রাজার গল্প


রাজা ঘড়ে ঢুকে দরজা বন্ধ করল,জামা কাপড় ছেরে কেরোসিন তেলের স্টোভে রান্না চাপিয়ে দিল,ভাত ফুটতে লাগল আর রাজার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পরতে লাগল জল।আজ বহুদিন পরে রুমা দি কে দেখল সে,সেই রুমা দি যার জন্য প্রতি রাতে কাদেঁ রাজা,ওই একটা মানুষ জীবনে এসেছিল বলেই হয়তো রাজা আজ ও বাঁচার রসদ পায়,পাশের একটা শপিং মলে সিকিওরিটি গার্ডের চাকরি করে রাজা আর এখানে বাড়ি ভারা করে থাকে,প্রায় দশ বছর হয়ে গেল নিজের বাড়ির সঙ্গে সম্পর্কই নেই তার,আর সে রাখতেও চায় না। লোকে বলে মা ই নাকি যে কোন মানুষের সবথেকে কাছের বন্ধু, কিন্তু সেই মায়ের কাছ থেকেই খুন্তির বারি,জুতোর বারি ছাড়া কিছুই জোটে নি রাজার। চিরকাল, “পেটের শত্রু,”,”অপদার্থ” এই সব শুনে এসেছে সে।মনে হয় স্তন্যপান করা যবে থেকে ছেড়েছে রাজা তবে থেকেই তার মা তার সাথে এরকম আচরন শুরু করেছেন।

রাজার মনে আছে মা তাকে খাইয়ে দিতেন,ঘুম পারিয়ে দিতেন,চোখে কাজল পরিয়ে দিতেন।

কিন্তু যবে থেকে রাজা স্কুলে ভর্তি হয়েছে তবে থেকেই তার মায়ের আচরন দিন কে দিন তার প্রতি শত্রুর মত হয়ে গেছে।তার দোষ এই যে সে পড়াশুনা কিছুই বোঝে না।

কত রাতে খাওয়া জোটে নি রাজার,”কবিতা মুখস্ত কর তারপর খেতে পাবি,।“ এরকম হুকুম হয়েছে তার উপর

সারারাতেও কবিতা মুখস্ত হয় নি রাজার,খিদের জ্বালায় কেদেঁছে,তবু একটুও সহানুভুতি পায় নি। সবার কথায়

এসব নাকি রাজার শয়তানি আর চালাকি......

তিন ভাই এর সবচেয়ে ছোট রাজা,আর সবথেকে নির্স্কমা।

না পড়াশুনায় ভাল, না খেলাধুলায় ভাল না ঘড়ের কাজে,

কিছুই মনে রাখতে পাড়তো না রাজা,রোজ স্কুল থেকে কমপ্লেন আসত।

বাড়িতে মার,স্কুলে মার,পাড়ার ছেলেদের কাছেও মার,আর এসব সহ্য করতে না পেরে কেদেঁ ফেললে তো কথা ই নেই, লোকের কাছে হাসির পাত্র,বিরাট খোরাক হওয়া,এই নিয়েই চলছিল রাজার জীবন।

রাজার বাবা রাজার সাথে কোনদিন কথা বলেছে বলে মনে পরে না রাজার।রাতে বাড়ি আসতেন সকালে বেড়িয়ে যেতেন।স্কুলের রেজাল্ট বেরোলে দুই দাদার রেজাল্ট দেখা হত,রাজা কে কিছু জিজ্ঞাসা ই করতেন না তিনি।

যখন রাজার দশ বছর বয়েস তখন একবার তাকে মেন্টাল হসপিটালেও দেওয়া হয়েছিল,কিন্ত সেখান থেকেও কদিন বাদে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাকে ।

হসপিটালের কর্তৃপক্ষের কথায় রাজার বিশেষ কোন মানষিক রোগ নেই, সাধারনের থেকে একটু কম বোঝে ঠিকই কিন্ত তার জন্য তাকে মানষিক রোগী বলার কোন অর্থই হয় না।

উচ্চশিক্ষিত পরিবারে জন্ম হওয়া টাই ছিল রাজার অভিশাপ। রাজার বাবা একজন চার্টার একাউন্টেন্ট আর মা হাউস ওয়াইফ কিন্তু ইংলিশে এম.এ,তাই রাজার মত অপদার্থ কে তারা ঠিক মেনে নিতে পারতেন না। প্রতি মুহুর্তে রাজা বুঝতে পারত যে সে এদের কাছে এক বোঝা।

বাইরের কারোর কাছে সে কিছু বললেও গালাগালি খেত,কেউ বিশ্বাস করতো না যে কোন বাবা মা সন্তানের সাথে এরকম করতে পারেন।সবাই ভাবতো রাজার ই দোষ।

মাঝে মাঝে রাজার ও তাই মনে হত যে তার ই বোধহয় সব দোষ,কেদেঁ কেদেঁ চোখের জল শুকিয়ে যেত তার।

আত্মহত্যা করতে চেয়েছে রাজা বহুবার কিন্তু সাহস পায় নি,শেষ অবধি আর পেরে ওঠে নি।

এভাবেই বেড়ে উঠছিল রাজা,একদিন হঠাৎ ঘটল এক ঘটনা।

পাশের জমিতে বাড়ি টা অনেকদিন ধরেই তৈরি হচ্ছিল,এবার কমপ্লিট হয়ে লোক ঢুকলো,

রুমা দি, সে বাড়ির মেয়ে।

উচ্চ মাধ্যমিকে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়েছিল সেবার।

ফিসিক্স অনার্স পরে, দারুন এক ব্যক্তিত্বময়ী অধ্যাপক দম্পতির কন্যা ১৮ বছরের কিশোরী রুমা গোস্বামী।

রাজা তখন ও বালক,এই বয়েস ১৪,কিন্তু রুমা দি কে ওর দারুন ভাল লাগলো।

এই রুমা দি ই সেই মানুষ যার কাছ থেকে রাজা প্রথম ভালবাসা পেয়েছিল,

“কি রে রাজা বাবু ,ও মা কি শান্ত দেখ,আয় খেলবি চল”.......ঠিক এভাবেই কথা বলত রুমা,পাড়ায় রাজার সমবয়েসী অন্য ছেলেরা বলতো “কি গো দিদি এই পাগল টার সাথে তুমি খেলবে?”

রুমা হেসে বলতো, “কি বলিস তোরা?কি মিস্টি ছেলে, পাগল কেন হবে ও?”

রাজা তখন চারবার পঞ্চম শ্রেনী তে ফেল করে পড়া ইতি দিয়েছে,

এই শুনে রুমা বলল “৪ বার আবার কেউ ফেল করে নাকি? দাঁড়া আমি তোকে পড়াবো,

রাজার বাবা কে বলে রুমা ই নতুন করে স্কুলে ভর্তি করাল রাজা কে।রাজার বাবা বলেছিলেন,”চেষ্টা কর গাধা পিটিয়ে মানুষ করতে পার কিনা?”

অদ্ভুত ভাবে রাজা সেবার পাশ করে ক্লাসেও উঠল,যা কেউ পারে নি তাই করে দেখাল রুমা,সবাই তো অবাক;

এভাবে কেটে গেল ৭ বছর,রুমার কাছে ই খেলার ছলে পড়াশুনা করে উচ্চ মাধ্যমিক ও পাশ করে গেল রাজা যা ভাবা যায় না।তবে কলেজে ভর্তি হওয়ার মত নম্বর ছিল না তার।তাই এখানেই পরাশুনা শেষ করতে হল তাকে।

তারপর P.H.D করা রুমা চলে গেল অক্সফোর্ডে রিসার্চ করতে।

রাজা হয়ে গেল একা।

এর কদিন পর রাজার দুই দাদা ই বিয়ে করে নিল,আর সেই কারনেই বাবা মা আর দাদা দের সাথে দিনরাত রাজাকে খোঁটা দিতে বউদি রাও লেগে গেল।

পালা করে করে চলত রাজা কে অপমান করা,অপমান করার নতুন নতুন পদ্ধতি আবিস্কৃত হতে লাগল।।

H.S পাশ ঠিক ই করেছে রাজা কিন্তু দুই দাদার মধ্যে একজন ইঞ্জিনিয়ার আর একজন ব্যাঙ্কে চাকুরী রত,তাদের কাছে রাজা তো কিছু ই না। তাই অবহেলা আর অপমান ই দিনরাত জোটে তার।“মেয়ে হলে একটা যাকে তাকে ধরে বিয়ে দিয়ে দিতাম,কিন্তু এটা ছেলে; কি যে কিরব?সারা জীবন ফ্রি তে গেলাতে হবে,”.....এমন ই বলত বাবা দাদা রা।

খুজে পেতে একটা কাজ পেয়েও ছিল রাজা,সাইকেলের দোকানে,কিন্তু এই খবর টা জানার পর বড়দা বেল্ট খুলে মারল তাকে,”এত বড় বাড়ির ছেলে হয়ে তুই সাইকেলের দোকানে কাজ করবি?....ছি: ছি: পরিবারের নাম ধুলোয় মেশালি তুই।“....এরকম বক্তব্য তাদের।

এত বড় ছেলেকে মারতে দেখে পাশের বাড়ির এক জেঠু প্রতিবাদ করতে এসেছিলেন,কিন্তু দাদারা ওনাকে স্পষ্ট বলল যে, “ও আমাদের নিজের ভাই ওর ভাল ই আমরা চাই,আর তার জন্যই এসব করা,তাই আপনি দয়া করে আমাদের পরিবারের মধ্যে কথা বলবেন না।“

দাদাদের সমর্থন করলেন রাজার মা,তার কথায়, “ও আমার পেটের ছেলে, তাই আমি ওর ভালর জন্যই বলছি, এই শাসন টা ওর দরকার,আর সন্তান কে শাসন করা বাবা মার অধিকার। এ নিয়ে বাইরের লোক কিছু বলতে পারে না। কোন মা কোনদিন সন্তানের খারাপ চায় না।“........এই সব কথার কোন উত্তর ই সেই জেঠু দিতে পারলেন না, তাই মাথা নিচু করে চলে গেলেন।

আরও ক দিন মানিয়ে থাকার চেষ্টা করেছিল রাজা কিন্ত তারপর একদিন কাউকে কিছু না বলে চুপ করে বাড়ি থেকে পালিয়ে এল আর বাড়ির লোক ও খোঁজ নিল না।হয়তো ভাবল আপদ গেছে।

প্রথম কদিন রাস্তায় বসে থাকল,তার পর কাজ পেল চা এর দোকানে আর সেই চা এর দোকানের ই একজন রোজের খদ্দের পরে ওই সিকিওরিটি গার্ডের কাজ টা পাইয়ে দিলেন রাজাকে,H.S এর সার্টিফিকেট টা থাকায় কাজটা সহজে হল।

ব্যাস আর কি?সুখে শান্তি তে দিনের ১২ ঘন্টা কাজ করে সময় কাটতে লাগল রাজার।

এভাবে কেটে গেছে দশ বছর,এখন সে সিকিওরিটি সুপারভাইজার ও হয়েছে,মায়না এই ১৫ হাজার মত পায়,একার চলে যাচ্ছে ভালই।

তা হঠাৎ আজ রুমা দির সাথে দেখা,এন্ট্রি গেট দিয়ে ঢোকার সময় ই দেখা হয় দুজনের, কিছু দরকারি শপিং করতে এসেছিল রুমা,আর রাজা সে সময় গেটের সামনেই চেকিং এ ছিল।

“রুমা দি না,”বলে ওঠে রাজা।

চোখে চশমা হয়েছে রুমার,ব্যক্তিত্ব যেন আরো বেড়ে গেছে।রাজাকে দেখেই তো এক গাল হাসি।“কি রে রাজা বাবু কত বড় হয়ে গেছিস,চেনাই যাচ্ছে না।“

নাসায় চাকরী করে রুমা।বিগ ব্যাং কের উপরে একটা প্রজেক্টে কাজ করছে সে,

রুমার বাবা সদ্য মারা গেছেন তাই কাজে এসেছিল রুমা।

না এখনও বিয়ে করে নি ৩৬ বছর বয়েসী রুমা, ডেটিং লিভ ইন প্রচুর করেছে কিন্তু বিয়ে করার মত একটি ও নয়, শরীর মিলেছ বহুবার কিন্তু মন টা যে মেলে নি কোথাও।

রুমার কাছ থেকে এসব ই শুনল রাজা,খুব আনন্দ আজ তার,কাজে ছুটি নিয়ে রুমা দির সাথে ই ঘুরল সারাদিন,সারা দিন হই হই আর গল্প।

সবার শেষে গেল এক পার্ক এ। তখন বিকাল ৪ টে, হাল্কা রোদ পরেছে।সবুজ ঘাসের উপর বসে রুমা হঠাৎ একটা কথা বলল রাজা কে।“এই রাজা?তুই আমাকে বিয়ে করবি?”

রাজা তো অবাক,ভাবল রুমা মজা করছে।“কি যে বল? তুমি কেন আমায় বিয়ে করবে?কোথায় তুমি আর কোথায় আমি”

“আরে না রে বাবু,ভালবাসতে সবাই পারে না রে,আর তুই কি আমায় আজকে চিনিস? তোর কি মনে হয় তোর সাথে মজা করব আমি”বলল রুমা।

“কিন্তু তা বলে আমি কেন রুমা দি? কি যোগ্যতা আছে আমার?”বলল রাজা।

“তোকে ভালবাসি তাই,তুই খুব সরল এটাই তোর যোগ্যতা।......তুই কি জানিস U.S.A te কত মিস করেছি তোকে,তোর বাড়িতে ফোন ও করেছিলাম কেউ দেয় নি তোকে,তখন তো তোর মোবাইল ও ছিল না তাই না?”......

তারপর একটু থেমে আবার বলল রুমা

”তুই আমায় ভালবাসিস না রাজা?ফিরিয়ে দিবি আমায়?”

মুখে কথা নেই রাজার চোখে জল।

চোখ মুছে আয়নার সামনে দাঁড়াল রাজা।কাল যে যেতে হবে পাসপোর্ট অফিসে।

ভাত রান্না করে তারাতারি খেয়ে সুয়ে পড়ল রাজা।

পাসপোর্ট হল ভিসা হল আজ রাজা U.S.A তে।তার পরিচয় বিখ্যাত সায়েন্টিস্ট রুমা গোস্বামী র স্বামী।

তা ছাড়া ও সে এক নামি দামি সিকিওরিটি এজেন্সি র মালিক,যে টা রুমা ই তাকে খুলে দিয়েছে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য।

এর কয়েক বছর পর নোবেল পেল রুমা,T.V তে,News এ সবসময় দেখায়,আর আম জনতার সাথে বসে দেখেন রাজার জন্মদাতা পিতা মাতা, যারা আজ থাকেন বৃদ্ধাশ্রমে,তাদের যোগ্য ছেলেরা যে কেউই তাদের আর ঘরে তোলে না।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.