" প্রতিলিপি" হিন্দী পেজের লেখিকা পবিত্রা অগ্রওয়ালের হিন্দী গল্প " রিস্তা মৈত্রী কা" র ছায়া অবলম্বনে।

" বন্ধুত্বের সম্পর্ক"


দরজা খুলতেই নজর পড়লো খামটার ওপর, হাতে ওঠাতেই অবাক হলাম। সময়ের এত ব্যবধানেও হাতের লেখা চিনতে মোটেই দেরী হলো না। শৈলেশের হাতের লেখা তো হাজার ভীড়ের মধ্যেও চিনে নেবে সে এখনও। ব্যগ্রতার সাথে চিঠি খোলে....

" প্রিয় নীরজা,


আশা করি তুমি বেশ ভালোই আছো। ভালো না থাকাটা আমার জন্য থাক। আর সেটাই আমার মত হতভাগার প্রাপ্য। তোমার পাঠানো দীপাবলি আর নববর্ষের শুভকামনা প্রত্যেকবারই পাই। কিন্তু জবাব দেওয়া তো দূরের কথা ধন্যবাদ জানানোর সাহসও কখনো জুটিয়ে উঠতে পারি নি। ক্ষমা কোর।


গত কয়েকবছর থেকেই তোমায় ফিরিয়ে আনার ইচ্ছেকে জোর করে দাবিয়ে রেখেছি। এখন কোন কাজেই মন লাগে না, শরীরও সাথ দিচ্ছে না, গত একমাস থেকে শয্যাশায়ী প্রায়। জীবন যেন অন্ধকারে ডুবে গেছে, কোথাও আশার এক বিন্দু নজরে আসে না। দুর্বলতার কারণে এই চিঠি অনেক কষ্টেই লিখছি। এবার মনে হচ্ছে মৃত্যু মাথার কাছে দাঁড়িয়ে। দুঃখ নেই তাতে, বাঁচার ইচ্ছেও শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তোমার কথা সবসময় মনে পড়ে, অপরাধবোধ কুরে খায়, অনেক কষ্ট দিয়েছি তোমায়। সপ্তপদীর সময়ে সারা জীবন সাথ দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেও তা রক্ষা করতে পারি নি। এই বোধ আমায় শান্তিতে বাঁচতে দিচ্ছে না, আর না দিচ্ছে মরতে। তুমি কি একটিবার আসবে? কতদিন হলো দেখি নি, অন্তত একবার দেখা দাও। তুমিই ছিলে আমার প্রথম প্রেম আর হয়তো বা একমাত্র। কোন সম্পর্কের দোহাই তোমায় দিই বলো তো? বন্ধুত্বের সম্পর্ককে তুমি চিরস্থায়ী মানতে। আর কিছু না হোক তারই দোহাই... প্লীজ, একবার এসো। তোমার আসার পথ চেয়ে রইলাম।


তোমার শৈলেশ।"


চিঠিটা পড়ে মন মুচড়ে উঠলো। কেন জানি না আজ তার এই অবস্থার জন্য খুশী হতে পারছি না বা রাগও হচ্ছে না তার ওপর। যদিও একসময় সে আমায় অন্যায়ভাবে ত্যাগ করে একাকীত্বের এই মরুভূমিতে ঝলসে যাওয়ার জন্য ছেড়ে দিয়েছিল, তাও কোথায় যেন একটা সূক্ষ্ম তার তার সাথে আমায় এখনো বেঁধে রেখেছে! এটাই কি সেই বন্ধুত্বের বাঁধন! আঠারো বছর আগেকার স্মৃতিরা হামলা করলো।


************************

" শুনেছো শৈলেশের মা, লালাজীর নাতি হয়েছে", পাশের বাড়ীর কাকীমা খবর দিলেন।

"তাই নাকি, বাহ্! এই তো কিছুদিন আগে লালাজীর ছেলের বিয়ে হলো। একেই বলে ভাগ্য," এক দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন শৈলেশের মা। আমি জানি এই দীর্ঘনিঃশ্বাসের কারন। আমাদের বিয়ের পাঁচ বছর পরও তাঁকে নাতি/নাতনীর মুখ দেখাতে পারি নি। এও জানি এনাদের গল্প শেষপর্য্যন্ত সেই বিন্দুতেই এসে পৌঁছাবে।


"আমার মতো অভাগিনী কে আর আছে বলো! একই ছেলে আমাদের আর বিয়ের পাঁচ বছর পরও নিঃসন্তান। মনে হয় আমাদের বংশ এই পুরুষেই শেষ হয়ে যাবে।"

" আজকাল আশ্রমে এক সাধুবাবা এসেছেন।

তুমি বৌমাকে নিয়ে সেখানে কেন যাচ্ছো না! শুনেছি তাঁর আশীর্বাদে অনেক নিঃসন্তানের কোল ভরেছে। "

" সে যাবে তবে তো। একবার বলেছিলাম তো সে এড়িয়ে গেল। কয়েকবার বলাতে বললো যে ছেলেকে নিয়ে যান। এমন বৌ কোন কাজের বলো তো যে বংশে বাতিই না জ্বালাতে পারবে!"


এইধরনের কথাবার্তা শুনে ভেতরে আগ্নেয়গিরির লাভা ফুটতে থাকে। বাচ্চা হওয়া না হওয়া কি আমার হাতে! ইচ্ছে তো আমারও হয় মা হতে। মনে মনে পিষে যেতে থাকি। কার কাছে নিজের ব্যথা শোনাবো! এই কারনেই নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য স্বামী আর শাশুড়ির অনিচ্ছে থাকা স্বত্বেও চাকরী ছাড়ি নি। ভেবে রেখেছিলাম ছেলেপুলে হওয়ার পর ছেড়ে দেব।

" তুমি শৈলেশের আর একটা বিয়ে কেন দিয়ে দিচ্ছো না? " কাকীমা পরামর্শ দিলেন।

" কেমন করে দিই বলো। এখন প্রথম স্ত্রী বেঁচে থাকতে দ্বিতীয় বিয়ে বেআইনী। হ্যাঁ, ডিভোর্স হয়ে গেলে আলাদা কথা। "

" আরে দিদি, তুমি আছো কোথায়! আজকাল কিই না হয়। আমার ভাইকেই দেখো কয়েকবছর আগে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে, আর দিব্যি ঠাটেবাটে রয়েছে।"

" আমিও তো তাই বলি। কিন্তু শৈলেশ কিছুতেই রাজী নয়। অবশ্য আগে যখন বলতাম তখন রেগে যেত, আর এখন না রেগে চুপচাপ থাকে। তাও বারবার বলতে সাহস হয় না। আমি তো প্রথম স্ত্রীকে একেবারে ছেড়ে দিতেও বলি না।"


শৈলেশ দ্বিতীয় বিয়ের কথায় আর রাগারাগি করে না একথা শুনে চমকে যাই আমি। তাহলে কি সে মনে মনে তার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে? বিচ্ছেদের কল্পনায় মন বিচলিত হয়ে ওঠে। আবার মনে হয় শৈলেশ এমন করতেই পারে না। এতদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, এত গভীর ভালোবাসা একটা বাচ্চার অভাবে তুচ্ছ হয়ে যাবে! না, এমন কখনই হতে পারে না। এখন আমার খেয়াল হয় যে কিছুদিন থেকে শৈলেশ ব্যবহার কিছুটা অন্যরকম লাগছে অবশ্য। তার উৎসাহ, আনন্দ, সবকিছুতেই যেন ভাটা পড়ে গেছে। রাত্রে ক্লান্ত হয়ে বাড়ী ফেরা, প্রায়ই বন্ধুর বাড়ীতে খেয়ে এসেছে বলে না খেয়ে শুয়ে পড়া, আমি খেয়েছি কি না সে খবর একবারও না নেওয়া.... এইধরনের তার কিছু স্বভাববিরুদ্ধ কাজে আমি একটু অবাক হচ্ছিলাম বৈকি।


সেদিন " কড়বা চৌথ "এর ব্রত ছিল। এই ব্রততে সারাদিন নির্জলা উপোস করে থেকে সন্ধ্যেবেলা চাঁদ আর স্বামীর মুখ একসাথে দেখে পূজো করতে হয়। স্বামীর হাত থেকেই জল আর প্রসাদ খেয়ে উপোস ভাঙ্গার নিয়ম। এমনিতে ব্রত- উপবাসে আমার বিশেষ রুচি কখনই নেই। কিন্তু শাশুড়ির মন রাখার জন্য এসব করেই যেতাম। এও মনে করতাম যে যাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি তার জন্য একদিন উপোস রাখা কোন বড় কথা নয়, আর শরীরের জন্যও ভালো। চাঁদ কখন উঠে গেছে, শৈলেশের পাত্তা নেই। রাত্রি একটার সময় বাড়ী ফিরে কোন কথা না বলে শোবার জন্য তৈরী হতে লাগলো।

" আজ অনেক দেরী করলে? খাবার নিয়ে আসি?"

" না, দরকার নেই। বাইরে খেয়ে এসেছি", বলেই বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে শৈলেশ।

আমিও লাইট অফ করে শুয়ে পড়ি। ভাবতে থাকি এই বুঝি শৈলেশ উঠে এসে পাশে বসবে আর বলবে," নীরজা, আজ তো তোমার ব্রত ছিল, চলো উঠে খেয়ে নাও।" মনে পড়ে বিয়ের পর প্রথমবার যখন উপোস করে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম শৈলেশ ব্যাকুল হয়ে পড়েছিল। বলেছিল, " তুমি যদি এইভাবে নিজেকে কষ্ট দিয়ে উপোস করে থাকবে তবে আমিও তাই করবো তোমার সাথে তোমার জন্য"। মা সেদিন খুব হেসেছিলেন একথা শুনে। সেই শৈলেশ আজ এত বদলে গেছে! ভাবতে ভাবতে চোখ দিয়ে নিঃশব্দে জলের ধারা বয়ে চললো।


রাত্রি এগারোটা বাজে। এখনও ফেরে নি সে। আজকাল দেরী করে বাড়ী ফেরা তার অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে। এই কি সেই শৈলেশ যার সাথে ক্লাস টেন থেকে এম এস সি পর্য্যন্ত একসাথে পড়াশোনা করতে করতে গভীর বন্ধুত্বের বাঁধনে বাঁধা পড়েছিলাম! এই সম্পর্ক সারা জীবন অটুট রাখার জন্য বিয়ে করেছিলাম আর প্রতিজ্ঞা করেছিলাম দাম্পত্যজীবনের সুখ-দুঃখের ওঠানামার কোন আঁচকে আমাদের বন্ধুত্বের মধ্যে আস্তে দেব না। হঠাৎ জুতোর আওয়াজে চিন্তার জাল ছিঁড়ে গেল, শৈলেশ বাড়ী ফিরলো। সেদিনও যথারীতি কোন কথা না বলে চেঞ্জ করে লাইট অফ করে শুয়ে পড়লো। আমি বিছানায় শুয়ে ছটপট করতে লাগলাম। আমাদের মধ্যে দিন প্রতিদিন দূরত্ব বেড়েই যাচ্ছিল। ঘুম আসছে না, নিশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছে। উঠে গিয়ে জানালার পরদা সরিয়ে দিতেই সারা ঘরে চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়লো। দেখি সে চোখের ওপর হাত রেখে শুয়ে আছে। পাশে থেকেও কত দূরে.... সাথে থাকাতেও তীব্র একাকীত্বের অনুভূতি মনকে মুচড়ে দিতে লাগলো। থাকতে না পেরে কাছে গিয়ে মাথার পাশে বসলাম। নিস্তব্ধতা ভাঙ্গার জন্য বলি," ঘুমিয়ে পড়েছো?"

" না তো।"

" আজ মুভি দেখতে গেছিলে নাকি...এতো দেরী হলো ফিরতে?"

" না, কুহেলী নিজের বাড়ী নিয়ে গেছিলো। তার বাচ্চাটা এত মিস্টি হয়েছে। আমায় টফিকাকু বলে ডাকে। ওর মিস্টি মিস্টি কথা শোনার জন্য চলে ওখানে চলে যাই।"


হয়তো স্বাভাবিক খেয়ালেই শৈলেশ বাচ্চাটার কথা তুলেছিল, কিন্তু আমার মনে হলো আমায় কষ্ট দেওয়ার জন্যই সে একথা বললো। কিন্তু সেটা বুঝতে না দিয়ে আবার বলে উঠি, " শৈলেশ, তুমি রোজ এত দেরী করে ফিরছো, আমি খুব একলা ফীল করছি আজকাল।"

" তাড়াতাড়ি ফিরেই বা কি করবো। বাড়ীতে আমার দমবন্ধ হয়ে আসে। শূণ্যতা যেন গিলে খেতে আসে। আচ্ছা, মা তোমায় কোথাও নিয়ে যেতে চান, তুমি রাজী নও কেন?"


নিঃসন্তান হওয়ার জন্য মায়ের কাছ থেকে অনবরত ব্যঙ্গবাণী শুনতে হয়। কতবার ভেবেছি শৈলেশের সাথে এসব শেয়ার করে নিজের মনকে একটু হাল্কা করবো। কিন্তু তার এই কথার পর তা করতে গেলে নিজেকে নিতান্তই খেলো করা হবে। তাই বলি, "কলেজের চাকরী আর বাড়ীর কাজ সামলানোর পর কোথাও যেতে আর ইচ্ছে করে না। তাছাড়া তুমি তো জানোই এইসব সাধু- সন্ন্যাসীর ওপর আমার ভক্তিও নেই বিশ্বাসও নেই। "

" অন্তত মায়ের মন রাখার জন্যও তোমার যাওয়া উচিৎ। একটা নাতি বা নাতনীর মুখ দেখার জন্য উনি ছটপট করছেন। ওনার তো আর দ্বিতীয় ছেলে নেই যার থেকে ওনার এই মনস্কামবা পূর্ণ হতে পারে।"


মনে হলো যে বলি, বিয়ের তো কেবল পাঁচ বছরই পার হয়েছে। কতলোকের বিয়ের দশ/ বারো বছর পরও বাচ্চা হয়। আর ডাক্তার তো আমাদের দু'জনের মধ্যেই কোন ত্রুটি নেই বলেছেন। তাছাড়া তাড়াহুড়ো থাকলে অনাথাশ্রম থেকে একটা বাচ্চাও নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু বেকার এসব বলা। শৈলেশ তো নির্বোধ নয়, সে তো নিজেও মাকে এসব কথা বোঝাতে পারে! তাই অনর্থক আর তর্কবিতর্কে না গিয়ে চুপ করে রইলাম। শৈলেশ আরও খিটখিটে হয়ে যেতে লাগলো। কথায় কথায় সামান্য ব্যাপারেও সবার সামনে আমাকে অপমান করতে ছাড়তো না। সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলে একদিন বললাম, " দেখো, আমি বুঝতে পারছি তুমি আমায় আর সইতে পারছো না। আমার কোন আচরণই তোমার বরদাস্ত হচ্ছে না। রোজ রোজ এমন খিটখিট হওয়ার চেয়ে আমাদের আলাদা হয়ে যাওয়ায় ভালো। আর আমার মনে হয় তুমি তাইই চাও।"

" হ্যাঁ... হ্যাঁ... যাও...যাও...মুক্তি দাও আমায়। আমি ডিভোর্সই চাই আমি।"

" কিন্তু ডিভোর্স তো তোমায় আমি দেব না।"

" আমার চাই।"

" কোন আধারে নেবে ডিভোর্স?"

" তা সময় এলে খুঁজে নেওয়া যাবে।"


আমার ভেতর শিউরে উঠলো। জানি নিঃসন্তান হওয়া ডিভোর্সের জন্য যথেষ্ট আধার নয়। তাই ডিভোর্স নিতে গেলে কোর্টে নানারকম বানানো নোংরা গল্পের অবতারণা ঘটবে, যা এক্কেবারে সহ্য করতে পারবো না। তাকে বলি," শৈলেশ, আমি অনেক মানসিক অত্যাচার সয়েছি এতদিন, আর নয়। কানুনী বিচ্ছেদ না হলেও এমনিই তোমায় ছেড়ে দূরে চলে যাবো। তুমি নিশ্চিন্তে দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারো। "

" কখনো তুমি যদি দাবী করো তো মুশকিলে পড়ে যাবো।"

" আমাদের মধ্যে কিই বা বেঁচে আছে যা দাবী করবো! আমার চাকরীর টাকাতে আমার বাকী জীবন স্বচ্ছন্দে কেটে যাবে। তোমার বৌএর ওপরে না থাক বন্ধুর ওপরে তো এটুকু বিশ্বাস করতে পারো। বলো তো স্ট্যাম্প পেপারে সাইন করে দিই।" একনিশ্বাসে এতগুলো কথা বলে ফেললাম। জানি না এর জন্য সাহস আর ধৈর্য্য আমি কোত্থেকে পেলাম!


বন্ধুত্ব শব্দটা শুনে শৈলেশ একটু বিচলিত হলো। আর কিছু না বলে চুপচাপ বাহিরে চলে গেল। কিছুদিনের মধ্যেই আমি নিজের ট্রান্সফার অন্য জায়গায় করিয়ে নিলাম। পরে শুনেছিলাম যে সে বিয়ে করেছে আবার, আর প্রথম ছেলের জন্ম দিয়েই তার সেই স্ত্রী মারা যায়। আরও কিছুদিন পরে খবর পাই তার পনেরো/ ষোলো বছরের ছেলে কুসংসর্গে পড়ে বাড়ী ছেড়ে চলে গেছে।


*********************


ফোন বেজে উঠতেই চমক ভাঙলো। সন্ধ্যে সাতটা বেজে গেছে, বুঝতেই পারি নি। অতীতের খেয়ালে ডুবে ছিলাম। চিঠিটা এখনও হাতে ধরাই আছে। তিনঘন্টা সময় আছে, একবার সেখানে যেতেই হবে। ফোনটা ওঠালাম। পাশে এসে দাঁড়ালো আমার এতদিনের সুখদুঃখের সাথী বাড়ীর কাজের মেয়ে সুজাতা। তাকে সব কথা খুলে বলি। সে বলে," তোমাদের মধ্যে তো ডিভোর্স হয় নি। তুমি কি সেখানে তার স্ত্রীর অধিকারে যেতে চাইছো?"

" সে সম্পর্ক তো কবেই শেষ হয়ে গেছে। শৈলেশ অসুস্থ, আমার সাথে দেখা করতে চায়। বন্ধু হিসেবে তার সে ইচ্ছে আমি পূর্ণ করতে চাই।"


শৈলেশের বাড়ীর দরজায় পৌঁছে দেখি দরজা আধা খোলা আছে। নিজের মনে ঢুকতে সংকোচ এসে ঘিরলো। বেল বাজাতেই মায়ের আওয়াজ এলো ভেতর থেকে," দরজা খোলাই আছে"। ঢুকতেই মায়ের ওপর নজর পড়লো, সব চুল সাদা হয়ে গেছে, শরীরও ভেঙ্গে পড়েছে। আমার দিকে একবার তাকিয়েই মাথা নীচু করে অন্য ঘরে চলে গেলেন। শৈলেশের ঘরে ঢুকে দেখি সে অভ্যেসমত চোখে হাত চাপা দিয়ে শুয়ে আছে। গায়ের রঙ ফ্যাকাশে, মুখে বেশ কয়েকদিনের না শেভ করা দাড়ি। কাছে গিয়ে মাথায় হাত রেখে ডাক দিই," শৈলেশ"।

চমকে চোখ খোলে সে। একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে ওঠে," নীরজা, তুমি সত্যিই এসেছো, আমি স্বপ্ন দেখছি না তো!"

হাল্কা হেসে বসি তার পাশে। দুর্বল হাত দিয়ে সে আমার হাত শক্ত করে ধরার চেষ্টা করে। মাকে ডাকে," মা দেখো, নীরজা এসেছে। আমি বলেছিলাম না যে সে আসবেই। মা অনেকদিন থেকে তোমায় ফিরিয়ে আনার কথা বলছিলেন, আমি সাহস করে উঠতে পারি নি। আর তোমায় কোথাও যেতে দেবো না," বলে আমার হাত নিজের চোখের ওপর চেপে ধরে সে। তার চোখের জলে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকা আমার দু'হাত ভিজে যেতে থাকে।


চার/ পাঁচদিন পর্য্যন্ত অক্লান্ত সেবা করে যেতে থাকি তার। মায়ের চোখে পশ্চাত্তাপের অশ্রু, " শৈলেশ তোমায় কখনও ভুলতে পারে নি। আমিই দোষী। এবার তুমি ওকে সামলে নাও মা।" চুপ করে শুনে যাই।


শৈলেশকে দেখতে আত্মীয় স্বজন আসতেই থাকে। আমার ওপরেই যে তাদের বেশী আগ্রহ সেটা বেশ বুঝতে পারি। তাদের ফিসফিস আলোচনা কানে আসে, "কি লক্ষ্মী বৌ দেখেছো, অসুখের কথা শুনেই ছুটে চলে এসেছে। ইচ্ছে করলে সেও তো অন্য বিয়ে করে নিতে পারতো। দেখো, কিভাবে সেবাযত্ন করছে। ছেলের জন্য এমন বৌকে ত্যাগ করেছিল শৈলেশ, আর সেই ছেলেই বা কোন স্বর্গে বাতি দেওয়ার জন্য বসে আছে তার কাছে! "

আবার এও কানে আসে, " হে ভগবান, এ কেমন মহিলা...না সিঁথিতে সিঁদুর, না গায়ে এয়োস্ত্রীর কোন চিহ্ন! স্বামী ছেড়ে দিয়েছিল, কিন্তু বেঁচে তো আছে। শুনেছি কানুনী ডিভোর্সও হয় নি। সমস্ত সম্পত্তির ওপর তারই তো অধিকার, আর এ অধিকার তার ছাড়াও উচিৎ নয়।" এসব শুনতে শুনতে মাথা ধরে যায়, মনে হয় সব ছেড়ে চলে যাই এখুনি।

সেদিন শৈলেশের বিছানার পাশে চেয়ারে বসে বসে একটু ঘুম চলে এসেছে, হঠাৎ মায়ের বিলাপ করে কান্নার আওয়াজে ধড়মড় করে উঠি। দেখি শৈলেশের ঠোঁটের পাশ দিয়ে দুধ গড়িয়ে পড়ছে, দুধের গেলাস মাটিতে গড়াচ্ছে। মা তার বুকের ওপর মাথা রেখে কেঁদে যাচ্ছেন। কিছুক্ষণের জন্য যেন জ্ঞানশূন্য হয়ে গেলাম, মুখ দিয়ে কোন আওয়াজ বেরোচ্ছে না। এত পাশ থেকে মৃত্যুকে প্রথম দেখলাম।

পড়োশীরা এসে মাকে শৈলেশের থেকে আলাদা করলো আর শৈলেশের মুখের ওপর চাদর টেনে দিল। কতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম জানি না। এক বৃদ্ধা মহিলা এসে হাত ধরে ওঠালেন, " ওঠো বৌমা, স্ত্রীর যা কিছু কর্তব্য তা তো তোমাকে করতেই হবে এবার।" উঠে দাঁড়িয়ে ধীরে বলি, " কি বলছেন কাকীমা, আমি শৈলেশের স্ত্রী নই বন্ধু। তার স্ত্রী তো কবেই মারা গেছে।" সবাই অবাক চোখে তাকায়।


শৈলেশকে নিয়ে চলে যাচ্ছে। একবার শেষবারের মত তার মুখ দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা আর বুক ফেটে বেরিয়ে আসতে চাওয়া অসহ্য কান্নাকে কোনরকমে চেপে রাখলাম। শ্মশানবন্ধুরা ফিরে আসে এবং একে একে বিদায় নেয়। আমিও নিজের ব্যাগ নিয়ে বেরোবার জন্য তৈরী হই। ভাবি মা বুঝি কিছু বলবেন। কিন্তু তিনি জোরে জোরে লাগাতার কেঁদেই যেতে লাগলেন। তাঁর পাশে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে বলি, " মা, আমি যাচ্ছি। কখনও কোন দরকার পড়লে নিশ্চয় জানাবেন।" অন্যান্য বন্ধুবান্ধবের মত আমিও ধীরেধীরে বাড়ী থেকে বেরিয়ে পড়লাম।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.