একক স্মৃতি


টুংটাং টুংটাং করে সুরেলা শব্দে ডোরবেল টা বেজে উঠল । সঙ্গে সঙ্গে সুপ্রতীকের ঘুমও ভাঙ্গল। নিশ্চয়ই কাজের লোক লতাদি এসেছে।"ধুস সাতসকালে ঘুমটা গেল...যাকগে মা দরজা খুলে দেবে" ভাবল সুপ্রতীক ।ঘুম চোখেই বালিসের পাশ থেকে মোবাইলটা তুলে সময়টা দেখতে গিয়ে খেয়াল পড়ল...আরে আজকে তো জুলাই এর ৭ তারিখ...আজ তো শ্রীময়ির বাড়ি যাবে ও। শ্রীময়ির আজ জন্মদিন। গত কয়েকমাস ধরে এই বিশেষ দিনটার কথা ও ভেবে এসেছে। দ্রুত বিছানা ছাড়ল সুপ্রতীক ...চিৎকার করে মা কে চা দিতে বলে সোজা বাথ্রুম। আজকে এক মুহূর্ত নষ্ট করার মতো সময় ওর কাছে নেই । দীর্ঘ তিন বছর পরে শ্রীময়ির সাথে ওর দেখা হবে। বাথ্রুম থেকে বেরিয়ে রেডি হতে গিয়ে ওয়াড্রোব খুলল সুপ্রতীক...আজকে সবুজ রঙের টিশার্ট টা পরবে ও । ওর মনে আছে শ্রীময়ির প্রিয় রঙ ছিল সবুজ । বাড়ি থেকে বেরনর আগে মোবাইল খুলে একটা ওলা বুক করল । ট্যাক্সি খুঁজে সময় নষ্ট করতে ও রাজি নয় । শ্রীময়িকে অনেকগুলো বছর দেখেনি ও। ওলাতে যেতে যেতে আচমকা বৃষ্টি শুরু হল। চলন্ত গাড়ির জানালা দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা গুলো স্পর্শ করতে করতে সুপ্রতীকের চোখে ভেসে উঠল কলেজের সেই দিনটার ছবি যেদিন ও প্রথম দেখেছিল ওর "শ্রী" কে...জংলা জংলা ছাপ সালোয়ার কামিজে আর একরাশ খোলা চুলে দাঁড়িয়ে ছিল কলেজের গেটের সামনের বকুল গাছটার তলায়।

"কি রে , হাঁ করে কি দেখছিস" সায়কের কথা শুনে সুপ্রতীকের চটকা ভাঙল । "ওই মেয়েটা কেরে সায়ক?" কেন, এত খোঁজ খবর কেন নিচ্ছ বস...প্রেমে পড়লে নাকি" । মাথাটা গরম হয়ে গেলো সুপ্রতীকের। "এতো খবরের তোর কি দরকার? যেটা জানতে চাইছি সেটা বল ।"

সায়ক গোমড়ামুখে উত্তর দিল "জানি না...তবে নতুন ভর্তি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে"। "কোন সাবজেকট,সেটা জানিস?"। সায়ক কুঁচকে যাওয়া ভুরু তুলে উত্তর দিলো "জানি না"। খবর বার করতে অবশ্য বিশেষ বেগ পেতে হল না। জানা গেলো শ্রী সেই বছর ভর্তি হয়েছে বিবিএ তে । সুপ্রতীক তখন ইনফরমেশন টেকনোলজির সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্ট। আলাপ জমতে দেরি লাগে নি। অসম্ভব ভাল গান গাওয়া সুপুরুষ চেহারার সুপ্রতীকের প্রেমে খুব সহজেই পড়ে গেলো মুখচোরা, শান্ত শ্রীময়ি। সম্পর্ক এগোতে লাগল স্বাভাবিক গতিতে। কলেজের পরে বাস স্টপে শ্রীময়ি অপেক্ষা করত সুপ্রতীকের জন্য...সুপ্রতীক নিজের বাইকে ওকে বাড়ি পৌঁছে দিত।কখনও কখনও কলেজ বাদ দিয়ে সিনেমা দেখতে বা ঘুরতে চলে যেতো ওরা দুজনে। সুপ্রতীকের জন্য বাড়ি থেকে রোজই কিছু না কিছু বানিয়ে আনতো শ্রীময়ি। ধীরে ধীরে সুপ্রতীক এটা বুঝতে পারছিল যে শ্রী ওদের এই সম্পর্কের ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস হয়ে পড়ছে। ওদের মধ্যে রাগারাগি হলে প্রতিবার সুপ্রতীকের রাগ ভাঙাত শ্রীময়ি...প্রথম ফোন বা মেসেজ করে। সুপ্রতীক এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছিল। তিন বছর কেটে গেলো। ইতিমধ্যে ক্যাম্পাস ইন্টারভিউতে ওর চাকরি হয়ে গেছে একটি নামী বহুজাতিক কোম্পানিতে।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুপ্রতীকের ব্যবহারে পরিবর্তন আসতে শুরু করলো। শ্রীময়িকে যেন আর ভালো লাগছিল না ওর... অতি সাধারন লাগছিল। শ্রীময়ির যত্ন,ভালবাসা সব যেন ওর কাছে একটা বদ্ধ খাঁচার মত লাগছিল।সুপ্রতীক ভেবে পাচ্ছিল না এই অতি সাধারন মেয়েটিকে কি করে ওর পছন্দ হয়েছিল এক সময়।

চাকরি পাওয়া উপলক্ষে একদিন কলেজের বন্ধুরা মানে সায়ক,অরিন্দম,শ্রেয়া আর কীর্তি ধরলো সুপ্রতীককে। "কিরে পার্টি কবে দিচ্ছিস আমাদের"? "কিসের পার্টি ?" "কেন তুই এতো ভালো জব পেলি যে সেটার জন্য খাওয়াবি না আমাদের ?" তবে বস শুধু খাবারে মানব না আমরা...সঙ্গে একটু অন্য কিছু ও চাই কিন্তু"। চোখ টিপল অরিন্দম। "অবশ্য যদি তোর শ্রী কিছু মনে না করে " কীর্তি ফোড়ন কাটল। সুপ্রতীক রেগে গেলো ।"তোরা কি বলতে চাইছিস যে আমি সব কাজ শ্রী কে জিজ্ঞেস করে করি?তোরা কি খাবি বল... বাকি আমার উপর ছেড়ে দে ।" বন্ধুরা হইহই করে উঠলো । সুপ্রতিকের ইচ্ছে ছিল না শ্রী এই পার্টিতে যায়। তাই শ্রীকে খবরটা জানালো না। কিন্তু কথায় কথায় সায়ক শ্রীকে জানিয়ে দিলো যে সুপ্রতীক ওদের পার্টি দিচ্ছে। শ্রী অবাক হল কিন্তু মুখে কিছু বলল না। পার্টির ঠিক আগের দিন শ্রী সুপ্রতীককে বলল..."সু, কালকে তুমি তোমার বন্ধুদের পার্টি দিচ্ছ কিন্তু আমাকে একবার ও বললে না তো?" সুপ্রতীক একটু চমকে গেলেও মুখে প্রকাশ করলো না।"হ্যাঁ পার্টি দিচ্ছি।তবে তোমাকে বলিনি কারন তুমি ওখানে যাওয়ার উপযুক্ত নও..নিজের দিকে কখনও একবার তাকিয়ে দেখেছ...কোনও স্মার্টনেস আছে তোমার মধ্যে...স্টাইল জান কিছু...ওখানে তোমাকে নিয়ে গিয়ে সবার কাছে বেইজ্জত হতে চাই না।" এই আকস্মিক আক্রমণে শ্রী স্তম্ভিত হয়ে গেলো।"এসব কি বলছ তুমি সু?" "যা বলছি ঠিক বলছি...ইনফ্যাকট আমার মনে হয় আমাদের আর সম্পর্ক না থাকাই ভালো... সত্যি কথা বলতে কি আমার পাশে তোমাকে মানায় না।তাই আজকের পর থেকে আমার সাথে আর তোমার কোন সম্পর্ক নেই...আর কখনও আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা কোর না।" ঝড়ের গতিতে বলা শব্দ গুলো যেন শ্রীর কান দিয়ে ঢুকছিল না...এক দৃষ্টিতে শ্রী সুপ্রতীককে দেখে যাচ্ছিল... আর ভাবছিল কতো সহজে সুপ্রতীক কথাগুলো বলছে। এতই কি সহজ কোন সম্পর্ক ভেঙ্গে বেরিয়ে যাওয়া। কথা বলা শেষ হলে শ্রী চুপচাপ চলে যায়। সেই দিন শেষ বারের মত শ্রীকে দেখেছিল সুপ্রতিক...তারপর আর দেখা হয় নি দুজনের। সুপ্রতীক ভেবেছিল প্রতিবারের মত শ্রী ওকে প্রথমে কল করবে কিন্তু শ্রী করে নি ... আর নিজের ইগো নিয়ে থাকা সুপ্রতিক ওকে আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি।

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সুপ্রতীক অনুভব করতে থাকে শ্রীর প্রতি তার ভালবাসা...বুঝতে পারে শ্রীর প্রতি ওর দূরব্যবহার, অবহেলা কতটা ভুল ছিল... কতটা ভুল ছিল সুপ্রতীক নিজে। শ্রীময়ির বাড়ির ঠিকানা জানত সে কিন্তু ওখানে গিয়ে জানতে পারল যে দুই বছর আগেই শ্রীময়িরা ওই বাড়ি বিক্রি করে অন্য কোথাও চলে গেছে...তবে বর্তমান ঠিকানাটা পেয়েছিল ওখান থেকে। আজ সুপ্রতীক যাচ্ছে ওর শ্রীর কাছে...ভুল স্বীকার করে ওকে ফিরিয়ে আনতে। "স্যার আপনার অ্যাড্রেসে পৌঁছে গেছি।" ওলার ড্রাইভারের গলার আওয়াজে বর্তমানে ফিরল সুপ্রতীক। ভাড়া মিটিয়ে নামল ও। মনে মনে ভাবল আজ এতদিন পর ওকে দেখে শ্রীময়ি ঠিক কি করবে...ভাবতে ভাবতে দরজার ডোরবেল টিপল সুপ্রতীক। আটপৌরে ভাবে শাড়ী পরা একজন মহিলা দরজা খুললেন।জিজ্ঞ্যাসা করলেন "কাকে চাই "? "শ্রীময়ি আছে?" ভদ্রমহিলা একটু অবাক হলেন। "তুমি কে বাবা?"

"আপনি আমাকে চিনবেন না। আমি শ্রীময়ির বন্ধু...একই কলেজে পড়তাম আমরা।" একটু চুপ থেকে ভদ্রমহিলা বললেন "আমি শ্রীময়ির মা। ভেতরে এসে বসো।" সুপ্রতীক ভেতরে এসে বসলে উনি দরজাটা বন্ধ করে সোফাতে এসে বসলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন "দাড়াও , শ্রী কে ডাকি। শ্রী...শ্রী... একটু এঘরে আয় তো।" সুপ্রতীক এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল...ওর হাতের মধ্যে থাকা গিফটের বক্সটা জোরে চেপে ধরল ও। পাশের দরজা দিয়ে যে ঢুকল তাকে চিনতে সুপ্রতীকের ভুল হওয়ার কথা ন্য...তার মনে হল এই দীর্ঘ তিন বছরে শ্রীময়ির সৌন্দর্য আরও বেরেছে...আরও সুন্দরী হয়েছে ওর শ্রী। শ্রীময়ি এসে ওর মার পাশে বসল ।"ডাকছিলে কেন মা?" উনি একঝলক সুপ্রতীককে দেখে নিয়ে বললেন "এই ছেলেটি তোর সাথে দেখা করতে এসেছে... তোর কলেজে পড়ত।" শ্রীর চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল "আপনি আমার কলেজে পড়তেন? কিন্তু আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না...আপনার নামটা একটু বলবেন প্লিজ?" সুপ্রতীকের মনে হল ওর পায়ের নিচে মেঝেটা আর নেই...এসব কি বলছে শ্রীময়ি...শ্রীময়ি ওর "সু" কে চিনতে পারছে না...কেন? সুপ্রতীকের হতভম্ব ভাবটা শ্রীময়ির মার চোখ এড়ায়নি। উনি বললেন "যা তো এক কাপ চা নিয়ে আয়"। শ্রীময়ি আর কোন কথা না বলে চলে গেলো ভিতরে। সুপ্রতীক চুপ করে বসে আছে...ও এতটাই অবাক হয়ে গেছে যে কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। শ্রীর মা বললেন "তুমি অবাক হয়ে গেছ বুঝতে পারছি। কিন্তু ও ইচ্ছে করে তোমাকে চিনতে পারেনি সেটা নয় কিন্তু। ও আসলে তোমাকে ভুলে গেছে... ঠিক যেভাবে ও ভুলে গেছে গত ছয় বছরের সব স্মৃতি।" এক মুহূর্ত থেমে উনি আবার বলতে শুরু করলেন "বিবিএ পাশ করার পর এম বি এ করতে শ্রী গেছিল পুনাতে একটা নামী ম্যানেজমেন্ট কলেজে... ওখানে শ্রীর একটা এক্সিডেন্ট ঘটে...মাথায় চোট পায় ও...বেশ কিছুদিন নার্সিং হোমে ভর্তি থাকার পর প্রাণে বেঁচে গেলেও ওর মাথা থেকে বিগত বেশ কিছু বছরের স্মৃতি হারিয়ে গেছে।কলেজের কোন স্মৃতি আর ওর মনে নেই।তাই ও তোমাকে চিনতে পারে নি।"

সুপ্রতীকের মনে হল গোটা ঘরটা ওর চোখের সামনে ঘুরতে শুরু করেছে... ওর শ্রী ওকে ভুলে গেছে... কোনোদিন আর চিনতে পারবে না ওকে... ডাকবে না ওকে "সু" বলে...এটা কি সম্ভব?আর বসতে পারল না সুপ্রতীক... উঠে পড়ল ও। বেরোবার আগে শ্রীময়ির মায়ের হাতে গিফটবক্সটা দিয়ে বলল "আজকে ওর জন্মদিন...তাই এনেছিলাম...ওকে দিয়ে দেবেন প্লিজ।" দরজা থেকে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করল সুপ্রতীক...বাইরে তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। সুপ্রতীকের দুই চোখ ঝাপ্সা হয়ে গেলো জলে... বৃষ্টির জলে না চোখের জলে সেটা ও নিজেও বুঝতে পারল না। শুধু বুঝতে পারল আজকের পর থেকে স্মৃতি গুলো শুধু ওর মধ্যেই থেকে যাবে...এগুলো ওকে একাই বহন করতে হবে সারাজীবন।

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.