হারায়ে খুঁজি



প্রায় আধঘন্টার উপর ‘রঙ্গন’ আর্ট গ্যালারীর সামনে তীর্থের কাকের মত দাঁড়িয়ে আছে শুভ্র।পরনের টি-শার্টটা ঘামে ভিজে জবজবে।একমেবাদ্বিতীয়ম রুমালটা আর ছুঁয়ে দেখার যুগ্যি নেই।অথচ প্রিয়া এখনও বেপাত্তা।
কবজি উলটে ঘড়িটা একবার দেখে নিলো শুভ্র।তিনটে বাজতে দুই।এবার আস্তে আস্তে গরম হচ্ছে মাথাটা।আজ নির্ঘাৎ দুঃখ আছে প্রিয়ার কপালে।কাঁটায় কাঁটায় দুপুর দুটোয় এই আর্ট গ্যালারীর সামনে দেখা করার কথা ছিল শুভ্র আর প্রিয়ার।তাছাড়া,আজকের দেখা করাটা যে কতটা গুরুত্বপূর্ন,সেটাও তো পইপই করে প্রিয়াকে বলে দিয়েছিল শুভ্র।এমনিতে লেটলতিফ প্রিয়ার সঙ্গে দেখা করতে আসার সময় হাতে কিছুটা বেশী সময় নিয়েই আসে শুভ্র।কিন্তু তাই বলে এতটা দেরী?ওর কি কোনওদিনও দায়িত্ববোধ তৈরী হবেনা?
“অ্যাই,চশমার ফাঁক দিয়ে কাকে দেখছো?আমি তো পেছনে…”
আচমকা ডাকে অন্যমনষ্কতা ভেঙ্গে ফিরে তাকালো শুভ্র।হলুদ ফুলস্লীভ চুড়িদারে অনবদ্য লাগছে প্রিয়াকে।নাকের উপর ফোঁটা ফোঁটা ঘাম যেন আলগা লাবন্যে যোগ করেছে অন্য মাত্রা ।কিন্তু মুগ্ধ হতে গিয়েও হতে পারলো না শুভ্র।বরং কন্ঠস্বরে কিছুটা রাগ-রাগ ভাব ফুটিয়ে বলে উঠলো,“সামনে পেছনে কোনওদিকেই দেখছি না।দেখছি শুধু আমার ঘড়ির দিকে।সে এগিয়ে চলেছে,আর আমি ঠায় দাঁড়িয়ে…”
“স্যরি!”,মূহুর্তে কাঁচুমাচু মুখে অজুহাত তৈরী প্রিয়ার,“এত জ্যাম…মাছি গলার জায়গা নেই।মানুষ গলবে কি!রাগ কোরোনা প্লীজ!চলো,ওই চায়ের দোকানটায় বসি…”
অন্য সময় হলে,প্রিয়ার অনুনয়বাক্যে গলে জল হয়ে যেত শুভ্র।কিন্তু এখন মনের অবস্থা অনুকূল নয়।তাই কঠিন গলায় বললো,“আমার কথাগুলো চায়ের ভাঁড়ে প্রজাপতি বিস্কুট ডোবাতে ডোবাতে বলা যাবে না।একটু নিরিবিলি জায়গা দরকার।চলো,সামনের রেস্টুরেন্টটায় গিয়ে বসবো…”
“ওঃ-,তা আগে বললেই পারতে যে তোমার কথাগুলো ফিসফ্রাইয়ে কামড় দিয়ে বলার মত…!”
স্বভাবসিদ্ধ রসিকতা করতে করতে শুভ্রর পশ্চাদধাবন করল প্রিয়া।
ছোট্ট একতলা রেস্টুরেন্ট।তারই কোনের দুটো চেয়ার দখল করে,দুটো কফি আর একটা চিকেন কাটলেটের অর্ডার দিয়ে মনে মনে নিজের বক্তব্য গোছাতে লাগলো শুভ্র।মিনিট পাঁচেকের মধ্যে কাটলেট আর ক্যাপুচিনো হাজির টেবিলে।ছোট্ট একটা চুমুক দিয়ে শুভ্র বক্তব্য পেশের ভঙ্গীতে বলে উঠলো,“বাবা আমার বিয়ের জন্য মেয়ে দেখছে।”
“অ্যাঁ!”,কাঁটায় গাঁথা কাটলেটের টুকরোটা মুখে পুরতে গিয়েও থেমে গেল প্রিয়া,“তাহলে আমার কী হবে?”
“সেই জন্যেই তো তোমায় ডেকেছি,”,উত্তেজনায় প্রিয়ার হাতদুটো চেপে ধরলো শুভ্র,“আজই তোমাকে বাবার কাছে নিয়ে যাব।”
“কিন্তু তোমার বাবার যদি আমাকে পছন্দ না হয়?”
“অসম্ভব!”,প্রিয়ার আশংকা ফুৎকারে উড়িয়ে দিল শুভ্র,“তোমাকে অপছন্দ হতেই পারেনা।”
“অদ্ভুত যুক্তি তো!তুমি আমার প্রেমে পড়েছ,তোমার বাবা তো নয়!কাজেই তোমার আমাকে বিশ্বসুন্দরী মনে হলেও,তোমার বাবা তার একমাত্র ছেলের জন্য আমার চেয়ে বেটার অপশান খুঁজতেই পারেন…”
“ইউ আর নট মাই অপশান,প্রিয়া!”,প্রায় কাঁদো কাঁদো শোনালো শুভ্রর গলা,“ইউ আর মাই নেসেসিটি।”
“কিন্তু আমার ব্যাকগ্রাউন্ড?”,ঈষৎ দৃঢ় শোনালো প্রিয়ার কন্ঠস্বর,“আমি কিন্তু সত্যি গোপন করে কোনও সম্পর্ক শুরু করতে পারব না।”
এই প্রসঙ্গটাতেই কিছুটা মিইয়ে গেল শুভ্র।তার বাবা সাঙ্ঘাতিক গোঁড়া।মা বেঁচে থাকতে তবু একটা পৃষ্ঠবল ছিল।কিন্তু বাবাকে একলা বোঝানো…?
মনে মনে খানিক দমে গেলেও অবদমনটা মুখে প্রকাশ পেতে দিল না শুভ্র।আত্মবিশ্বাসী সুরে বলে উঠলো,“আগে তো চল।তারপর যা হবে,দেখা যাবে।খারাপটাই বা ধরে নিচ্ছ কেন?”
“দাঁড়াও আগে খাওয়াটা শেষ করি।গড নোজ,আবার কবে তোমার পকেট কাটতে পারব…”
তারিয়ে তারিয়ে কাটলেট খেতে খেতে শুভ্রর মুখেও জোর করে এক টুকরো গুঁজে দিল প্রিয়া।তারপর কফি শেষ করে,বিল মিটিয়ে উঠে পড়ল দুজনে।
এবার গন্তব্য,শুভ্রর বাড়ী।

“একে তো ঠিক চিনলাম না…”
গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন রজত,
প্রিয়ারা এখন বসে আছে শুভ্রদের সতেরোশো স্কোয়্যার ফিটের ফ্ল্যাটের পেল্লায় ড্রয়িংরুমের নরম সোফায়,শুভ্রর বাবা রজত মজুমদারের মুখোমুখি।ফ্ল্যাটের প্রতিটি খুঁটিনাটি সাজানোয় রুচিশীলতার ছাপ স্পষ্ট।
“বাবা,ও প্রিয়া।আমার বান্ধবী।”
আমতা আমতা করে বলে উঠলো শুভ্র,
“কই,আগে তো দেখিনি?”
“আগে আনা হয়নি…”
“হুম।তা শুধুই বন্ধু,নাকি…?”
“হ্যাঁ,মানে,”,ঢোক গিললো শুভ্র,“উই লাভ ইচ আদার।”
নিস্তব্ধ ঘর।কয়েক মূহুর্ত পর নীরবতা ভাঙলেন রজত,“কোথায় থাকো তুমি?বাড়ীতে কে কে আছেন?”
জবাবটা শুভ্রই দিতে যাচ্ছিল,তাকে চোখের ইশারায় থামিয়ে প্রিয়া বলে উঠলো,“আমার বাবা,মা নেই।থাকলেও আমি তাদের দেখিনি।”
“মানে?”
“মানে,আমি অনাথ।অনাথ আশ্রমের ফাদারই আমার বাবা।এখন যদিও একটা লেডিস হষ্টেলে থাকি।”
ঘরে পিন পড়ার মত নিস্তব্ধতা।শুভ্র রগ টিপে বসে আছে।অসম্ভব রাগ হচ্ছে প্রিয়ার উপর।পরিস্থিতিটাকে এই ভাবে হাতের বাইরে পাঠিয়ে দিল মেয়েটা?
“দেখ প্রিয়া,”,প্রায় মিনিট তিনেক পর নীরবতা ভাঙলেন রজত,“আমার একমাত্র ছেলের সাথে যদি একজন অনাথিনীর বিয়ে দিতে না চাই,তাহলে সেটা কি আমার খুব বড় অপরাধ হবে?”
“হয়ত না,”,একটুও না ভেবে জবাব দিল প্রিয়া,“তবে আমার অনাথ হওয়ার জন্য যেহেতু আমি দায়ী নই,তাই সেই দায়টা সম্পূর্ণ আমার উপর চাপানোটা বোধহয় উচিত হবে না।”
শুভ্র স্তম্ভিত।এ কোন প্রিয়াকে দেখছে সে?
“যদি বলি,এ বিয়েতে আমার মত নেই,কী করবে তোমরা?”
এবার ছেলেকে প্রশ্ন করলেন রজত,
“তোমার অমতে আমরা কিছুই করতে চাইনা বাবা।কিন্তু তুমিও নিশ্চই আমার পছন্দটা বিবেচনা করে দেখবে।সম্পূর্ণ অযৌক্তিক একটা কারনে…”
হাত তুলে ছেলেকে মাঝপথে থামিয়ে দিলেন রজত।তারপর জিজ্ঞাসা করলেন,“তুমি কী কর প্রিয়া?মানে কাজ টাজ…”
“একটা স্কুলে পড়াই।মাস তিনেক হল জয়েন করেছি।”
“বেশ।আমার একটা শর্ত আছে।প্রিয়াকে একটা কাজ করতে হবে।যদি সাক্সেসফুল হয়,আমি এই বিয়েটা নিয়ে ভেবে দেখতে পারি।”
“কী শর্ত?”
“এক মিনিট,”,পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে,দ্রুত হাতে টেপাটেপি করে,সেটা প্রিয়ার দিকে এগিয়ে দিলেন রজত,“এ কে,আন্দাজ করতে পারো?”
মোবাইলের স্ক্রীনে একটা সদ্যোজাত শিশুর ছবি।কয়েক মূহুর্ত সেদিকে চেয়ে থেকে ঘাড় নাড়লো প্রিয়া,চেনে না।
“এটা আমার মেয়ের ছবি।”,গলা ভারী হয়ে এসেছে রজতের,“জন্মের তিন দিনের মাথায় নার্সিংহোমে আগুন লাগে।শুভ্রর মাকে বাঁচাতে গিয়ে বাচ্চাটাকে বের করে আনা যায়নি।পরে জানতে পারি,অনেক সদ্যোজাতর মধ্যে আমার মেয়েটাও…”,মুখ ঘুরিয়ে অশ্রু সংবরন করে ফের বলতে থাকলেন রজত,“কিন্তু সে কথা আমার আজও বিশ্বাস হয়না।তার মৃতদেহও আমি দেখিনি।অনেক খুঁজেও কোনও সন্ধান না পাওয়া যাওয়ায় ডাক্তার ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে দেয়।এর প্রায় বছর ছয়েক পরে শুভ্রর জন্ম।”
ঘরের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে।শুভ্র জানে,রজত তার এই মেয়ের ব্যপারে খুবই স্পর্শকাতর।তাই সাহস করে জিজ্ঞাসাও করতে পারছেনা যে প্রিয়াকে এসব কথা বলার মানে কি-
“আমার মেয়েকে তোমায় খুঁজে বের করতে হবে…”,স্বয়ংসৃষ্ট নিস্তব্ধতা স্বয়ংই ভাঙ্গলেন রজত,“অন্তত তার মৃত্যুর বিশ্বাসযোগ্য প্রমান আমায় এনে দাও।এটাই আমার শর্ত।”
আপাদমস্তক কেঁপে উঠলো শুভ্র।এ তো এক রকম ঘুরিয়ে বাতিল করা!এর চেয়ে তো সরাসরি না করে দেওয়া বেশী সম্মানের ছিল!বাবা চাইছেটা কী?
“বল,পারবে?”
দৃঢ়তা ফিরে এসেছে রজতের কন্ঠস্বরে,
“পারবো।”
ফের শুভ্রর অবাক হওয়ার পালা।প্রিয়া কি পাগল হয়ে গেছে?
“বেশ।এই ছবির একটা কপি আর যাবতীয় ডকুমেন্টের জেরক্স আমি পাঠিয়ে দেব।অল দ্য বেষ্ট…”
সোফা ছেড়ে উঠে পড়লেন রজত।প্রিয়ার ভ্রুতে খাঁজ।এ কোন নতুন রহস্যের মুখোমুখী হতে চলেছে সে?

“ধরো…”
প্রিয়ার গায়ের উপর একটা এনভেলপ ছুড়ে দিল শুভ্র,
খাম খুলতেই একেএকে বেরিয়ে এল এক কপি ছবি,বার্থ আর ডেথ সার্টিফিকেট,হাসপাতালের ঠিকানা ইত্যাদি।এলোমেলো ভাবে কাগজগুলো উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল প্রিয়া।
“বাবাকে যে আলটপকা কথা দিয়ে দিলে,এবার খড়ের গাদায় সুঁচটা খুঁজবে কীভাবে?”
বেশ বিরক্তি ভরেই প্রশ্নটা করল শুভ্র,
“আগে সঞ্জয়দার বাড়ী যাব,”,কাগজে চোখ বুলাতে বুলাতেই জবাব দিল প্রিয়া,“এ কাজে এগোতে গেলে তার সাহার্য্য প্রয়োজন।”
“তাহলে আজই চল।কাল থেকে তো আমার অফিস।তাছাড়া,আজ রবিবার।সঞ্জয়দাও হয়ত বাড়ী থাকবে…”
“চল।”
ব্যাগে কাগজপত্রগুলো ঢুকিয়ে,বেরিয়ে পড়ল প্রিয়া।
সঞ্জয় সেন কলকাতা পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্তা।কাজের সূত্রে তাকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হলেও,এবার প্রায় মাস ছয়েকের উপর কলকাতায় রয়েছেন।আশ্রমের ফাদারের সঙ্গে পূর্বপরিচয়ের সূত্রে তার সাথে প্রিয়ার আলাপ।আর এখন তো শুভ্রর সাথেও দারুন ভাব হয়ে গিয়েছে।পুলিশের বড়কর্তা বললেই যে রাসভারী চেহারা মনে আসে,সঞ্জয় তার সম্পূর্ণ বিপরীত।দিব্যি হাসিখুশী দিল্-খোলা মানুষ।শুভ্র,প্রিয়ার প্রেমপর্ব তার অজানা নয় এবং তাতে যথেষ্ট ইন্ধনও রয়েছে তার।
সঞ্জয়ের স্ত্রী পরমা মারা গেছেন বছর তিনেক আগে,ওদের একমাত্র মেয়ে তিতিরকে জন্ম দিতে গিয়ে।সঞ্জয় আর বিয়ে করেননি।তিতিরকে মানুষের মত মানুষ করাই এখন তার অন্যতম ধ্যান-জ্ঞান।কাজ,মেয়ে আর গুটিকতক বন্ধু-বান্ধব নিয়েই দিব্যি মেতে আছেন।
যেকোন সমস্যায় পড়লেই সঞ্জয়দার শরনাপন্ন হয় শুভ্র আর প্রিয়া।সঞ্জয়ও তুখর উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে চটজলদি সব সমাধান বাতলান।তাই এহেন পরিস্থিতিতেও ত্রাহি মধুসূদন বলে সঞ্জয়ের ড্রয়িংরুমে গিয়ে হানা দিল যুগলে।
“এ তো খুব গোলমেলে কেস রে,”
কাগজপত্রগুলো ওল্টাতে ওল্টাতে বলে উঠলেন সঞ্জয়।ইতিমধ্যে প্রিয়ার থেকে ঘটনার ধারাবিবরনী শোনা হয়ে গেছে তার।
“তাই তো তোমার কাছে এলাম।কিছু একটা তোমায় করতেই হবে সঞ্জয়দা!প্রিয়া তো আগুপিছু না ভেবেই ‘হ্যাঁ’ করে বসে আছে…”
“কেস হিসাবে এটা নিঃসন্দেহে খুবই ইন্টারেস্টিং,”,সদ্য কামানো মসৃন গাল চুলকাতে চুলকাতে বলে উঠলেন সঞ্জয়,“এক কাজ কর।তোরা ফার্স্ট এই ‘অলিভ’ নার্সিং হোমের সুপারের থেকে অগ্নিকান্ডের ডিটেলটা নে।তারপর নেক্সট স্টেপ নিয়ে ভাবা যাবে।”
“কিন্তু এতদিন পর…?”,প্রিয়ার কন্ঠস্বর দ্বিধামিশ্রিত,“সুপার কি আমাদের কিছু জানাবেন?”
“না জানালে আমায় একটা ফোন লাগাস।সামলে নেব।দেখবি তখন জানানোর জন্য নিজেই তোদের পেছনে দৌঁড়চ্ছে…”
“ও-কে”,
সঞ্জয়ের বাড়ী থেকে বেরিয়ে এল শুভ্ররা।মাথার মধ্যে সব কিছু তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে প্রিয়ার।ক্রমশ কঠিনস্য কঠিন মনে হচ্ছে ব্যপারটা।পারবে তো সব কিছু সামাল দিতে?

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.