গোপন কথাটি রবে না গোপনে

গোপন কথাটি রবে না গোপনে

ছোটবেলার কোচিং ক্লাসের বন্ধুত্ব যদি কলেজেও বিস্তার লাভ করে ভালই লাগে, তাই না? আমারও ভাল লেগেছিল। কলেজের নতুন পরিবেশে একটা চেনা মুখ বেশ মনে নির্ভরতা জাগায়। তাই লিস্টে দুজনের নাম পর পর দেখতে পেয়ে যে কি আনন্দ হয়েছিল! কোচিং ক্লাসে ওর সাথে সেরকম ঘনিষ্ঠতা ছিল না কিন্তু, তাও কলেজের প্রথম দিন প্রথম ক্লাসে দুজনে পাশাপাশিই বসলাম স্বাভাবিক ভাবেই। আর তারপর থেকে অভ্যাস নাকি জানি না, বা আলাদা বসার কোনও কারণ ঘটেনি বলেই হয়ত পাশাপাশিই বসতে থাকলাম। ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা বেড়েই গেল। ক্লাসের বাকি ছেলে-মেয়েরা জিজ্ঞেস করত – “তোরা প্রেম করিস?” আমি হেসে জবাব দিতাম – “না, আমরা বন্ধু”।

এইভাবে বছর গড়িয়ে গেল। পোস্ট গ্রাজুয়েট পাশ করার পর আমার সম্বন্ধ করে বিয়ে হল, একটা স্কুলে পড়ানো শুরু করলাম, বিয়ের তিন বছর বাদে মা হলাম, মোটমাট আর পাঁচটা মেয়ের মতো সুখে সংসার করতে থাকলাম। আর ও নেট দিয়ে গবেষণা শুরু করল, পি এইচ ডি র শেষে জার্মানি চলে গেলআরও উচ্চতর গবেষণার জন্য। আমাদের যোগাযোগ ভালই ছিল, ই মেলে।

একদিন রাতে একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন এল, ইন্টারন্যাশনাল নাম্বার, হ্যালো বলতেই ও পাশ থেকে ভেসে এল খুব পরিচিত একটা গলা – “আমি রে! চিনতে পারছিস তো?”

-“তুই! হঠাৎ ফোন করছিস?”

-“আমি দেশে ফিরছি। ফিরে প্রথমেই তোর সাথে দেখা করতে চাই। আসবি এয়ারপোর্টে? খুব অল্পদিনের জন্য থাকছি, তারপরই চাকরি নিয়ে ইংল্যান্ড চলে যাব। এয়ারপোর্টে আয় না, একসাথে ট্যাক্সিতে ফিরতে ফিরতে গল্প করে নেব। আমার ফ্লাইট রাত ৮ টায় নামছে।”নির্দিষ্ট দিনে বর অফিস থেকে ফিরলে বরের কাছে বাচ্ছাকে জমা দিয়ে ট্যাক্সি নিয়ে এয়ারপোর্টে হাজির হলাম যখন ৮ টা বেজে গেছে। ও নেমেই ফোন করেছে, একটু রাগ দেখাল দেরী করেছি বলে।ফেরার পথে ট্যাক্সিতে অনেকদিন বাদে দুই বন্ধু পাশাপাশি বসে গল্প শুরু করলাম –

“মোটা হয়ে গেছিস তো?” (ওর পর্যবেক্ষণ)।

“বাচ্ছা হলে সব বাঙ্গালিই মোটা হয়। ইউরোপিয়ানদের মতো অত ফিগার কন্সাস নই আমরা! তুই বিয়ে করবি না? বয়স তো কম হল না!” (আমাকে বিব্রত করা হল, এবার তুই হ’)।

“মেয়ে আছে?”

“ঢঙ! এদ্দিনে একটা মেয়ে পেলি না?”

“কি করব বল? কলেজে থাকতে তুই অন্য কাউকে দেখতে দিলি না!”

“একটা চড় খাবি! বিদেশে গিয়েও মেয়ে পেলি না?”

“কাউকে যে আর চোখে ধরল না! যে মেয়ের মুখের দিকে তাকাই, তোর মুখটাই চোখে ভাসতে থাকে!”

এবার আমি গম্ভীর হয়ে গেলাম! ইয়ার্কির একটা সীমা আছে! ও আমার মুখ দেখে আমার মনোভাব আঁচ করতে পারল। বলল “আমি খুব বোকা রে! তখন বুঝিনি, তাই তোকে বলাও হয়নি। বিশ্বাস কর, সত্যি বলছি – এখন বুঝি, আমি একমাত্র তোকেই ভালবেসে এসেছি। বুঝলাম তোর বিয়ে হয়ে যেতে। তাই তো বিদেশে পালালাম, পালিয়েও কি তোকে ভুলতে পারলাম?”

“তুই কি আমায় আজ ডেকেছিস এইসব বলার জন্য?”

“না না, তোকে দেখতে ইচ্ছে হল। কিন্তু কথাটা আজ বলে ফেললাম, বিদেশে থেকে স্মার্ট হয়ে গেছি”। বলে ও হা হা করে হেসে উঠল।

আমি গম্ভীর মুখ করেই থাকলাম। তারপর কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ। আবার ওই মুখ খুলল “রেগে গেলি?”

“না” এককথায় উত্তর দিলাম।

ওকে কি করেই বা বলি যে আমিও মনে মনে ওকে ভালবাসতাম? বিয়ে ঠিক হচ্ছে যেদিন ওকে বললাম সেদিন ওর মুখে ‘অভিনন্দন’ শুনে কতটা ব্যথা পেয়েছিলাম? বিয়েতে সবাই এল, ও এল না, খুব রাগ হয়েছিল ওর ওপর। ওর বাড়িতে যেদিন ওকে বিয়ের নেমন্তন্নের কার্ড দিতে গেলাম সেদিনই ওর সাথে আমার শেষ দেখা। তারপর সময়ের সাথে সাথে রাগ অভিমান দুঃখ সব চলে গেছিল – আজ আবার এতদিন পর – কেন? কি দরকার ছিল?

আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে ওই আবার মুখ খুলল “না বললেই হত বল? আমাদের বন্ধুত্বটা নষ্ট করে দিলাম!” কি বলে? বন্ধুত্ব আবার নষ্ট হয় নাকি? আমি হেসে বললাম - “না না, বন্ধুই তো পারে বন্ধুকে মনের সব কথা বলতে। এতদিনের একটা গোপন কথাটা বলে দিয়ে তুই প্রমাণ করে দিলি যে তুই আমার প্রিয় বন্ধু। আমিও তোর প্রিয় বান্ধবী, তাই আজ তোকে আমার মনের গোপন কথাটাও বলে দি

– তুই আমার প্রথম ভালবাসা। তুই বিয়ে কর, সুখী হ’। আমি খুব ভাল আছি আমার বর-বাচ্ছার সাথে”।

*ঝিনুক - একটি আধার বর্ষবরণ সংখ্যায় (২০১৬) প্রকাশিত

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.