বৌমা প্রোফাইলটা ঘাটতে শুরু করল... অনেকটা পিছনে গিয়ে দেখতে পেল একটা পোষ্ট....
হলদে ফাটা ফাটা কাগজে একটা কাঁচা হাতের আঁকা ছবি,পাশে অনন্ত রায়ের নিজের ফোটো ...লেখা আছে "আমার ছোটবেলার বন্ধু সবুর আঁকা ছবি,মেলে কি আমার সাথে?"
-----–-------–--------

অপটু হাতে ভয়ে ভয়ে হলেও ইদানীং স্মার্টফোন নাড়াচাড়া করতে পারছে মধ্য পঞ্চাশের সবিতা।প্রথম প্রথম কিছুই পারত না।সারাদিন ছেলের উপর রাগে গজগজ করত।
ছেলে কর্মসূত্রে দিল্লীতে থাকে।মা একা বাড়িতে।বাবা মারা গেছে বছর পাঁচেক হল।তাই যোগাযোগ বাড়াবার জন্য এই ফোন। আর ফেসবুক অ্যাকাউন্টটা ছেলেই জোর করে খুলে দেয়।এতদিন কিছুই পারত না,ছেলের বোঝাবার অত ধৈর্য্যও নেই।তাই এটা পড়েই ছিল।
শীতের ছুটিতে বউমা আর নাতি জোর করে ধরে ধরে শিখিয়েছে।
এখন কিছুটা সড়গড়।নাতি আর ছেলেকে রোজ একবার হলেও দেখতে পায়।বৌমার মাঝে মাঝেই রান্নার রেসিপি চায়।বেশ দিব্যি সময় কাটে সবিতার এখন।

কলেজে ভর্তি হয়েই বিয়ে হয়ে যায় সবিতার।স্কুলের বন্ধুদের কথা ইদানীং খুব মনে পড়ে।
একদিন দুপুরে নিজেই স্মৃতি হাতড়ে হাতড়ে বেশ কয়েকজনের নাম মনে করে করে খুঁজেছিল।কাউকেই পায় নি।কি জানি টাইটেল বদলে গেছে হয়তো।
এটা বেশ একটা নেশার মত হয়েছে।সারাদিন কাজের মাঝে ছোটবেলার স্মৃতি মনে করা...
সব মানুষের নাম মনে করে করে খুঁজে দেখা।
প্রতিদিনই বিফল হয় সবিতা।তাতে নেশা আরো বাড়তেই থাকে।
সবিতার বাবা ছিলেন রেলের স্টেশনমাস্টার।বাবার বদলীর চাকরীর সুবাদে বিভিন্ন জায়গায় রেল কোয়াটারে কাটিয়েছে সে।সব জায়গার মানুষের কথা মনে করে সে সারাদিন।অনেক নাম স্মৃতির অতলে।কিছুতেই মনে পড়ে না তার।
তবুও মনে করতেই হবে... খুঁজে দেখতেই হবে।কাউকে তো একদিন খুঁজে পাবেই।ছেলে যে বলেছিল,পুরোনো সব বন্ধুদের সে খুঁজে পেয়েছে।বৌমাও বলে।
সে ও ঠিক পাবে।কাউকে তো পাবেই।
ইদানীং সবিতার খাটে পুরোনো অ্যালবাম,পুরোনো ডায়েরী,বাবার অনেক চিঠি সব ছড়ানো থাকে...
একজন কেও যদি...
মাস ছয়েক হয়ে গেছে,কাউকেই পায় নি সবিতা...
মনে একটা বিষণ্ণতা চেপে বসেছে ।কিছুই ভালো লাগে না তার।শুধুই খোঁজা... একজনকেও যদি।

-------------
অনন্ত রায়... টাইপ করে সার্চে ক্লিক করে খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ ই পরশপাথর ছুঁয়ে ফেলে মধ্য পঞ্চাশের সবিতা। চিৎকার করে ওঠে..

-এই তো! এই তো! অন্তু।একদম অবিকল সেই মুখ।

তারপরই থমকে যায়।না অন্তুর বয়স তো তারই মতো।তবে এ তো সে নয়।হাত কাঁপছে তার।চশমাটা শাড়ীর আঁচলের খোঁট দিয়ে ভালো করে মুছে নেয়।আবার দেখে।হুমম্!এ তার ছেলের ছবি।পাশেই অন্তু দা।চিনতেই পারে নি সবিতা।

তখন বাবার বদলি ছিল ঘাটশিলায়।সবিতার ক্লাস সেভেন।পাশের কোয়াটারে অন্তুদা নাইন।একই স্কুল।পড়াশুনার অত বালাই ছিল না কারোরই।
ফুলডুংরি পাহাড়,সুবর্ণরেখায় সন্ধ্যে নামা... শালবনে ছমছমে বিকেলে ভয়ে হাত ধরা... সবই তো....
একদিন বুড়ো অন্তুদার ছবি এঁকেছিল স্কুলের খাতায়.. টাক পড়া ..চশমা আঁটা....

মনে পড়তেই আবার চোখ গেল মোবাইলের ছবিতে... মনে করতে পারছে না এমনই কি ছিল সে ছবি?
আজ ভীষণ খুশি লাগছে সবিতার।ঠিক মনে হল তেমনই,যেদিন অন্তুদা শালবন থেকে ফেরার সময় ওর হাত..
হাত দুটোয় চোখ গেল সবিতার।

"ইসস্! কি ছিড়ি করেছে!বৌমা কতবার বলেছে,একটু যত্ন নিতে।"

ফ্রেন্ড রিকোয়েষ্ট টা পাঠিয়েই নিজেই গজগজ করতে করতে বাথরুমে গিয়ে হাত ,মুখ, পা ভালো করে ধুয়ে বৌমার দেওয়া ক্রিমটা মাখল।বিকেল গড়িয়ে এল।
কাজের মেয়েটাকে সজোরে হেঁকে বলল-

' এক কাপ কফি দে দিকি! সন্ধ্যে বাতিটা দিয়ে আসি,সিরিয়ালটা আজ বেশ জমাটি জায়গায়।'

সিরিয়ালে মন বসল না সবিতার।বারবার চোখ যাচ্ছে,ওই মোবাইলে।অ্যাকসেপ্ট হল কি!!
সেদিন রাতেও ঘুম এল না...

তিনদিন হয়ে গেল.... এখনো তো হল না।
কাজের মেয়েটা ইতিমধ্যে একদিন দিদিমা বলাতে হঠাৎ খেপে গেল অকারণ-

"এই মেয়ে শোন,আমাকে দিদিমা না,মাসীমা বলবি।"

কাজের মেয়ে গজগজ করতে থাকে-
"বুড়ো বয়সে যত ভীমরতি!কি সাজ বেড়েছে দেখো বুড়ির।"
কিছুদিন পর কাজের মেয়ের ফোনে বৌমা নাতি নিয়ে হাজির হল বাড়িতে।
শাশুড়ির অদ্ভুত পরিবর্তন চোখে পড়ল.. এত পরিপাটি কোনোদিনও দেখেনি সে।আর সারাক্ষণ মোবাইল আঁকড়ানোটাও বড় নজরে ঠেকছে।
সবিতা চেপে রাখতে পারল না,দু দিনের মাথায়ই বউমাকে জানাল দু মাস হয়ে গেছে এখনো অ্যাকসেপ্ট হয় নি।তবে কি অন্তু দা তার সবুকে চিনতে পারে নি....
---–--------------------

বৌমা একের পর এক ছবি গুলো দেখাচ্ছে শাশুড়িকে।সারাদিন কিছুই খাওয়ানো যায়নি সবিতাকে।বৌমা বোঝাতে পারছে না তার অন্তুদা এই প্রোফাইলে আর কোনোদিন ই ফ্রেন্ড রিকোয়েষ্ট অ্যাকসেপ্ট করবে না।এই প্রোফাইলের মালিক আসলে এক বছর পূর্বেই মৃত।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.