মৌলালির ক্রসিং থেকে গাড়িটা ডানদিকে ঘুরতেই,স্বনামধন্য রহস্য রোমাঞ্চ ঔপন্যাসিক লালমোহন গাঙ্গুলী আর ধৈর্য রাখতে না পেরে বলে উঠলেন-“মশাই যাচ্ছি টা কোথায় বলবেন?”

ফেলুদা সামনের সিটে বসে,চারমিনারে শেষ টানটা দিয়ে সিগারেটটা ক্যারামের স্ট্রাইকারের মত দুআঙুলের টোকায় চলন্ত গাড়ি থেকে পাশের জঞ্জালে নিক্ষেপ করে উল্টো দিকে ঘুরে বলল-“তখন যে হরিপদ বাবুকে বললাম M.G.Road,শোনেন নি?

-“তা শুনেছি কিন্তু দরকারটা কি?একটু যদি ক্লু দেন,হে হে।”

-“ডাকনাম হ্যারির ছেলে,তেতলা বাড়ি,আর মহাদেবের জটা!

-“বোঝো! চন্দ্রবিন্দুর ‘চ’,বেড়ালের তালব্য ‘শ’,রুমালের ‘মা’ ”বেজার মুখ করে বললেন জটায়ু।

-“কি তোপসে আমরা কোথায় যাচ্ছি?”

এতক্ষণ আমিও ঠিক ঠাওর করতে পারছিলাম না আমরা কথায় যাচ্ছি,তবে এই ক্লু শুনে গন্তব্য স্থল একেবারে জলের মতন পরিস্কার হয়ে গেল।

-“ব্যোমকেশ বক্সির বাড়ি ?”

-“সাব্বাস তোপসে,এবার জটায়ুকে বুঝিয়ে দে দেখি।”

-“এই দাড়াও তপেশ ভাই,লেট মি ট্রাই,M.G,Road এর আগের নাম হ্যারিসন রোড হল গিয়ে হ্যারির ছেলে,মহাদেবের নাম করতে বেশিরভাগ সময়ে হর হর ব্যোম নাম করা হয়,আর তার জটা অর্থাৎ কেশ,মিলিয়ে হল ব্যোমকেশ।”
-“প্রখর রুদ্র তো বেশ প্রখর হয়ে উঠছে দেখছি এবার।”

-লালমোহনবাবু তার বিনয়ের হাসিটা হেসে বললেন,“মশাই বলেন কি,আমরা এখন সত্যাস্বেনীর বাড়ি যাচ্ছি?”
-“উফ! লালমোহনবাবু সত্যাস্বেনী নয়,সত্যান্বেষী,মানে যিনি সত্যের অন্বেষণ করেন ।”
-“দাঁড়ান দাঁড়ান একটু নোটপ্যাডটায় সেভ করে নি,বড় কাজের জিনিস এটা ,কি সুন্দর অভ্রতে বাংলা লেখা যায়,টেকনোলজির এ উন্নতি ভাবা যায় না মশাই।”

-“আপনি তো এবার ব্লগেও লেখালেখি শুরু করতে পারেন লালমোহন বাবু?”
আমার প্রশ্নে হেসে ভদ্রলোক উত্তর দিলেন লিখছি তো,লেখা শুরু করে দিয়েছি।সেদিন ফেলুবাবুর ফেসবুক স্ট্যাটাসে কমেন্ট করলুম নামটা,‘মুখপুস্তিকায় মুখোমুখি’,ওইটেই আমার নেক্সট উপন্যাস ।
“মুখপুস্তিকা পরে হবে আপাতত সত্যের মুখোমুখি হতে হবে, আমরা এসে গেছি।”

হরিপদ বাবু বাঁ দিক করে গাড়িটা দাঁড় করাতেই দেখলাম,একটি তিনতলা পুরনো বাড়ি,বয়স কম করে দেড়শো বছর হবে।দোতলার ছোট্ট বারান্দা,শিকভাঙ্গা গ্রিলের জানলা ,ইট সুরকির রঙ বেড়িয়ে আসা খাস উত্তর কলকাতার সাবেকি বাড়িটা ভীষণ গর্ব করে বড়রাস্তার বাঁদিক ঘেসে দাড়িয়ে আছে ।

-“স্থানমাহাত্ম্য বলে একটা কথা আছে জানতুম মশাই,এখানে এসে স্পষ্ট বুঝতে পারছি।বেশ একটা ইয়ে ইয়ে ফিল করছি বুঝলে ভায়া তপেস!”লাল পাথরের তৈরি চওড়া সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বললেন লালমোহন বাবু।
-“থ্রিলিং বলছেন?কিছুটা বাঁচিয়ে রাখুন,ভেতরে ঢুকেও অনেকটা থ্রিল পাবেন !”
“ফেলুদা তুমি কি ওঁদের জানিয়েছ?”
-“তোর কী মনে হয় বোকাচন্দর ওদের না জানিয়ে আমি আসব?”
বাড়িটার তেতলার ঘরের বাইরে উপস্থিত হতেই দেখলাম,দরজার পাশে পিতলের ফলকে লেখা-

শ্রীব্যোমকেশ বক্সী(সত্যান্বেষী)
শ্রীঅজিত বন্দ্যোপাধ্যায়(সাহিত্যিক)
শ্রীমতি সত্যবতী বক্সী

কলিংবেলটা টেপার কিছুক্ষণের মধ্যেই সাদা আদ্দির শার্ট আর ধুতি পরিহিত রিমলেস ফ্রেমের চশমা পরা যে ভদ্রলোক দরজা খুলে দিলেন তিনি অজিত বাবু ছাড়া আর কেউ হতে পারেন না।
-“আসুন আসুন আমরা আপনাদের জন্যই অপেক্ষা করছি।

ভেতরের ঘরে ঢুকতেই দেখলাম ঘিয়ে-সাদা পাঞ্জাবি আর ধুতি পরিহিত এক ভদ্রলোক একমনে,ইউটিউবে কোন একটা মার্ডার কেস দেখে চলেছেন আরামকেদারায় বসে,সামনের পেল্লাই সাইজের স্যমসং এর স্মার্ট টিভিতে ।আমরা এসছি সেটা বোধহয় খেয়াল করেন নি।ভদ্রলোকের হাইট ফেলুদার মতই হবে,সুঠাম চেহারা,চোখে কালো ফ্রেমের চশমা।
একটু গলা খাঁকড়িয়ে অজিত বাবু বললেন-
“ইয়ে ব্যোমকেশ ওনারা এসেছেন ।

-“নমস্কার!আমি প্রদোষ চন্দ্র মিত্র।এটি আমার খুড়তুতো ভাই তপেশ রঞ্জন মিত্র আর ইনি হলেন আমার বন্ধু লালমোহন গাঙ্গুলি।”
এরপর একটা ঠাণ্ডা অথচ তীক্ষ্ণ উত্তর এলো-
“আপনাদের সবারই নাম শুনেছি,কিন্তু চাক্ষুস এই প্রথম।আপনার লাস্ট ওই জাল ডাক্তারের কেস টা পেপারে পড়ছিলাম।ভালই ধরেছেন পাণ্ডাটাকে।আর লালমোহনবাবু আপনার ‘ভেনিজুয়েলার ভ্যানভ্যানানি’ খোকার খুব ভালো লেগেছে।”এই বলে টিভিটা বন্ধ করলেন ব্যোমকেশ বাবু।আমরা পাশের সোফা আর চেয়ারে ভাগাভাগি করে বসলাম,ফেলুদা আর ব্যোমকেশ বাবু মুখোমুখি চেয়ারে।ততক্ষণে পুঁটিরাম এসে সবাইকে চা আর প্লেটে করে ফিসফ্রাই আর মিহিদানা দিয়ে গ্যাছে।
সেগুলোর সদগতি করতে করতে ব্যোমকেশ বাবু বললেন-“বলুন মিঃ মিত্তির,হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?”

“বলছি,তার আগে বলুন তো মিসেস বক্সী আর খোকাকে দেখছি না,ওরা কি পাটনায় সুকুমারবাবুর ওখানে ?”
-“বিলক্ষন! বলে সিগারেটের বাক্সটা এগিয়ে দিলেন ফেলুদার দিকে।”
অজিতবাবু একটু অবাক হয়েছেন দেখে ফেলুদা বলল,“আসলে এখন সব স্কুলে গরমের ছুটি চলছে,ঢোকার সময় বাইরের ঘরে দেখলাম বইপত্রের তাকটা বেশ যত্ন করে কাপড়ে মোড়া,আর জুতোর র্যালকে খোকার স্কুল শু টা ছাড়া আর কোন জুতো নেই।আর বাকিটাতো আপনার লেখা পড়েই জেনেছি অজিতবাবু।”
অজিতবাবুর চোখে মুখে তখন অবাক ভাবটা আরও স্পষ্ট।

“হ্যাঁ যেটা বলছিলাম ব্যোমকেশ বাবু,ওই জাল ডাক্তারটিকে ফাঁদে ফেলার আগে আমি একটি ইমেল পাই,অদ্ভুত ভাবে তাতে ওই জাল ডাক্তারটির আসল পরিচয় জানিয়ে দেয় মেল প্রেরক।আমি তখনো খানিক অন্ধকারে,ওই বেসরকারি নার্সিং হোমের জাল ডাক্তারটিকে নিয়ে।রহস্যভেদের আসল ক্লু টা ওই মেলের মধ্যেই লুকিয়েছিল।”
-
“আমাকে সেই মেল প্রেরককে চিনতে আপনাকে সাহায্য করতে হবে তাই তো?”
-“ঠিক তাই।”
-“তা মেইল আইডিটা কি?”
-“এই আইডিটাই তো রহস্যের চাবিকাঠি আমার কাছে।আইডিটা হল-
hiddencocaineriver@gmail.com।
-“বাহ!চমৎকার নাম তো!এ কারবার তো আর প্রকাশ্যে হয়না মিত্তির
মশাই।বুদ্ধিমান লোক নো ডাউট ,ঠিকাছে আপনি মেইলটা আমায় ফরোয়ার্ড করে
দিন,আমি একটু ভেবে দেখি ব্যাপারটা নিয়ে।”

-“তার কি খুব দরকার হবে বক্সী বাবু?”ফেলুদার বরফশীতল কণ্ঠে গোটা ঘরে শুধু
ঘড়ির টিক টিক ছাড়া আর কোন শব্দ নেই।আমরা সবাই থম মেরে গেছি।শুধু দুই মস্তিস্কের সেয়ানে সেয়ানে টক্কর আমাদের চুপ করিয়ে রেখেছে একদম।
- “বলে ফেলুন,আমি শুনছি।”

ফেলুদা বলে চলল আসলে প্রথমটা আমিও বুঝিনি তারপর একদিন হঠাৎ করেই
লালমোহনবাবু বাড়িতে এসে বললেন,গুপ্ত সাম্রাজ্যের উপর উনি একটি বই লিখবেন।তখনি আমার মেলটার কথা মাথায় আসে এবং খুলে বুঝতে পারি hidden এর অন্য প্রতিশব্দ হল গুপ্ত।আর river অর্থাৎ নদী,বা পুং বিশেষে নদ।cocaine আর নদ একসাথে দাঁড়ায় কোকোনদ,পুরো নামটা হল কোকনদ গুপ্ত আপনার চিরশত্রু,’সত্যান্বেষী’ গল্পের অনুকুল বাবু ওরফে ‘উপসংহার’ গল্পের কোকনদ গুপ্ত।

আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি উনি এখনো জেলে সাজা খাটছেন,কাজেই এ কাজ আপনার।
-“আমি জানতাম আপনি ঠিক ধরে ফেলবেন।আসলে আপনার সাথে আলাপের লোভ অনেকদিনের,তাই এই ছোট্ট খেলার অবতারণা।”

-“থ্যাঙ্ক ইউ স্যার!কোকনদ গুপ্তের প্রকাশ্য মেল না হলে কেসটা সল্ভ হতে সময়
লেগে যেত অনেক।আপনি যে কেসটা ফলো করে আমায় হেল্প করেছেন,এটাই পাওনা
আমার।”
-“দেখি আপনার আঙুলগুলো।”দুই দুঁদে রহস্যভেদীর করমর্দনের মধ্যে সমাজকে
কলঙ্কমুক্ত করার একটা সুদৃঢ় ছবি দেখতে পেলাম আমরা সবাই।
গাড়িতে ওঠার সময় লালমোহন বাবু বললেন-“জাল ডাক্তারের কেসটা
কি ফেলুবাবু?”
“তোপসে লিখছে ওটা নিয়ে,লেখা শেষ হলে পুরোটা জানবেন।”
-যাই হোক মশাই ঝড় বইয়ে দিলেন তো।সাধে কি বলি জয় বাবা ফেলুনাথ!”
-“আজ একটা অন্য কথা বলুন,জাল ডাক্তার রহস্যে ইনি আমায় টেক্কা দিলেন।”
-“কি বলব মশাই?”
-“হর হর ব্যোমকেশ!”
হরিপদবাবু গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিয়েছেন,জটায়ুর ব্যোম ভোলেনাথ চিৎকারের মধ্যে দিয়ে
গ্রিন আম্ব্যাস্যাডারটা হুস করে বেড়িয়ে গেল ফ্লাইওভার দিয়ে।
এবার গন্তব্য ২১ রজনী সেন রোড!


bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.