পর্ব ১
নবজাতকের ওঁয়া ওঁয়া কান্নার শব্দে ভরে উঠলো পুরো বাড়িটা । কিন্তু নূতন শিশুর আগমনে শঙ্খ বাজলো না , হুল্লোড় হল না , সব কেমন গম্ভীর আর নিস্তব্ধ হয়ে রইল । থমথমে পরিবেশ , ঘরের অন্ধকার যেন আরও গাঢ় হয়ে এলো । বাইরে তুমুল ঝড় , বৃষ্টি আর বজ্রপাত । এই মোক্ষম সময় , শিশুটিকে এখুনি বাইরে ফেলে দিয়ে আসতে হবে । অবাঞ্ছিত , পিতৃ পরিচয় হীন , কুমারী মায়ের গর্ভের শিশুকে কে কবে বরণ করে নিয়েছিল !
মায়ের কোলের থেকে শিশুটিকে কেড়ে নিয়ে কাপড়ে মুড়িয়ে একজন বাইরে নিয়ে চলল । বাইরে বেরোতেই বৃষ্টির জলে ভিজে যাচ্ছিলো মানব শিশুটি , ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে গেলো সে । খুঁজে নিতে চাইল মায়ের উষ্ণ বুক , তখনি সজোরে তাকে ছুঁড়ে ফেলা হল পুতিগন্ধ ময় নোংরা আবর্জনার মধ্যে । ব্যথায় একবার ককিয়ে উঠলো শিশুটি , তারপর নিস্তেজ হয়ে পড়ে রইল ।
সেন বাড়ির বড় কর্তা শিশুটিকে ফেলে দিয়ে দাঁতে দাঁত ঘষে বললেন ,
" বেজন্মা ! "
তাঁর মেয়ের গর্ভের এই অবাঞ্ছিত শিশু জানে না , ওর অপরাধ ঠিক কোন জায়গায় ।
পর্ব ২
শেখ করিম ভোরবেলা বউকে ডেকে তুললেন ,
" আমিনা ! ওঠো , মসজিদে যেতে হবে তো ! "
স্বামী স্ত্রী ভোরের বৃষ্টি ভেজা রাস্তা ধরে চলেছেন মসজিদের উদ্দেশ্যে । পথে আস্তাকুড়ের সামনে এসে দুজনেই চমকে উঠলেন । শিশু কণ্ঠের খুব ক্ষীণ গলায় কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না ! কান খাড়া করে দুসেকেন্ড শব্দটা শুনলেন ওঁরা । না , কোনো ভূল নেই , ওটা বাচ্চারই কান্নার আওয়াজ । দুজনেই ঝুঁকে পড়লেন আস্তাকুড়ের দিকে ।
আরে ওই তো ! কাপড়ে মোড়ানো কি একটা অল্প অল্প নড়ছে । ছোট্ট দুখানা পা দেখা যাচ্ছে । আমিনা হাত বাড়িয়ে ওকে কোলে তুলে নিলেন । কি সুন্দর , ফুটফুটে এক শিশু কন্যা । শিশুটির মুখ দেখে মাতৃত্ব থেকে বঞ্চিত আমিনার হৃদয়ে মমতার বান ডাকল । তিনি বুকে জড়িয়ে ধরলেন শিশুটিকে , স্বামীকে বললেন , " এ আমাদের মেয়ে । আল্লাহ দয়া করে একে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন । আমি ওর মা হবো , ওকে মানুষ করবো । "
নিঃসন্তান দম্পতির ঘর আলো করে বড় হতে লাগলো মেয়েটা । তাঁদের পালিত সন্তান সালমা । যেমন তার রূপ , তেমন তার গুণ । যে তাকে দেখে , সেই মুগ্ধ হয় । সালমা প্রতিদিন আব্বু আম্মুর সাথে মসজিদে যায় , পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে । ধর্মকর্মে খুব মতি এই শান্ত শিষ্ট মেয়েটির । সবাই ওর প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
পড়াশোনাতেও দারুণ মেধাবী সালমা । এখন সে একটি নামী কলেজে ইংলিশ অনার্স নিয়ে পড়ছে ।
পর্ব ৩
কলেজেই সালমার পরিচয় হল পিটারের সাথে । সে বাঙ্গালী , কিন্তু খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী । ওদের পরিচয় কবে বন্ধুত্বে পৌঁছল , আর তারপর প্রেমে , সেটা তারা কেউ বলতে পারে না । গভীর প্রেমে ভেসে গেল দুজন । সালমা বুঝতে পারলো পিটারকে ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব ওর পক্ষে । তাই একদিন সে আম্মু আর আব্বুকে জানালো পিটারের ব্যাপারে । সে যে পিটারকেই বিয়ে করতে চায় , সেটাও জানিয়ে দিল ।
সালমার আম্মু , আব্বু কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না যে তাঁদের আদরের মেয়ে এক বিধর্মীকে বিয়ে করবে । তাই তাঁরা সালমাকে ঘরবন্দী করে রাখলেন। কিন্তু সালমার অনেক কান্নাকাটি , অনেক অনুনয় বিনয় তাঁদের রাজী করে ফেললো শেষ পর্যন্ত । আসলে আদরের মেয়ের এই অবস্থা তাদের সহ্য হচ্ছিল না ।

তাই একদিন শুভক্ষণে সালমা আর পিটারের বিয়ে হয়ে গেলো । তারপর তারা ঘর বাঁধল , তাদের স্বপ্নের ঘর । যে ঘর ভরা ছিল সুখ আর ভালোবাসায় ।
একদিন সালমাও মা হল । দুটো পুত্র সন্তানের মা হল সে । দুই ছেলেকে নিয়ে যখন তাদের সংসারে ভরভরন্ত সুখ । তখনই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত হঠাত দুদিনের জ্বরে মারা গেল সালমা । অন্ধকার নেমে এলো পিটারের সুখের সংসারে।
পর্ব ৪
শরীর ছেড়ে বেরিয়ে সালমার বিদেহী আত্মার খুব কষ্ট হচ্ছে স্বামী পুত্রকে ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে বলে । পিটার আর ওর দুই সন্তানের কান্নায় ওর বুক ভেঙ্গে যাচ্ছে । কিন্তু কিছু করার নেই , যেতে তো ওকে হবেই । আর তখনই বাধল গোলমাল ।
যেহেতু সালমা খুব ভালো একজন মানুষ ছিল , তাই তার আত্মাকে নিয়ে যেতে স্বর্গ থেকে দেবদূত , বেহেস্ত থেকে ফেরেশতা , আর হেভেন থেকে অ্যাঞ্জেল এসে হাজির । তাদের প্রত্যেকেরই দাবী , সালমা তাঁদেরই মানুষ ।
দেবদূত বলল , " এই পবিত্র আত্মার জন্ম হয়েছে এক হিন্দু মায়ের গর্ভে । তাই জন্মসূত্রে ও যেহেতু হিন্দু , ওকে স্বর্গেই যেতে হবে । "
ফেরেশতা বলল , " এই পবিত্র আত্মা বড় হয়েছে মুসলিম ধর্মের নিয়ম মেনে । কোরান পাঠ , নামাজ , কোনো কাজেই ও কখনো ত্রুটি রাখে নি । তাই ও মুসলিম । আর মুসলিম ধর্মের নিয়মানুসারে পবিত্র আত্মাদের বেহেস্তে যেতে হয় , সেই জন্যই আমরা সালমাকে বেহেস্তে নিয়ে যেতে এসেছি । "
অ্যাঞ্জেল বলল , " এই পবিত্র আত্মা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী এক ব্যক্তির সাথে । তাই বিবাহ সূত্রে ও খ্রিষ্টান । আর সেই জন্যই আমি এসেছি ওকে হেভেনে নিয়ে যেতে । "
সালমার বিদেহী আত্মাকে নিয়ে যাবার জন্য দেবদূত , ফেরেশতা আর অ্যাঞ্জেলের মধ্যে লড়াই বেধে গেলো । প্রত্যেকেই সালমাকে নিজের জায়গায় নিয়ে যেতে চায় । আর এটাকে কেন্দ্র করেই হুলুস্থুল , মারামারি চলতে লাগলো। পৃথিবী কেঁপে উঠলো এই ভয়ঙ্কর লড়াইয়ে । হুলুস্থুলে ঈশ্বর মহা বিরক্ত হয়ে নীচে নেমে এলেন । তিনি ঝগড়ার কারণ জানতে চাইলেন । সব জানার পর শুরু হল ঈশ্বরের অট্টহাসি ।

কে ঠিক করে দেয় ধর্ম ? কোন আইনে স্থির হয় , কে কোন ধর্ম নিয়ে জন্ম নেবে ? কিভাবে স্থির হবে সালমার ধর্ম কি ! কোন উজবুক বানিয়েছে এই সমস্ত নিয়ম ! মানুষের ধর্ম মানবতা , এর চেয়ে বড় ধর্ম হয় নাকি ! মানবতার ধর্মে সালমা মহান , তাই সে পবিত্র আত্মা ।
দেবদূত , ফেরেশতা আর অ্যাঞ্জেল মাথা নিচু করে রইল । এসবের কোনো জবাব ছিল না তাদের কাছে । ঈশ্বর তখন সালমাকেই জিজ্ঞেস করলেন ,
" তুমি কি চাও ? "
সালমা মাথা নিচু করে উত্তর দিল , " হে প্রভু , আমার কাছে আমার সংসারই স্বর্গ । আমি এখান থেকে এখুনি যেতে চাই না । আমাকে আরও কিছুদিন এই পৃথিবীতেই থাকতে দিন প্রভু ! "
ঈশ্বর বললেন , " তথাস্তু ! "
মৃত সালমার দেহে প্রাণ ফিরে এলো । সবাই ভাবল অলৌকিক কোনো ঘটনায় সালমা প্রাণ ফিরে পেয়েছে । পিটার আনন্দে জড়িয়ে ধরল সালমাকে । বাচ্চা দুটো ফিরে পেল তাদের মাকে ।
ঈশ্বর তারপর দেবদূত , ফেরেশতা আর অ্যাঞ্জেল , এই তিনজনকে বললেন ,
" কোন আস্পর্ধায় তোমরা লড়াই করছিলে ? তোমরা বোধহয় ভুলে গেছিলে , এই পুরো বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড আমার সৃষ্টি । এখানে সব জায়গায় , সব মানুষের সমান অধিকার । কেউ কারো থেকে আলাদা নয় । লড়াই করে শান্তি বিঘ্নিত করার অপরাধে তোমাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিলাম । তোমরা জেলে যাও, শান্তি ফিরুক পৃথিবীতে। সব অশান্তি কেটে গিয়ে উত্তরণ হোক মানবতার , জয় হোক শুধুই ভালোবাসার । "

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.