কিছু ব্যক্তিগত কাজে গেছিলাম মুম্বই | ফিরছিলাম গীতাঞ্জলিতে | "মুম্বই CST" থেকে | খুব ভোরের ট্রেন | তখনো আলো ঠিক করে ফোটেনি | ট্রেন ছাড়তে কিছু সময় বাকি আছে | আমি চুপ করে বসে আছি | বলা যায় ঢুলছি আর কি ! ভোরে ওঠার অভ্যেস নেই খুব একটা | ট্রেনের লাইট গুলোও নিভিয়ে দিলাম |

প্রথম একজন ভদ্রলোক উঠলেন | তিনি এসেই দিকি ফটাফট জামাপ্যান্ট খুলতে থাকলেন | আমি ভাবলাম একি ! লোকটা করে কি ! ভাবলাম প্রকৃতির ডাকও হতে পারে | কিন্তু না, বেশ বারমুডা পড়ে টড়ে হালকা জামা কাপড় পড়ে দাঁত টাত ব্রাশ করে এক্কেবারে তৈরী হয়ে গেলেন যাবার জন্য | বুঝলাম বেশ এরকম যাতায়াত করেন টরেন | আমার হটাৎ মনে পড়ল ধুর ! আমার তো সব জামা কাপড়ই ব্যাগের ভেতর | একটু হালকা হলে মন্দ হতোনা | ব্রাশটা আর পেস্টটাও আমার পিঠের ব্যাগে হাতড়াতে লাগলাম | ভদ্রলোক বললেন , "কি দাদা , কলকাতা তো ? " আমি একদিকে মাথা নাড়ালাম |

এই গেলো প্রথম জন | তারপর এলো এক Couple | বিয়ে থা হয়নি | ভাই বোন হবে হয়তো দেখে মনে হচ্ছে | বেশ Stylish এবং Glamorous-ও বটে | মেয়েটির ডানহাতে বিরাট একটা Tattoo | বাংলায় লেখা "বসুমিত্রা" | ছেলেটার তো সারা গায়েই Tattoo | একটা designer স্যান্ডো গেঞ্জি পড়ে রয়েছে | এ.সি.-র ওই ঠান্ডায় ব্যাটা এভাবেই যাবে ?দুজনে পুরো ইংরিজিতে কথা বলে যাচ্ছে | একটিও বাংলা শব্দ শুনলাম না | কি অদ্ভুত ! ভাবলাম , বাঃ ! বাঙালি এগোচ্ছে |

আর একজন ভদ্রমহিলা উঠলেন | তিনি মধ্যবয়স্কা | বিবাহিত | উঠেই যেভাবে বাকি আমাদের সাথে গল্পে মেতে উঠলেন , ভাবলাম কি মিশুকি ! আবার একটা অজানা ভয়-ও ভর করলো | সীটের তলায় আমার ট্রলি ব্যাগটার তালা ঠিকঠাক লাগানো আছে কিনা দেখে নিলম আড়চোখে |

ট্রেন ছাড়লো | আমার ঘুম তখনো কাটেনি | জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি | চা এল | বেশ আয়েশ করে চুমুক দিলাম | আমার কাছে বিস্কুটের প্যাকেট ছিল | দুটো খেলাম | সিট্ কিছু ফাঁকাই থাকলো | ভাবলাম আর কেউ হয়তো নেই |

পরের স্টেশন চলে এলো ইতিমধ্যে | নাম "দাদার" | উঠে পড়লো আরো দুজন | ঠিক দুজন নয় | সঙ্গে একটা ছোট্ট মেয়ে ছিল | মেয়েটির মা আর তার ঠাকুমা | বেশ হন্তদন্ত হয়ে এলো তারা | পুরোদস্তুর ঘরোয়া বাঙালি গৃহবধূ | এসেই সিট্ নম্বর মিলিয়ে বসার তোড়জোড় .. আমাদের তো প্রায় উঠে যাবার জোগাড় | অনেক বাক্স প্যাঁটরা | সব সিটের তলায় এদিক ওদিক ঠিক মত রাখতে হবে | ভদ্রমহিলা আমায় এসে বললেন , "আমায় নিচের সিট্ টা দেবেন ? আমার বাচ্চা হবে তো ! " আমি দেখলাম সত্যিই তো মহিলার ওজন তো অনেকটা বেড়ে গেছে | উনি নিচের সিট্ টা পেয়ে খুব খুশি হলেন | সত্যি এরকম অবস্থাতে তার শাশুড়ি মেয়েকে নিয়ে এতো টা পথ যাবেন উনি | বাঙালি এগোচ্ছে |

যাই হোক, বাকি সিট্ গুলো ফাঁকাই পরে রইলো | ট্রেন চললো নিজের মতো | আস্তে আস্তে সময় গড়িয়ে চললো | জানলার কাচ দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বসে রইলাম | একটু আনমনা হয়ে গেছিলাম | হটাৎ প্রথম মধ্যবয়স্ক মহিলা বললেন " কি দাদা ! চা হবে নাকি ? " ভদ্রমহিলা ফ্লাস্কে করে চা নিয়েই এসেছেন | সাথে ব্রেকফাস্ট | আমি দুদিকে মাথা নাড়ালাম | একমাত্র প্রথম ভদ্রলোক দেখি চা নিলেন | দুজনের মধ্যে বেশ একটা আড্ডা চলতে থাকলো | আমি মোবাইল ঘাঁটছিলাম | হটাৎ চোখ চলে গেলো "বসুমিত্রা" নামক মেয়েটির উপর | ভাইয়ের জন্য একটা খুব সুন্দর রাখি বানাচ্ছিল সুতো টুতো দিয়ে | মাঝে মাঝে হাতের মাপ টা ঠিকঠাক দেখে নিচ্ছিলো ছেলেটার | আমি মোবাইল রেখে একমনে দেখতে লাগলাম | হাতের কাজ ভারী সুন্দর |

মধ্যবয়স্কা ভদ্রমহিলার মুম্বইযে শ্বশুরবাড়ি | স্বামী শিক্ষক | এক ছেলে | স্কুলে পড়ে | নিজের প্রতিষ্ঠিত বুটিক | বেশ ভালো ব্যবসা | এক্কেবারে Independent | কিছু শাড়ি কেনাকাটা করতেই আসছেন কলকাতা | কলকাতায় বাপের বাড়িও আছে | কিন্তু সেখানে শুধু একজন caretaker | বাবা মা কেউ নেই | ভাইয়েরা আলাদা থাকে | বিরাট একটা বাড়ি | থাকার কেউ নেই | আমার মনে সেই সিনেমার মতো দৃশ্য ফুটে উঠলো | বাংলো বাড়ি | কেউ থাকে না | ভুত ঘোরাঘুরি করে | দরজায় ক্যাচ ক্যাচ আওয়াজ হয় | কালো বিড়াল ডেকে ওঠে | ..... তবে সেই বাড়ি মোটেও ভুতের বাড়ি নয় | মহিলা মাঝে মাঝে এসে দেখভাল করেন | তা ছাড়া ব্যবসার কিছু কাজও থাকে কলকাতায় | এখানকার পুরো দায়িত্ব তার উপর | সত্যি বাঙালি এগোচ্ছে | এখানকার মেয়েরা |

ভদ্রলোকও বলে চললেন , তার কাজের কথা | দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোর কথা | বোহেমিয়ান গোছের হয়ে গেছেন তিনি | স্ত্রী পুত্র আছে বাড়িতে | কিন্তু তাদের কে সেরকম সময়ই দেয়া হয় না | এই কাজের জন্য | ভদ্রমহিলা ভদ্রলোককে বললেন মুম্বইয়ে একটা বাড়ি কেনার জন্য | মাঝে মাঝে কাজের সূত্রে এলে ওখানেই থাকবেন আর কি ! তো তিনি দেখি বেশ উৎসাহিত হয়ে পড়লেন | ওখানে বাড়ি কেনা ফ্ল্যাট কেনার তেমন ফ্যাচাং নেই | খুব সহজ পদ্ধতি | বলেই বাংলার নিন্দে মন্দ করতেও ছাড়লেন না | সিন্ডিকেট , কালো টাকা , প্রোমোটার রাজ্ , খুন খারাপি , রাজনীতি সবই ঘুরে ফিরে আলোচনা চলতে থাকলো | সত্যি নিজেকে খানিকটা হলেও লজ্জিত মনে হচ্ছিলো সেই সময় | হয়তো সেই ভদ্রলোকটিরও | যাই হোক , চায়ের সাথে টা আর হাতে অঢেল সময় থাকলে বাঙালিরা যে আড্ডায় সবাই কে হার মানায় সেটাই প্রমান হলো আরেকবার | বেশ সময় কেটে যাচ্ছিলো গল্প গাছায় |


ছোট্ট মেয়েটির সাথে আলাপ করতে লাগলাম | ভারী মিষ্টি | খুব মিশুকে | আমার সাথে বেশ গল্প জুড়ে দিলো | ওর বাড়ি মুম্বইযে | খড়্গপুরে মামারবাড়ি | বাবা এখন তার সাথে আসতে পারছে না অফিস থাকায় | তাই মেয়ের মন খুব খারাপ | বাবা তাকে একটা ট্যাব কিনে দিয়েছে | বলেই আমায় দেখালো ওটা | অনেক গুলো গেম আছে | দুজনে মিলে খেলতে বসে গেলাম | আমায় বেশ দেখিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছিলো | যাই হোক, বাবার অনুপস্থিতিটা এই যন্ত্রটা অনেকটাই ভোলাতে পেরেছে | একসময় তার মায়ের হাঁক , " বাবু এস , দুপুর হয়ে গেছে খেয়ে নাও ..." | মহিলা নিজেই ওই অসুস্থ অবস্থাতেও মেয়েকে নিয়ে চললো বেসিনে হাত মুখ ধোয়াতে | খাবার টাবার বের করে বেশ সুন্দর পরিপাটি করে মেয়েকে খাইয়ে দিলো , শ্বাশুড়িকে বেড়ে দিলো | লক্ষ্য করছিলাম মহিলাকে | ভাবছিলাম সত্যি এরকম গর্ভে আর একটা জীবন নিয়ে কিভাবে এতটা পথ পাড়ি দিয়েছে সে | মেয়ের চুল বেঁধে দেওয়া , ক্রীম মাখিয়ে দেওয়া তারপর খাবার থালাটালা গুলো বাসন টুকটাক নিজেই দেখলাম ধুয়ে টুয়ে রাখলো |সবটাই হাসিমুখে | যেন কিছুই হয়নি | একটা ব্যাপার আমি সত্যিই উপলব্ধি করেছিলাম মহিলারা এই একটা সময়ই পুরুষদের থেকে অনেকটা এগিয়ে যায় | সত্যি মা ব্যাপারটা কতটা কষ্টের ! নিজের অজান্তেই ওই ভদ্রমহিলার প্রতি একটা শ্রদ্ধা জেগে উঠছিলো |

আস্তে আস্তে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামছিলো | কিছুক্ষনের জন্য একটু জিরিয়ে নিলাম | "নাগপুর" ঢুকে গেলো ট্রেন | এখানে বেশ কিছুক্ষন ট্রেন দাঁড়াবে | শুনেছিলাম এখানকার কমলালেবু নাকি বিখ্যাত | কিনে ফেললাম একটা | খুব একটা খেতে ভালো লাগলো না | টক টক | প্রথম ভদ্রমহিলা কিছু শুকনো খাবারের প্যাকেট কিনলেন | স্টেশনটা বেশ বড়ো | খুব গোছানো , পরিষ্কার | ট্রেনের কিছু কর্মী এসে বাথরুম , আমাদের সিটের প্যাসেজ গুলো সব পরিষ্কার-টরিষ্কার করে দিলো , সুগন্ধি ছড়িয়ে দিলো |

বাচ্চা মেয়েটার সাথে আমার বেশ একটা বন্ধুত্ব হয়ে গেছিলো এইটুকু সময়ের মধ্যেই | কত কিছু যে আমায় বলার ছিল তার | মাঝে মাঝে তার যন্ত্রটায় একটু গেম খেলা হচ্ছিলো | সে তো আমার কোলের উপর এসে বসেছে একেবারে | জমিয়ে সুপার মারিওটার সদ্গতি করছিলাম | একটা করে রাউন্ড পেরোচ্ছিলাম আর মেয়েটির কি চিৎকার আনন্দে ! আমিও সাথে সাথে গলা মেলাচ্ছিলাম | তার মা হাসিমুখে বলতে লাগলো , "ওর বাবার সাথে এরকমই করে সারাদিন , ওই খেলে আর চেঁচামেচি করে |" এক মূহর্ত মনে হলো নিজের মেয়েই যেন | একটা অদ্ভুত অনুভূতি ! তার ঠাকুমার সাথেও আলাপ হলো | আমার পরিবারের কথা জিজ্ঞেস করলেন | কোথায় থাকা হয় ইত্যাদি ইত্যাদি | তিনি বৌমার খুব প্রশংসা করছিলেন | আমি আড়চোখে দেখলাম একবার বৌমার দিকে | সে মেয়ের বাবার সাথে ফোনে ব্যস্ত |

রাত্রের দিকে ট্রেনের এ.সি টা যে কেন এতো বাড়িয়ে দেয় কে জানে ! কম্বল মুড়িটুরি দিয়ে তবে খুব একটা খারাপও লাগছিলো না শুয়ে থাকতে | ছোটবেলা থেকেই আমার ট্রেনে ঘুমোতে বেশ ভালো লাগে | বেশ নড়তে থাকে ট্রেনটা | ঘুম ভালোই হয় | তার সাথে ট্রেন চলার আওয়াজটা তো আছেই | একরকম ভাবে ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক শব্দটা কিরকম যেন নেশা ধরিয়ে দেয় | এমনকি বাড়িতেও স্তব্ধ রাত্রে যখন ওই ট্রেনের আওয়াজ শুনতে পাই কিরকম একটা উদাস উদাস লাগে | ছোটবেলায় এরকমও হয়েছে, ট্রেন জার্নির পরের রাত্রে বাড়িতে শুয়েও মনে হতো কিরকম যেন দুলছি ট্রেনের সাথে সাথে | আস্তে আস্তে আমাদের সব লাইট নিভে গেলো | জ্বলে রইলো শুধু ওই নীলচে ডিম্ লাইটটা |

সকাল বেলা বেশ দেরি করেই উঠলাম | প্রথম ভদ্রমহিলা বললেন , "Good Morning! " উপর থেকে নামলাম | "টাটানগর" স্টেশন চলে এসেছে | চা টা খেলাম | বাইরে হালকা হালকা ঠান্ডা | শরৎ আসছে | আবার কিছু মানুষ দুটো নতুন জামা পরিবার কে উপহার দেওয়ার জন্য দিনরাত এক করে খাটতে থাকবে | ট্রেনে বাসে কিছু বেশি মানুষের পকেট কাটা যাবে | রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিভিন্ন কারণে প্রাইভেট গাড়িওয়ালাদের দেওয়া ফাইন পাল্লা দিয়ে বাড়বে | আমাদের শ্রেষ্ঠ পুজো আসছে |

এবার আসি ওই Couple-টার কথায় | খুব কৌতূহল হচ্ছিলো ওদের কথা জানার | জিজ্ঞেস করেই ফেললাম | মেয়েটি বললো , তারা স্বামী স্ত্রী | তার মা বাঙালি আর বাবা গোয়ানিজ | Tattoo টা তার মায়ের নামেই করা | তার স্বামী এংলো ইন্ডিয়ান | তার জন্ম গোয়াতে | স্বামী স্ত্রী দুজনেই মুম্বইতে রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকে চাকরি করে | সেখানেই আলাপ দুজনের, প্রেম | এই প্রথম বার জামাই যাচ্ছে কলকাতা তার মায়ের বাড়ি ধর্মতলা | মেয়েটি আগে এক্ দুবার গেছে তাও খুব ছোটবেলায় | আমার মুখটা কখন যেন খেয়াল করলাম হা হয়ে গেছে | এরা স্বামী স্ত্রী !! দেখে একটুও বোঝার জো নেই | মেয়েটিকে ওই রাখীর কথা জিজ্ঞেস করতে বললো ওটা তার কলকাতার ভাইয়ের জন্য বানাচ্ছিল সে | যায় হোক, এইবার জামাইয়ের সাথে খুব আলাপ করা শুরু হলো | প্রথমবার কলকাতা যাচ্ছে সে | সবাই মিলে জ্ঞান দিতে শুরু করলো সে কি কি করবে কি খাবে ইত্যাদি ইত্যাদি | "রসগোল্লা দিয়ে শুরু করবে বুঝলে !! শেষ করবে রসমালাই দিয়ে .. কে.সি দাস জিন্দাবাদ " , "ফুচকা টা ছেড়ো না কিন্তু , ধর্মতলার মোড়ের ফুটপাথে প্রচুর আলুকাবলি ঘুগনীর ষ্টল আছে " , "আমাদের ব্যারাকপুরে দাদা বৌদির হোটেলের বিরিয়ানি আর স্টেশনের মোড়ে লস্যি ..আহা কি অপূর্ব !" , "আচ্ছা জাদুঘর , চিড়িয়াখানা ,বিড়লা তারামণ্ডল , ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল .. এসব কিন্তু মিস কোরো না বাবা !" ঘুরে ফিরে এলো ইডেন গার্ডেন , দক্ষিনেশ্বর মন্দির , ইকোপার্ক , নন্দন , শোভাবাজার রাজবাড়ী , প্রিন্সেপ ঘাট | রকের আড্ডা , বাংলা ব্যান্ড , পাতাল রেল , ময়দানের ট্রাম | আমি বললাম , "বস , যাই খাওয়া দাওয়া কর ফুটপাথের স্টলগুলো থেকে খেয়ো | কলকাতার Street Food-এর মজাই আলাদা " | ছেলেটি মুচকি হাসলো | বললো , "হামি খোলকাতা ভালোবাসে | খোলকাতার মিটিং আর মিছিল ভালোবাসে |" দারুন একটা হাসির রোল উঠলো | ওরা ভাই বোন নয় , স্বামী স্ত্রী |

ছোট্ট মেয়েটিকে এবার নেমে যেতে হবে | খড়্গপুর ঢুকছে | আমি আর প্রথম ভদ্রলোক তাদের বাক্স প্যাটরা স্টেশনে নামাতে সাহায্য করলাম | ছোট্ট মেয়েটি বললো , "কাকু ভালো থেকো , আবার দেখা হবে |" আমি একটা চুমু খেলাম ওর গালে | মনটা কিছুটা হু হু করে উঠলো হটাৎ | সেও আমায় জড়িয়ে ধরলো | তার মা বললো , "খুব ভালো লাগলো আপনাদের সাথে , ভালো থাকবেন " | "আপনিও সুস্থ থাকবেন | আপনাকে অনেক অনেক অভিনন্দন | সাবধানে থাকবেন |" ট্রেন ছেড়ে যাচ্ছে এবার | আমি দরজা দিয়ে যতক্ষণ পারলাম বাচ্চাটা কে দেখতে থাকলাম | ........ সত্যি মানুষ চাইলে কত কিছুই না করতে পারে | বিশেষ করে মেয়েরা | নারীজাতি | বাঙালি এগোচ্ছে |

ফিরে এসে দেখলাম আর একটি যুবতী এসে বসেছে আমাদের কূপে | বিনা টিকিটের যাত্রী এ.সি.তেও চলে আসে আজকাল | কি অদ্ভুত ! বাঙালি মনে হলো | তাই বেশি অবাক হলাম না আর | দেখি মধ্যবয়স্ক মহিলা আর মেয়েটা বেশ ইংরিজি তে কথাবার্তা বলছে | মেয়েটি মোটেই বাঙালি নয় | হায়দ্রাবাদে আদি বাড়ি | বাবার কর্মসূত্রে খড়্গপুরে থাকে | এখান থেকেই হাওড়া অবধি reservation | মেডিকেল ছাত্রী | হোস্টেলে থাকে | ছুটিতে বাড়ি আসে | ডাক্তারির প্রসঙ্গে আমাদের কলকাতার ডাক্তারদের তুলোধোনা করা শুরু হলো সবার | হাসপাতাল গুলোর ব্যবসা , রোগীদের দুরবস্থা , সরকারি হাসপাতালের নোংরা পরিবেশ ইত্যাদি ইত্যাদি | কি আর করবে মেয়েটি , সব হজম করতে হলো | আমি বললাম , "আমাদের কথায় কথায় ওষুধ খাবার বাতিক আছে অনেকের , কিছু হলো কি না হলো দুটো ওষুধ খেয়ে নিলাম " | মেয়েটি বেশ ভালো বললো ,"আমরা mainly এইটা নিয়েই পড়াশোনা করি যে কোন ওষুধের কি Side Effect | প্রত্যেক এলোপ্যাথি ওষুধের কিছু না কিছু Side Effect থাকে | সেই Effect ঠিক করতে আবার আরো কিছু ওষুধ প্রয়োজন পড়ে | তার আবার Side Effect | এইরকম চলতেই থাকে | তাই যত সম্ভব এইসব ওষুধ কম খাওয়াই ভালো | বরং নিয়মিত যোগাভ্যাস , শরীর চর্চা করলে ওষুধের প্রয়োজন কম পড়ে | ভালো হালকা জিনিস খাওয়াটাও খুব ভালো অভ্যেস | " এই বলে সে যোগ করলো , " আমি তো বাড়িতে হোমিওপ্যাথি খাই খুব দরকার পড়লে !"

ট্রেনের গতি কমে এসেছে | জানলার বাইরে তাকালাম , হাওড়া ঢুকছে | সবাই আস্তে আস্তে রেডি হয়ে নিলাম নামার জন্য | রইলো পড়ে কিছু খালি জলের বোতল | যাত্রা শেষ হলো | অনেকটা স্মৃতি নিয়ে ট্রেন থেকে নামলাম | প্রথম দুই মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলার মধ্যে বেশ ভাব হয়ে গেছে | তারা একসাথে ট্যাক্সিতে share করবে | কাছাকাছিই বাড়ি দুজনের | ভদ্রমহিলার ওই "ভুতুড়ে" বাড়িতে ভদ্রলোকের নিমন্ত্রণ রয়েছে | ভদ্রমহিলা সবাই কে ব্যাগ থেকে চকোলেট বের করে দিলো | এইবার আর ভয় লাগলো না | হাসিমুখে নিলাম | মানুষকে বিশ্বাস করতে সত্যি ভয় লাগে | তাও আবার ট্রেনে | কিন্তু অন্যরকম অভিজ্ঞতা হলো | ওই গোয়ানিজ couple কে নিতে ওদের বাঙালি মা এসেছে | "বসুমিত্রা" | কি অপূর্ব সুন্দরী ! সত্যি বাঙালি মেয়েদের থেকে বোধ হয় আর বেশি সুন্দরী কেউ হতে পারে না | ওই ডাক্তারির মেয়েটিকে আর দেখতে পেলাম না | হটাৎ কোথায় হারিয়ে গেছে |

আর পড়ে রইলাম আমি | Taxi ধরলাম | এবার ঘরে ফেরার পালা | বাড়িতে আমার স্ত্রী পুত্র অপেক্ষা করছে |

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.