বেদবতীর উপাখ্যান


চারদিকে খবরটা রটে যাবার আগেই দাহ কার্য সমাধা করতে হবে। ছি ছি ছি, চক্রবর্তী বাড়ির বউ শেষে কিনা সুইসাইড ! তা বিবাহিত দেওরের সাথে না হয় একটু ইয়ে ছিলই, কিন্তু তা তো বাড়ির ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল, এইবার যে চারদিকে ঢিঢিক্কার পড়ে যাবে। শেষরক্ষে করলেন শ্বশুরের বাবা। মোটা টাকা দিয়ে বিশ্বস্ত বলিষ্ট ছ'জন শ্মশান যাত্রীকে পাঠালেন দাহ করাতে। স্বামী তো নয়ই, ভাসুর, দেওর কাউকেই সাথে যেতে দেওয়া হল না সঙ্গে। বেশ খানিক দূরে শ্মশান, তখনো ইলেকট্রিক চুল্লি স্বপ্ন। হেঁটে যেতে হত। মাঝে এক বিরাট জঙ্গল।রাত এগারোটায় ওরা রওয়ানা দিল। প্রায় তিন ঘন্টার হাঁটা পথ। বডি নিয়ে কিছুদূর এগোতেই শুরু হল তুমুল ঝড় বৃষ্টি।জঙ্গলের মধ্যে একটা গাছের নীচে খাট রেখে ছয়জনা আশ্রয় নিল কাছের একটা মন্দিরে।এদিকে বৃষ্টির বেগ ক্রমেই বাড়তে লাগলো।
কিছুক্ষণ নাড়ির গতি স্তব্ধ হয়ে গেছিল, বিষ ক্রিয়াও কিভাবে যেন কেটে গিয়ে ফের প্রাণের স্পন্দন ফিরে এল, ধীরে ধীরে চোখ মেলল করুণা। পুরোনো কথা এমনকি নিজের নামটাও আর কিছুতেই মনে পড়ছে না। খাটে উঠে বসল। প্রবল বৃষ্টিতে আশপাশে কাউকে না দেখতে পেয়ে হাঁটা দিল জঙ্গলের দিকে।বৃষ্টি থামতে ছ'জন ফিরে এসে দেখল খাট ফাঁকা। খানিক ভয় খানিক বিস্ময়ে ক'জন হতবাক হয়ে পড়লো। খানিক এদিক ওদিক খোঁজাখুঁজি করে তারা নিশ্চিত হল, বোউদিমণিকে শেয়ালে নিয়ে গেছে। নির্দিষ্ট কিছু সময় ওখানে অপেক্ষা করে ভোরবেলায় ওরা চক্রবর্তী বাড়ি ফিরে এল এবং বল্ল যথাসম্ভব নিয়মমোতাবেক দাহ কার্য সুসম্পন্ন হয়েছে।
এদিকে সম্মোহিতের মত করুণা হাঁটতেই থাকে,হাঁটতেই থাকে। একসময় খুব নীচু একটা মোটা গাছের ডালে মাথা ঠুকে পুরোপুরি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। যখন জ্ঞান আসে, দেখে খড়ের চালের এক বাড়িতে মাটির দাওয়ায় সে শুয়ে আছে। চারদিকে কৌতুহলী মানুষের মুখ।একজন মহিলা মুখে অনবরত জলের ঝাপটা দিচ্ছেন। সুধাকর চাটুয্যে গঙ্গাস্নানে গিয়ে করুণাকে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন এবং স্থানীয় কয়েকজনের সহায়তায় বাড়ি নিয়ে আসেন। সুধাকর নিষ্টাবান ব্রাহ্মণ। দুবেলা আহ্ণিক না করে জলগ্রহণ করেন না। আবার বিদ্যাসাগর মশাইএর চরম ভক্ত। বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে এবং বিধবা বিবাহের পক্ষে। অনেক চেষ্টা চরিত্তির করেও করুণার স্মৃতি ফিরিয়ে আনা গেল না। সুধাকর তার নাম নতুন দিলেন বেদবতী। নিজের মেয়ের মতই বাড়িতে রেখে দিলেন। বিপত্নীক সুধাকর আর তাঁর পুত্র প্রভাকরের ছোট্ট সংসারে বেদবতী যেন আশার আলো।
কয়েকমাস যেতে না যেতেই সুধাকরের ছেলে প্রভাকরের সাথে বেদবতীর সখ্য গড়ে উঠল। এতকিছুর মধ্যেও বেদবতী মাঝে মাঝে কেমন যেন অন্যরকম হয়ে যায়। ঝড়ের রাতে বা চন্দ্রালোকিত রাতে কোন এক সুদূর অতীত তাকে টেনে নিয়ে যায় এক মায়ালোকে।স্বপ্নে প্রায়ই দেখে সদ্য দাড়ি গোঁফ গজানো এক ২২/২৪ বছরের সৌম্য যুবা কোন এক ছাদের ঘরে বসে তাকে কবিতা শোনাচ্ছে, শান্ত স্নিগ্ধ তার কন্ঠস্বর, চোখে এক গভীর আকুতি। কিঞ্চিৎ কৌতুক করে বেদবতী তাকে বলে "ধুস এ কি কবিতা নাকি"? জেদ চেপে যায় সেই নব্য যুবার। আরো লেখে আরো, আরো।
বৌদি মারা যাবার পর শুভ কেমন অন্যরকম হয়ে যায়। তার সুখ, দুঃখ হাসি-কান্না ভাগাভাগি করে নেবার মানুষটাই যে নেই সেটা ভাবতে খুব কষ্ট হয়। এদিক ওদিক কান পাতলে অনেক কথাই শোনা যায় কিন্তু একথা কাউকে বোঝানো হয়ে ওঠে না যে তারা শুধু বন্ধুই ছিল। অন্য কোন খারাপ সম্পর্ক তাদের ছিল না। আসলে শালা সমাজটাই এমন। একটা ছেলে আর একটা মেয়ের গভীর বন্ধুত্বের কথা কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। এই নব্য কবি এখন কাকে শোনাবে তাঁর কবিতা?কার সাথে করবে সাহিত্য আলোচনা। তাঁর স্ত্রীকে কতবার কবিতা গল্প শোনাবার চেষ্টা করেছেন শোনাতে পারেন নি, নানা কাজের অছিলায় উঠে চলে গিয়েছে। তবে কি ছেড়ে দেবে লেখার কাজ? না না কিছুতেই না। লেখা এগিয়ে চলে এবং আশ্চর্যের বিষয় বেশিরভাগ কবিতাতেই ফিরে ফিরে আসে তার বৌদির কথা, তাদের বন্ধুত্বের কথা।

শুভ চক্রবর্তী আজ প্রবীণ। স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে বছর খানেক। শহরের পরিবেশ ছেড়ে কোন এক অজ পাড়াগাঁয়ে একটি স্কুল খুলেছেন। মেয়ে এবং ছেলের বিয়ে দিয়েছেন অনেক দিন। একটি নাতিও হয়েছে। তার স্কুলের নাম বেশ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। দু চার দিনের বেশি কেউ স্কুলে না এলে তার বাড়িতে নিজেই গিয়ে হাজির হন। স্কুলে চারজন নতুন মাস্টার নিয়োগ করেছেন। লেখালেখি ছাড়তে পারেন নি। বেশ দিন তিনেক হল মন্দিরা স্কুলে আসছে না, সাত বছরের মেয়েটার চোখে মুখে যেন আশ্চর্য এক মায়া কবে কোথায় যেন ওই মুখ দেখেছেন, বুঝি বা পূর্ব জন্মের স্মৃতি। মালিকে জিজ্ঞাসা করে ওর বাড়ির ঠিকানা নেয়। বিকেলের দিকে রওয়ানা হয় যখন ওদের বাড়ি পৌঁছান তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বলছে। উঠোনের দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে শুভ। সহসা চমকে ওঠে, মাটির দাওয়ায় দেয়ালে ঠেসান দিয়ে অমন স্থানুর মত বসে থাকা প্রৌঢ়া কে? মাথার সামনের দিকের কিছু চুল পেকে গেছে চোখ দেখে মনে হচ্ছে কোন এক সুদূর আকাশে তা নিবদ্ধ। পুরোনো কথা সব ভিড় করে আসতে চায়। কান্না যেন ঠেলে আসতে চায়। অনেক কষ্ট করে দমন করে নিজেকে। আরো এগিয়ে যায় কবি। এদিকে সাড়া পেয়ে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে আসে মন্দিরা। কবির চোখ সেদিকে নেই, দৃষ্টি এখন ওই বয়স্কা মহিলার দিকে। আকাশের থেকে চোখ নেমে এসেছে প্রৌঢ়ার তা এখন কবির দিকে নিবদ্ধ।মুখে কথা সরে না ফ্যাল ফ্যাল তাকিয়ে থাকে কবির দিকে, দুচোখে যেন সাত সাগরের জল, ঝরে পড়তে চায় মাটির বুকে।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.