মায়ের আঁচল ধরে পিছু পিছু ঘুরছিল কালথেকেই। মায়েরও বসে-দাঁড়িয়ে থাকা শরীরে সয় না, এটা সেটা কাজ নিয়ে চলছে আসা ইস্তক। হলুদ বাটা, আগ গড়া, বরণডালা সাজানো, আইহাঁড়ির জোগারযন্তর করা, কণেরবাড়ি কি আর কাজের অভাব। সকালে মার ঝাঝুনি খেয়ে চুপচাপ বসেছিল মিতালি। বিয়েবাড়িতে হুলুস থুলুস ব্যাপার, লোকজন ভর্তি, সকলেই ব্যাস্ত। এদিকে মিতালির চেনা তেমন কেউ নেই, আগে কখন এ বাড়িতে সে আসেওনি। মার মাসির ছোটো মেয়ের বিয়ে। গ্রামের চাষিবুসি হলেও বেশ সম্ভান্ত পরিবার। উঠানে ধানের মড়াই, গোলচালায় চারখানা গরু। এসব মিতালির অদেখা নয়, নিজেদের নাথাকলেও গাঁয়েগজ্ঞেই ঘর তাদের। বেশ কয়েকটা কচিকাঁচা হুড়োহুড়ি করে বিয়েবাড়ির মজা কুড়োচ্ছে। কিন্তু মিতালি একটু লাজুক, ও সকলের সাথে মিশতে পারেনা তাড়াতাড়ি।

রিক্তা আসতে চায়নি একেবারেই, তাও আবার জিরোকে ছেড়ে। জিরো ওর ডগি, ওর সবথেকে প্রিয় বন্ধু। স্কুল থেকে ফিরে ওর সাথেই তো কাটে সারা দুপুরটা। বিকালে বনিপিসি রাতের খাবার ফ্রিজে রেখে- ওকে দিয়ে আসে আঁকার ক্লাসে। ওখান থেকে সন্ধাবেলা নাচের ক্লাসে পৌঁছেদিয়ে বনিপিসির ছুটি। কোনদিন অফিসফেরতা মা কোনদিন বাবার সাথে বাড়ি ফেরে সে।

কেমন একটা অন্য রকম বিয়েবাড়ি, বাড়ি থেকে কত দূর। বাবা আসতে পারবে না তাই মাকেই অফিস কামাই দিয়ে আসতে হল। পরিবেশটা একেবারেই পছন্দ হচ্ছিল না রিক্তার। মায়ের মোবাইলটায় গেম খেলছিল সে। মিতালি টুকুর টুকুর এদিক ওদিক দেখতে চোখ পড়ল রিক্তার দিকে। কি ফর্সা দেখতে, খুব সুন্দর জামা আর ফুলপ্যান্ট পরে আছে মেয়েটি। একটু দূর থেকেই রিক্তার হাতে মোবাইলে খেলাটা দেখছিল মিতালি। দেখেই খুব আনন্দ হচ্ছিল ওর। মিতালির বাবারও একটা ফোন আছে বটে, তবে তাতে এমন খেলা য়ায় না। এত বড়, সুন্দর দেখতেও নয় সেটা। রিক্তার কিন্তু গেমটা খেলতে ভাল লাগছিল না। পাশে মিতালি কে দেখতে দেখে আরও কিছুক্ষণ খেলাটা চালিয়ে গেল। মিতালি ততক্ষণে রিক্তার একেবারে পাশে এসে বসেছে। রিক্তা কালো ছিপছিপে ফ্রক পড়া মেয়েটার চুলের লম্বা বিনুনির দিকে তাকিয়ে বলল ‘খেলবি ?’। মিতালি লজ্জা পেয়ে বলল ‘ তুই খেল, আমি দেখছি’।


দুজনের বয়স প্রায় এক, তবু রিক্তাকে যেন বড় মনে হয় মিতালির থেকে। রিক্তা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে কেজি থ্রী-তে পরে। আর মিতালি খিচুড়ি ইস্কুলে। রিক্তাকে রোজ সকালে তাড়াতাড়ি ঘুমথেকে উঠে জোর করে বিস্কুট আর কমপ্লান খেয়ে স্কুলে যেতে হয়। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতেই ম্যাগির টেবিলে বসিয়ে দিয়ে বাবা –মাকে অফিস বেড়তে হয়। মার সাথে সেই দেখা সন্ধেবেলা। নাচের স্কুলথেকে ফিরে মার কাছে আসতে না আসতেই মিস্ আসে হোমওয়ার্ক করাতে। রবিবারটাই শুধু শান্তি, সকালে সাঁতার শিখে সারাদিন ছুটি। মিতালির কিন্তু সবদিনই রবিবার। স্কুলের ছুটিটা বাদদিলে রোজ দেরিকরে ঘুমথেকে উঠে বই নিয়ে একটু বসা, তারপর মার সাথে রান্না ঘরে খুটুস খাটুস করে, বাবার কে চা-টা, জল-টা এগিয়ে দিয়ে একটু ভাত মুখেদিয়ে স্কুল যাওয়া। স্কুল থেকে ফিরে রান্না বাটির খেলনা গুলো মেজে ধুয়ে, বড়-বৌকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে বই হাতে উঠানের আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ছোট হয়ে আসে। লেচি থেকে ছিড়ে নেওয়া আটার ডেলা হাতের মুঠোয় শুকিয়ে আসে। ঘুম চোখে রুটি খেয়ে বাবা মার মাঝে শুয়ে পড়ে মিতালি। বরের আনা এত্ত বড় একটা কাতলা মাছের আঁস ছাড়াতে স্বপ্নে ভেসে আসে তার খেলাঘরের বৌ।

বিয়েবাড়িতে বিকেল আসার আগেই চারিদিকে টিউব লাইট লাগাতে এসেছে ডেকরেটার। ইলেকট্রিক মিস্ত্রির হাতে হাতে সরঞ্জাম জুগিয়ে চলেছে বছর বারোর হিরা। লেখা পড়ায় যখন মন নেই, তখন হাতের কাজ শেখাই ভাল। তাই ক্লাস থ্রীর পর ওর স্কুল যাওয়া শেষ, তবে বড়োদের সাথে থেকে ও শিখে নিয়েছে নেগেটিভ, পজেটিভ অনেককিছুই।

আলো ঝলমল করে ওঠার সাথে ছোট ছেলে মেয়েরা লেগেপড়েছে লুকোচুরি খেলায়। রিক্তা এ খেলা খেলেনি কখনো। আজ মিতালির সাথে খেলার নিয়মগুলো শিখে বেশ লাগছে ওর। বিয়ের সময় এসে পড়ছে, কণেকে সাজানো হচ্ছে ঘরের দরজা বন্ধ করে। মিতালির এবারও নিতকণে হওয়া হল না। তবে এবারে ও একটা খুব ভাল বন্ধু পেয়েছে, এক্কেবারে শহরের বন্ধু। রিক্তা পাশের ফ্লাটের স্মিতির সাথে মাঝে মধ্যে গল্পস্বল্প করে, গেম খেলে ঠিকই, কিন্তু এমন ভাল বন্ধুত্ব কখনো হয়নি ওরও।

মিতালি আরও কটাদিন থাকবে ওখানে, কিন্তু রিক্তাকে ফিরে যেতে হবে বাড়ি। মার অফিস, পড়া শোনা, নাচের ক্লাস। মিস করলে স্মিতিকে টেক্কা দেওয়া যাবে না যে।

***********************************************************

মিতালি, রিক্তা বা হিরার মত এই শিশুদের ভবিষ্যৎ আমরা বড়োরা ঠিক করে দিই সবক্ষেত্রে। কিছু ক্ষেত্রে হয়ত প্রয়োজন। কিন্তু কোথাও একটা ভারসাম্য হারিয়ে যাচ্ছে নাতো? কাউকে ঘর আর সম্পর্কের সাধনায় উৎসাহ দিচ্ছি ঠিকই কিন্তু তাকে তার সমর্থ হওয়ার সুযোগ দিচ্ছি কি! কাউকে হার-জিতের লক্ষ্য চিনিয়ে দিচ্ছি ঠিকই কিন্তু তার কাছে বেঁচে থাকার অক্সিজেন আসতে দিচ্ছি কি? অশিক্ষিত- অসভ্য বলে তিরস্কার করার আগে ঐ শিশুদের শিক্ষা-সুরক্ষা সুনিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন নয়কি? যে কোন বড় বা মাঝারি রেল স্টেশনে শিশুদের ভিক্ষা করতে দেখা আজ আম ব্যাপার। তাদের মা-বাবার আচরন, মানসিকতা আমাদের অজানা নয়। কেউ ততকাল রেহাই পেতে দু-একটাকা ধরিয়ে দেওয়াই ঠিক মনে করি, কেউবা অবঞ্জা করে বলি ‘ আগামি দিনের ক্রিমিনাল তৈরি হচ্ছে’। কিন্তু এ বদলের উপায়টাই বা কি? শিশুদের উপর শারীরিক, মানসিক অত্যাচার বা অন্যায় আচরন নির্মূল করতে আমাদের সামাজিক সচেতনতা কি যথেষ্ট?

এমন দিনটার অপেক্ষা রইল যে দিন প্রত্রিটি শিশু মুক্ত হাওয়ায় ফুলের মত হাসতে পারবে। একে অপরের কাছে শুধু প্রতিযোগী নয়, একে অপরের প্রকৃত বন্ধু হতে পারবে। শিখবে সভ্য শিক্ষা, যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা- নোংরা করা নয়। গড়বে পরিচ্ছন্ন দেশ, বড় বয়সে এটা আর শেখা যায় না।



-----------

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.