"হ্যালো..."

"হ্যালো, আ-আ-আমি বলছি, প্লিজ কেটোনা ফোনটা, কথা দিচ্ছি আর কোনোদিন বিরক্ত করবো না তোমায়। আজ একটিবার কিছু কথা বলতে চাই।"
"আমার স্বামী ঘরে আছে, ভুল বুঝবে, রাখছি ...।"
"কি নিখুঁত মিথ্যে বলতে শিখে গেছো তুমি ..."
"মা-আ-আ-নে, তুমি কোথায়? সত্যি বলোতো?"
"ভয় নেই, তোমার চোখের সীমার বাইরে আছি। তবে স্টেশনে তোমার স্বামীকে ট্রেনে উঠতে দেখলাম কিছুক্ষণ আগে।"
(দূরাভাষের দুপারে কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা)
"না না, মিথ্যে বলে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই, আমি জানি তুমি অতীত ভুলে সামনে এগোতে চাও। আর সেটাই ঠিক তোমার জন্য। কিন্তু এটাও ভাবা ভুল যে আমি অতীতকে আঁকড়ে রাখতে চেয়েই আজ ফোন করেছি তোমায়।"
"তবে কেন করেছো?"
"কেমন আছো?"
"এটাই জানতে ফোন করেছো? তবে শোনো বেঁচে আছি, ভালো আছি আর ভালোই থাকবো।"
"নিশ্চয়ই ভালো থাকবে ..।"
"আর আমার এই ভালো থাকাতে তুমি ভালো থাকবেতো?"
"ভালো খারাপ সব বদলে যায় গো সময়ে আর পরিস্থিতিতে ..."
"মানে? কি বলতে চাও?"
"ও কিছু নয়। যেটা বলতে কল করেছি ... হ্যাপি বার্থ ডে ডার....।"
"আটকে গেলেতো 'ডার্লিং' শব্দতে?"
"আসলে তোমার জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানানোর অভ্যাসটা বোধ হয় কাটিয়ে উঠতে পারিনি এখনো। তবে অভ্যাস হয়ে যাবে শীঘ্র ... তোমার বকুনিতে সিগারেটের সংখ্যা কমানো, বুক পকেটে ফোন না রাখা, খালিপেটে না থেকে ছোটো পারলিজির প্যাকেট সাথে রাখা, আর ... অফিস ফেরত পথে তোমার শেষ নিষেধাজ্ঞায় পাড়ার মোড়ে অপেক্ষা না করা ... এসবের মতোই হয়ে যাবে অভ্যাস।"
(কিছুটা ভেজা গলায়) "আমি এসব শুনতে চাইনা, প্লিজ ফোন রাখো।"
"আমি বলতেও চাইনি, বিশ্বাস করো। কেন যে তাও ... ? যাই হোক, যেটা বলছিলাম, তোমার আমাকে নিয়ে অভিমান করাটা খুব স্বাভাবিক। কারণ সত্যি তুমি আমায় এতোটা ভালোবেসেছিলে যে, বাড়ির সবার আপত্তিতেও এক বস্ত্রে বেড়িয়ে আসতে চেয়েছিলে ওমন রাজপ্রাসাদ থেকে আমার ছোট্ট কুঁড়েঘরেতে। আমিও তখন জেগে জেগেই রূপকথার রাজ্যের স্বপ্ন বুনছিলাম তোমায় নিয়ে। কিন্তু সেদিন তোমার বাবা যখন আমাদের পালাবার শেষ মুহূর্তে আমাকে তোমার পাশে দেখে কড়া কথাগুলো বললেন, আমি যেন মূহূর্তে আছড়ে পরেছিলাম বাস্তবের মাটিতে। সেদিন তোমার হাতদুটো ছেড়ে বেহায়ার মতো অপমানগুলো হজম করে বাড়ি ফিরে রাতে শুয়ে নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করেছিলাম, কাজটা ঠিক করছিলাম কি আদৌ? তখন হঠাৎই মনে পড়ে গেল বাস্তব সব অভিজ্ঞতাগুলো। যখন দেখেছি মা বাবার ভালোবাসায় চির ধরিয়েছিল দারিদ্রের চোখ রাঙানি, যখন দেখেছিলাম বোনের বিয়েতে টাকা দিতে গিয়ে পোয়াতি বৌদির চিকিৎসায় ঘাটতি হয়ে বাচ্চাটা মরে গেল, পাশের বাড়ির দিদিটার ছোট্ট ছেলেটা টাকার অভাবে জ্বরের বিছানায় জীবনের অনিশ্চয়তায় দীর্ঘ শয্যাগত, আর সেই চিন্তার মুহূর্তগুলোতে বিশ্বাস করো ... সব ভালোবাসা উড়ে গিয়েছিল। ছোটো থেকে যে পেট আর হৃদয়ের টানাপোড়েনে পেটের আগুনটাই দাউদাউ করে জ্বলে উঠতে দেখেছি বারবার। আর যদি তুমি আমার সাথে সেদিন পালিয়ে আসতে, আমার ৯ হাজার টাকার মাইনের এই কঠিন জীবন যুদ্ধে পেটের ক্ষিদের সাথে জ্বলে উঠতো মনের অতৃপ্ততা ... তার সাথে মনের এই বিশ্বস্ত ভালোবাসাটিও পুড়তে থাকতো বাস্তব চাহিদার দাবানলে ... আমি পারতাম না মেনে নিতে তোমার আত্মত্যাগের সেই পরিণতিটা। তাই কিছুটা সময় চেয়েছিলাম, হয়তো তাতেও কতটুকু কি করতে পারতাম ... জানিনা। বা হয়তো আরেকটু সময় তোমাকে আমার অপেক্ষায় পেতে চেয়েছিলাম। আমিই দোষী, শাস্তি আমার প্রাপ্য তোমার বিচারে। শুরুতেই আমার নিজের কাঁধের মাপটা বোঝা উচিৎ ছিল। ওই যে বলেনা বয়সের দোষ, তাই গঙ্গার পাড়ের হাওয়ায়, আর রাস্তার পাড়ের মাটির ভাঁড়ের চায়ে ... প্রেমের অলীক স্বপ্ন দেখে বামুন হয়ে আকাশের চাঁদ ধরার কথা ভেবে ফেলেছিলাম। আজ হয়তো আমার উপর রাগ হচ্ছে তোমার খুব, কিন্তু বিশ্বাস করো তোমায় কখনো কষ্ট দিতে চাইনি, শুধু ভালোবাসার লোভে ভুল করে ফেলেছি। পারোনা আমায় ক্ষমা করতে, একটিবার ?"
" না, পারিনা, পারিনা ...পারিনা। তোমায় না আমায় না, ভগবানকেও না ... ওই যে বলে জন্ম মৃত্যু বিয়ে তিন বিধাতা নিয়ে। সত্যিই যদি এতোকিছু তার নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে দুটি হৃদয়ের মধ্যে ভালোবাসার জন্মের সময়টা কেন তিনি পারেননি নিয়ন্ত্রণ করতে? কেন জীবন নামক শব্দটি মৃত্যুর থেকেও যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছে আজ ?"
"তুমি কাঁদছো? দেখো, আবার কাঁদালাম তোমায় আমি ... প্লিজ শোনো, সব ঠিক হয়ে যাবে। একদিন দেখো, তোমার নতুন এই সংসার ঘিরে সব ঠিক ভুলে যেতে পারবে তুমি। একটু সময় দাও, সব ঠিক হয়ে যাবে।"
"ঠিকই বলেছো, হয়তো একদিন আমি অভ্যাসবশত এই সংসারের সম্পর্ক আর কর্তব্যের বেড়িতে আবদ্ধ হয়ে উঠবো, হয়তো স্মৃতি মলিন হয়ে যাবে অতীতের পাতায়। হয়তো তোমার জায়গায় চিন্তার জগতে ঠাই নেবে অন্য নামের ভিড়, জীবনও অভ্যাসে শ্বাস নেবে তোমায় ছাড়া। কিন্তু প্রথম প্রেম ... সারাটা জীবন অতৃপ্ততার স্বাদে রাতের স্বপ্নে উঁকি দেবে ক্লান্ত জীবনের শ্রান্ত নিদ্রায়। হয়তো, সকালে উঠে আজকের মতো চোখ ভিজে যাবেনা সেদিন, কিন্তু স্বপ্ন দেখার অভ্যাসটা বোধ হয় অবচেতন মনেই থেকে যাবে।"


bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.