিল, " আমার একটুও ভালো লাগে না তন্নী ..লোকে তোমার দিকে ওই ভাবে তাকিয়ে থাকবে.. তুমি যেন তুমি কতটা সুন্দরী.. !..আমি তারাতারিই মা বাবাকে বিয়ের কথা বলতে তোমাদের বাড়ি পাঠাবো ....তারপর সারা জীবনের মতন তোমাকে নিজের করে নেবো..!" ...সেইদিন কথাটা শুনে তন্নীর চোখে লাজুক হাঁসি .. 'সত্যি ছেলেটা পাগল, ওর জন্য..'..
সেই বছরের ১৪ই নভেম্বর ওদের বিয়েটা হয়েই গেল.. তন্নী বাবা মার এক মাত্র মেয়ে.. তাই বিয়েতে ওরা কোনো সাধ অপূর্ণ রাখেনি.. লোক হয়েছিল হাজার এর মতন... এনগেজমেন্ট, মেহেন্দি, গায়ে হলুদ, বিয়ে , বৌভাত এই সব হাজারও অনুষ্ঠান চলেছিল ৭ দিন ধরে.. আর ৮ দিনের দিনই ফ্লাইট এ করে ওর সোজা কলকাতা থেকে নেপাল.. হনিমুন এ কোথায় যাবে এই নিয়ে প্রায় এক মাস ধরে অনেক ঝামেলাঝাটি চলেছিল শ্রীদীপ আর তন্নীর, তন্নীর পছন্দ সমুদ্র, আর শ্রীদীপের পাহাড়.. এই নিয়ে অনেক তর্কাতর্কির পর শ্রীদীপ হঠাৎ একদিন তন্নীকে না জিজ্ঞাসা করেই নেপালের ফ্লাইট বুক করে দিয়েছিল... রাতে ফোন এ কথাটা শুনে তন্নীর চোখ দুটো ওর অজান্তেই জলে ভিজে গিয়েছিল.. হনিমুন টা কি শ্রীদীপের একার !.. তন্নীর না !.. এত বড় একটা ডিসিশন ও একা নিয়ে নিলো..!..ওকে বললও না !.. মাকে জড়িয়ে ধরে রাগে অভিমানে তন্নী যেন সেইদিন ভেঙ্গে পড়ল.... মা ওর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললো... "তুই একটা পাগল !.. এইটুকু তে কেউ এই ভাবে কাঁদে না কি!.. আর বিয়ের পর মেয়েদের একটু তো মানিয়ে চলতেই হয়.... বুঝলি..."..জীবনে সেইদিন প্রথম ওর মা ওর হয়ে কথা বললো না... আর একটা মূলমন্ত্র যেন ওর কানে দিয়ে দিল, বিয়ের পরের মূলমন্ত্র, ''মানিয়ে চলা...''.......
ওদের হনিমুন থেকে ফেরার সাত দিন পর হঠাৎ তন্নীর শ্বশুরবাড়ি দরজায় কলিং বেল বেজে উঠলো, দরজা খুলে সেই চেনা মুখ.. অরিন্দম.. তন্নীর স্কুল লাইফ এর বন্ধু.. ওদের বিয়ের সময় চেন্নাই তে ছিল তাই আসতে পারেনি তখন..কিন্তু ফোন এ বলেছিল , "তন্নী তোর বিয়ে মিস হচ্ছে তো কি হয়েছে, তোর গিফ্ট কিন্তু মিস হবে না.. নিজে গিয়ে তোর শ্বশুরবাড়িতে দেখা করে আসবো, গিফ্ট আর ফুলের বুকে সমেত..".. সত্যি অরিন্দমের কথার দাম আছে !.. ঠিক এড্রেস চিনে হাজির হয়েছে... সেইদিন সারাটা সকাল ওর ছিল নস্টালজিয়া তে ভরা.. পুরনো স্কুল, পুরনো বন্ধু... কত গল্প জমা ছিল ওদের !.. প্রায় ৬ বছর বাদে আবার দেখা !.. সেইদিন সন্ধ্যেবেলা এক গাল হেঁসে তন্নী শ্রীদীপের কাছে গেল, " বলো , কি দারুন সারপ্রাইজ টা দিলো অরিন্দম.. আমি তো ভাবতেই পারিনি ও সত্যি সত্যি এসে হাজির হবে .. কত দিন বাদে মনে হচ্ছিল স্কুলের দিন গুলো তে ফিরে গেলাম...!".. কথাটা শুনে শ্রীদীপ অদ্ভুত দৃষ্টিতে তন্নীর দিকে তাকালো... ওর চোখে কেমন একটা নোংড়া দৃষ্টি.. " হ্যাঁ, সেই .. দেখতেই পেলাম..পুরনো বন্ধুকে দেখে কি ঢলানিপনা টাই করছিল.. তো এই সব নোংড়ামি আমার বাড়িতে না করে কোনো রেস্টুরেন্ট এ দেখা করে করলেই হত..!.. মা বাবা কি ভাবলো কে জানে !.."........তন্নীর যেন একটা ধাক্কা লাগলো.. এই ভাবে বললো শ্রীদীপ ওকে.. এত গুলো খারাপ কথা !... তাও এই ভাষায় ... কানে কথা গুলো খুব লাগছিলো.. বিশ্বাস হচ্ছিল না যে একজন ইঞ্জিনিয়ার এই যুগে এইসব কথা বলতে পারে !..হঠাৎ একটা প্রশ্ন ওর নিজের মন ওকে করে বসলো,...... তাহলে কি এই বিয়েটা ওর জীবনটাকে থমকে দিল?.. অবশ্য সেই রাতে শ্রীদীপ বিছানায় তন্নীকে জড়িয়ে ধরে নরম সুরে বলেছিল, "আসলে তুমি তো জানো,রাগ হলে আমার মাথার ঠিক থাকে না.. ওই ভাবে কথাগুলো বলা আমার উচিত হয়নি.. .. আমাদের ফ্যামিলি একটু কনসারভেটিভ.. তাই প্লিজ এরপর তুমি তোমার কোনো ছেলে বন্ধুকে বাড়িতে আসতে বোলো না.. ভালো দেখায় না...".......... সেই রাতে তন্নী সারা রাত জেগে ছিল...বুকের ভেতর একটা জমাট কষ্ট ওকে যেন শেষ করে দিচ্ছিলো. .. চোখের জলে বালিশটা ভিজে যাচ্ছিলো বার বার..
এই ঘটনার এক মাস হয়ে গেছে.. তন্নী আর ছেলে কি, মেয়ে বন্ধুকেও ওর শ্বশুরবাড়িতে ডাকে না...! মা বলেছিল মানিয়ে চলতে.. এখন বোঝে কথাটার মানে.... যেমন সেইদিন তন্নী পয়লা বৈশাখের কেনাকাটি করতে বেড়িয়েছিল .... দু ঘন্টা বাদে যখন বাড়ি ফিরলো তখন শ্রীদীপের মুখ ভার.. "তুমি না কি গলির মুখে কোন একটা উঁটকো ছেলের সাথে দাঁড়িয়ে ছিলে... গলির সামনে বিশুকাকার মুদির দোকান..জানো আমাকে কি বললো ... যে তোমাকে নাকি ওই ছেলেটার সাথে এমন অবস্থায় দেখেছে যে মুখেও আনা যায় না!..".... কথাগুলো এক নাগারে শ্রীদীপ বলে গেলো ... তন্নী অবাক.. ."তুমি কি পাগোল!... গলির মুখে বিল্টুর সাথে দেখা হয়েছিল..ক্লাস টুয়েলভ এ পড়ে.. বিয়ের আগে আমার কাছে পড়তো ও..মিশ বলে ডাকে আমাকে.. তুমি তো চেনো !.."......... কথাটা শুনে শ্রীদীপ দু মিনিট চুপ করে থাকলো, তারপর বেশ ভেবে বলল, "দেখেছ তাহলে লোকে কেমন ছয় কথা কে নয় করে... রং লাগিয়ে কথা বলাটা লোকেদের যেন স্বভাব.. বিশুকাকা আমাকে বলেছে তাও এক, যদি মা বাবাকে বলত!.. একটা কেস হয়ে যেত.. দেখো তন্নী এরপর রাস্তায় ঘাটে কোনো ছেলের সাথে দেখা হলে অত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলবে না.. বাড়ির বউ তুমি..এটা মাথায় রেখে চলবে.."........... সেইদিন ও বুঝলো যে শ্রীদীপ আর একটা ফরমান জারি করলো.. মানিয়ে চলার লিস্ট এ আর একটা ব্যাপার এড হলো.. তারপর থেকে শ্রীদীপ ওকে একা একা আর কোথাও বেড়োতে দেয় না.. , ডিরেক্টলি হয়তো বারণ করে না...কিন্তু ও কোথাও বেড়োবে, কোনো কাজে দোকানে বাজারে যাবে এটা শুনলেই শ্রীদীপের একটা কমন ডায়লগ রেডি, "শুধু শুধু তুমি একা কষ্ট করে বেড়োতে কেন যাবে ! অটো ,বাসে ভিড় ঠেলে বেকার বেকার..তার থেকে স্যাটার ডে, সান ডে তো আমার ছুটি..সেইদিন নিয়ে বেড়োবে..."........... তন্নী বোঝে শ্রীদীপের ইঙ্গিত গুলো !.. আর চুপ করে থাকে...কি ই বা বলবে.. এই সবের কি ই বা সমাধান আছে ?.. মা শুনে বলে 'আসলে তোকে নিয়ে একটু বেশি চিন্তা করে, বুঝিস না..'... আর বাবা বিশেষ কিছুই বলে না.. আসলে ওদের বক্তব্য প্রত্যেকটা বাড়ির কিছু নিয়ম থাকে..শ্রীদীপদেরও আছে.. ব্যাস..এই ভাবেই দিনগুলো কাটছিল..
সেইদিন অফিস থেকে ফিরে শ্রীদীপ সোজা তন্নীর ঘরে.. ড্রেসিং টেবিল এর সামনে তন্নী চুল বাঁধছিলো ..শ্রীদীপ এসেই তন্নীর হাতটা ধরে ওকে টেনে তুললো, " তুমি সন্ধ্যেবেলা ৬ টা থেকে ৭:৩০ অব্দি কার সাথে ফোন এ কথা বলছিলে ? আমি কতবার কল করলাম..বার বার বিজি .."............"আমার সেজো মাসি ফোন করেছিল..অনেকদিন বাদে কথা হচ্ছিল..কেন কি হয়েছে ?..".. তন্নীর কথাটা শেষ হতে না হতেই শ্রীদীপ ড্রেসিং টেবিল এর ওপর রাখা তন্নীর মোবাইলটা নিয়ে কল লিস্ট টা খুললো .. ৬টার সময় ইনকামিং কল এ 'মিঠু মাসি' নামটা দেখে যেন ও শান্ত হলো... তারপর আবার নরম সুরে তন্নীকে কাছে টেনে নিয়ে বলল, "আসলে অতক্ষণ ধরে বিজি ছিল.! আমার তাই একটু চিন্তা হচ্ছিল..আসলে সুন্দরী বউ হলে যা হয় !..এনিওয়ে আমি খুব টায়ার্ড.. এক কাপ চা দাও তো.."...... ... তন্নীর শুধু একটা দীর্ঘ্যশ্বাস এলো...শেষে ওর ফোন ও চেক হবে!.. এত ভয় শ্রীদীপের !.. মাঝে মাঝে মনে হয় এই বাড়িটাতে ও যেন একজন বন্দী.. এই বাড়ির দেয়াল গুলোই আজ ওর সঙ্গী..দম আটকে আসে এখানে !..
এই দিনটার এক মাস বাদে ওদের একটা বিয়ে বাড়ির নেমন্তন্ন ছিল... তন্নীর জ্যাঠতুতো বোনের বিয়ে.. অনেক দিন বাদে সেইদিন নিজের চেনা লোকগুলো কে দেখে তন্নী মন খুলে হেঁসেছিলো ..কথা বলেছিল... খুব সুন্দর ছিল দিনটা.. বিয়েবাড়িতে অনেক মাস বাদে ওর কাকাতো দিদি আর জামাইবাবুর সাথে দেখা হলো.. দিদি জামাইবাবু যখন প্রেম করতো ,ও ছিল ওদের মাঝের তোতাপাখি..বাড়িতে ম্যানেজ করে কত সিনেমা দেখা, রেস্টুরেন্ট এ খাওয়া এই সব করেছে ওরা তিনজন.. সময়ের খেলায় আজ ওই দিনগুলো কোথায় হারিয়ে গেছে!.. তন্নী তখন ছিল মুক্ত, আজ ও বদ্ধ... সেইদিনও বাড়ি ফিরে শ্রীদীপ নিজের রং দেখালো, "আমি খেয়াল করছিলাম তোমার জামাইবাবু লোকটা মোটেও সুবিধার না.. কি বাজে ভাবে তোমার দিকে তাকিয়েছিল... চোখটা কি নোংড়া.."............ তন্নী আজ অবাক হয়নি.. শ্রীদীপ বাড়ি ফিরে কিছু একটা ঝামেলা করবে সেটা ওর জানা..এতদিনে শ্রীদীপের স্বভাবও কিছু হলেও বুঝেছে !.. " শ্রীদীপ প্লিজ..থামো... জামাইবাবুকে আমি তোমার থেকেও আগে চিনি..প্রত্যেক বছর রাখী পড়াতাম ওর হাতে..ওকে নিয়ে অন্তত খারাপ কথা বোলো না!.."......... শ্রীদীপ কিন্তু সেইদিন তর্ক থামালো না, "শোনো, একটা কথাই আছে .. শালী আধি ঘরবালী.. আর ছেলেরা একমাত্র রক্তের সম্পর্ক ছাড়া কাউকে নিজের বোন হিসেবে মানে না..! পাতানো বোন রাখে ফুর্তি করার জন্যই..".............. না,এই মানষিকতার কাউকে আর কিছুই বলার নেই.. সেই রাতে তন্নী বাইরের ড্রইং রুমে শুয়েছিল... পারছিল না আর ওই মানুষটার সাথে একটা ঘরে থাকতে... ও বুঝতে পারছে আসতে আসতে ওর সহ্যের সীমা শেষ হয়ে আসছে.............
তারপরের দিনই তন্নী কিছু কোম্পানিতে চাকরির জন্য এপ্লিকেশন দিল.. কম্পিউটার সাইন্স এর স্টুডেন্ট.. কোথাও একটা ঠিক ওর চাকরি জুটবে ও জানতো ... এখন খুব মনে হয়, নিজের একটা পরিচয় খুব দরকার ওর... শুধু নিজের জন্য.. ওর মনের কথাটা মিলেও গেল..কিছুদিনের মধ্যেই একটা কোম্পানি থেকে ইন্টারভিউ কল এলো পোস্ট এ... ও জানত লেটার টা দেখে বাড়িতে কিছু একটা অশান্তি ঠিক হবে.. আর হলো ও তাই..!তবে অশান্তিটা শ্বশুর শাশুড়ির থেকেও অনেক বেশি করলো শ্রীদীপ.. ওর মাথায় যেন আজ আগুন জলছে.. ওকে না জিজ্ঞাসা করে তন্নী চাকরির জন্য এপ্লাই করেছে এটা যেন ও কিছুতেই মানতে পারছে না !... "আমাদের বাড়ির বউরা কখনো বাইরে বেরিয়ে চাকরি করে না.. আর কিসের অভাব তোমার!... পা এর ওপর পা তুলেই তো খাচ্ছ..তাহলে এত ন্যাকামি কিসের..."........... আজ তন্নীরও জেদ চেপেছে..আজ ও চুপ থাকবে না, "চাকরি আমি করবই শ্রীদীপ ..সব সময় তোমার সব কথা আমাকে মানতে হবে এর কোনো মানে নেই!......"......... কথাটা শুনে শ্রীদীপ এক সেকেন্ড এর মধ্যে তন্নীর হাত থেকে লেটার টা ছিনিয়ে নিয়ে লাইটার এর আগুনে কাগজটাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিলো... তন্নীর চোখের সামনে ওই কাগজটা পুড়ছে......... সেই আগুনের সামনে হঠাৎ তন্নীর কানে একটা কথা ভেসে এলো, দেড় বছর আগে গঙ্গার ধরে বসে শ্রীদীপ ওকে বলেছিলো , "বিয়ের পর তোমার চাকরি করতে ইচ্ছে হলে করবে..তুমি এত পড়াশোনা করেছো বাড়িতে বসে থাকার জন্য না কি!.."....... সত্যি..কি তারাতারি শ্রীদীপের সব কথাগুলো বদলে গেলো .. না কি আগেরটা ছিল অভিনয়... !..আজ ও সত্যি...!...........
এই দিনের পর থেকে ও শ্রীদীপের সাথে আর কথা বলতো না.. প্রয়োজন অপ্রয়োজন কখনই না.. আসলে কথা আর আসতই না... এখন রোজ রাতে ওর ঠিকানা ড্রইং রুমের সোফাটা... এরমধ্যে একটা শনিবার ও রান্নাঘরে যাচ্ছিল এক কাপ চা আনতে..কিন্তু হঠাৎ রান্নাঘরের দরজার সামনে পা টা থমকে গেল... শ্রীদীপ বাড়ির কাজের লোকটাকে জিজ্ঞাসা করছে, "আমি চলে যাওয়ার পর কি এই বাড়িতে কেউ আসে বৌদিমনির সাথে দেখা করতে? দুপুরবেলা যখন মা বাবা ঘুমোয় তখন... কিছু জানিস..".............. কাজের লোকটা ঘাড় নাড়িয়ে উত্তর দিল, "না দাদাবাবু কেউ আসে না.. আমি তো দুপুরে আপনার কথা মতন জেগেই থাকি..নজর রাখি বৌদিমনির ঘরে...... "....... তন্নী যেন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না... এত অপমান!..এতটা....... শেষে একটা বাড়ির কাজের লোক ওকে ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট দেবে ! ... সে ওর ওপর নজর রাখে !... শ্রীদীপ কি মানসিক রুগী?! অবিশ্বাস করাটা কি ওর স্বভাবে ? মানষিকতায় ? কিসের এত ভয় ওর!... এখন যেন তন্নীর মনে হয় যে সব সময় দুটো চোখ ওর দিকে নজর রাখছে.. ওর খাওয়া, সোয়া, হাঁটা চলা সবদিকে... ও যেন একটা রোবট,আর তার রিমোট টা শ্রীদীপের হাতে!... হয়ত আর কয়েকদিন বাদে ঘরের চার দেয়ালে সিসি টিভি ক্যামেরা বসবে... ওর ওপর নজর রাখার জন্য..!.. বিয়ের এই এক বছরে ওর জীবনটা যেন পুরোপুরি বদলে গেল!..এখন আর মুক্ত বাতাস নেই!.. এই জীবনে শুধুই অন্ধকার... বিয়ে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছিল তন্নী..আজ সেই স্বপ্নগুলো ওকে দেখে যেন হাঁসে ..মজা করে... বাস্তব ওকে আঁকড়ে ধরে...রোজ... সেইদিন আর পারলো না তন্নী.. এইভাবে ও দম বন্ধ হয়ে মরে যাবে... ও আজ নিজের বাড়ি যাবে... বাবা মার কাছে...ওদের গিয়ে সবটা বলবে.. বোঝাবে শ্রীদীপের চিন্তাধারার কথা.. শ্রীদীপ যেটা করে সেটা একটা মানসিক রোগ..একটা পাগলামি... এটা কোনো বাড়ির নিয়ম হতে পারে না!... এইসব ভেবেই টাক্সিতে উঠলো... কিন্তু মাঝরাস্তায় টাক্সিটা দাঁড়িয়ে পড়ল হঠাৎ.. সামনেই একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে.. তন্নী রাস্তায় নেমে অবাক, রক্তে মাখা সেই চেনা মুখটা... !.. হসপিটাল এ সেইদিন সন্ধ্যে অব্দি ছিল,.. ব্লাড এরেঞ্জ করা, অসুধ কেনা.. সবই ও করেছে... আসলে এই মানুষটার বাড়িতেও তো কেউ নেই!... তন্নী কাকেই বা খবর দেবে এক্সিডেন্ট এর !... এই সবের মাঝে একবার শ্রীদীপ কল করেছিল... "কি শুনলাম আমি? তুমি বাড়িতে কিছু না বলে বেড়িয়ে গেছো !....দিন দিন কি তোমার ডানা গজাচ্ছে ?"...তন্নী সেইদিন এককথায় উত্তর দিয়েছে "লাইফকেয়ার হসপিটাল এ আছি..এখানে একজনের আমাকে খুব দরকার.. তোমার বাজে কথা শোনার এখন সময় নেই আমার..."........... ভেবেছিল ব্যাপারটা আর এগোবে না.. কিন্তু ফোনটা রাখার আধ ঘন্টার মধ্যে শ্রীদীপ হসপিটাল এ হাজির... করিডোর এর অত লোক,পেসেন্ট, নার্স ,ডাক্তারদের সামনে তন্নীর উপর যেন ও ঝাঁপিয়ে পড়লো , আজ তুমি না, আজ ও তুই তে নেমে এসেছে..
.." এই তুই ভাবিস কি নিজেকে রে ? তোর সাহস কি করে হলো আমার পারমিসন ছাড়া একটা রাস্তার লোককে তুলে হসপিটাল এ নিয়ে আসার.,... !.. আর তুই বাড়িতে না বলে বেড়িয়েছিস.... চল তুই আজ বাড়ি... তোদের মতন মেয়েছেলের সাথে ভদ্র ভাষায় কথা বললে চলে না!..." কথাটা বলেই সৃদীপ তন্নীর হাতটা ধরে টানতে যাবে সেই সময়ই তন্নী শ্রীদীপের গালে পাঁচ আঙ্গুলের দাগ বসিয়ে দিলো... হসপিটাল এর করিডরে অত লোকের ভিরে তন্নী শ্রীদীপের গালে একটা থাপ্পর মারলো... " ইউ ডিসার্ভ দিস স্ল্যাপ মাচ মোর আর্লিয়ার শ্রীদীপ.. ভুল টা আমার ছিল..তোমাকে আমি এতটা বাড়তে দিয়েছি... একটা নোংড়া লোক তুমি... একটা মানসিক রুগী... আর আজ যাকে আমি হসপিটাল এ নিয়ে এসেছি উনি আমার স্কুলের স্যার... প্রিয়তোষ বাবু.. আমাকে দশ বছর ধরে বাড়িতে অঙ্ক ইংরেজি পড়াতে আসতো...আমার বাবার বয়সী একজন... তবে এইসব আমি তোমাকে কেন বলছি!.. তোমার সাথে তো আমার আর কোনো কথা থাকতেই পারে না... যাই হোক ডিভোর্স পেপারটা তোমার বাড়ি আর সাত দিনের মধ্যেই পৌঁছে যাবে... সাইন করে দিও...".............শ্রীদীপের চড়টা হজম করতে দু মিনিট সময় লেগেছিল!..ভাবতে পারেনি তন্নী এইভাবে রিয়াক্ট করবে... !.. গলার স্বরটা আপনাআপনিই নিচে নেমে গিয়েছিল, "তুমি আমাকে সবার সামনে চড় মারলে ? আমি তোমার হাসবেন্ড..".... তন্নী এবার দৃঢ় গলায় উত্তর দিল, "না শ্রীদীপ তুমি আমার হাসবেন্ড কখনই ছিলে না.. তুমি বিয়ে করে যেন আমাকে কিনে নিয়েছিলে... আর কিছুদিন বাদে হয়ত নিঃশ্বাস প্রঃশ্বাস ও আমাকে তোমার পারমিসন নিয়ে নিতে হত!... যাই হোক, এরপর বরং একটা কাজ কোরো..কুমোরটুলি থেকে একটা মাটির প্রতিমা অর্ডার করে বাড়ি নিয়ে এস..তাকে বিছানায় শুয়ে রাখবে ...দেখবে সে না কোনো কথা বলবে, না রাস্তায় বেড়োবে, না বন্ধুত্ব করবে কারোর সাথে..! সব সময় তোমার নজরবন্দী হয়ে থাকবে...."......... সেইদিনের পর আর তন্নী ওই বাড়ি ফিরে যায়নি...
ওর এক বছরের বিয়ে আজ ভেঙ্গে গেছে... ডিভোর্স কেস শেষ.. এখন আইনের চোখেও ওরা আর স্বামী স্ত্রী না... তন্নী এখন স্বাধীন.. ও একটা মাল্টিনেসনাল কোম্পানিতে চাকরি করে... রোজ সেজে গুজে অফিস যায়..সবার সাথে অনেক কথা বলে... অনেক নতুন বন্ধু ,পুরনো বন্ধুর ভিড় ওর জীবনে.. ও আজ মন খুলে হাঁসে... কারণ আজ ও মুক্ত.. ওর সামনে আজ সীমাহীন নীল আকাশ.. আজ ও উড়তে চায়.. আকাশের রামধনুর সাতটা রংকে স্পর্শ করতে চায়....

--------------< সমাপ্ত >---------

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.