ডেকার্স লেনটা অফিস থেকে হেটে গেলে দশ মিনিট | একটু পা চালালে মিনিট সাতেক | মৈনাক বেরিয়েই পড়ল | ব্যাগে পরোটা-আলুর দম আছে | তোর্সা আলুর দমটা করেও দারুন | কিন্তু আজ পরোটা-আলুর দমের নিকুচি করেছে | আজ চিত্তদার স্টু আর টোস্ট খেতে হবে | ব্যাগটা নিয়েই বেরিয়েছে মৈনাক | অফিসে ফিরবেনা | ভাল লাগছেনা আজ | মনটা বড় উল্টে-পাল্টে গেছে | এরকম হচ্ছেই বা কেন কে জানে | নিজে সামলে নিতে পারবে ভেবেছিল মৈনাক | প্রথমটায় একটু মজা লাগছিল | কিন্তু এখন সত্যিই অসুবিধা হচ্ছে | ভাবতে ভাবতে ভিক্টোরিয়া হাউসকে ডানহাতে রেখে রাস্তা পেরিয়ে কে সি দাসের পাশ দিয়ে রাজভবনের দিকে হাঁটতে লাগল মৈনাক | কিন্তু মনটা বড় অশান্ত হয়ে আছে | মনের হাল খারাপ থাকলে নাকি পছন্দ মত কিছু একটা করতে হয় | বিশেষজ্ঞরা বলেন চকলেট খেতে | চকলেটে নাকি এন্টি-ডিপ্রেশন এজেন্ট থাকে | মন ভাল করে দেয় | এর আগে মৈনাক ছোটখাট মন খারাপ একটা গোটা, বড় চকলেট খেয়ে বেশ ফল পেয়েছে | কিন্তু আজ গল্প অন্য | ডেকার্স লেনে ঢুকে পড়েছে মৈনাক | পাঁচ মিনিট দাঁড়াতে হল | টোস্ট আর স্টু নিয়ে বেঞ্চে বসে পড়ল মৈনাক |

তোর্সার সাথে বিয়ের দেড় বছর হয়ে গেছে | প্রেমের বিয়ে নয় | বোঝাপড়াটা ক্লিক করে গেছে | লেপচা জগতে হানিমুনটাও তার জন্যে বেশ খানিকটা দায়ী | তোর্সা আগে একটা পাবলিকেশন কোম্পানিতে চাকরি করত | এখন কিছু করছেনা |ডিসট্যান্স মোডে টুরিজম ম্যানেজমেন্ট পড়ার কথা ভাবছে | পড়ুক | মৈনাকের নিজের ছোট এক্সপোর্ট ফার্ম | তোর্সা কাজ না করলেও কিছুনা | স্টুটা অনেকদিন পর পেটে গেল আজ | সাত-আট বছর আগে যখন নিজের অফিস খোলার জন্যে দিনরাত চরকিপাক খেত, তখন খুব রেগুলার আসা-যাওয়া ছিল এই রাস্তায় | উল্টো ফুটের দোকানটাতেও বহুবার হাফ ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন খেয়েছে সে | এই মন খারাপের মারাত্মক দিনে সেইজন্যেই এখানে আসা | চারপিস টোস্ট আর একবাটি চিকেন স্টু খেয়ে একটু স্বস্তি পেল মৈনাক | দাম মিটিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল এবার কোথায় যাওয়া যায় | বাবুঘাট? বসার জায়গা নেই তেমন | মিলেনিয়াম? ধুর ওই প্রেম-পাখিদের ভিড়ে গিয়ে লাভ টা কি? হাঁটতে হাঁটতে ফিরে এল মৈনাক | এসপ্লানেড মেট্রো |

শোভা বাজার মেট্রোর পাশেই লাল মন্দিরের সামনে থেকে রাস্তাটা সোজা চলে গেছে কুমোরটুলির দিকে | মৈনাক ঢুকে পড়ল রাস্তাটায় | কুমোরটুলির ভেতর দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে আস্তে আস্তে নিজের মনের খেয়ালে আহিরীটোলা ঘাটে এসে বসে পড়ল | সাড়ে তিনটে বাজে | শীতকালের রোদটা ভালই লাগছে গায়ে | এখানে অনেকদিন আগে এসেছে কয়েকবার | সাথে তখন পল্লবী থাকত | মধুরার সাথে কখনও সেদিকে আসেনি | কস্তুরীর সাথে প্রেমটা তো সাউথের লেকেই বসেই কেটেছে | সল্ট-লেকে বনবিতানেও মৈনাকের যাতায়াত ছিল | সেটা প্রিয়াঙ্কা আগরওয়ালের সময় | মৈনাকের তখন কলেজ লাইফ শেষ করে এমবিএ পড়ার দিন | কলেজ লাইফ থেকে মৈনাকের পরিচিতি এভাবেই তৈরি হয়েছে | বন্ধুরা বলত, তুই শালা বিরাট আর্টিস্ট | একসাথে এতগুলো সামলাস কি করে ? মেয়েমহলে খেলোয়াড় ইমেজ থাকলেও মেয়ে জুটতে মৈনাকের কখনও অসুবিধা হয়নি | শহরের মধ্যে প্রেম, জোকায় রিসর্টে রাট কাটানো, মন্দারমনিতে আউটিং সবই চলেছে | কিন্তু খুব গোপনে | পল্লবীর মধ্যে একটু বিয়ে-বিয়ে ভাব ছিল | মৈনাক কিছুটা এগিয়েওছিল | কিন্তু কেসটা কেটে যায় | এসবের পর অনেকদিন হয়ে গেছে |

বাবা-মা'র পছন্দের পাত্রী তোর্সা'র সাথে বিয়ে হয়ে গেছে | পুরোন মেয়েদের কথা তোর্সাকে জানায়নি মৈনাক | সে নিজেও ওই জীবন থেকে বেরিয়ে এসেছে | তার জন্যে একমাত্র দায়ী তোর্সার ভালবাসা | কিন্তু গত একমাসে পুরনো সব কিছু কেমন সামনে চলে এসেছে | পল্লবী, প্রিয়াঙ্কা, কস্তুরী, মধুর সবাই যেন মৈনাককে দুহাত বাড়িয়ে কাছে চাইছে | ঠিক সেই সময় যেটা তোর্সার প্রাপ্তির সময় | মৈনাক আর তোর্সার একান্ত শারীরিক সময়ে মৈনাক কোনদিন তোর্সার সাথে গুলিয়ে ফেলছে মধুরাকে, কোনওদিন কস্তূরীকে | তোর্সার শীৎকার মুহূর্তে মনে করিয়ে দিচ্ছে পল্লবীকে | কখনও তোর্সার চুমুর স্বাদে মনে পরে যাচ্ছে প্রিয়াঙ্কার লিপ-স্টিকের গন্ধ | গত একমাসে এই অদ্ভুত ব্যাপারটা তোর্সার সাথে প্রায় অনেকটাই দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে | তোর্সা কতটা কি বুঝেছে কে জানে কিন্তু মৈনাক ভাল ভাবেই টের পেয়েছে এই অস্বস্তির জের | কাজে মন নেই | খাওয়া-দাওযা ঠিক মত নেই | বিশেষ করে ডিনারের পর মৈনাকের একটা ক্রাইসিস তৈরি হচ্ছে | তোর্সা যদি চায় তাহলে? শুরুটা ঠিকমত হবে কিন্তু তারপর? দুজনে রিদমে এসে গেলেই মৈনাক জ্ঞানশুন্য হয়ে পড়ছে | ভাগ্য ভাল মুখ থেকে কারো নাম বেরিয়ে যায়নি | আজ তোর্সাকে জীবনের পুরনো কথা গুলো বলে দিতেই হবে |তোর্সা কিভাবে নেবে জানা নেই | কিন্তু যা হবার হবে | মৈনাকের পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছেনা | এসব ভাবতে ভাবতেই মৈনাক মেট্রো স্টেশনে ফিরে এসে লাইনে দাঁড়াল | একটা কবি সুভাষ |

বাড়ি ফিরে দোতলায় চলে এল মৈনাক | বেডরুমের ভেতরটা বাইরে থেকে অন্ধকার লাগছিল | ভেতরে ঢুকে ব্যাপারটা বোঝা গেল | একটা মোমবাতি জ্বলছে | জানলায় দাঁড়িয়ে আছে তোর্সা | বাইরের দিকে মুখ করে | ব্যাগটা খাটেই নামাল মৈনাক | আলো জ্বালাওনি কেন ? তোর্সা নিরুত্তর | আস্তে আস্তে কাছে গিয়ে তোর্সার কাঁধে হাত রাখল মৈনাক, শরীর খারাপ নাকি? তোর্সা সেভাবেই নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে জবাব দিল, একটা কথা আছে আমার, তোমায় এখনই শুনতে হবে | বুঝে গেল মৈনাক | গলাটা খুব শুকনো লাগছে হঠাৎ | এবার বেশ কিছু অপ্রিয় কথা শুনতে হবে | পুরো ব্যাপারটার জন্যে একটা শো-কজ হবে | তোর্সা মুখ খুলল | কাঁপা কাঁপা গলা | একটা কথা আমি তোমায় জানায়নি আগে | মৈনাক চুপ | কোথা থেকে শুরু করতে চাইছে তোর্সা | "আগেই তোমায় সব জানান উচিত ছিল |" মৈনাক কোনওমতে জিজ্ঞেস করল, "কি?" বলে চলল তোর্সা. "বিয়ে আগে অফিস থেকে পিকনিকে গিয়ে এক কলিগের সাথে আমি মিলিত হই | পুরোটা নয় | তবে অনেকটাই | হঠাৎ হয়ে গেছিল ব্যাপারটা | ছেলেটার খুব একটা এফেক্ট হয়নি কিন্তু আমি মানসিক ভাবে খানিকটা জড়িয়ে গেছিলাম | তবে সাত-আট মাস পর মাথা থেকে এটা বেরিয়ে গেছিল | বাট আই ডোন্ট নো, গত কয়েকদিন থেকে এই ঘটনাটা খুব ট্রাবল দিচ্ছে আমায় | তুমি আদর করতে শুরু করলেই আস্তে আস্তে আমার ঘটনাটা মনে পড়তে থাকে | আমি কিছুতেই তোমায় সাড়া দিতে পারিনা মৈনাক | কিছুতেই পারিনা |" হঠাৎ ঘুরে তোর্সা মৈনাকের বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল | মৈনাক এখনও নীরব | কিন্তু হঠাৎ করে একধাক্কায় মনের মধ্যে অন্ধকারটা কেউ যেন কাটিয়ে দিয়েছে | এই ফিলিংটাকে কি বলে মৈনাক জানেনা | এটা স্বস্তি? না কেস খাওয়ার থেকে রেহাই পেয়ে চাপা আনন্দ? এটা বৌয়ের কনফেশনের সুযোগ নেওয়ার সময় নয়তো? মাসখানেক সে নিজেই এত অসুবিধায় ছিল যে তোর্সার অসহায়তাটা খেয়ালই করেনি | তাহলে দুজনে যন্ত্রের মত একে অন্যের প্রয়োজন মিটিয়েছে | একটুও ইনভল্ভমেন্ট ছিলনা কারও | মৈনাক তোর্সাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আস্তে আস্তে বলল, "আমার কিছু কথা আছে | এখনই শুনতে হবে তোমায় |"

এক মাস পরে একদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠল দুজনে | "উফফফ, মাংকি ক্যাপটা পরে নাও | ঠান্ডা লাগলে এখানে ফেলে চলে যাব কিন্তু |" বাধ্য হয়েই টুপিটা পরেই নিল মৈনাক | তোর্সাও মাফলার দিয়ে নিজের কান-মাথা মুড়িয়ে নেয় | বেরিয়ে পড়ে দুজনে | হোম-স্টের গেট পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যায় | "দেখ মেঘ কেটে গেছে |" খিলখিল করে হাসে তোর্সা | মৈনাক একটা লম্বা হাই তুলে বলল, " রাতে বলেছিলাম তো সকালে সানরাইজ কন্ফার্মড | সেবার মনে নেই? এরকম মেঘ কেটেই যায় শেষ-মেশ |" ভোরের হালকা আলোয় অসম্ভব সুন্দর লাগছে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে | দুজনে হাত ধরে দাঁড়িয়ে পড়ল | ঘুম ভাঙছে শায়িত বুদ্ধের | সূর্য উঠছে |

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.