বিষ



ধড়ফড় করে উঠে বসলো শুভ্র। ঘোর কাটতে বেডসাইড টেবিলে রাখা বোতল থেকে ঢকঢক করে বেশ খানিকটা জল খাওয়ার পর নিজেকে একটু শান্ত মনে হলো। কিন্তু এসব সে কি ভাবছে? আলিয়াকে পাওয়ার জন্য কম রিস্ক তো নেয়নি, কিন্তু এখন কি হবে? কাল সুধার ব্যাপারে কোর্ট ফাইনাল ভার্ডিক্ট দেবে।

(1)

পনেরো মাস আগে...

"এক মাসে পাঁচবার ফুড পয়জন কি করে হয় তোর শুভ্র? খুব আশ্চর্যের বিষয় কিন্তু."

"তুই ডাক্তার তো, তাই একটু বেশী ভাবছিস, বাইরের খাবার খেলে কখনো কখনো এরম হয়ে যায়."

"না, অ্যাবরিন পাওয়া গেছে তোর লিভারে."

"সেটা কি?"

"একধরনের বিষ, নিশ্চিতভাবে কেউ তোকে বিষ দিচ্ছে"

"পাগল হয়ে গেছিস নাকি? ঘরে তো মাত্র দুজন লোক, আমি আর সুধা- সুধা বিষ দেবে আমায়? কি আলতুফালতু বকছিস? আমার বন্ধু হয়েও তুই আমার স্ত্রী সম্পর্কে এসব কি করে ভাবতে পারিস?"

"বন্ধু বলেই বলছি শুভ্র, নিজের খেয়াল রাখিস"

এই কথোপকথনের ঠিক দুদিন পরে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ী ফেরে শুভ্র। কিন্তু মনের মধ্যে অশান্তির ঝড় বয়ে যাচ্ছে. সুধা, যে মেয়েটা তাকে পাগলের মতো ভালবাসে সে কি কখনো এরম নিচু কাজ করতে পারে!

এক মাসের মধ্যে প্রায় দশদিনই অফিসের বাইরে কাটাতে হয় শুভ্রকে, নিরুপায় - আর সুধা, শুভ্রর আটমাসের বিবাহিত স্ত্রী, চাকরি করে এক বোটানিক্যাল ল্যাবে। সুখী জীবন, যদিও বাচ্চা হয়নি। শুভ্রর বাবা মা থাকেন কলকাতায়, তাঁদের নিজস্ব বাড়ীতে। আর শুভ্র তার স্ত্রীকে নিয়ে মুম্বাইনিবাসী- চাকরিসূত্রেই আসা।

নাহ! এবার সুধাকে একটা বাচ্চা নেওয়ার কথা বলতেই হবে৷ অফিসের ট্যুরে এসে, ব্যাংককের হোটেলে বসে ভাবছিল শুভ্র- এইভাবেও যদি মনের থেকে দুর্ভাবনাগুলো যায়- সুধা কখনো এরম করতেই পারে না। এসব ছাইপাঁশ ভাবতে ভাবতে গরম কফির কাপে চুমুক দিলো শুভ্র।

পরেরদিন-

এয়ারপোর্টে নেমেই সুধাকে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আগের দিনের কালো মেঘ কেটে গিয়ে ঝলমলে রোদ্দুরের আলোয় মন ভরে গেলো শুভ্রর। ফেরার পথে গাড়িতে সুযোগ পেয়ে মনের কথাটা সুধাকে বলে দিলো। কথাটা শুনে ফর্সা সুধার গালদুটো রক্তিম আভায় ভরে গেলো।

"লজ্জা পেলে?"

"ইশ... মোটেও না"

সেদিন ওরা বাইরেই খেয়ে ফিরল...

পরেরদিন সকাল

"সুধা- আর কতো বাকি? দেরি হয়ে যাচ্ছে যে-"

"এই তো... খেয়ে নাও- পুরোটা খাবে"... গরম লুচি আর সাথে সাদা আলুর তরকারি দেখে জিভে জল এসে গেলো শুভ্রর।

"একি! একটা প্লেটে কেন? তুমি খাবেনা? অফিস যাবেনা? শরীর খারাপ নাকি?"

"না না- কিচ্ছু হয়নি আমার. ঋতু আসবে আজ, ওর বিয়ের কেনাকাটা করতে। তাই ফার্স্ট হাফটা ছুটি নিয়েছি। তুমি খেয়ে নাও তাড়াতাড়ি- ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে"

অফিসে ঢোকার খানিক্ষণ পরেই হটাত করেই শুভ্রর শরীর আবার আগের মতো খারাপ হতে শুরু করলো। তলপেটে ব্যাথা, সাথে বমি। ডাক্তার অর্ণব বোসকে ফোন করতে করতেই... আস্তে আস্তে চারিদিক অন্ধকারে ছেয়ে গেলো....

জ্ঞান যখন ফিরল, চোখ খুলে সুধাকে দেখতে পেলো- হাসপতালের বিছানায় শুয়ে আছে সে।

(2)

কি হয়েছিলো আমার?" অসহায়ভাবে প্রশ্ন করলো শুভ্র।

"কি আবার! একই- ফুড পয়জনিং" ধৈর্যহারা হয়ে উত্তর দিলেন ডক্টর অর্ণব বোস।

"বাইরে গিয়ে কি যে খাও- কে জানে!! আচ্ছা ডাক্তারবাবু, ওঁকে কবে বাড়ী নিয়ে যাবো?"

"কালকের মধ্যেই রিলিজ করে দেবো" একরাশ বিরক্তি দেখিয়ে ডাক্তারবাবু বেরিয়ে গেলেন।

"আমি উঠি গো, ঋতু বাড়ীতে আছে, কাল এসে তোমায় নিয়ে যাবো। চিন্তা কোরোনা..."

আবার! আবার সেই এক ব্যাপার. তাহলে কি অর্ণব ঠিক বলছিলো? সুধা!

"এবারেও তোর শরীর থেকে অ্যাবরিন পাওয়া গেছে"

"কি করি বলতো অর্ণব? কিচ্ছু বুঝতে পারছি না"

"পুলিশের সাথে যোগাযোগ কর। ওরা কোনো একটা উপায় ঠিক বের করবে৷ "

"পাগল হয়েছিস নাকি! সুধা যদি জানতে পারে আমি ওকে সন্দেহ করছি- না না,

তবে, একটা কাজ করলে হয়..."

"কি কাজ?"

"খাওয়ার ঘরে যদি একটা গোপন ক্যামেরা লাগাই?"

"দারুন আইডিয়া- ফিরে গিয়েই লাগা. দেরি করিস না"

পরেরদিন বাড়ী ফিরল শুভ্র- খুব শীঘ্রই তাকে ক্যামেরা লাগাতে হবে৷ কিন্তু সুধাকে জানতে দেওয়া যাবে না। পরেরদিন অফিস গেলো না শুভ্র, সুধা বেরিয়ে যাওয়ার পরেই অফিসের অপারেটরকে ডেকে এমন জায়গায় ক্যামেরা লাগালো যাতে সেটা সুধা কোনোভাবেই বুঝতে না পারে; কিন্তু ডাইনিং টেবিলটা সম্পূর্ণ দেখা যায়।

অন্যান্য দিনের মতোই সুধা অফিস থেকে বাড়ী ফিরে শুভ্রর শরীরের খবর নিল- শুভ্র সেদিন অনেকটাই সুস্থ। রাত্রিবেলা খাওয়ার সময় যথারীতি দুজনে একসাথেই খেতে বসলো। সুধা কিন্তু গোপন ক্যামেরার ব্যাপারে কিছুই বুঝতে পারেনি।

খেতে বসেছে, তখনো কেউ একগ্রাসও মুখে দেয়নি, শুভ্র বলে উঠলো "একটা লঙ্কা নিয়ে আসবে প্লীজ..." সুধা লঙ্কা আনতে উঠে যেতেই শুভ্র খাওয়ারের প্লেট আর বাটি দুটোই অদলবদল করে দিলো- সুধা কিচ্ছু টের পেলো না। খাওয়াদাওয়া শেষ করে সুধা সংসারের বাকি কাজ করতে গেলো আর উদ্বিগ্ন মনে শুভ্র টিভিতে খবর দেখতে লাগলো।একটু সময় উশখুশ করে রান্নাঘরে গিয়ে শুভ্র সুধাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল৷

"আহ্! কাজের সময় কি অসভ্যতা করছ!"

বেশ একটা আদুরে গলায় শুভ্র বললো,

"কফি খেতে ইচ্ছে করছে, আমি বানাবো?"

"বেশ, বানাও তাহলে"-

কাপ, শসপ্যান নাড়তে নাড়তে শুভ্র সুধাকে জল দিতে বলল ৷ পেছন ঘুরে মাপ করে জল দিতে দিতে বিড়বিড় করে কি যেন বলল সুধা- একটু সময় লাগলো৷ রান্নাঘরেই গল্প করতে করতে দুজনে বেশ হাসিমুখে কফি শেষ করলো৷ কফি খেয়ে ফুরফুরে মেজাজে সুধা রান্নাঘরের বাকি কাজ সারতে লাগলো আর শুভ্র আগের মতো টিভি চালিয়ে খবরে মনোনিবেশ করলো৷ বেশ খানিক্ষন পরে শুভ্র সজোরে একটা আওয়াজ পেতেই চিত্কার করে উঠল "সুধা! সুধা!" সুধা তখন অজ্ঞান হয়ে রান্নাঘরের মেঝেতে পড়ে আছে। নিজেকে এত অসহায় বোধহয় আগে কোনদিন মনে হয়নি, সুধাকে নিয়ে দ্রুতগতিতে গাড়ী বের করতে করতে ডক্টর বোসকেও একটা ফোন করে নিল...

হাসপাতাল পৌঁছনোর আগেই মৃত্যু হলো সুধার-

শুভ্র খুব ভেঙে পড়েছে- ডক্টর বোস সামলানোর চেষ্টায় "পুলিশকে ফোন করেছি, তুই চিন্তা করিস না, আমি আছি তোর সাথে-"

পুলিশ এলো- সুধার বডি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হলো, অটোপ্সি রিপোর্টে সুধার শরীরেও সেই একই বিষ পাওয়া গেলো- অ্যাবরিন। পুলিশ তদন্ত করলো- গোপন ক্যামেরায় ধরা পড়লো প্লেট অদলবদলের ঘটনা,

তিনমাস পর আজই সেই ফাইনাল ভার্ডিক্ট এর দিন, উদ্বিগ্ন ভাবে সারাক্ষন কোর্টে বসেছিল শুভ্র, এতগুলো দিন বন্ধু অর্নব আর ফোনের ওপারে আলিয়া তার পাশে ছিল, সবাই চাইছিল শুভ্র যাতে সঠিক বিচার পায়। আলিয়া জানেনা আজ কি হবে। সুধার মৃত্যুটা অত্যধিক বিষক্রিয়ায়, এবং তারজন্য শুভ্র দায়ী নয়। নিঃশর্ত মুক্তি পেলো শুভ্র।

তিনমাস পর---

ব্যান্দ্রার পশ এলাকার লিফটের দরজা বন্ধ করে চোদ্দতলার বোতাম টিপলো শুভ্র। নেমপ্লেটে নাম লেখা আছে - আলিয়া কুমার, দরজা খুললো কাজের মেয়ে। খুব পরিচিত ভঙ্গিতে ভেতরে ঢুকলো শুভ্র, ঢুকেই আলিয়াকে জড়িয়ে ধরল "সব ঠিক করে দিয়েছি- এবার আমরা নিশ্চিন্তে বিয়ে করতে পারি।"

"কিভাবে করলে?"

"তোমার জন্য রোজ একটু একটু করে বিষ নিয়ে আর জলের অছিলায় কফিতে বিষ দিয়ে"...

নিজেকে আলিঙ্গনমুক্ত করে বিস্ফোরিত চোখে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে রইল আলিয়া...

"মানে! তুমিই সুধাকে?..."

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.