ঝংকার

তাথৈ এর যখন তিন বছর , তখনই প্রথম ওর নাচের স্কুলে যাওয়া... ছোট্ট দুটো পা এ ঘুঙ্গুর বেঁধে কত্থকের বোলে তাল মেলানো.. মোটেও সহজ কাজ না.. কিন্তু তাথৈ এর কাছে সেটা খুব কঠিন ছিল না !! নাচটা যেন ওর খুব নিজের, সেই তিন বছর বয়স থেকেই... প্রথম যেই দিন ও ওদের স্কুলে নাচের কম্পিটিসন এ পার্টিসিপেট করলো, তখন ক্লাস ওয়ান.. তাথৈ এর মার তো সারা রাত টেনসন এ ঘুমই আসেনি... মেয়ে কি করবে কালকে!! স্কুলে সবার সামনে যদি নার্ভাস হয়ে যায়!! বাবারও একই অবস্থা.. মেয়ে প্রথম স্টেজ এ সবার সামনে নাচবে.. ক্যামেরায় রিল ভরে সে রেডি.. তাথৈ এর নাচের প্রত্যেকটা মুহূর্তকে পারলে ক্যামেরায় সাজিয়ে রাখে!!... আর কি অদ্ভুত, ওই টুকু মেয়ে স্টেজ এ অত লোকের সামনে নার্ভাস হওয়া তো দূরে থাক, উল্টে ক্লাস ফোর এর দুটো মেয়েকে কম্পিটিসন এ হারিয়ে ফার্স্ট হয়ে গেল... সেই মেডেলটা আজও যত্ন করে আলমারিতে রাখা.. তাথৈ এর প্রত্যেকটা শিরায় যেন নাচ.. ওর আনন্দে ,ওর দুঃখে, ওর সব অনুভূতি গুলোতে নাচ.. তাল, ছন্দ, ঘুঙুরের আওয়াজ যেন সব সময় ওকে ঘিরে থাকে... নাচকে এত ভালবাসে বলেই উচ্চ মাধ্যমিকের পরই ঠিক করলো নাচ নিয়েই পড়বে... সেই মতই রবীন্দ্রভারতীতে admission ... কত্থকের ওপর মাস্টার্সটাও করলো.. আর তারপরই শুরু করলো নিজের নাচের স্কুল, 'ঝংকার'................. তাথৈ এর জীবনটা বেশ একটা সুন্দর লয়েই চলছিল... সবটাই প্ল্যান মতন .. এই সময়ই একটা নাচের ফাংসন এ গিয়ে ওর আলাপ হলো রক্তিম এর সাথে.. রক্তিম, পেশায় ইঞ্জিনিয়ার.. কিন্তু সেই দিন অফিস ছেড়ে বন্ধুর সাথে সংস্কৃতি চর্চা করতে এসেছে.. না, নাচে বিশেষ ইন্টারেস্ট নেই, আসলে বন্ধু খুব জোরাজুরি করে ঠেলে ধাক্কেই ওকে এনেছে,... সেই বন্ধুর বোনও নাচবে আজ ফাংসন এ.. শুরু থেকেই রক্তিম বেশ বোরই হচ্ছিল এখানে.. নাচ, তাও আবার ক্লাসিকাল .. ওর মাথার ওপর দিয়েই চলে যাচ্ছিল পুরো ব্যাপারটা.. যতক্ষণ না তাথৈ কে দেখল!!!.. তাথৈ এর নাচ,ওর ঘুঙুরের আওয়াজ,ওর চোখের চাওনি সবটাই রক্তিমকে রাঙিয়ে দিল... বন্ধুর বোনের থ্রু দিয়ে আলাপটাও করে ফেলল.. এমনিতে তাথৈ প্রথম আলাপে কারোর সাথে বেশি কথা বলে না,কিন্তু রক্তিমের সাথে কিছু কথা আপনাআপনিই চলে আসছিল.. ওকে দেখে মনে হয়েছিল, "ছেলেটার মধ্যে বেশ একটা পার্সোনালিটি আছে..".. সেই প্রথম দিনের আলাপের পর থেকে ওদের কথা প্রত্যেক দিন যেন বেড়েছিল, ফোন এ মেসেজ, রাত জেগে call , শনি রবিবার গঙ্গার ধারে, পার্কে দেখা, আর অনেক কথা... রক্তিমের নাচের প্রতি ইন্টারেস্ট না থাকলেও তাথৈ এর প্রতি খুবই ইন্টারেস্ট ছিল.. তাই নিজেই যেচে পরে এক ধাপ এগিয়ে বিয়ের কথা বলেছিল...তাথৈও রাজি ছিল.. প্রথম দিন থেকেই রক্তিমকে ওর আলাদা লেগেছিল..কেন লেগেছিল তার কারণ কখনো খোঁজেনি.. বিয়ের এক মাস খুব সুন্দর ছিল.. হানিমুনে ওরা শিমলা গিয়েছিল.. পাহাড় তাথৈএর খুব প্রিয়.. মেঘ কুয়াশার দেশ তো,তাই.. কিন্তু তাল কাটল যেই দিন ঝংকারে ওর নাচের ক্লাস নিতে যাওয়ার ছিল.. বিয়ের পর প্রথম স্কুল খুলবে সেইদিন.. এমনিই মনটাতে একটা আলাদা আনন্দ ছিল.. কিন্তু যেই বাড়ির গেট এর বাইরে পা রাখবে তখনি রক্তিমের মা হঠাৎ একটা প্রশ্ন করলো, "বৌমা,তুমি কি বিয়ের পরও নাচের স্কুল টুল করবে না কি ? এই রকম কি কথা ছিল!!" হঠাৎ এই রকম একটা প্রশ্ন,সত্যি expect করেনি তাথৈ , " কেন মা..এখন এই কথা বলছ.. আমি তো বিয়ের আগে থেকেই এই স্কুল টা চালাই..সেটা তো তুমি জানতে..." "হ্যাঁ, কিন্তু সেটা বিয়ের আগে ছিল.. বিয়ের পর বাড়ির বউ ঘুঙ্গুর পরে ধেই ধেই করে নাচবে সেটা ভাবিনি.." কেমন যেন থম মেরে গিয়েছিল তাথৈ.. এই ভাবে বলল!! নাচ করাটা যেন পাপ করা... আজ অব্দি ওর নাচ নিয়ে কেউ কখনো ওকে এই সব কথা বলেনি... আর যদি নাচ পছন্দই না তাহলে ছেলের বিয়ে দিল কেন ওর সাথে!!! প্রথমে কেন কিছু বলল না.. সেই দিন রাতে হাজারটা প্রশ্ন নিয়ে ও রক্তিমের দিকে তাকিয়েছিল.. উত্তরও পেয়েছিল একটা, " আসলে মা ,আমি দুজনেই ভেবেছিলাম যে নাচটা তোমার hobby ... বিয়ের আগে তো সবাই একটু আধটু নাচে, গান গায়.. কিন্তু বিয়ের পর বাড়ির বউ প্রত্যেক সপ্তাহে নাচ শেখাতে যাবে, ফাংসন এ বাইরের লোকেদের সামনে নাচবে , এই সব মা কি করে মানবে!! বাড়ির তো একটা আলাদা সম্মান আছে.. আমি বলছি না তোমাকে বাড়িতে বসে থাকতে.. I suggest তুমি বিজনেস কর..আমি টাকা ইনভেস্ট করব.. আর ওই নাচের স্কুলটাও চালাও.. কোনো একটা নাচের টিচারকে তুমি ঠিক করো.. সে গিয়ে নাচ শিখিয়ে দেবে.. তাকে একটা monthly salary দিয়ে দেয়া হবে , ব্যাস.." ব্যাস..কি সহজ রাস্তা বলে দিল রক্তিম.. কয়েক মিনিটে ও সব সমস্যার সমাধান করে দিল.. তাথৈ এর মুখে আর কোনো কথা নেই..শুধু চোখটা জলে থৈ থৈ করছে.. একে ভালবেসেছিল!! একে নিজের ভেবেছিল!! যে নাচ আর ব্যবসাকে এক চোখে দেখে.. না..তাথৈ কোনো ব্যবসা খোলেনি.. নাচের কোনো টিচার রাখেনি.. প্রত্যেক সপ্তাহে নিজে যেত নাচ শেখাতে.. মাথা উঁচু করে.. নাচ ওর অহংকার... তাতে যদি কেউ লজ্জা পায় ,সেটা তার প্রবলেম.. সেই নিয়ে ওর মাথা ব্যথা নেই... হ্যাঁ,সেই জন্য বাড়িতে রোজ ঝামেলা হোত... রক্তিমের মা একটা সুযোগ কখনো ছাড়তো না তাথৈকে কথা শোনানোর..যেমন সেই দিন বাড়িতে গেস্ট এসেছিল...সেই এক ঘর লোকের মাঝে রক্তিমের মা বলল, " বৌমা আমার মমতা শংকর , নেচে সারা বিশ্ব উদ্ধার করবে, আগে যদি জানতাম এই সব ন্যাকামির কথা!!..কত ভালো ভালো সম্বন্ধ এসেছিল ছেলের জানেন..কিন্তু সবই কপাল....".................... রক্তিমও ঘরে ছিল সেই দিন.. সে নির্বাক শ্রোতা... বরং রক্তিম রোজ সকালে আর সন্ধ্যে বেলা একবার করে রিমাইন্ডার দেয়, "মার বয়স হয়েছে.. কি বা এমন চায় মা তোমার থেকে...আর তোমার মতন নাচিয়ে অনেক আছে কলকাতায়..তুমি নয় একটু ঘর সংসারই করলে,...তাতে এই সমাজের কোনো ক্ষতি হবে না.."......... এই সব কথায় এখন তাথৈ এর সয়ে গেছে... যত এরা বলে তত ওর জেদ চাপে, না..নাচ ও ছাড়বে না.. এদের সামনে নাচ শেখাতে যাবে..এটাই ওর জবাব.. সেই দিনও নাচের স্কুল এ যাবে বলে রেডি হয়েছিল.. দিন টা ছিল রবিবার..রক্তিম বাড়িতে.. ওর মুখ হাঁড়ি..বউ নাচতে যাচ্ছে তো,তাই.. তাথৈ রক্তিমের সামনে দিয়েই বেরিয়ে গেল.. সিঁড়ির ওপারেই দরজা.. আর তারপরেই মুক্ত বাতাস..যেখানে ছন্দ আছে,তাল আছে, বোল আছে.. কিন্তু না, সেই দিন আর দরজাটা পেরোতে পারল না তাথৈ, সিঁড়িটা পিছল ছিল... তেলতেলে.. তাথৈ বোঝেনি..নিজের তালে নামছিল.. পা টা স্লিপ করে গেল.. প্রায় ১০ টা সিঁড়ি গড়িয়ে সোজা মাটিতে..তারপর আর কিছু মনে নেই.. যখন জ্ঞান ফিরেছিল তখন হাসপাতালে..পায়ে প্লাস্টার..ডাক্তারের কথাটা কানে ভেসে এসেছিল, "পা এর লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেছে.. হাঁটতে সময় লাগবে অনেক.. আর নাচটা আর এ জীবনে সম্ভব না.." সেই দিন তাথৈ হেরে গিয়েছিল.. ভেবেছিল ভাগ্য হারিয়ে দিল.. ওর কাছ থেকে ভাগ্য নাচ নিয়ে নিল.. বা বলা যায় ওর জীবনের তাল,ছন্দকে কেড়ে নিল.. কিন্তু সিঁড়িতে অতটা তেল এলো কি করে!! রোজ ,সকাল থেকে সন্ধ্যা শুধু এই কথাটাই মনে হোত.. বাড়িতে তিন জন কাজের লোক থাকায় সিঁড়িতে অতটা তেল পরেছিল আর কেউ দেখল না!!.......... বার বার মনে হোত যে এটা কেউ ইচ্ছে করে করেনি তো!! আবার মনই উত্তর দিত, না না এরা এত খারাপ হবে না... এক্সিডেন্ট এর পর দু বছর কেটে গেছে.. পা এর যন্ত্রণা টা এখন অনেক কম.. হাঁটতে গেলে আর স্টিক নিতে হয় না.. কিন্তু মনের যন্ত্রণাটা আজও একই..আজও তাথৈ যেন ওই এক্সিডেন্ট এর দিনটায়..কিন্তু আজ ওই দরজা টা ওর কাছ থেকে অনেক দূরে..ওই দরজাটা পেরোনোর শক্তি আজ ওর নেই.. সেই দিন এই সব ভাবতে ভাবতেই রক্তিমের মায়ের ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল.. কিন্তু হঠাৎ চোখটা ওই আধভেজা দরজার দিকে চলে গেল.. বাড়ির কাজে মেয়ে মিনা কে রক্তিমের মা একটা টাকার বান্ডিল দিচ্ছে, কেমন যেন লুকিয়ে.. এত টাকা!! এই কাজের মেয়েকে দিচ্ছে!! তাও রক্তিমের মা!! যে এত হিসেবী..হঠাৎ কি মনে হলো তাথৈ মিনাকে আলাদা ডেকে জিজ্ঞাসা করলো কি ব্যাপার.. প্রথমে মিনা চুপই ছিল, কিন্তু তাথৈ টাকা দেবে শুনে সবটা মুখস্ত বলে দিল... সেই দিনের সেই এক্সিডেন্ট টা ইচ্ছে করেই হযেছিল..রক্তিমের মা-ই তেলটা ঢেলেছিল সিঁড়িতে.. ভেবেছিল কেউ দেখেনি..কিন্তু মিনার চোখ সেই ঘটনা এড়ায়নি.. আর সেই জন্যই দু বছর ধরে ভালো টাকাই রক্তিমের মার হাত থেকে গলে মিনার জন্যে.. তাথৈ এর চোখে সেই দিন একটা ঘেন্না ছিল.. মানুষ কত নোংরা হতে পারে!! ওর মা এর বয়সী একজন এই ভাবে ওর জীবনটা শেষ করলো.. নাচ ওর জীবন থেকে যায়নি, কেড়ে নিল ওই মহিলা... প্রথমে মনে হযেছিল ওই মহিলার সামনে গিয়ে আজ সব সম্পর্ক শেষ করে দেবে রক্তিমের সাথে.. বিয়েটা শেষ করে দেবে..এই বাড়ি, এই বদ্ধ বাড়িটা ছেড়ে চলে যাবে.. কিন্তু পরের মুহূর্তে মনে হলো যাবে কি করে!! ওর শরীরে আর একটা প্রাণ আছে এখন.. নিজের জন্য তার জীবনটা কি করে নষ্ট করবে!! তাথৈ এর একটা মেয়ে হয়েছে, নাম তিতাস.. তিতাস এসে ওর জীবনটা কে রাঙিয়েছে.. যেই রং নাচ চলে যাওয়ার পর চলে গিয়েছিল ওর জীবন থেকে, তিতাস এর আধো আধো কথা, ছোট্ট ছোট্ট দুটো হাত, নড়বড়ে পা এ চলা যেন সেই রং ফিরিয়ে এনেছে.. ওকে নিয়েই দিনটা কেটে যায়.. আসতে আসতে তিতাস এর নড়বড়ে দুটো পা শক্ত হচ্ছে.. এখন ও স্কুলে যায়.. এ,বি,সি,ডি বলে.. নিজের মনের কথাগুলোকে শব্দে সাজায়.,.. সেই দিন তাথৈ অপেক্ষায় ছিল যে তিতাস কখন স্কুল থেকে আসবে!!, মেয়ের সাথে কত জমা কথা থাকে.. কিন্তু সেই দিন তিতাস স্কুল থেকে এসে ব্যাগ টা রেখেই বলে উঠলো, "যেন মা আজ স্কুল এ একটা মিস এসেছিল,নাচ সেখাতে.. আমি একটা নাচ শিখেছি..দেখবে ?" কথাটা বলেই তিতাস ওর ছোট ছোট দুটো পা এ তাল দিয়ে দিয়ে,হাত গুলো দিয়ে ছবি এঁকে নাচতে থাকলো.. আর তাথৈ স্থির চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে..যেন কত দিন বাদে নিজেকে দেখতে পেল.. যাকে আয়নায় আর খুঁজে পেত না,তাকে দেখল আজ..এত বছর বাদে..... চোখটা জলের ভারে যেন আবছা হয়ে গিয়েছিল.. তাথৈ কান্নায় ভাঙ্গা গলায়ই মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলো , "তোর নাচ ভালো লাগে ? নাচ শিখবি তুই ?" তিতাস এক গাল হেসে ঘাড় দোলালো...............

তাথৈ এখন রোজ তিতাসকে নাচের ক্লাসে নিয়ে যায়..প্রত্যেক শনি রবিবার.. এখন প্রত্যেকদিন ওই বাড়িটাতে ঘুঙুরের আওয়াজ শোনা যায়...তিতাস এর পা এর ছন্দ শোনা যায়... রক্তিমের মা আজ চুপ.. ঘুঙুরের আওয়াজ আজ রক্তিমের মার কানে সয়ে গেছে.. প্রথম যেই দিন তিতাসকে নিয়ে তাথৈ নাচের স্কুলে যাবে সেই দিন রক্তিমের মা আটকাতে এসেছিল, "বৌমা আবার শুরু করলে?? নিজের শখ মিটল না দেখে এখন মেয়েকে পাঁচ জনের সামনে নাচাবে ?" সেই দিন তাথৈ খুব দৃঢ় গলায় উত্তরটা দিয়েছিল, " কেন মা.. তিতাস যদি নাচে তাহলে কি আপনি নিজের নাতনির পা এর লিগামেন্টটাও ছিড়ে দেবেন? সিঁড়িতে তেল ঢেলে ? সেটা করতে বাঁধবে না তো আপনার.." সেই দিন প্রথম রক্তিমের মার চোখ দুটো নিচে নেমে গিয়েছিল.. লজ্জায়.. তাথৈ সেই দিন আর ফিরে তাকায়নি....দরজাটা সামনে ছিল..মেয়ের হাত ধরে বেরিয়ে গিয়েছিল..এমন একটা জগতে,যেখানে তাল আছে, ছন্দ আছে..নাচ আছে..

(সমাপ্ত)

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.