নিষিদ্ধ স্বর্গের চিলেকোঠা

নিষিদ্ধ স্বর্গের চিলেকোঠা

হিম হিম বাতাসটা বড় ভাল লাগে । ভাল লাগে সুবহে সাদেকের শরীর জুড়োনো হাওয়া । কানের কাছে মাতাল করা কোন এক বাঁশির সুর ছুঁইয়ে আবার সে হারিয়ে যায় দূরে । থৈ পাওয়া যায় না আর । পাওয়া যায় না কূল । আকাশে দু একটা তারা তখনও টিমটিম করে জ্বলে । ঋতুমতি কিশোরির বিবর্ণ মুখের মত জেগে থাকা ফ্যাকাসে চাঁদটা ঝুলে থাকে ঈশান কোণে । বোবা চোখে সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে জয়নাল । রহম কর! আল্লাহ্! রহম কর! বিড়বিড় করে বুকে হাত লাগিয়ে কপালে ঠোকে । শূন্যে সেলাম আঁকে ।

ঘুমটা বড় জ্বালাচ্ছে ইদানিং । ধরা দিয়েও দিতে চায় না । নটি মাগীর ছেনালিপনায় কাছে এসে আবার শূন্যে মিলায় । ঘুমহীন চোখ জ্বালা করে । অদূরে রেজাউলের শূন্য ভিটের দিকে তাকিয়ে বুকটা কেমন হু হু করে । মহুয়ার গন্ধ বাতাসটাকে উসকে দেয় আরও । একটু একটু করে পর্দা তুলে নেয় কেউ ।পুবের আকাশে গনগনে আগুনটা বৃত্তাকারে উঁকি দেয় । সেদিকে তাকিয়ে কলজে কেঁপে ওঠে জয়নালের । চৈত্রের দাবদাহ বড় অস্থির করে তুলেছে গাঁয়ের জনজীবন । একফোঁটা বৃষ্টি নেই । আকাশে মেঘের নাম মাত্র নেই । সাদা সাদা মেঘগুলো ভেসে যায় কোন সে সুদূর । বৃষ্টির আশা মাত্র জাগায় না মনে । গ্রামের খাল-বিল শুকিয়ে কাঠ । জলের অভাবে পুরো গ্রাম চৌচির । জয়নাল তার অশক্ত শরীরে দূরের মোল্লাবাড়ির কুয়ো থেকে জল বয়ে এনে তবে পিপাসা মেটায় । গ্রামের অধিকাংশেরই ভরসা মোল্লাবাড়ি নয়তো মালিথা বাড়ির কুয়ো ।

হনুফা নেই প্রায় চার যুগ হল । তার না থাকাটা নতুন করে জানান দিচ্ছে আজকাল । জয়নাল যত অশক্ত আর অথর্ব হচ্ছে হনুফার না থাকাটা তত বেশি জাঁকিয়ে বসছে মনে । হনুফা! নামটা ভাবতেই বুকের মধ্যে একফালি নরম জমিনে যেন কষে লাঙল চালায় কেউ । সকালের হাওয়া যতই শীতল হোক পূবের লালরঙা বৃত্তটা চোখ রাঙিয়ে জানিয়ে দেয় সে তার দাপট দেখাতে একরত্তি ভুল করবে না আজও । মাথার উপরে মাটির টালি যথেষ্ট ঠান্ডা তখনও । জয়নাল বেরিয়ে পড়ে । ঠান্ডা থাকতে থাকতেই গুছিয়ে নিতে হবে দিনের রসদ । জল এনে কলসি ভরে রাখে । উনুনে ফুটিয়ে নেয় সারাদিনের খাবার । খায় । বাকী ভাতে জল ঢেলে রাখে । ততক্ষনে সূর্যটা রেগে টং । তেতে উঠেছে হাওয়া । আগুন ঢালছে রোদ । ঝোলার স্বাস্থ্য দিনকে দিন খারাপ হচ্ছে । নিজের গাঁয়ে সে ভিক্ষে করে না । লজ্জা । যে গাঁয়ের অর্ধেক ধানি জমির মালিক ছিল সে আর তার পূর্বপুরুষ সে গাঁয়ে ভিক্ষের ঝুলি নিয়ে দাঁড়াতে মর্মে শেল বেঁধে বড় । বেশি দূরে সে যেতে পারে না এখন । ভিক্ষেও জোটে কম । আর বেশি বাকী নেই । দিন ঘনিয়ে আসছে । আর বেশিদিন ঝুলি হাতে ফিরতে হবে না গ্রামকে গ্রাম, জানে জয়নাল ।

রেজাউলের ফাঁকা ভিটেয় পুঁই আর লাউয়ের ডগা লতিয়ে উঠেছে বেশ । আজ আর মাধুকরীতে না গিয়ে বরং এগুলোর পরিচর্যায় লাগে সে । এই তীব্র খরায় গাছগুলো কি করে টিকে গেল সেই আশ্চয্যি! নারকেলের মালুইতে ঘড়া থেকে জল গড়িয়ে এনে পরম মমতায় গাছের গোড়ায় ঢালে, ছিটিয়ে দেয় গাছের বেড়ে ওঠা ডগায় । নিমেষে জল শুষে নেয় মাটি । ভাপ ওঠে গরম! জানান দেয় তার আরও জল চাই । চাই তৃষ্ণার পরিসমাপ্তি । জয়নাল সেদিকে নজর করে না বড় । জলের বড্ড টানাটানি । তার ভিটের কুয়োটা হেজে মজে গেছে সেই কবে । এখন দু তিনটে চাকা সমান গর্ত নিয়ে জেগে আছে, কোনোকালে ওখানে কিছু ছিল তার জানান দিতে । অথচ এককালে, যখন তাকদ ছিল শরীরে সে নিজেই মানুষের বাড়ির কুয়ো পরিষ্কার করত, কত দূর দূরান্ত থেকে তার ডাক আসত, গ্রামের মানুষ তাকে ডাকতো কুয়ো ঝালাইকর বলে ।

টালির চালার ঘরের বারান্দায় বসে উড়োখুড়ো বাতাসের তান্ডব দেখে জয়নাল । দেখে ধাঁ ধাঁ রোদের তেলেসমাতি । ছানি পড়া চোখে যদিও ঠিকঠাক ধরা পড়ে না সব । ধোঁওয়া ধোঁওয়া রোদের শরীরে চোখ রেখে জয়নাল বড় ধ্বন্দে পড়ে যায় । সে কি বেঁচে আছে আদতেই! নাকি সকলই মায়ার খেল! ভ্রান্তির মোহ! নিজের হাড় জিড়জিড়ে হাতটাতে সে চিমটি কাটে জোড়ে । ব্যথায় উহ্ করে ওঠে সহসা । ফোকলা দাঁতে আবার হাসে ফ্যাকফ্যাক । পরক্ষনেই গম্ভীর হয়ে যায় । অভিশাপ! অভিশাপ! রেজাউলের শূন্য ভিটেটা অভিশাপের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হয়ে অষ্টপ্রহর তাকে খুঁচিয়ে মারে । রেজাউলের জন্মের দিনটা মনে পড়ে । তখনও তিনভিটেয় চারচালা তিনখানা ঘর ছিল জয়নালের । ছিল বেশ কিছু ধানী জমিও । একমাত্র ছেলের মুখ দেখে তাই খুশি উপচেছিল মুখে । হনুফার মুখে যেন চাঁদ নেমেছিল সহসা । রেজাউলের কামানের অনুষ্ঠানে গাঁ সুদ্ধ মানুষকে খাইয়েছিল জয়নাল । সুখপাখি উড়ে গেল ক দিনেই! রেজাউল মূক, বধির! শব্দহীনতার সীমাহীন আঁধারে মুড়োনো পৃথিবী নিয়ে সে অবতীর্ণ হয়েছে এই কোলাহলময় সংসারে! দুঃখে শয্যা নিল হনুফা । আর তখনই গুঞ্জনটা শুরু হল! প্রথমে কানাকানি, ফিসফাস আর তারপর সকল আড়াল ছেড়ে তা বেরিয়ে এল জনসম্মুখে, যেমন করে দীর্ঘদিন গুহাবাসের পর ফ্যাকাসে শরীর নিয়ে বেরিয়ে আসে অভুক্ত সরিসৃপ! টনক নড়লো জয়নালের! চমকে উঠলো সে! হনুফা ধাক্কাটা সামলাতে পারলো না । সে এক জোছনাভেজা রাতে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা ঝাঁকড়া লিচুগাছটার ডালে দড়ি বেঁধে ঝুলে পড়ল । আল্লাহ্! রহম কর! রহম কর!আবার শূন্যে সেলাম আঁকে জয়নাল । পাপ কাটাতে চায় । পাপ! পাপ! কোন পাপ, কার পাপ নিজের কাছেই ধোঁয়াশা ঠেকে বড় । রমিজদ্দি প্রাণের দোস্ত ছিল তার । কত দিন, কত রাত এক সাথে গল্প করে আর পদ্মার চরে মাছ ধরে নয়ত নৌকোয় শুয়ে আকাশের তারা গুণে কাটিয়েছে তারা! নৌকো ঢেউয়ের দোলায় দুলতে দুলতে, স্রোতের টানে ভাসতে ভাসতে চলে যেত কতদূর! সেদিকে ভ্রুক্ষেপ থাকতো না তাদের । তারা জানত যতই নিরুদ্দেশে ভাসতে চাক তারা, নিয়তি তাদের ঠিক ফিরিয়ে দেবে পদ্মা তীরের ঐ নাকউঁচু গ্রামটির কোলে । একদিন রমিজদ্দিই বুদ্ধিটা বাতলেছিল। রেজাউলের শূন্য ভিটেয় ধাঁ ধাঁ রোদ্দুরে কি সব ঝাপসা অবয়ব নাচে, ছানি পড়া চোখে সেদিকে তাকিয়ে নিজের মনেই গুনগুন করে জয়নাল ।

‘লোকটা জমিদার সোনার সংসার গোলা ভরা ধান মাঠ ভরা জমি মিয়ার বাড়িতে দালান লোকটা জমিদার‘- চাঁন পরামাণিককে মনে হত যেন স্বর্গ থেকে নেমে আসা কোন দেবদূত, যে তার কণ্ঠের সুর মাধূর্যে আবিষ্ট, মোহগ্রস্ত করে রাখতো শ্রোতাদের । ছেলেবেলার পুঁথিপাঠের আসরটা জয়নালের মাথার মধ্যে বসে এখন । সে গুনগুনায় –লোকটা জমিদার সোনার সংসার... মাথায় রেজাউলের কচি মুখটা সাঁতরায়- হনুফা চলে যাওয়ার পর বোবা কালা ছেলেটাকে নিয়ে বড় কষ্টের দিন গেছে তার ।বড্ড বিয়ে পাগল ছিল ছেলেটা । ততদিনে জমির মোকদ্দমায় ফেঁসে জয়নালের ধানী জমি সব গেছে, গেছে খেটে খাওয়ার তাকদটুকুও । হাতে ততদিনে শোভা পাচ্ছে ভিক্ষের ঝুলি । অনেক খুঁজে, বিস্তর মেহনত করে তবে পাত্রী পাওয়া গেল রেজাউলের । নতুন বউ এল ঘরে । দিন যাচ্ছিল । দু দুটো ছেলেপুলেও হলো । হঠাৎ রেজাউলের বউ এখানকার বাস গুটিয়ে চলে গেল বাপের বাড়ি । পেছন পেছন রেজাউল । রেজাউলের শূন্য ভিটে মনে করিয়ে দেয় এখানে কেউ ছিল, এখন নেই । হনুফার না থাকাটাই যেমন ভীষণভাবে থাকা হয়ে উঠল বাকী জীবন ।

তমিজদ্দির প্রস্তাবে প্রথমে ভীষণ চমকে গেছিল জয়নাল । গড়িমসি করেছিল । পরে তার রক্তেও ভীষণরকম এক উত্তেজনা টের পেয়েছিল সে । বুকের মধ্যে অদ্ভুত এক অনুভূতি ঘাই মারছিল খুব । যেন কেউ তাকে কোনো নিষিদ্ধ আনন্দে আহ্বান করছিল, হাতছানিতে ডাকছিল । সে অবশেষে রাজী হয়েছিল । এবং বলতে কি শেষের দিকে তমিজদ্দির চেয়ে সেই অভিযাত্রায় তার আগ্রহই অধিক ছিল । মাত্রাতিরিক্ত আগ্রহ তার ঘুম কেড়ে নিয়েছিল এমনকি রতিক্রিয়ায় সে তখন হনুফাকে সন্তুষ্ট করতে পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছিল । হনুফা সে নিয়ে অনুযোগ করতে ছাড়েনি । তাতেও টনক নড়েনি জয়নালের ।

অন্ধকার অমাবস্যার রাতে সে আর তমিজদ্দি বেরিয়ে পড়েছিল ।চুপিচুপি । গাঙকূল ঘেঁষে, পায়ে চলা পথ এড়িয়ে, এবড়ো খেবড়ো অসমান পথ ধরে হাঁটছিল তারা । তমিজদ্দির হাতে ছিল ছোট্ট ধারালো একটা ছুরি । জয়নালের হাতে ড্যাগার । অন্ধকারেও ঝলসে উঠছিল ধাতব ধারালো ফলা । মুখ, মাথা ঢাকা দু জন মানুষের অন্ধকার ছায়া তারচেয়ে অন্ধকারের শরীরে সেঁধিয়ে ধীরে ধীরে এগুচ্ছিল কালিবাড়ির দিকে ।

বেশ নির্বিঘ্নে মন্দিরের কালী মূর্তির শরীরের সব গহনা একে একে খুলে নিয়েছিল দুজনে । চলে আসার সময় হঠাৎ তমিজদ্দির হাত টেনে ধরেছিল জয়নাল! তমিজদ্দি সেই আঁধারে জয়নালের মুখ দেখতে না পেয়ে অবাক গলায় ফিসফিসিয়ে জানতে চেয়েছিল- কি রে? হাতের মধ্যে থাকা পাঁচ ব্যাটারির টর্চটা খুব প্রয়োজন ছাড়া জ্বালানো নিষেধ । তবু সেটা ফস করে জ্বেলেছিল জয়নাল । জ্বেলেই নিভিয়েছিল ফের । ইঙ্গিতটা বুঝে খিকখিক হেসে উঠেছিল তমিজদ্দি । তার গায়ে জোরে চিমটি কেটে জয়নাল বলেছিল- আয়!

আবার মন্দিরে ঢুকে কালী মূর্তির টকটকে লাল জিবটাতে হাতের টর্চ দিয়ে সজোরে বাড়ি । প্রথমবার হলো না কিছুই । এবার তমিজদ্দি । একই ভাবে ।খসে পড়লো অতঃপর । রেজাউলের শূন্য ভিটে এই ভর দুপুরে যেন হা করে গিলে ফেলতে চায় জয়নালের অস্তিত্ব । জয়নাল ধ্বন্দে পড়ে আবার । সে আদতে বেঁচে আছে নাকি হনুফার মৃতদেহ যেমন সকালের ঝিরিঝিরি বাতাসে দারুণ এক ছন্দে দোল খাচ্ছিল তেমনি সেও মরে গিয়ে দোল খাচ্ছে জীবন বৃক্ষের কোন এক অশক্ত ডালে । চৈত্রের প্রখর দাবদাহ তার শরীরে আগুনের হলকা হানে । চোখে ঝিমুনি নিয়ে জয়নাল ভাবে মরে গিয়ে বুঝি দোজখে চালান হয়েছে সে । তপ্ত আগুনে বুঝিবা পোড়ানো হচ্ছে তার হাড় জিড়জিড়ে অশক্ত, নুয়ে পড়া দেহ । চমকে সে চোখ খোলে । ছানি পড়া চোখেও সে দেখতে পায় রেজাউলের ভিটেয় বেড়ে ওঠা লাউ আর পুঁইয়ের মাচান । দোজখে এসব থাকার কথা মওলানা সাব ওয়াজে কখনও বয়ান করেন নি । নিশ্চিন্তির শ্বাস ছেড়ে সে আবার চোখ বুঁজে বেশ অভিনিবেশ সহযোগে ঝিমুতে থাকে ।

দারুণ ফুর্তি নিয়ে কালি মন্দির ত্যাগ করছিল তারা । জয়নালের কানের কাছে চাপা হিংস্র একটা আওয়াজ উঠেছিল তখন । খুব সামান্য সময়ের জন্য । ভীষণ চমকে সে পা চালিয়েছিল জোরে । শব্দটা তমিজদ্দিও পেয়েছিল । ফিসফিসিয়ে সে তাগাদা দিয়েছিল- চল পালাই! খুব আস্তে কিন্তু স্পষ্ট স্বরে, সাপের মত হিসহিসিয়ে একটা কণ্ঠ তাদের কানের কাছে বলেছিল- তোরা ফল পাবি! শিগগিরই ফল পাবি!

ভীষণ জ্বর নিয়ে ফিরেছিল তমিজদ্দি । উথাল পাথাল জ্বরে তিনদিনের দিন চুপিসারে মরে গিয়েছিল অতঃপর । মাস সাতেক পরে তার স্ত্রী একটি পুত্র সন্তান জন্ম দেওয়ার কয়েকমাস বাদেই শিশুটির বধিরত্ব চাউর হয়েছিল গ্রামময় । গরমে খাবি খায় জয়নাল । বারান্দা থেকে উঠে ঘরের কোণায় রাখা কলসি থেকে জল গড়িয়ে গলায় ঢালে । ‍গিলে নেয় ঢকঢক । বেরিয়ে পড়া কণ্ঠা বেয়ে তা চালান হয়ে যায় পেটে । পরিশ্রমে হাঁপায় সে, বুকের মধ্যে কি একটা হাঁসফাসানি টের পায় । গরম এলেই সারা শরীরে চুলকানি ওঠে । ঝুলে পড়া, কুঁচকানো চামড়ায় নিজের খড়ি ওঠা খসখসে হাতে পাগলের মত চুলকায় । খস্ খস্ শব্দ ওঠে । কানে সে এখনও স্পষ্ট শুনতে পায় । শব্দটির শরীরে বহু বছর আগে শোনা অন্য একটি শব্দ যেন আছড়ে পড়ে । চমকে উঠে চুলকানো বন্ধ করে জয়নাল । হতাশ হয়ে আবার ফিরে এসে বসে বারান্দায় ।সামনে খোলা মাঠ । মাঠ পেরোলে নদী । নদীর কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে কালী বাড়ি । মহাকালের কিংবা জয়নালের সেই অমার্জনীয় কৃতকর্মের স্বাক্ষী । ছানি পড়া চোখে সেদিকে তাকিয়ে থাকে জয়নাল । আলেয়া নাচে । বাস্তবে নাকি মানসপটে ঠাওর করতে পারে না আদৌ ।

দিগন্তের দিকে ঘোলাচোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ব্যথা করে ওঠে জয়নালের । মনে হয় হনুফা বুঝি দূর থেকে ডাকে । তার ঝুলন্ত দেহটা ভীষণ ছন্দে দোলে । মাঝে মাঝে এমনকি তমিজদ্দিকেও দেখে সে । তার হাতে চকচকে কি একটা বস্তু রোদের স্পর্শে ঝিকিয়ে ওঠে । চোখ ধাঁধিয়ে যায় জয়নালের । মাঝে মাঝে হাত ইশারায় তমিজদ্দিকে ডাকে । আর তাকে ভাগে কম দেবে না আশ্বাস দেয় । তমিজদ্দিকে বড় একটা আশ্বস্ত হতে দেখা যায় না । সে তেমনি দূর থেকে তাকিয়ে থাকে জয়নালের দিকে । জয়নাল বড় টালমাটাল হয়ে যায় । তার ইচ্ছে করে একছুটে গিয়ে সে কেড়ে নেয় ঐ চকচকে বস্তু! কিংবা পাঁজাকোলে তুলে আনে হনুফার নরম শরীর! দিগন্তে তেমনি নাচে রৌদ্রের চোখ ধাঁধানো ঘূর্ণি, তমিজদ্দির মুখে তেমনি আগুন জ্বালে সূর্য আর হাওয়ায় ছন্দ তুলে দোদুল দোলে হনুফার ঝাপসা অবয়ব । জয়নাল ঘোলা চোখে চেয়ে থাকে ।মাথা ঝাঁকিয়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করে । শ্রান্তিতে দু চোখ মুদে আসে, মাঝে মাঝে চমকে চোখ খুলে সে ঠাউরে নেয় তার অবস্থান । পৃথিবীতে- নাকি দোজখে চালান হয়ে গেছে ইত্যাবসরে... হনুফা, চৈত্রের আগুনলাগা দুপুর নাকি তমিজদ্দির হাতে ঝিকিয়ে ওঠা আলো – কোনটা সত্যি কিছুতেই ভেবে বের করতে পারে না সে । তার শরীর গুলিয়ে ওঠে । মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা ওঠে । সে ঝাপসা চোখে দেখে একটি সুন্দর প্রতিমার মুখ ড্যাবডেবে চোখে তাকিয়ে থাকে তার দিকে । আবার বিভ্রমে পড়ে সে । হনুফা ? নাকি... নিষিদ্ধ স্বর্গের চিলেকোঠার দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে চোখ ঠিকরে বের হয়ে আসতে চায় জয়নালের । সে অপলক তাকিয়ে থাকে, মুখ দিয়ে সাদা সাদা ফেনা ভাঙ্গে... পৃথিবীটা অদ্ভুত নিথর হয়ে আসে হঠাৎ!

********************************************************

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.