বুম্বার ঘরটায় থরে থরে ছবি সাজানো। সবই ওর হাতে আঁকা। বেশির ভাগই ফিমেল পোর্ট্রেট।একটা জিনিস নজর করলাম।অধিকাংশ ছবিতেই একই মেয়ের মুখের আদল। কেবল দেহভংগীটুকু যা আলাদা।দেখে মনে হল কোনো সদ্য কিশোরী যেন। পুরু ঠোঁট, নাকটা ঈষৎ চ্যাপ্টা আর চোখদুটো আয়তাকার হলেও ভীষন উজ্জ্বল। বুম্বার চমৎকার তুলির টানই হোক বা মেয়েটির মায়াবী চোখদুটো। কেন জানিনা আমার দৃষ্টি বারবার আটকে যাচ্ছে ছবির মেয়েটিতে।

যীষ্নু বুম্বার ছোটোভাই। আমার থেকে বছর সাতেকের ছোটো। যে বাড়িতে ভাড়া থাকি এখন সেখানে টিউশনি পড়তে আসে যীষ্নু।এই কদিনে ওর সাথে ভালই বন্ধুত্ব হয়ে গেছে আমার।ওই সারা বাড়ি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ওর দাদার আঁকা ছবিগুলো সব দেখাচ্ছে। জিজ্ঞাস করলাম , 'এটা কার ছবি যীষ্নু ? সব ছবিতেই একই মেয়ে যে?'
যীষ্নু সংক্ষেপে উত্তর দিল 'জানিনা।'
'জানিনা মানে?' আমি একটু অবাক হলাম। তোমার দাদা দিনের পর দিন একই মেয়ের ছবি এঁকে যাচ্ছে , আর তুমি জানতেও চাওনি এটা কে?'
যীষ্নু একটু বিরক্ত হল, বলল 'না তা নয়। আমি অনেকবার জিজ্ঞাসা করেছি। দাদা বলেছে এটা ওর স্বপ্নে দেখা নারী। বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্ব নেই।'

আমি ঠোঁট উলটিয়ে বললাম, 'ধূর তা আবার হয় নাকি। একই মেয়ের এতগুলো ছবি এঁকেছে যখন নিশ্চয় মনের গভীরে লুকিয়ে আছে বিশেষ কেউ। একটা গল্পে পড়েছিলাম শিল্পী যখন কোনোকিছু গড়ে তখন অবশ্যই কারুর আদলে গড়ে। দেখ কি সুনিপুণ কায়দায় শরীরের প্রত্যেকটা ভাঁজ , অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলেছে বুম্বা। এত নিখুঁত এত ভালবাসা না থাকলে সম্ভব নাকি কখনও । নিশ্চয় প্রেমিকা হবে।'
যীষ্নু বলল, 'না। তৃষাদি কে মোটেও এমন দেখতে না।'
আমি আন্দাজ করলাম তৃষা নিশ্চয় বুম্বার প্রেমিকা। বললাম, 'কই, তৃষাদির ছবি দেখি তোমার। বুম্বা এত ভাল আঁকে যখন নিশ্চয় তৃষারও ছবি থাকবে অনেক।'
যীষ্নু: ' না। দাদা বলত তৃষাকে হারাতে চাইনা কখনও । মনের সবটুকু ভালবাসা উজাড় করে দিতে না পারলে তৃষার মুখ ক্যানভাসে ফুটবেই না । আর ছবি শেষ হলে যদি ভালবাসাটাও শেষ হয়ে যায় ? তৃষাদি যদিও অনেক বার অনুরোধ করেছিল দাদা কে কিন্তু দাদা কোনোদিন আঁকে নি ওর ছবি।'
কি অদ্ভুত কথা। বুঝলাম বুম্বার চিন্তাভাবনা একটু পাগলাটে ধরনের। ঘুরে ঘুরে সব ছবিগুলো দেখছি। যদিও বহুধরনের ছবি আছে তবুও আমায় বুম্বার ওই স্বপনচারিনী আকৃষ্ট করছিল বেশি। শেষ কয়েকটা ছবিতে দেখলাম মেয়েটির অভিব্যক্তির সামান্য পরিবর্তন হয়েছে। মায়াবী চোখদুটোই যেন কিছুটা যন্ত্রণা আর একরাশ অবিশ্বাসের ছাপ। আরও কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাব তার আগেই মাসিমা মানে বুম্বার মা নীচে ডাকলেন আমাদের। মাসীমার সাথে আমার আলাপ বিশুদার দোকানে।গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় কটা টুকিটাকি জিনিস কিনতে গিয়েছিলাম আরকি। কি ভীষন কথাই যে বলতে পারেন মহিলা। তারপর যখন শুনলেন দাসকাকুর বাড়িতে নতুন ভাড়া এসেছি আমরা তখন তো বলতে গেলে ছাড়ছিলেনই না। তারপরও দু তিনবার দেখা হয়েছে রাস্তা ঘাটে। প্রতিবারই অনেক করে অনুরোধ করেছেন ওনার বাড়িতে আসার জন্য। খুব একটা দূর নয়, জাস্ট পাশের গলিতে ঢুকে তিনটে বাড়ি পর। সেই উপলক্ষ্যেই আজ আমার এখানে আসা। মাসীমা বললেন, 'যীষ্নু দিদিকে সব ছবিগুলো দেখালি বাবা ?' যীষ্নু আলতো করে ঘাড় হেলায়। তারপর বললেন, 'চল মা তোমায় বাগানটা দেখিয়ে আনি।'
শেষ বিকালের মৃদুমন্দ হাওয়ায় বাগানে বেড়াতে মন্দ লাগছিল না। বাগান বলতে ওই গোটা চার গোলাপ, রক্তজবা, চাপটগর এইসবই আরকি। মাসীমা বলে যাচ্ছেন, 'বুম্বার আমার খুব বাগানের নেশা। এসব ওর হাতেই লাগানো। খালি খালি একগাদা দাম দিয়ে গাছ কিনত। আমি বলতাম কি লাভ বেকার টাকা নষ্ট করে?'
বাগানের শখ আমারও আছে। তাই এই ইমপাল্স টা আমিও বুঝি ভালমতই। হেসে বললাম, 'আসলে শিল্পী মানুষ তো। সংগে শৌখিনতা তো থাকবেই। আচ্ছা মাসীমা আপনার কাছে ওনার এত গল্প শুনলাম, হাতে আঁকা ছবি, বাগান দেখলাম। সেই মানুষটার সাথে আলাপ হলে বড় ভালো লাগত!'
মাসীমা কিছু জবাব দেন না। যীষ্নু কিছুটা অবাক হওয়ার সুরে বলে, 'সে কি গো তানিদি তুমি কিছুই জাননা? মা তোমায় বলেনি? আমি ভেবেছিলাম তুমি হয়তো সব শুনে থাকবে আগেই।আজ প্রায় দেড় বছর হতে চলল দাদা আর আমাদের মাঝে নেই।'

আমি অবাক হয়ে মাসিমার মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। এইকদিনে ওনার কাছে বুম্বার এত গল্প শুনেছি অথচ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে বুম্বা আসলে মৃত। যীষ্নু ব্যাপারটা আন্দাজ করে বলল, "আসলে তানিদি মা এইরকমই। দাদা যে নেই মা সেটা মানতেই চায়না। তাই অচেনা লোক অনেক সময় ভুল করে ফেলে।'
ব্যাপারটা অদ্ভুত হলেও খুব স্বাভাবিক। প্রিয়জনের বিচ্ছেদবেদনা আর কজনই বা সইতে পারে। মাসিমার উপর সত্যি করুণা হল আমার। যীষ্নু বলল, 'সেইদিন রাতের বেলা সাড়ে নটার লোকালে কলকাতা থেকে ফিরছিল দাদা। দশটাই এখানে পৌঁছে যাওয়ার কথা। কিন্তু সাড়ে এগারোটা বেজে যাওয়ার পরও দাদা ফিরলনা দেখে আমাদের সত্যি খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। তারপর পৌনে বারোটা নাগাদ দাদার এক বন্ধু খবর দেয় যে দাদা আর নেই। ট্রেনে আর যারা সব ছিল তারা বলেছিল ব্যারাকপুর ঢোকার ঠিক আগেই দাদা হঠাৎ করেই চলন্ত ট্রেন থেকে লাফ দেয়। আমরা যখন গিয়েছিলাম হাঁটুর নীচ থেকে শরীর ছিহ্নভিহ্ন হয়েগিয়েছিল পুরো। মা কে দেখতে দিইনি বডি।"
মাসিমার মুখের অবস্থা দেখে যীষ্নু চুপ করে যায়। আমিও প্রসংগ পাল্টাতে মাসিমার শাড়ীর প্রসংশা শুরু করে দিলাম।

সেদিন সন্ধ্যা হওয়ার পর পরই ফিরে এসেছিলাম বুম্বাদের বাড়ি থেকে। কিন্তু ওর স্বপ্নচারিনী শান্ত থাকতে দিল না আমায়।দিনের হাজারটা কাজের মাঝে,রোগী দেখার ভিড়ে এমনকী রাতে ঘুমের মধ্যেও যেন জ্বলজ্বল করছে মেয়েটার চোখদুটো। এত প্রাণবন্ত চোখ,সহজ সরল নিস্পাপ মুখের অধিকারিনী বাস্তবে অস্তিত্বহীন বলে ভাবতেই আমার কেমন যেন লাগছে। অগত্যা ফোন লাগালাম রোদ্দুরকে। রোদ্দুর আমার সেই নার্শারী স্কুলের বন্ধু আর শহরের নাম করা আর্টিস্ট। এই বয়সেই দেশে বিদেশে ছবি আঁকিয়ে হিসাবে বেশ নাম করে ফেলেছে। আমার মনে হল রোদ্দুর নিশ্চয় কিছু সাহায্য করতে পারবে এ ব্যাপারে। তাই আর দেরী না করে ওর অ্যাকাডেমীর বাইরের সিসিডি টাতে বিকালে মিট করবার কথা জানিয়ে দিলাম।
বিকালে বেশিক্ষন অপেক্ষা করতে হল না রোদ্দুরের জন্য। গিয়ে দেখি আমার আগেই সে হাজির। রোদ্দুরের এটা খুব ভাল গুণ সবকিছুতেই ও ভীষন পাংচুয়াল। আমার থেকে সব শুনে বলল, 'তোর মাথায় আবার সেই পাগলামিটা চেপেছে তানিয়া? কি লাভ এইসব ফালতু ঝামেলায় জড়িয়ে ?ও যার খুশি ছবি এঁকেছে তাতে তোর কি?'
আমি যদিও দমবার পাত্রী নয়। মোবাইল খুলে মেয়েটার ফটোটা দেখালাম রোদ্দুর কে। পরশুই হোয়াট্স অ্যাপে যীষ্নুর থেকে চেয়েনিয়েছিলাম পেন্টিংগুলোর একটা ফটো। ও দেখে বলল, 'সত্যি ভীষন সুন্দর। কিন্তু এটা আগে কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।'
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'তারমানে বলতে চাইছিস কোনো নামী দামী আর্টিস্টের আঁকা নয় এটা। বুম্বার একদম নিজস্ব, তাইতো?"
ঘাড় নাড়ল রোদ্দুর "অন্তত আমার নলেজ তাই বলে। তবে আরও খুঁজতে হবে ভালো করে ফাইনালি কিছু বলার আগে। হতেও পারে এটা সম্পূর্ন বুম্বার কল্পনা মিশিয়ে সৃষ্টি। বাস্তবে হয়তো খুঁজেই পাওয়া যাবেনা মেয়েটিকে। আর্টিস্টদের ক্ষেত্রে এটা বিরল নয়।'
'প্লিজ রোদ্দুর তবু একটু দেখ। আমি যে ঘুমোতে পর্যন্ত পারছিনা। তুই তো জানিস আমার ছবির কত শখ। বুম্বাকেও যে জিজ্ঞাসা করব তারও তো উপায় নেই।' আমি অনুরোধ করতে থাকি রোদ্দুরকে।
'ঠিক আছে। এত করে বলতে হবেনা' রোদ্দুর বলতে থাকে, 'তা মেয়েটা যখন এতই পছন্দ হয়েছে ওর একটা ছবি নিয়ে আসতে পারতিস তো। নাহয় দাম দিয়েই নিতিস।'
আমি বলি, 'নারে।মাসীমা, যীষ্নুকে অনেক করে বললাম।ওনারা কিছুতেই রাজি হলেন না।বললেন এগুলোর প্রত্যেকটা নাকি বুম্বার স্মৃতি। একটাও হাতছাড়া করতে চান না। '
'হুম্। দেখছি কি করা যায়।'

এরপর প্রায় মাস দুয়েক কেটে গেল। আমার আর্টিস্ট বন্ধুটি তেমন কোনো সুবিধা করে উঠতে পারেন নি এখনও পর্যন্ত। তাছাড়া সাংসারিক ঝুটঝামেলা আর নানান কাজের চাপে আমিও ব্যাপারটা ভুলেগেছি বলতে গেলে। তবে ডাক্তার হওয়ার সুবাদে যীষ্নুদের বাড়িতে গেছি দুএক বার। তাছাড়া ছেলেটার বিরাট বই পড়ার নেশা। দেশ বিদেশের কত লেখকের বই যে আছে ওর সংগ্রহে।ওইসব বই এর টানে আর মাসিমা সংগ দিতে সময় পেলেই যায় ওবাড়ি। এই তো সেদিন মাসিমার শরীরটা খারাপ হয়েছিল একটু। আমায় ফোন করে ডেকে পাঠালেন। গিয়ে দেখলাম যতরাজ্যের প্রেসক্রিপশনের ফাইল আর ওষুধ নামিয়ে শুয়ে আছেন বিছানায়। আমায় বললেন, ' তুমি তো জানবে মা, দেখোতো আগেরবার ডাক্তার এই ওষুধ গুলো খেতে বলেছিল। আর যেতে পারিনা, এগুলোই খেয়ে যাব কি?।' বলে একগাদা প্রেসক্রিপশন ধরিয়ে দিলেন আমার হাতে। আমিও ওনার কেস হিস্ট্রী ঘাঁটতে থাকি সেই দু হাজার ছয় থেকে। উচ্চ রক্তচাপ আর সুগার দুটোই রয়েছে সমানে সমানে। মাঝে একটা প্রেসক্রিপশনে চোখ আটকে গেল আমার। জিজ্ঞাসা করলাম 'দেবজিৎ ঘোষ কে মাসিমা?'
মাসিমা বললেন, 'ওহ ওটা তো বুম্বার কাগজ। আমার গুলোর সাথে ঢুকে গেছে তাহলে।'
আমি প্রেসক্রিপশনটা পড়তে থাকি। ডক্টর বসু হলেন এই শহরের বেশ নামকরা সাইক্রিয়াটিস্ট আর আমার শ্রদ্ধেয় স্যার।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.