হসপিটালের বেড এ শুয়ে আছি।একদিন আগে আমার বেবী বয় হয়েছে ।পাশাপাশি সারি সারি বেড।সব বেডেই সদ্যজাত বেবী আর তাদের মায়েরা রয়েছে।

দুপুরে নিজের বেডে শুয়ে আছি আমি চোখ বন্ধ করে।ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজে চোখ মেলে তাকালাম।কোনো বেবীর কান্নার আওয়াজ তো নয়!দেখলাম আমার পাশের বেডের মা কাঁদছে তার বেবীর মুখের দিকে তাকিয়ে।খুব খারাপ লাগছে ওর কান্না দেখে।ভাবলাম বাচ্চাটির কি কিছু হয়েছে?আমার আয়াকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম

-"কি হয়েছে?''

আয়া বললো

-"মেয়ে হয়েছে গো দিদি।বাড়ির থেকে শাশুড়ি মানে বাচ্চাটির ঠাকুমা দেখতে আসেনি।বলেছে দেখতে আসবে না সে।তাই কাঁদছে।প্রথমে নাকি একটা মেয়ে বাচ্চা হয়ে মারা গেছে।আবার মেয়ে হয়েছে।"

শুনতে শুনতে ভীষণ ভাবে অবাক হলাম আমি।ঐ মায়ের কান্না ভেজা মুখের দিকে তাঁকিয়ে ভাবছিলাম

-"মা হওয়া প্রত্যেক মেয়ের জীবন কে পূর্ণতা দেয়।কিন্তু এই মা তো তার জীবনের সেরা পাওয়াটাকে পূর্ণ ভাবে উপভোগ করতেই পারবে না কতিপয় মানুষের জন্য।"

আমার সামনের বেডের মা কে দেখছি কেমন যেন মনমরা হয়ে বসে থাকে।বাচ্চাটা কাঁদলে ও কেমন যেন চুপচাপ।পরে শুনলাম ওর আগে একটা মেয়ে আছে ।ছেলের আশায় আবার বাচ্চা নিয়েছে।কিন্তু আবার মেয়ে হয়েছে।তাই মেয়েটার প্রতি বিরূপ।

এ কি চিন্তা ভাবনা।মনে মনে ভাবছিলাম

-"এই মেয়ে সন্তান গুলো কোন পরিবেশ পরিস্থিতির মধ্যে বড়ো হয়ে উঠবে?যাদের জন্মানোর সাথে সাথে চোখের জল অবহেলা দিয়ে শুরু হলো তাদের ভবিষ্যত জীবন কি হবে?"

কি মনে হচ্ছে গল্প শেষ এখানেই?না!যদি এটা গল্পের শেষ হতো তাহলে তো গল্পটা শুরুই হতো না।

সেদিন রাতে একটা ফিসফিস কথা বলার আওয়াজ কানে এলো।পাশ ফিরে হসপিটালের আলোতে দেখলাম একটি ছেলে সদ্য মা হওয়া মেয়েটির দু হাতে হাত রেখে খুব আস্তে আস্তে বলছে

-"তুমি কেঁদো না আমি তো আছি।আমি ওর বাবা তুমি ওর মা।আমরা দুজনে মিলে ওকে বড়ো করে তুলবো।আর ঠাকুমা, নাতনি বাড়ি গেলে সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।তুমি একদম কেঁদো না সোনা।আমি খুব খুব খুশি আমার রাজকন্যার জন্যে।তুমি শুধু আমার রাজকন্যার আর নিজের খেয়াল রাখো।"

যাবার আগে ছেলেটি তার রাজ কন্যার মায়ের কপালে ঠোঁট ছোঁওয়ালো।এবার ছেলেটি দোলনার কাছে দাঁড়িয়ে তার রাজকন্যাকে অপলক দৃষ্টিতে দেখছিল। সে দৃষ্টিতে ছিল অনেক অনেক ভালোবাসা।বাবা হবার আনন্দের অনুভূতি।অনুভব করলাম ঐ দৃষ্টি ওকে সারাজীবন ধরে আগলে রাখবে।

(বিশেষ অনুমতি নিয়ে ছেলেটি রাতে দেখা করতে এসেছিল।)

-তুমি পাগল সোনা?মেয়ে হয়েছে তো কি হয়েছে ?ঘরে লক্ষ্মী এসেছে।তুমি আমি মিলে আমাদের দুই মেয়েকে বড়ো করে তুলবো।আর শোনো মেয়েরা কিন্তু মায়ের কষ্ট বোঝে।

মেয়েটির বাবা তার ছোট্ট লক্ষ্মী কে আদর করতে করতে বলছে মেয়েটির মা কে।মেয়েটির বাবার মুখে এক অনাবিল হাসি।

বুঝতে পারছিলাম ঐ হাসি তার লক্ষ্মীর চোখে কোনোদিন জল আসতে দেবে না।

এটাও কিন্তু এ গল্পের শেষ নয় শুরু।দুটো নতুন জীবনের শুরু....

-সমাপ্ত-

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.