এই একটা দিন খোঁজ পড়ে রেডিও টার। প্রতিবার মহালয়ার আগের দিন আলমারির মাথার ওপর থেকে চার চৌকো ,এক সাইড ভাঙা প্রত্নতাত্বিক নির্দশন টাকে নামানো হয়, চালাতেই ঘর ঘর করে কিছুক্ষন শ্লেষ্মায় ভোগা রোগীর মতো ঘর ঘর করে কোমায় চলে যায়..ব্যাস তার পর থেকেই ঠাকুমার ঘ্যান ঘ্যান .."তোরা কি বুঝবি এর মর্ম? এই রেডিও আমার বাবা কে অফিস থেকে উপহার দেওয়া হয়েছিল, মহালয়ার দিন ভোর চারটে য় আমাদের একান্নবর্তী পরিবারের সাতাশ জন সদস্য একসাথে বসে মহিষাসুরমর্দিনী শুনতাম.."

-"ওহ, ঠাম্মা, সারা বছর তো ওই ভুলভাল সিরিয়াল গুলো দেখো, তো কাল ও না হয় ভোরে টিভির মহালয়া টাই দেখে নিও.." বুবাই ফোড়ন কাটলো।

-"থাম, এই একটা দিন যদি রেডিও তে মহালয়া না শুনি নিজেকে বাঙালি বলেই মনে হবে না.. তুই এত কথা না বলে তোর বাবা কে ডাক, একটু দেখে দিক.."

-"ও আর সারবে না..ও দেহ রেখেছে, আর কত টানবে? প্রতিবছর এই একটা দিনের জন্য ওটা র কথা মনে পড়ে.বহুবার সারিয়েছি, আর পারবোনা, তোমাকে তো বলেছি নতুন একটা কিনে দি ওই মডেল পাওয়া না গেলেও তোমার কাজ তো মিটে যাবে..তুমি তাতেও রাজি না.." দাড়ি কামাতে কামাতে বললো বাবা।

ঠাকুমার মন খুব খারাপ। ঘুরছে ফিরছে আর ওই যন্ত্র টা কে না না ভাবে দেখছে, নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চেষ্টা করছে বার বার, যদি আর এই বছর টা টেনে দেয়..প্রতি বছর এই এক ই প্রার্থনা করে ঠাকুমা। কিন্তু নাঃ তার আয়তকার বাক্স কোনো রেসপন্স করছে না।

বুবাই আবার এলো ঘরে, "ঠাম্মা, বলো কোন মিউজিয়ামে রাখবো তোমার এই ঐতিহ্য কে? দেশ বিদেশ থেকে মানুষ দেখতে আসবে, ওহ তুমি সেলেব হয়ে যাবে গো.."

এই সব কথায় ঠাম্মার মেজাজ আরও গরম হয়ে যাচ্ছে। বোধ হয় মন খারাপের চোটে আজ খাবেই না। বুবাই এর মা অনেক কষ্টে বুঝিয়ে টুঝিয়ে খাইয়েছেন।

ঠাম্মার এরকম মুখ ভার দেখে বুবাই এর ও মন মেজাজ ভাল নেই। সন্ধে বেলা পড়তে পড়তে ভাবছে কি করা যায়। ওই রেডিও ছাড়া মহালয়া নাকি মহালয়া ই নয় ঠাম্মার কাছে, আর ওই রেডিও ও বেয়াদপ ..কোনো টুঁ শব্দ টিও করছে না।

রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লো ঠাকুমা। তার আগে মাথার কাছে টেবিলে সুন্দর করে সাদা এমব্রয়ডারি করা ক্লথ টা পেতে তাতে পরম প্রিয় রেডিও রেখে ওপরে কুশন এর কভার দিয়ে রাখলো।বলা যায়না ভোরে হয়তো দেবীর কৃপায় চলতেও পারে। সেই আশাতেই ঘুমোতে গেল ঠাম্মা।

ভোর চারটে। রেডিওর নব ঘোরাতেই ..সেই গায়ে কাটা দেওয়া সুর বেজে উঠলো...তারপর সেই স্বর্গীয় চির নবীন কন্ঠস্বর যেটা ছাড়া মহালয়া , পুজো কোনোটাই শুরু হতে পারেনা.."আশ্বিনের শারদ প্রাতে / বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জির / ধরনীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা / প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত / জ্যোতির্ময়ী জগতমাতার আগমন বার্তা...”।

মহালয়া শেষে। ঠাকুমা দু হাত জোড় করে মাথায় ঠেকালো, "আমি জানতুম, মা তুমি ঠিক আসবে.."আনন্দে ভক্তিতে বিশ্বাসের ধারা গড়িয়ে পড়তে লাগলো দু চোখ বেয়ে।

এবার আসল কথা টা বলি? বুবাই মার পারমিশন নিয়ে ফোন চেয়ে রেখেছিল শুধু আজ সকাল টার জন্য। তারপর চারটে বাজার ঠিক আগে গুটি গুটি পায়ে ঠাকুমার ঘরে ঢুকে ওই টেবিলের পেছনে লুকিয়ে পড়লো। যেই ঠাকুমা নব ঘুড়িয়েছে। বুবাই ও ইউ টিউব চালিয়ে দিলো। ঠাকুমার খুশির জন্য এই টুকু ছলনায় মা দুগ্গা একটু ও রাগ করবে না। তাই না?

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.