আমার শখের জগৎ


শখ ছাড়া হয়তো আমরা মানুষ নই, অভ্যাসের দাস, যন্ত্রমানব। বাস্তবের রুক্ষ মাটিতে যতবার আছাড় খাই, ছুটে চলে যাই ওই শখ দিয়ে গড়ে তোলা কল্পনার খেলাঘরে। যেখানে রাজাও আমি, রানীও আমি। শখ পূরণের মধ্য দিয়ে হারিয়ে যাই দিকশূন্যপুরে। রামধনুর সাত রং দিয়ে সাজানো আমার শখের জগৎ। ছোটবেলায় এক পিসি আমার হাতে তুলে দিয়েছিল রূপকথার জগৎ। সেই থেকে শুরু আমার শখের জয়যাত্রা। হ্যাঁ, আমার প্রথম শখ ছিল গল্পের বই পড়া। মন খারাপের মাঝে, পড়ার বইয়ের সাথে, একলা মনে, কাঁদতে কাঁদতে সবসময় আঁকড়ে ধরেছি সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু বইকে। আজ আর তা শুধু শখ নয়, নেশায় পরিণত হয়েছে। ক্লাস সেভেনে শেষ করেছি শরৎচন্দ্র সমগ্র আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'শেষের কবিতা', 'চোখের বালি'। কিছুই বুঝিনি সেই বয়সে তবু পড়ে গিয়েছি গোগ্রাসে। এছাড়া কাকাবাবু, অর্জুন, ফেলুদা, কিরীটি রায়, ব্যোমকেশ, টেনিদা, ঘনাদা, মিতিনমাসী কাকে ছেড়ে কার কথা বলি! সবাই যে কখনও না কখনও এই একলা আমি কে সঙ্গ দিয়ে গিয়েছে নিঃস্বার্থভাবে। একলা দুপুর হোক বা নিস্তব্ধ রাত, ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুবিন্দুগুলো মাধ্যাকর্ষনের টানে নেমে আসার আগেই যে শীতল স্পর্শ মনের ক্ষত ঢেকে বারবার এক অন্য পৃথিবীতে নিয়ে গিয়েছে সেই শীতল স্পর্শ আর কারোর নয়, আমার সবথেকে প্রিয় বন্ধু এই গল্পের বইগুলোর। কত ঝগড়া, অশান্তি হয়েছে এই বই কেনা নিয়ে। শখের খাতিরে ধার করেও বই কিনে নিয়ে এসেছি। আর ধার করে বই পড়া তো ছিলই। বাবা সবসময় বলে " আমি না থাকলে ধার করে হয়তো খেতে পারবিনা কিন্তু বইয়ের অভাব হবেনা তোর"। কথাটা যদিও খুব একটা মিথ্যে নয়। বাড়িতে কয়েকটা ছেলে-মেয়েকে পড়িয়ে যা টাকা পেতাম বেশিরভাগটাই চলে যেত বই কিনতে। শেষে কলেজের ফর্ম ফিল্-আপের টাকাতেও হাত পড়েছে এই বই কিনতে আর বাবার কাছে মার খেতে খেতেও বেঁচে গিয়েছিলাম। বিশেষত পুজোর সময় আনন্দমেলা, কিশোর ভারতী, শুকতারা, সন্দেশ, চির সবুজ লেখা, দেশ একসাথে কিনে কর্পদশূন্য অবস্থায় বাড়ি ফেরার পর ঠিক হয় এবার থেকে আমার যাবতীয় টাকা মাতারানীর দায়িত্বে থাকবে এবং প্রয়োজন পড়লে উপযুক্ত কারণ প্রদর্শন করতে পারলে হয়তো কিঞ্চিৎ কিছু তিনি দয়া-দাক্ষিণ্যে দিলে দেবেন। ঠিক এই কারণেই এতদিন আমার কলকাতা কেন, কোনো বইমেলাতেই যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। কেন জানিনা বাবার বদ্ধমূল ধারণা যে আমি চাইলে বাবাকেও বিক্রি করে বই কিনতে পারি। হয়তো বাবাকে ভিখিরি বানিয়ে মনের সুখে বই কিনে তারপর সেই বইয়ের বিপুল বোঝা বাবার কাঁধে চাপিয়েই অম্লানবদনে হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরব। তাই মনেহয় বাবা এই ঝুঁকিটা নেওয়ার সাহস পায়নি। আচ্ছা, আপনারাই বলুন তো মানুষ শখের জন্যে কী না করে আর আমি তো সামান্য.............................. সে যাই হোক, এতক্ষণ আপনাদের প্রথম শখের গল্প শোনালাম। এবার দ্বিতীয় শখের কথায় বলি। এটি আর কিছু নয়, মুঠোফোন। হ্যাঁ, খুব শখ ছিল একটা ভালো ফোন কেনার। তা অনেক কষ্টে পূরণ হয়েছে। তবে এই মুঠোফোনের দৌলতে আমার গল্পের বইগুলো আজকাল একলা হয়ে পড়ে। তবুও ওদের অভিমান হয়না। ডাকলেই সব ভুলে আবার হাতটা ধরে। আর একটিও শখ আছে আমার। নিঝুম অন্ধকারে বসে চুপচাপ একটার পর একটা গান শুনে যাওয়া আর ভাবনার জগতে হারিয়ে যাওয়া। বড় ভাল লাগে। এইভাবেই সাজানো আমার শখ দিয়ে তৈরি কল্পনার খেলাঘর। যেখানে কখনও আকাশের মুখ ভার হয়না। কখনও কখনও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামলেও বৃষ্টি শেষে রামধনুর ছটায় রঙিন হয়ে ওঠে আমার জগৎ। আমার শখের জগৎ!

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.