শখের বাগান


সুবীরের বাড়ি এই প্রথম এলো সুনিপা, প্রেম যদিও বছর খানেকের উপর হল। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার ভিক্টোরিয়া আর এলিওট পার্কেও ঢুঁ মেরেছে, রেস্টুরেন্ট-মলের চক্করও মেরেছে বিস্তর। আজ সুবীরের সাধাসাধিতেই ওর বাড়ি আসা, সুনিপারও ইচ্ছা ছিল মনে মনে তার হবু সংসারটা একবার দেখে আসার, তাই সুবীর একটু জোর করতেই রাজি হয়ে গিয়েছিলো।

সুনিপা আদ্যান্ত কলকাতার মেয়ে আর সুবীর মফঃস্বলের ছেলে; আলাপটা হয়েছিল একটা সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের মাধ্যামে, মিউচুয়াল ফ্রেন্ড ছিলনা যদিও কোন, কিন্তু সুবীরের প্রোফাইল পিকচারের ভাসা ভাসা চোখের নদীতে বছর একুশের সদ্য কলেজ পেরনো সুনিপা ভেসেই গিয়েছিলো, আর তারই ফলাফল স্বরুপ বন্ধুত্বের আমন্ত্রনে সাড়া দেওয়া। তারপর যখন প্রথম হাই টা উড়ে এসেছিল চ্যাটবক্সের অপরপ্রান্ত থেকে, সুনিপা তো তখন হাওয়ায় উড়ছে। সুনিপার রূপের মায়াজালে যে সুবীরও ধরা দিয়েছে সেকথা কদিনের কথাবার্তাতেই সুনিপা বুঝে গিয়েছিলো, তবুও আবছায়া বিছিয়ে রেখেছিল নিজের চারপাশে যাতে সুবীর নিজে এসে ধরা দেয়। সোশ্যাল সাইট পেরিয়ে বন্ধুত্ব ততদিনে ফোনালাপে পৌঁছেছিল। ধরা শেষ অব্দি সুবীরকেই দিতে হয়েছিলো, এক নিদ্রাবিহীন রাতে অনেক কথার মাঝে হঠাৎই সুবীর জানিয়েছিল তার ভাললাগার কথা। সেদিনই সুনিপা হ্যাঁ বলে দিতে পারত কিন্তু তবু বলেছিল ভেবে দেখবে।

পরেরদিন সকালবেলাই সুনিপার তলব বিকালে দেখা করতে হবে, তখনি উত্তর দেবে। সুবীর অফিস সেরে হন্তদন্ত হয়ে এসেছিল বিকালে, সুনিপাও জানিয়েছিল তার মনের কথা, সেটা অবশ্যই হ্যাঁ বাচকই ছিল। সুনিপা আগেই কথায় কথায় জেনেছিল সুবীরের মা বাবা কেউ নেই, কোন এক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। সুবীর আসলে ওর বাড়ির কথা বেশি বলতে চায়না, মন খারাপ করে তো পুরানো কথা ভেবে, তাই এড়িয়ে যায় হয়তো, তবু সুনিপা জোর করায় একদিন বলেছিল এসব।

সুবীরের মন খারাপ হওয়ার কথা ভেবে আর কখন এসব কথা তোলেনি, যাঁরা নেই তাঁদের কথা তুলে কেন আর দুঃখী মানুষটাকে কষ্ট দেবে। আজ তাই সুবীর নিজে থেকে ওর বাড়ি যাওয়ার কথা বলতে প্রথমের কিছুটা অবাকই হয়েছিলো নিপা, সুবীর এই নামেই ডাকে সুনিপাকে, আদরের ডাক। তখন সুবীর নিজেই বলেছিল, “অবাক হচ্ছো কেন? তোমার সংসার তোমায়ই তো বুঝে নিতে হবে। একদিন নয় দেখেই এলে।”

সুনিপা,সুবীরের ফ্ল্যাটে এসে দেখল একদম সাজানো গোছানো ফ্ল্যাট, হবে নাই বা কেন, সেন্ট্রাল গভঃ-এর উচ্ছপদস্থ কর্মী সুবীর, আর্থিক সচ্ছলতা তো আছেই। প্রথমদিনেই এমন সাজানো সংসার দেখে সুনিপার নিজেকে খুব ভাগ্যবতী মনে হল। সুবীরের মত এমন সাজানো সংসারী ছেলে পাওয়া সত্যি ভাগ্যের ব্যাপার, এতো ভালো চাকরী করে তবু অহংকার নেই।এসব ভেবেই সুনিপার মনটা খুশিতে ভরে গেল। তারপর হঠাৎ যখন সুবীর জিজ্ঞাসা করলো, “সংসার পছন্দ হয়েছে তো? তোমার জন্য সব সাজিয়ে রেখেছি। কবে আসবে বলো।” তখন সুনিপা লজ্জায় রাঙা হয়ে গেছে, তবু বলেছিলো “খুব তাড়াতাড়ি।”

সুনিপা মা বাবার একমাত্র মেয়ে, সচ্ছল পরিবারে আদরে বড় হওয়া মেয়ে। তাই সুবীরের কথা যখন সে মা বাবাকে বলল তাঁরা বিশেষ কিছু বলেননি, আগে মেয়ের পছন্দটা যাচাই করতে চেয়েছিলেন, তারপর নয় কিছু বলা যাবে। পরের রবিবার যখন সুবীর এলো, তখন আর আপত্তি করার কথা মনেই আসেনি সুনিপার মা বাবার; এমন ভদ্র-নম্র ছেলে, বড়দের প্রতি কি সন্মান আর শ্রদ্ধা। এইরকম ছেলে আজকাল লাখে একটা মেলে। নিজেদের মেয়ের পছন্দের উপরে সুনিপার মা বাবার একটু গর্বই হল, আর সুবীরের যেহেতু কেউ নেই তাই পাকা কথা একপ্রকার তখনই সেরে নিলেন সুনিপার মা বাবা।

এখন দিনগুলো সুনিপার কাছে স্বপ্নের মতো যাচ্ছে, আর মাস দুই বাদেই ও আর সুবীর নতুন জীবন শুরু করবে, সুনিপার বাবা যদিও বলেছিল বিয়ের পর তাদের সাথেই থাকতে ওই ভারার ফ্ল্যাট ছেড়ে, কিন্তু সুবীর রাজি হয়নি। সুনিপারও ইচ্ছা ছিল না, হলই বা ভাড়া, কিন্তু তাদের নিজেদের সংসার হবে তো, আর সুবীর যথেষ্টই ভালো চাকরী করে, ও চাইলেই একটা ফ্ল্যাট কিনতে পারে, বিয়ের পর খুব শীগগির একটা ফ্ল্যাট কিনবেও বলেছে সুনিপার বাবা মাকে, ওনাদের মেয়ের কোন কষ্ট সুবীর হতে দেবে না, কথা দিয়ে গেছে। সুনিপা এখন সারাদিন শুধু তাদের নতুন সংসারের কথা ভাবছে। হাতে সময় তো বেশি নেই তাই এর মাঝে দু দিন বেরিয়েছিল দুজনে বিয়ের বাজার করতে। একদিন তো সুবীরের বাড়িও গিয়েছিলো আবার সুবীরের আবদারে, সংসারে আর কি দরকারি জিনিস লাগবে সেটা দেখে শুনে লিস্ট তৈরি করে দিতে হবে। সুবীর সব ঠিক করে সাজিয়ে গুছিয়ে এনে রাখবে যাতে সুনিপার এসে কোন কষ্ট না হয়।

দেখতে দেখতে বিয়ের দিন এসেও গেল, যদিও সুনিপার বাবার খুব ইচ্ছা ছিল ঘটা করে বিয়ের আয়োজন করার কিন্তু সুবীরের আপত্তি থাকায় সুনিপা ও বেঁকে বসে তাই বাধ্য হয়ে একটা ঘরোয়া অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই বিয়েটা হয়ে যায়। পরেরদিন সুনিপা নিজের নতুন বাড়িতে ঢোকে একরাশ নতুন স্বপ্নের ঝুলি নিয়ে। শাশুড়ি ননদের বালাই ছিলোনা তাই কাল রাত্রির বিরহও সইতে হল না, বউভাতের অনুষ্ঠান একটা হল কিন্তু ওই নিয়ম রক্ষা করতে যেটুকু করতে হয় ওইটুকুই তাও সুনিপার মায়ের জোরজবরদস্তি করার ফলে।

পরেরদিন সবাই চলে গেলো, সবাই বলতে সবই সুনিপার আত্মীয় আর সুবীরের অফিসের যারা এসেছিল তারা রাতেই চলে গিয়েছিলো। সবার শেষে সুনিপার মা বাবাও যখন উঠতে গেলো সুনিপার দুচোখ আর বাধ মানল না, নতুন স্বপ্ন মুহূর্তের জন্য হলেও হার মানল মায়ের আদর আর বাবার ভালবাসার কাছে। সুনিপা ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল মাকে, কিন্তু যেতে যে হবেই তাই মেয়েকে অনেক বুঝিয়ে বেরিয়ে পরলেন সুনিপার মা বাবা, মেয়ে তো পরের ঘরে জাবার জন্যই ঘরে আসে, অকারন মায়া বাড়িয়ে এখন আর কি হবে। মেয়ে জামাইকে তো তারা চেয়েছিলেন কাছে রাখতে, তারাই তো থাকতে চায়নি। এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে সুনিপার মা বাবা যখন বাড়ি পৌঁছলেন তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে। সুনিপাও তখন নিজেকে সামলে নিয়েছে অনেকটা, নিজের ছোটবেলার রান্নাবাটির সংসার দেখে মনটা যেমন ভালো হয়ে যেত এও যেন তেমন স্বপ্নের সংসার। সুনিপা বরের আর একটু কাছ ঘেসে এসে শুল,মা বাবা যাওয়ার পর খুব ক্লান্ত লাগছিল দুজনেরই তাই শুয়ে পরেছিল, যখন ঘুম ভেঙ্গেছিল তখন সন্ধ্যা, তবুও সুনিপা শুয়ে শুয়ে এসব ভাবছিল। সুবীরের ঘুম ভেঙে যাওয়ায় ভাবনায় ছেদ পরল, হাসি মুখে সুনিপা বলে উঠল, ‘উঠে পরেছ? দাঁড়াও চা করে আনি।’কিন্তু ততক্ষণে নিপা তার বীরপুরুষ বরের বাহুডোরে বাঁধা পরেছে। চা খাওয়া হল যদিও তবে সেটা ভালবাসার খেলা সাঙ্গ হওয়ার পর।

এক দুই করে স্বপ্ন ভরা দিনগুলো কাটছিল, এর মাঝে সুনিপা আর বাবা মায়ের কাছেও যায়নি, আজ হঠাৎ মনে আসায় তার নিজেরই লজ্জা লাগলো। নিজের সংসার পেয়ে সে মা বাবার কথা ভুলে গেলো কি করে, তাঁরা এতদিন ধরে তাকে মানুষ করলো আর সে এতো কাছে থেকে প্রতিদিন একবার ফোন করেই দায় সেরে ফেলছে! নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে লজ্জায় পরে গেলো সে। সুবীর অফিস চলে গেছে সেই নটার দিকে, এখন তার অখণ্ড অবসর, নিজের লাঞ্চও সেরে ফেলেছে। মা অনেকদিন ধরে যাওয়ার কথা বলছে, সুনিপাও অনেকবার সুবীরকে বলেছে, কিন্তু সুবীর নানা অজুহাতে এড়িয়ে গেছে। সুনিপা বুঝতে পারে মনে মনে, তাদের যে এই নিজেদের মধ্যে সময় কাটানো, আদর-ভালবাসা, এটার কোন ভাগীদার সুবীর চায়না, তাই হাজার বাহানা দেয়। সুনিপা ঠিক করলো আজ দুপুর দুপুর মায়ের কাছে যাবে দিয়ে সুবীর আসার আগেই চলে আসবে তাই আর সুবীরকে জানালো না, তৈরি হয়ে নিল বেরনোর জন্য।

কতদিন পরে মা বাবার সাথে দেখা, এই প্রথম নিজের ঘরে পরের মত করে আসা, এমনি হয়তো মেয়েদের জীবন। সুনিপার চোখ ছলছল করে উঠল, নিজের ঘর, নিজের বিছানা, নিজের হাতে সাজানো আলমারি, বইয়ের তাক, সবকিছু আজ পর। অনেকদিন পর এসে মা- বাবার সাথে কত কথা, কত মান অভিমান, সব যেন ঠেলে বেরিয়ে আসছে। কথার মাঝে হঠাৎই সুবীরের ফোন এলো, গম্ভীর গলার হ্যালো শুনে এক মুহূর্তের জন্য হলেও সুনিপার এই মানুষটাকে অচেনা লাগলো।

সুনিপা যখন বাড়ি এলো তখন সবে সন্ধ্যা ছটা, এতো তাড়াতাড়ি সুবীর কোনোদিনই ফেরেনা, আজই প্রথম এতো তাড়াতাড়ি এসেছে আর আজই সে নেই, সুনিপার নিজেরই খারাপ লাগলো। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে কলিংবেলটা বাজাল। দরজার খুলে ওপারে যে দাঁড়িয়ে সে যেন সুনিপার খুব অচেনা, চোখ মুখ লাল সুবীরের, রাগ যেন ফেটে বেরিয়ে আসছে।ঘরে ঢুকতেই সুনিপার চুলের মুঠি ধরে দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন করলো, “আমার চোখের আড়ালে কি করে বেড়াস তুই? আজ হাতেনাতে ধরা পরে মায়ের কাছে যাবার বাহানা দিচ্ছিস? তোর তলে তলে এতো বুদ্ধি? কি ভেবেছিস আমার চোখে ধুলো দিবি? আমায় ফাঁকি দেওয়া অতো সোজা না। তোর মত কত দেখলাম।” আরও অনেককিছু শব্দ কানে আসছিলো কিন্তু সেটা বোঝার ক্ষমতা তখন আর সুনিপার ছিল না।

সুনিপার জ্ঞান যখন এলো তখন চারপাশ বেশ অন্ধকার। প্রথমটায় তার কিছুই মনে পড়ছিল না তারপর হঠাৎ মনে পরে গেলো সব এক এক করে, একটা মানুষ কে হিংস্র জানয়ারে পরিবর্তিত দেখা, তিলে তিলে সাজানো স্বপগুলো কে এক লহমায় ভেঙে যেতে দেখা, সব মনে পড়ছিল সবকিছু ধীরে ধীরে। মাথাটায় অল্প অল্প ব্যথা হচ্ছে, হাত দিয়ে দেখল চটচট করছে, জমাট বাঁধা রক্ত। আস্তে আস্তে উঠে বসলো সুনিপা, জানালার কাঁচের আবছা আলোয় মনে হল তার সদ্য ভেঙে যাওয়া চেনা সংসার নয় এটা, অন্য কোন জায়গা, সুনিপা চারপাশ দেখেও কিছুতেই চিন্তে পারলো না

হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল, চোখে হঠাৎ আলো লাগায় মুহূর্তের জন্য সুনিপার চোখ ধাঁদিয়ে গেলো তারপর দেখতে পেল সুবীরকে, কাল অব্দি যাকে ভগবান ভাবতো সেই হিংস্র শয়তান এখন তার সামনে। শান্ত হাসি মুখের সুবীর, তার খুব চেনা সুবীর কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। সুনিপা চারপাশটা আলোতে একবার আলতো করে দেখল, একটা পুরানো আসবাবের গুদাম ঘর, পুরানো কাঁসার বাসনও কিছু রাখা এখান সেখান করে, সে ভয়ার্ত কণ্ঠে কোনোরকমে জিজ্ঞাসা করলো, “এটা কোন জায়গা?” সুবীর হঠাৎ তার স্বভাবসুলভ হাসি হাসল যেটা আগে সুনিপার প্রান খোলা হাসি লাগত র এখন যেটা পৈশাচিক হাসি লাগছে, হাসি থামিয়ে বলল, “এই তো তোমার আসল শ্বশুরবাড়ি, আমার বাবার বানানো বাড়ি।”

সুনিপাকে আলতো করে ধরে জানলার কাছে নিয়ে গেলো সুবীর, যেমন করে ধরত আদরের সময়, কিন্তু সেই ছোঁওয়া আজ সুনিপার হার হিম করে দিল। জানলার কাছে গিয়ে সুনিপা দেখল বিশাল একটা বাগান, তাতে এক দুই তিন করে সারে সারে লাল গোলাপের গাছ, লাল রক্তের মতো গোলাপ ফুটেছে কয়েকটা গাছে, কিছু গাছে সবে কুঁড়ি এসেছে।

এতো খারাপের মধ্যেও আলতো একটা হাসি সুনিপার ঠোঁট ছুঁয়ে গেলো মুহূর্তের জন্য, অতো সুন্দর গোলাপ বাগান দেখে। যদিও মুহুরতের জন্য ছিল হাসি টা, তবু সেটা সুবীরের নজর এড়ায়নি। সে মুখে তার চির পরিচিত আলগা হাসিটা ঝুলিয়ে বলল, “আমার বাবার গোলাপের শখ ছিল, কিন্তু বেশি গোলাপ পায়নি তো। আমি বাবার ছেলে, বাবার শখ পূরণ করা তো ছেলের কর্তব্য, তাই আমি বাবার জন্য গোলাপ নিয়ে আসি আর ওই খানে পুঁতে দি।”

সুনিপা মোহিত হয়ে বাগানের দিকে তাকিয়ে ছিল ওমনি নিস্তব্ধতা ভেঙে সুবীর আবার বলল, “ওই দেখো, একেবারে কোনে যে গোলাপ গাছটা, ওটা আমার মা।” কথাটা সুনিপার কানে বজ্রাঘাতের মতো লাগলো, সে নিজের অজান্তেই জিজ্ঞাসা করে উঠল, “মানে?” সুবীর বলল, “হ্যাঁ তো, মা তো বাবার বন্ধু অশোক কাকুর সাথে চলে গিয়েছিলো। তখন আমি বারো বছরের, কত খুঁজলাম আমরা, শেষে মায়ের বিছানার পাশ থেকে মায়ের লেখা চিঠি পেয়েছিল বাবা, তখনই জানতে পারলাম মা নিজে নিজে চলে গেছে। দুদিন পর মা আবার ফিরে এসেছিল। এসেই মা কান্না শুরু করেছিল বাবার পা ধরে, ক্ষমা চাওয়ার জন্য।” এতটা বলে সুবীর থামল, সুনিপা শূন্য দৃষ্টি নিয়ে ভয়ানক কিছুর অপেক্ষায় গল্প শুনে চলেছে।

সুবীর আবার বলা শুরু করলো, “মা তো গাছ ভালো বাসত না, তাই বাগানে একটাও গাছ ছিল না আমাদের। মা আর কখনো ফিরবে না সেটা আমরা ধরে নিয়েছিলাম, যেদিন মা এলো সেদিন সকালেই বাবা বাজার থেকে একটা গোলাপ গাছ এনেছিল, মা যখন বাবার পা জড়িয়ে ধরেছে তখন বাবা গাছ লাগাবার জন্য মাটি খুঁড়ে ফিরছিল। মা ক্ষমা চাওয়ায় বাবা বলেছিল, মেয়েরা হচ্ছে ফুলের মতো, এদিক ওদিক করলে তো নোংরা হবেই, কিন্তু এবার আর আমি কোথাও যেতে দেব না, তোমায় আমার কাছেই রেখে দেব, আর কোথাও যেতে দেব না। তারপরই মাটি খোঁড়ার নিড়ানিটা মায়ের মাথায় বসিয়ে দিল। মায়ের মাথা থেকে গলগল করে রক্ত বেরচ্ছিল। বাবা খুব শান্ত ভাবে মা কে নিয়ে গেলো ওই গর্তে শুইয়ে দিল, তারপর গোলাপ গাছটা বসিয়ে দিল।” তারপর সুনিপার ভয়ার্ত মুখের খুব কাছে এসে বলল, “দেখো, মা চুপ করে দাঁড়িয়ে, শিকলে বেঁধে দিয়ে গেছে বাবা, কোথাও যাওয়ার উপায় নেই।”

তারপর আবার জানলার কাছে গিয়ে বলল, “তারপরের দিনই বাবা হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলেন। বাবার সখের বাগানটা আর করে যেতে পারলো না। আমি তাই একে একে এই গাছগুলো খুঁজে খুঁজে এনে লাগিয়েছি। বাবার স্বপ্নের বাগান কত ভরে গেছে দেখো। ওরা সব গোলাপ, সবগুলো তোমার মতই আমার চোখে ধুলো দিতে চাইছিল, আমি তাই বাবার মতো সবাইকে শিকলে বেঁধে ফেলেছি, আর আমায় ছেড়ে চাইলেও কোথাও যেতে পারবে না।”

সুনিপা আস্তে আস্তে অবস্থাটার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছিল, তাকে খুব তাড়াতাড়ি মাথা ঠাণ্ডা করে কিছু করতেই হবে, বাঁচতেই হবে তাকে। সুবীর আপন মনে বলে চলল, “ওই কোনে, ওই দেখো, ঐযে রাখা নতুন গোলাপ গাছটা ওটা তুমি।” হঠাৎ সুবীরের মাথায় খুব জোরে কিছুর ধাক্কা লাগলো, সুবীর পরে যাওয়ার আগের মুহূর্তে দেখল, সুনিপার হাতে বাবার সেই নিড়ানি , বাবার শখের বাগানের, শখের নিড়ানি, তার নতুন টাটকা গোলাপের হাতে, সুবীর অজ্ঞান লুটিয়ে পরল মাটিতে।

সুনিপা ভারী শরীরটা আস্তে আস্তে টেনে বাগানে নিয়ে এলো, তখনও প্রান আছে সুবীরের শরীরে। অনভ্যস্ত হাতে একটু একটু করে মাটি খুঁড়ল মা-বাবার আদরের মেয়ে সুনিপা। শয়তানের এলিয়ে যাওয়া শরীর কে ঠেলে নামিয়ে দিল পাতালঘরে, তার উপরে বসিয়ে দিল সুনিপার জন্যই আনা নতুন গোলাপ চারা। সুনিপার নরম ঠোঁটে সে এক পৈশাচিক আনন্দ, সে বাকি সব গোলাপ গাছকে উপড়ে ফেলে দিল। আজ সুনিপা সব গোলাপের কাঁটা হয়ে তাদের মুক্তি দিয়েছে ওই হিংস্র শয়তানের হাত থেকে, পূরণ করেছে তাদের শখ, কোন শিকল নেই আজ আর তাদের পায়ে।

আজ থেকে এই বাগান তাদের, তাদের শখের বাগান, ইচ্ছাপূরণের ঠিকানা।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.