এক রকমের গল্প

গল্প ১

চায়ের জলটা চাপিয়ে আড় চোখে সুমনা তাকাল মালতির দিকে।দ্রুত হাতে বাসন মাজছে।ঘষনির ঘষঘষ শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে দুলছে ওর সস্তার চকচকে ঝুমকো।বেশ তাড়া আছে সেটা বোঝা যাচ্ছে।এটা জুনের প্রথম সপ্তাহ। বৃষ্টির জন্য শহরজুড়ে হা হুতাশ।কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ছাড়া মালতির মধ্যে আর কোনো ক্লান্তির লক্ষণ চোখে পড়ল না ওর।তবে কি শুধু শুধুই ডুব দিল তিনদিন! -"এখন শরীর কেমন মালতি?" -হুঁ? মালতির অন্যমনস্কতায় বিরক্ত হল সুমনা।কোনোরকমে কাজ সারছে আজ।মন নেই। -" বলছি তোর বর যে সেদিন ফোন করে বলল, তোর নাকি সাংঘাতিক জ্বর,তা এখন কেমন শরীর?" -"ভালো" দায়সারা জবাবে পাশ কাটালো মালতি।বুকের ভেতর একটা জ্বালা অনুভব করল সুমনা।মাসের শেষে গুনে গুনে হাজার টাকা দিতে হয়। কাজ বলতে তো ঘর মোছা বাসন মাজা।কাচাকুচি তো সুমনাই সেরে নেয় ওয়াশিং মেশিনে।বাসি কাপড় থাকলে সেটা কাচে মালতি।তা তাই বা আর কটা হয়।নাহ কাচাটা বাড়াতে হবে।সেদিন রুমিও তাই বলছিল। -"কাজ অনুযায়ী বড্ড বেশি নিচ্ছে মা।তুমি কাজ বাড়াও।"টোস্টার থেকে পাঁউরুটি বার করে আবার গলা চড়াল সে। -" তোর বর তো জলপাইগুড়ি তে ড্রাইভারের কাজ করে,তা অসুস্থ বউ কে ফেলে চলে গেল!" -"না গো মাইমা।বাবুরা সব বাইরে গিয়েচে।বিদ্যাশ। তাই অর এখন ছুটি।" কথাগুলোর আড়ালে লুকোনো অহংকার টা সুমনার কান এড়াল না। দুয়ে দুয়ে চার। এই কথা! সত্যি বলার মুরোদ নেই এদিকে বরের সাথে আশনাই করার জন্য ঝুড়িঝুড়ি মিথ্যে। ঠিকই বলেছে রুমি কাজের লোক বেশি পুরোনো হলেই মাথায় চড়ে বসে।আফটার অল লোয়ার ক্লাস,শুধু টাকা ছাড়া আর কিছু বোঝে না।অতএব তক্কে তক্কে থাকো নতুন লোক পেলেই একে ছাঁটাই।মাসের মধ্যে চারদিন কামাই তো বাঁধা। রুমিকেই দায়িত্ব দিয়েছে সুমনা, একটা ভালো দেখে লোক খুঁজে দেওয়ার জন্য।রুমি ঠিকও করে ফেলেছে প্রায় একজন কে।কম বয়সি মেয়ে নতুন কাজ খুঁজছে।টাকাটা ও কম। কিভাবে মালতি কে বলবে এই নিয়ে দোলাচলে ছিল সুমনা।এখন সুযোগ সামনে।গত তিনদিন ধরে সংসারের ঊনকোটি সমস্ত কাজ একা হাতে সামলাতে হয়েছে।এতদিন পরে মেয়ে জামাই কে খেতে বলেছেন বলে একটু বড় আয়োজন ই করেছিলেন।ছেলেটা তো বাইরেই খায়, তাই নিজে হাতে আগাগোড়া সব রাঁধবেন এই ছিল প্ল্যান।মালতি বলেও রেখেছিলেন, বাঁটাবাঁটি, কাটাকুটি টুকু হাতে হাতে করে দিতে, তা দেবীর দেখাই মিলল না তো সাহায্য! চাবুকের মতো টানটান কালো শরীর টা ঘর মুছছে এখন। চলনে বেশ তাড়াহুড়ো। আর কোনো কাজ নিয়েছে কিনা কে জানে। টাকার লোভে কাজের পর কাজ নেবে তারপর শুরু ফাঁকিবাজি। -" তা আজও তো না এলেই পারতি,বর সেবা করছে, সোজা কথা?" মালতি মুখ ফেরাল, ঠোটের কোণের সলজ্জ হাসি। বুকের দহনটা বেড়ে চলেছে সুমনার। " খুব তাড়া দেখছি আজ। নতুন কাজ নিয়েছিস নাকি?" - " না মাইমা, একজাগা যাব। কাজ আচে" -"বরের সাথে নাকি?" সুমনার উত্তাপ টুকু টের পেয়ে চুপ করে গেল মালতি। আর সহ্য হলনা সুমনার। দপদপিয়ে উঠে গেলেন ঘরে। আজ তিন তারিখ। দুটো পাঁচশ টাকার নোট টেবিলে রেখে সশব্দে চাপা দিলেন।"কাল থেকে আর আসার দরকার নেই।এতই যখন অসুস্থ বিশ্রাম নাও গে।অসুবিধে তো নেই বর আছে, যত্ন আত্তি করবে।আমি তার বউ কে খাটিয়ে মারি কেন।"

বিস্মিত দৃষ্টি ছাপিয়ে নোনতা জলধারা নামল মালতির গাল বেয়ে।গাল থেকে গলা,গলা থেকে বুক। বুকের মধ্যে ভিজতে লাগল দুটো কাগজ। রিয়ার স্টল, ম্যাটিনি শো।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.