অরুনের নিয়মিত বাড়ি ফেরা অনেক সময়ই হয়ে ওঠে না।ওর ফিরতে মাঝেমাঝে রাত হয় অনেক,আই.টি সেক্টারের চাকরি তো।ঠিক সেইরকমই,অনেক সময় অফিসে বিশেষ কাজ না থাকলে বাড়িও চলে আসে।আজ অরুন অনেকদিন বাদে একটু ছুটি পেয়েছে তারাতারি।তাই মনের মধ্যে একটা খুশিখুশি ভাব।মেসে ফিরছে বাসে।ও কলকাতা তে একটা মেস ভাড়া করেই থাকে।বাড়ি মেদিনীপুর জেলায়।
রাস্তায় খুব ভিড়। এটা শুধু আজকের ব্যাপার নয়।গত দু-মাস ধরেই এমন চলছে।সামনে বিধানসভা ভোট,তাই সব রাজনৈতিক দলগুলোরই ধুম লেগেছে মানুষের মন জয় করার তাগিদে।মিছিল,মিটিং,প্ল্যাকার্ড, পতাকায় একটা অন্যরূপ নিয়েছে কলকাতা।এই যানজটে পরে মানুষের যে কি পরিমান নাজেহাল হতে হচ্ছে,তা বলে বোঝানো যাবে না।লাউডস্পিকারের শব্দে কানে তালা লাগার জোগাড়।রাস্তার উপর গাড়ি ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে আছে।প্রতিদিনের মতো আজও ওই পরিস্থিতিতে পরেছে অরুন।যে রাস্তা ৪৫ মিনিটে পৌঁছানো যায়,সেটাই লেগে গেল দেড়ঘন্টার ওপর।
যাইহোক,অনেকক্ষন পরে,বাসে করে এসে নামল চৌ-রাস্তার মোড়ে।ওইখান থেকেও প্রায় আটমিনিট মতো হেটে যেতে হয় মেসে পৌঁছতে গেলে।অনেকটা খুশি,আর খানিকটা যানজটের তিক্ততা নিয়ে সে হেটে চলেছে মেসের দিকে।পথের দুধারে এত দলীয় পতাকা লাগানো হয়েছে যে,একটা রঙচঙে ঝলমলে ব্যাপার চোখের সামনে উপস্থিত হয়েছে।পতাকা লাগানোর ব্যাপারেও একটা প্রতিযোগিতা আছে-কে বেশী লাগাতে পারবে,কার পতাকাটা বেশী বৃহত্।যেন মনে হয়,মানুষ ভোট দেওয়ার আগে রাস্তায় বেড়িয়ে একবার গুনে নেবে কে বাশী পতাকা লাগিয়েছে,এবং সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নেবেন-"চলো ভাই,ওকেই ভোটটা দেওয়া যাক,যতই হোক দুটো হলেও তো পতাকা বেশী লাগিয়েছে"।অরুন চিরকালই এই দলীয় ভাঁড়ামো গুলো একেবারেই দেখতে পারে না।তাই রাস্তায় এইসব দেখছে,আর মনের মধ্যে রাগের পাহার জমে উঠছে ওর।বাড়ির অনেকটা কাছেই চলে এসেছে অরুন।
বাড়িতে ঢুকতে যাবে,এমন সময় অরুন দেখছে-ওর মেসবাড়ির ঠিক সামনে একটা পাথরের স্ল্যাবের উপর ছায়াময় যায়গায় একজন মেয়ে,মনে হচ্ছে ভিখিরি, শুয়ে আছে পাশে একটা ঝোলা রেখে।তখন দুপুর তিনটে,রাস্তায় চনচনে রোদ।তাই পাড়া শুনশান।হয়ত মেয়েটি একটু ছায়া পেয়েছে বলে এখানে এসে শুয়ে পরেছে।অরুন ওর পাশ কাটিয়ে মেসের দরজা দিয়ে ঢুকতে যাচ্ছিল,ঠিক এমন সময়ে মেয়েটার ঘুম ভেঙে যায়।সে উঠে বসে বলল- "বাবু,একটু কিছু দেবেন?আজ কিছু খাইনি।"অরুন একটু ভেবে বলল-"আমি ঘর থেকে কিছু এনে দেব,না টাকা দেব খেয়ে নেবেন?"।তখনও উত্তর দেইনি মেয়েটা,অরুনের হঠাত্ই মনে পরল- মেসে তেমন কোনো খাবারই আনা হয়নি,তাই সে পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট বের করে মেয়েটাকে দিল।তারপর মেয়েটি আস্তেআস্তে ওইখান থেকে উঠে দাঁড়াল।অরুন খুবই কষ্ট পেল ওর পরনের কাপড়টা দেখে।এতক্ষণ অরুন ওতটা খেয়াল করেনি,এখন উঠে দাঁড়ানোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।কাপড়টা ছিঁড়ে এমন একটা অবস্থা নিয়েছে,যে নিজের লাজ রক্ষে করাও যায়না ওটা দিয়ে।মেয়েটি হাটা শুরু করেছে।অরুনের ওয়ালেটে তখন মাত্র একশোটা টাকা পরে আছে।কিছুদিন ধরে এ.টি.এম-এ যাওয়া হয়নি ওর।মেয়েটির হাতে যে কিছু টাকা দিয়ে বলবে একটা কাপড় কিনে নিতে,সেটাও পারছে না বলে অরুনের খুবই আফসোস হচ্ছে।
অরুন থাকে ওই বাড়ির একদম নিচের তলায়।তাই ওর ঘরের জানালাটা রাস্তার দিকে মুখ করে।অরুন খুব মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে ঘরে ঢুকে দেখছে,ওর জানলার উপরের স্ল্যাবেই আজই কেউ,একটা বড়ো পতাকা গেঁথে দিয়ে চলে গেছে।পতাকাটা কিছু না হলেও পাঁচফুট লম্বা আর তিনফুট চওরা হবে।এর কারনে একটা ঘন ছায়া পরেছে ঘরের ভিতরে।অরুনের এইটা দেখে,মাথার মধ্যে আচমকা একটা বুদ্ধি খেলে গেল।তারাতারি ও বাইরে বেরিয়ে জানলার উপর থেকে ওই পতাকাটাকে নিচে নামিয়ে, ওটাকে বাতা থেকে খুলে বের করল।অরুন হাত দিয়ে দেখল,বেশ ভালো শুতির কাপড় দিয়ে বানানো ওটা।সোজা রাস্তার পিছন দিকে তাকিয়ে দেখল,মেয়েটা এখনও বেশী দুর যাইনি।অরুন পতাকাটা নিয়ে দৌড়ে গিয়ে দাঁড়াল মেয়েটার সামনে।মেয়েটা খুব আশ্চর্য হয়ে দেখছে ওকে।অরুন একটাও কথা না বলে ওই পতাকাটা ওর গায়ে জড়িয়ে দিল ভালো করে।পতাকাটা এতটাই বড়ো,যে বেশ ভালো ভাবেই ঢেকে গেছে ওর সারা গাটা।অরুন বলল- "আমি আসি।এটাকে খারাপ ভাবে নিও না।"এই বলে অরুন চলে আসছিল খুব দ্রুতপদে।পিছন থেকে মেয়েটি ডেকে বলল- "বাবু!!"।অরুন দাঁড়ালে, মেয়েটি পায়ে হাতদিয়ে একটা প্রনাম করে চলে যায়।অরুনের ভিতরে সেইদিন একটা চরম তৃপ্তি কাজ করেছে।

(২)
ঘটনাটা বেশ কিছুদিন হয়ে গেল,ওর মাথা থেকে বেরিয়েও গেছিল অনেকটা।
সেদিন রবিবার।ছুটির দিন।সকালে একটু দেরি করে ওঠে অরুন।তখন ন'টা হবে,বিছানা থেকে উঠে সবেমাত্র কফিতে দুবার চুমুক দিয়েছে,এমন সময় দরজায় কেউ একজন ঠকঠক করল।ও গিয়ে খুলতেই দেখল,ছয়জন প্রৌঢ় লোক এসেছে।অরুন সুপ্রভাত জানাতেই,ওদের মধ্যে একজন খুব অসভ্যভাবে গলা ঝাঁজিয়ে বলল-"আপনি নাকি আমাদের লাগানো পতাকাটা খুলে ফেলেছেন।পল্লবদা দেখেছে বলে,নাহলে তো জানতেই পারতাম না।এত সাহস দেয় কে আপনাকে?"
অরুন যতই বোঝাবার চেষ্টা করে,ওরা কিছুতেই গায়ে লাগায় না ব্যাপারটা।ওদের মধ্যে একজন বলল-"বিপক্ষ দলের মদতপুষ্ট না আপনি?কত টাকা পান?"
এরই মধ্যে অন্যজন পিছন থেকে সামনে এসে বলল-"এই পাড়া চিরকাল আমাদের দখলে ছিল,এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।তাই ফের যদি এইসব দেখি,পুরো এই পাড়া থেকে বের করে দেব।দেখব,আপনার দল কি করে আপনাকে বাঁচায়।তাই বলছি-সাবধান।"
কিছুক্ষন আরও শাসিয়ে ও হুমকি দিয়ে চলে গেল ওরা।ও ভেতর থেকে পুরো ভেঙে পরেছিল সেইদিন।হিত্ করতে বিপরীত হয়ে গেল পুরো।
সন্ধে বেলায় বাড়ির মালিক এসে বলল-" পাড়ায় টিকতে দেবেন না দেখছি।আমাদের আজ সকাল থেকে কত কথা শুনতে হচ্ছে জানেন। বাইরে বেরোবার জো নেই পর‍্যন্ত।কিছু মনে করবেন না,আমাদের তো এখানে বাড়ি,তাই এদের সাথে মিলেমিশেই থাকতে হবে।আপনাকে যতক্ষণ ঘরছাড়া না করছি,ওদের শান্তি নেই।আপনি বরঞ্চ একটা ঘর দেখে নিন অন্য পাড়ায়।দুদিন সময় দিচ্ছি।"
এই বলে চলে যায় বাড়ির মালিক।এরপর দুদিনও লাগেনি।ভিতরে পরিস্থিতির উপর তিক্ততা এতটাই জমে উঠেছিল যে,অরুন সেই সন্ধেতেই পাশের পাড়ায় একটা বাড়ি খুঁজে নিয়ে,তার ঠিক পরের দিনই স্থান পরিবর্তন হয়ে যায়।
আরুন সেদিন বুঝেছিল,সমাজে ভালো লোকের সংখ্যা কেন এত নিম্নগামী। উপকারী লোকের যে অভাব তা হয়ত নয়,কিন্তু তার প্রভাবে একজন মানুষকে যে উপদ্রব সহ্য করতে হয়,সেই ভয়েই অনেকে গুটিয়ে যান।ফলত,আমরা সততা বিসর্জন দি বলীষ্ঠের কাছে।

~সমাপ্ত~

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.