প্রতিশোধ


বাবাকে কোনদিন কাঁদতে দেখেনি সৃজা।ছোটবেলা থেকে কম ঝড়তো যায়নি সৃজাদের উপর!মা যখন মারা যায় তখন সৃজার কতই বা বয়স!এই নয় দশ।তবু সেদিনের কথা স্পষ্ট মনে আছে সৃজার।স্কুল থেকে ফিরে সেদিন অনেক ডাকাডাকির পরেও কিছুতেই দরজা খুলছিল না মা।প্রতিদিন তো সৃজা আসার অনেক আগে থেকেই দরজা খুলে রাখে মা।তবে আজ কী হল?এদিকে সৃজার গলার আওয়াজ পেয়ে আশপাশ থেকে একজন দু'জন করে লোক জড়ো হতে শুরু করেছে সৃজাদের বাড়ির সামনে।এদের মধ্যেই কেউ একজন বাবাকে ফোন করে দিয়েছিল।কিছুক্ষণের মধ্যে বাবাও চলে এল।ততক্ষণে ভীড় জমে গেছে বাড়ির সামনে।বাবা আসার পরই সবাই দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকলো।আর ঢুকেই হু হু করে কেঁদে উঠলো পাড়ার কাকিমা জ্যাঠিমারা।সৃজাও ছুট্টে চলে এল তাদের শোবার ঘরে।কিন্তু এ কি!উফ!..........সে দৃশ্য আজও ভুলতে পারেনি সৃজা!একঝলক দেখেছিল সে দৃশ্য!কী ভয়ানক দৃশ্য!ফ্যান থেকে ঝুলছে মায়ের দেহটা।সেদিনও বাবার চোখে একফোঁটা জল দেখেনি সৃজা ।বরং এক অদ্ভূত আগুন দেখেছিল বাবার চোখে।তারপর পুলিশ,আইন,আদালত সবকিছু বাবা সামলেছে একা হাতে।তখন রাতের পর রাত বাবাকে জেগে থাকতে দেখেছে সৃজা।

রাতে ঘুম ভেঙে গেলে সৃজা দেখতো অস্থির ভাবে বাবা পায়চারি করছে ঘরময়।মা মারা যাওয়ার পর সৃজার স্কুলে যেতেও ইচ্ছা করতো না।যতটা না কষ্টে তার চেয়ে বেশী ভয়ে।স্কুলে গেলেই কৌতুহলী বন্ধুরা প্রশ্ন করতো,'এই সৃজা, তোর বাবা তোর মাকে মেরে ফেলেছে না রে?'শান্ত সৃজা কোন উত্তর দিতে পারত না,শুধু কাঁদত।সে বুঝতে পারতো না সবাই তার বাবাকে খুণি ভাবছে কেন?বাবাকে একদিন সেকথা জিজ্ঞেসও করেছিল সৃজা।বাবা বলেছিল,'সত্যিটা একদিন সবাই জানতে পারবে দেখিস সৃজা।আমার উপর ভরসা রাখিস মা।তুই আমাকে ভুল বুঝলে আমি যে আর বাঁচতে পারব না রে।তোর মাকে আমি তোর কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারি বল?'

বাবার গলা ধরে এসেছিল কিন্তু চোখে ছিল সেই আগুন।বাবাকে জড়িয়ে ধরে অবুঝ সৃজা জিজ্ঞেস করেছিল

-' মা কেন মরে গেল বাবা?কেন তোমাকে ছেড়ে আমাকে ছেড়ে আকাশের তারা হয়ে গেল মা?'

-'তুই একটু বড় হ ।সব বলব তোকে।তোকে যে বলতেই হবে সব কথা।'

বাবা বুকে টেনে নিয়েছিল ছোট্ট সৃজাকে।

তারপর কত ঝড় বয়ে গেছে।সাক্ষী দিতে আদালতেও যেতে হয়েছিল ছোট্ট সৃজাকে।তখনও বাবাকে এতটুকু ভেঙে পড়তে দেখেনি সৃজা।এসময় মামাবাড়ীর দাদু দিদা এসে দাঁড়িয়েছিল বাবার পাশে।শেষে একদিন সেই দুঃখের দিনও কেটে গেল।সৃজারা তাদের পুরনো বাড়ি ছেড়ে চলে এল এই নতুন শহরে,এই নতুন বাড়িতে।

সত্যি!সময় কত তাড়াতাড়ি চলে যায়! সেদিনের সেই শান্তশিষ্ট সৃজা আজ একজন ক্রিমিনাল ল'ইয়ার।পরিস্থিতি কত বদলে দেয় মানুষকে!নাহলে কে ভেবেছিল সেদিনের সেই মুখচোরা মেয়েটা একদিন তুখোড় ল'ইয়ার হয়ে উঠবে!

ইতিমধ্যেই বেশ নামডাক হয়েছে তার।কিন্তু মায়ের মৃত্যুটা এখনও ধোঁয়াশাই রয়ে গেছে।কেন করেছিল মা আত্মহত্যা?বাবাকে বহুবার একথা জিজ্ঞেস করেছে সৃজা।প্রতিবারই বাবা বলেছে,'এখনও সময় আসেনি সৃজা।ঠিক সময়ে তুমি সব জানতে পারবে।এখন নিজের কেরিয়ারে মন দাও।মনে রেখো,তোমার মাকে ন্যায়বিচার তুমিই দিতে পারবে।আর সেজন্য তোমাকে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে।'

কথাগুলো বলার সময় বাবার চোখে ফুটে উঠতো সেই আগুন।এমনিতে পড়াশোনার ক্ষেত্রে বাবা কখনও জোর করেনি সৃজাকে।শুধু উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর বলেছিল,'এখান থেকেই তোমাকে লক্ষ্য স্থির করতে হবে সৃজা।তোমার মায়ের দোষীদের শাস্তি দিতে এখান থেকেই শুরু করতে হবে তোমাকে।বল,এরপর কী পড়তে চাও তুমি?'

উত্তর সৃজার ঠিক করাই ছিল।আর তার উত্তর শুনে বাবার মুখে অনেকদিন পরে একটা প্রশান্তির ছাপ দেখেছিল সৃজা।

আজ সে ক্রিমিনাল ল'ইয়ার।কিন্তু আজও বাবা বলেনি তার মায়ের মৃত্যুর রহস্য।সৃজাও কিছু জিজ্ঞেস করেনি।সে জানে সময় এলে বাবা নিজেই বলবে সে কথা।

পড়ার টেবিলে বসে এসবই ভাবছিল সৃজা।এখন অনেক রাত।প্রায় ১টা বাজে।হঠাৎ বাইরে বাবার গলার আওয়াজ পেয়ে চমকে উঠল সৃজা।

-'বাবা! এখনও ঘুমাওনি তুমি?'

-'তুইও তো ঘুমাস নি।আয়,বাপ বেটিতে মিলে আজ একটু গল্প করি।'

বারান্দার চেয়ারে এসে বসল সৃজারা।সামনে গাঢ় অন্ধকার।দূর থেকে ভেসে আসছে ল্যাম্পপোষ্টের আলো।

-'আচ্ছা সৃজা,তোর মায়ের কথা শুনতে খুব ইচ্ছে করে না রে?'

সৃজা কিছু বলেনা।বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকে।আবছা আলোয় বাবার মুখে যেন এক চিলতে হাসি দেখতে পায় সৃজা।

-'তোর মা জানিস একদম তোর মতই ছিল।শান্তশিষ্ট লাজুক।কারো দিকে মুখ তুলে তাকাতো না।প্রথম তোর মাকে আমি দেখি কলেজে।আস্তে আস্তে আমাদের বন্ধুত্ব হয়।তারপর আমরা একে অপরকে ভালোবাসতে শুরু করি।সে দিনগুলো স্বপ্নের মতো ছিল জানিস!দুজন দুজনের দিকে তাকিয়েই গঙ্গার ধারে কত বিকেল কাটিয়ে দিয়েছি আমরা।তোর মা খুব ভালো গান গাইতো জানিস!সেবার কলেজের ফেস্টে একরকম জোর করেই তোর মায়ের নামটা দিয়ে দিয়েছিলাম আমি।এখন বুঝতে পারি কী ভুল সেদিন করেছিলাম!ঐ ফেস্টেই তোর মাকে প্রথম দেখেছিল এম এল এ রমাকান্ত নিয়োগীর লম্পট ছেলে রকি।তারপর থেকেই নানারকমভাবে কুপ্রস্তাব পাঠাত সে তোর মায়ের কাছে।তারপরতো রীতিমতো ধমকি দিতে শুরু করলো তোর মাকে!সহ্য করতে না পেরে একদিন তোর অমন শান্তশিষ্ট মাও জীবনের চরম ভুলটা করে বসল।সজোরে একটা চড় লাগিয়ে বসল জানোয়ারটার গালে।ঠিক সেই মুহূর্তে আমি চলে আসায় তখনের মতো পরিস্থিতি আয়ত্তে আসলেও আমি জানতাম অতো সহজে এত বড়ো অপমান রকি কিছুতেই হজম করবে না।হলও তাই।সেইদিনই সন্ধ্যাবেলায় গানের ক্লাস থেকে ফেরার সময় ও তুলে নিয়ে গেল তোর মাকে।এদিকে তোর দাদু দিদিমা তো চিন্তায় অস্থির হয়ে আমাকে ফোন করল।অনেক খোঁজাখুঁজি,থানা পুলিশ করার পর পরদিন সকালে আমার বাড়ির সামনেই পাওয়া গেল তোর মায়ের অর্ধনগ্ন,ধর্ষিত,অচৈতন্য দেহটা।'

বাবার গলাটা কেঁপে গেল।থামল কিছুক্ষণ।

সৃজারও গলার কাছে পাকিয়ে উঠছে কান্না।

আস্তে আস্তে রাত শেষ হয়ে আসছে।

অস্ফুটে সৃজা বলে উঠলো 'তারপর? '

-'তারপর যে কি কষ্টে আমরা তোর মাকে সামলেছি সে শুধু আমরাই জানি।কোনো সাজা হয়নি ঐ শয়তানটার।হবে কি করে?ওর বাবা যে এম এল এ!কত ক্ষমতা,কত প্রতিপত্তি তার!ধীরে ধীরে আমরা চেষ্টা করছিলাম তোর মাকে স্বাভাবিক করতে ।ওকে খুশি রাখতে,আনন্দে রাখতে সবসময় চেষ্টা করতাম আমরা।তারপর ঠিক করলাম বিয়েটা এক্ষুনি সেরে নেব।তাহলে কিছুটা হলেও শান্তি পাবে তোর মা।কিন্তু সে কিছুতেই রাজী হলো না বিয়ে করতে।সেসময়ও বেশ কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল তোর মা।বারবার বোঝানোর পর অবশেষে রাজী হতে বাধ্য হল সে।আস্তে আস্তে স্বাভাবিকও হয়ে আসছিল ও।তারপর আমাদের বিয়ে হল।তুই হলি।আবার সুখ ফিরে এল আমাদের জীবনে।তুই এসে সব পাল্টে দিলি।তুই ছিলি আমাদের নয়নের মনি।তারপর এল সেই অভিশপ্ত দিন।সেদিন তুই স্কুলে চলে যাওয়ার পর,আমি অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার পর বাড়িতে এসেছিল সেই রকি।তোর মা সুখে আছে,আমরা সুখে আছি এটা ও কিছুতেই সহ্য করতে পারছিল না।ও তোর মায়ের সেই সেদিনে তোলা কতকগুলো অশ্লীল ছবি দেখিয়ে ব্ল্যাকমেল করেছিল তোর মাকে।বলেছিল ও সেসব ছবি তোকে দেখাবে।দেখিয়ে বলবে তোর মা কতটা নোংরা!আর যদি তোর মা চায় যে ও সেটা না করুক তবে যেনো ওর কুপ্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়।এসব কথা তোর মা আমাকে ফোনে বলেছিল।আমি ব্যস্ত থাকায় বলেছিলাম যে বাড়ি ফিরে এ ব্যাপারে কথা বলবো আমরা।কিন্তু সেই ধৈর্য্যটাই ধরতে পারেনি তোর মা।শেষ করে দিয়েছিল নিজেকে।'

বাবা থামলো।অন্ধকারে সৃজা ঠিক বুঝতে পারছিলো না বাবার চোখে জল এসেছে কি না!সৃজার দু'চোখে তখন নেমেছে বৃষ্টি।

-' সৃজা,তুই পারবি না ঐ খুণি ধর্ষকটাকে সাজা দিতে?ও নিজেই এখন ওখানকার এম এল এ হয়ে বসেছে।তোকে যে ওকে সাজা দিতেই হবে!'

চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে সৃজার।

-' পারবো বাবা। ওকে সাজা আমি দেওয়াবই।'

উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বাবার মুখ।

-' তবে আয়।এতোদিন ধরে ওর বিরুদ্ধে একটু একটু করে সমস্ত তথ্য প্রমাণ আমি সংগ্রহ করে রেখেছি।ওগুলো কাজে লাগবে তোর।'

সদ্য ভোর হয়েছে তখন।নবীন সূর্য জানান দিচ্ছে একটি নতুন দিনের সূচনা।এ সূচনা মায়ের অপমানের বিরুদ্ধে সৃজার যুদ্ধের।তৈরী হয়ে নেয় সে।আবার নতুন করে ওপেন করে প্রতিপত্তির চাপে বন্ধ হয়ে যাওয়া মায়ের ধর্ষণ কেস।

লড়াইটা সহজ ছিলো না।কিন্তু শেষ মেশ আবারও একবার জয় হল সত্যের।

জজসাহেবের রায় শুনে এই প্রথম বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়েন সৃজার বাবা।এতদিনের জমাটবাঁধা কষ্ট ভেসে যায় চোখের জলের ধারায়।

*************

সেদিন অনেক রাতে সৃজার ঘরের আলো নিভে যাওয়ার পর সৃজার বাবা এসে দাঁড়ান সৃজার মায়ের বিশাল ফটোটার সামনে।

-' শুনছো! আজ আমি সত্যি সত্যি জিতে গেছি গো।তোমার দোষীরা শাস্তি পেয়েছে।ঐ রকি শাস্তি পেয়েছে। আর কে ওকে শাস্তি পাইয়েছে জানো?..............ওর নিজের মেয়ে।হ্যাঁ গো হ্যাঁ,সৃজা,ঐ শয়তানটার অত্যাচারের ফসল,ওর নিজের সন্তান শাস্তি দিয়েছে ওকে।নিজের বাবাকে শাস্তি দিয়েছে সৃজা।আহ! কি শান্তি! কেউ জানেনা একথা।আর আজ থেকে আমিও চিরদিনের মতো ভুলে গেলাম এ সত্য।সৃজা শুধু আমার মেয়ে।শুধু আমার.......'


::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.