সুরিনাম। নামের মধ্যে যে সুর লুকিয়ে ছিল, তা শুরুতেই ধরতে ব্যর্থ হয়েছিলাম। সুরিনাম সাউথ-আমেরিকার একটি ছোট্ট দেশ। যদিও আয়তনে ওর থেকে ছোট্ট হয়তো আরও দেশ আছে। মোটের ওপর বাঙালিরা, সর্বোপরি ভারতীয়রা চিরকালই যেদিকে টাল খাওয়া, মানে আমেরিকা-লন্ডন-সুইৎজারল্যান্ড, তাদের সাথে সাধারণত এই দেশের নাম নেওয়া হয়না। ঘটনাচক্রে আমি চললাম সে দেশে। ইন্টারনেটে আগু-পিছু খবর তাড়াহুড়োতে যেটুকু নেওয়া গেলো, পরে বুঝলাম তা না নিলেও খুব অসুবিধা হতো না। ইন্ডিয়া থেকে প্রায় রিলে রেস করে পৌঁছতে হয় সে দেশে। বেশ কয়েকটি লম্বা মধ্যবর্তী বিরতিসমৃদ্ধ হপ ওভার পেরিয়ে যখন ও দেশে পৌঁছনো, তখন নতুন দেশ চেনা-জানা অপেক্ষা ক্লান্তিতে বিছানাতে আত্মসমর্পণে বিশেষ আগ্রহ। শরীর-ব্যাটারী আর কতক্ষনই বা সমর্থন করতে পারে বলুন তো! পৌঁছেছি যখন, প্রায় সন্ধ্যা। তাই আশ-পাশ দেখার মতো পরিস্থিতি বা পরিবেশ কোনোটাই ছিল না। তাই ও দেশের মাটিতে পা রেখেও খুব বিশেষ জ্ঞান তখনও উপলব্ধ হলো না। পরদিন সকাল থেকে একটু একটু করে যা বুঝলাম তা কিছুটা এইরকম। মূলতঃ কৃষ্ণাঙ্গ মানুষেরই বাস এ দেশে। শ্বেতাঙ্গ কিছু মাইগ্রান্টও দেখা যায় বটে। বেশ কিছু ইন্ডিয়ান মুখও দেখা গেলো।

তা আর আশ্চর্য্যের কি? ইন্ডিয়ান সমগ্র পৃথিবীতে ছেয়ে গেছে। তবে লন্ডন-সানফ্রান্সিসকোতে তা আশা করা যায়। এ দেশে ঠিক আশা করিনি। যাই হোক দেশের ক্যাপিটালটি ভারতবর্ষের একটি গ্রামের ন্যায় দেখতে লাগে। উঁচু ঝাঁ চকচকে বিল্ডিং, ওভারব্রিজ ইত্যাদি সমস্ত এদেশে এখনো ঘাঁটি গাড়েনি। আশ-পাশ ঘুরে দেখার মতো পরিস্থিতির বেশ অভাব। মানে লোকাল ট্রান্সপোর্টেশন বিদেশীদের জন্য উপযুক্ত নয়। খুব অনিয়মিত, ফলত যখন তার দেখা পাওয়া যায় তা একেবারেই ঠাসা। তাই ক্যামেরা হাতে হেঁটেই এদিক ওদিক দেখার জন্য বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তা যথেষ্ট অপরিষ্কার। খানা-খন্দ বাঁচিয়ে একটি নদী দেখতে পাওয়া গেলো। তার মধ্যে এমন কিছু দেখলাম যা দেখে কিছু বিশেষ বলতে পারি। আবহাওয়াও বেশ গরমের দিকে। তাই একটু হেঁটেই ক্লান্তি লাগলো। রাস্তায় চলতে অন্য একটি অসুবিধাও হচ্ছিলো বটে। স্থানীয় লোকজন বিশেষত পুরুষদের দৃষ্টিতে একটু অস্বস্তি অনুভব করলাম। একজন তো মনে হলো রীতিমতো পিছু নিয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি হেঁটে দেখলাম একটা বিশাল বাগান, উহু ঠিক বাগান নয়, ক্ষেত বলা যায়। তাল গাছের ক্ষেত। তাতে ছোট বাচ্চারা সবাই খেলছে। কোনো পিকনিক হচ্ছে বলে মনে হলো। রান্না-বান্নার ব্যবস্থাও চলছে দেখা গেলো। ওতেই নিজেকে একটু নিরাপদ মনে হলো।

কয়েকঘন্টার অভিজ্ঞতাতেই ভিতরে ভিতরে অনুভব করলাম এই জায়গা সম্বন্ধে একটা তিক্ততার জন্ম নিয়েছে। এখুনি ফিরবো ঠিক করছি, অমনি পিছু নেওয়া লোকটি কোথা থেকে দুম করে উদয় হলো একেবারে মুখের সামনে। অবশ্যই আকস্মিক। মনে হলো কিছু একটা বলতে চাইছে। এগিয়ে আসছে। এদিকে আমার হার্টবিট বাড়ছে। ভারতবর্ষের মেয়েরা সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। আসে-পাশে কাউকেই চিনি না। কিভাবে এর মুখোমুখি হবো জানি না। চিৎকার করে উঠলাম, "হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট?" চিৎকারে লোকটা কিরকম পিছিয়ে গেলো। আর ওই পিকনিকের বেশ কিছু মহিলা-পুরুষ দৌড়ে চলে এল। তাতে ভরসা পেলাম কেন জানি না, কিন্তু পেলাম। ওরা নিজেদের মধ্যে কি সব বলাবলি করতে শুরু করলো, অবশ্যই স্থানীয় ভাষায়। গোলমাল হওয়ার আগেই আমি তাড়াতাড়ি বোঝালাম লোকটির পিছু নেওয়ার কথা। কিছু মানুষ ইংরিজি বোঝেন দেখলাম। তারা ব্যাপারটা বুঝে ওই লোকটির সাথে কিছু বলতেই, দেখি সবার মুখে প্রথমে কিরকম একটা অবাক ভাব, তারপর মুচকি হাসি। না চক্রান্তের প্রেম চোপড়া হা হা হাসি নয়, নির্মল এই-পথ-যদি-না-শেষ-হয় হাসি।

ব্যাপারটা বোঝাতে একজন আমাকে যা বললেন, তা কিছুটা এইরকম। সুরিনামে ২৭.৪ শতাংশ মানুষ ইন্দো-সুরিনামেস। অর্থাৎ এরা বহু জন্ম আগেই ভারতবর্ষ ছেড়ে কর্মসূত্রে এদেশে চলে এসেছিলেন এবং এরা এখন এখানকার স্থানীয়। এই লোকটিও এরকমই একজন, এনার বাবা ইন্দো-সুরিনামেস, মা ডাচ। এই লোকটি আমাকে দেখেই বুঝতে পেরেছিলো আমি সম্ভবত ইন্ডিয়ান এবং এখানে ঘুরতে এসেছি। ইনি নাকি আশা ভোঁসলের বড়ো ফ্যান। ইনি নিজেও গান করেন। এবিষয়েই কথা বলতে, ইন্ডিয়া সম্পর্কে আরও কিছু জানতেই তার আমার পিছু নেওয়া। হা ভগবান। ঠিক কতক্ষন জানিনা, তবে সম্বিৎ ফিরতে মিনিট পাঁচেক যে হা করে ছিলাম, সে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। যে সমস্ত উন্নত দেশে এধরণের পিছু নেওয়াটা অসভ্যতা, তারাও বোধকরি পিছু নেওয়ার আসল উদ্দেশ্য জানার পর আমার মতোই লজ্জ্বায় অবনমিত হবেন। একটা অস্বস্থিকর পরিস্থিতি। কিভাবে এরা আমার মনের কথা ঠিক বুঝে গেল! আমার সে অবস্থা কাটাতে, হৈ হৈ করে এরা আমাকে বসতে দিল। ইন্ডিয়ার নানা কথা জানতে চাইল। শেষ অব্দি লাঞ্চ না খাইয়ে যে ছাড়বে না, তাও নিশ্চিত করল। এর মধ্যে একজন বলল প্রচুর ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁ আছে এ দেশে। তার মধ্যের একটিতে রাতের ডিনারটা নাকি তারাই বন্দ্যোবস্ত করবে। বুঝুন কান্ড! সে তাদের কত প্রশ্ন, কত কথা। ইন্ডিয়ার মানুষ কেমন? আবহাওয়া? ভাষা? কালচার? ঘোরার জায়গা ইত্যাদি। তাদের অনেকের স্বপ্ন নিজেদের আসল শিকড়, ইন্ডিয়াতে ঘুরতে যাওয়ার।

সবে ভাবছি এখানকার ইন্ডিয়ানরা কেমন হবে? ভাবতে না ভাবতেই ওরা বলে ওঠে, কাছেই নাকি ইন্দো পাড়া আছে, আর ওমনি নিয়ে গেল সবাই মিলে আমাকে। কিভাবে আবার এরা আমার মনের কথা বুঝে গেল! চমক লাগলো! ছোট্ট দেশ, ছোট্ট শহর। তাই সবাই সবাইকে বেশ চেনে। তা সেই ইন্দো পাড়ায় পৌঁছে দেখি, আসে-পাশের সব হিন্দু বাড়ির সামনে ত্রিশূল লাগানো। অপূর্ব কারুকাজকরা হিন্দু মন্দিরের সামনের মাঠে একটা অনুষ্ঠানের বিজ্ঞপ্তি। শিবপূজার অনুষ্ঠান। অজান্তেই কখন চোখ থেকে জল বেরোচ্ছে বুঝতে পারিনি। ভাগ্গিস সন্ধ্যা হয়েছিল, তাই অন্ধকারে লুকিয়ে ফেলা গেলো চোখের জল। সেই ইন্দো পাড়ায় আড্ডা মেরে, ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁতে খেয়ে কিছুক্ষনের জন্য মনে হয়েছিল পুরোনো কলকাতার গলির নেশাতে আছি বুঝি। ডিনারটাইমে ওই পিছু নেওয়া লোকটি গিটার বাজিয়ে আদো আদো হিন্দিতে গাইলো, "আভি না যাও ছোর কর"। ফিরে এসে সারা রাত শুধু এই অভিজ্ঞতার সর চেখে গেলাম প্রাণ ভরে। কাক ভোরে আবিষ্কার করলাম, এরা ম্যাজিশিয়ান। এরা মনের খবর টের পেয়ে যায়। এরা নজরুলের "প্রাণ-খোলা হাসি উল্লাস"। এরা মুহূর্তেই তিক্ততাকে নস্টালজিয়া বানিয়ে দেয়। এরা কোনোদিন যে দেশ দেখেনি, সেই দেশের শিকড়ের খোঁজে এরা অধীর। এরা বলেছিলো, এরা মানে ইন্দো-সুরিনামেসরা নাকি হিন্দিভাষা বলতে পারে না। কিন্তু তাতে কি? আসলে ওদের ভাষার প্রয়োজনই নেই। হার্টবিটের সাথে কম্যুনিকেট করতে যারা জানে, তাদের কি আর মুখের ভাষার প্রয়োজন? আর "কি বলতে পারি তোমাকে? সুরে সুরে বাঁধা থাকবে তোমার নাম- সুরিনাম।"

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.