ছোট্ট শহরটা যেন এই রংচটা, প্লাস্টার খসে পড়া, আগাছা ও জঙ্গলী ফুল-পাতা দিয়ে ঘেরা বাড়িটার সামনে এসে শেষ হয়ে গিয়েছে। শ্বেত পাথরের ওপর ‘পদ্মনাভ দাসগুপ্ত’ লেখাটাও আজ অস্পষ্ট। বুনো লতানে গাছ গুলো বাড়ির আনাচ কানাচ বেয়ে উপরের দিকে উঠে গিয়ে বাড়ির আসল রংটাই ঢেকে দিয়েছে। তবে জবা ফুল, পেয়ারা, ডালিম জাতীয় গাছ এদিক ওদিক ছড়িয়ে আছে, তবে তারা যে সুফলা তা বলা যাবে না। বোঝাই যাচ্ছে যে অনেক বছর ধরে কেউ বাগানের যত্ন নেয় না। আর্মি অফিসার পদ্মনাভ দাসগুপ্ত সখ করে এমন একটি জায়গা বেছে নিয়েছিলেন বাংলো করার জন্যে। জায়গাটা কিন্তু সত্যিই ভীষন মনোরম ও জল-হাওয়া অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর। দুমাস প্রচণ্ড গরম আর দুমাস প্রচণ্ড শীত; বাকী সময়ের আবহাওয়া খুবই উপভোগ যোগ্য। অফিসারের আকস্মিক মৃত্যুর পর তার স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে কলকাতায় চলে যান। কখনো সখনো আত্মীয়দের নিয়ে বেড়াতে আসেন।

বাড়িটার সামনে এসে শহরের সব রাস্তা থেমে যাওয়ার অন্যতম কারণ সুন্দরী নদী।

ছোট্ট একটা এবড়ো খেবড়ো মাঠ আর তার পরেই নদী। নদীর ওপাশে সুউচ্চ টিলা; তার পরে ট্রেনলাইন। ভোররাতে বা মাঝরাতে নিঃশব্দতা ভঙ্গ করে ঝুকঝুক আওয়াজ ভেসে আসে টিলার ওপাশ থেকে। স্থানীয় আদিবাসীরা নদীটার কি একটা দেহাতী নাম দিয়েছে, এমন খটমট যে উচ্চারণ করা দায়। স্থানীয় বাঙালীরা ওকে সুন্দরী বলেই ডাকে। যদিও সারা বছর রুগ্ন ও শুস্ক হয়ে পড়ে থাকে সে। কিন্তু মুষলধারে এক পশলা বৃষ্টি হলেই সে নবযৌবনা হয়ে ওঠে; তখন তার সে কি রূপ! তাই তো বর্ষাকালে ও বসন্তকালে এই জায়গার সৌন্দর্য্য বহুগুন বেড়ে যায়।

একটানা চারদিন বর্ষন শেষে আজ একটু আগেই আকাশ পরিষ্কার হল। নীল আকাশে সাতরঙা রামধনুটা তারই প্রমাণ বহন করছে। ব্যালকনিতেই দাঁড়িয়েছিল তিয়াসা; দেখছিল বৃষ্টির জল সুন্দরীকে কেমনভাবে ভরিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু হালকা রোদ উঠতেই প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্য তাকে আকৃষ্ট করল। সে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল নদীর ধারে। পাথর আর ঘাসের মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরী হওয়া ঢিপির ওপর গিয়ে বসল। একদৃষ্টে দেখছিল সে সুন্দরীকে, তার উচ্ছ্বলতা, তার উন্মত্ততা; আকাশের নীল রঙ আর রামধনুর ছায়া নিয়ে সে ইচ্ছেমত খেলছে যেন। তারও তো এমনটাই থাকার কথা ছিল। মাত্র ষোল বছরের বালিকা সে। অথচ এইটুকু বয়সেই রূঢ় বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছে তাকে। কেমন যেন নেতিয়ে পড়েছে সে। কেন হল এমন??

একইসময় ব্যালকনিতে দোলনায় বসে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন অনিমেষ সেনগুপ্ত; আয়েস করে পান করছিলেন বলা যাবে না। কপালে তাঁর চিন্তার ভাঁজগুলো সুপষ্ট। তিয়াসা তাঁর একমাত্র সন্তান। কাল রাতের ট্রেনে এসেছেন তাঁরা। বেড়াতে নাকি মন ভাল করতে, তা তাঁরাই বুঝি জানেন না। তবে শহর কলকাতায় ক্রংক্রিটের জঙ্গলের ভিতর থাকতে থাকতে যে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। একটু আগেই সুমিত্রা ধোঁয়া ওঠা কফি দিয়ে গেল। সুমিত্রা দাসগুপ্ত অনিমেষের নিজের দিদি। অনিমেষ তিয়াসার মা’কেও আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পূরবী কাজের অজুহাত দেখিয়ে কলকাতাতেই রয়ে গেলেন। পূরবী একটি ইংরাজী মাধ্যম স্কুলের প্রিন্সিপাল। সাত দিনের জন্যে ছুটি নিতেই পারতেন, কিন্তু নিলেন না। মেয়ের ওপর তিনি অসম্ভব রেগে রয়েছেন। মাধ্যমিকে কোনরকমে ফার্স্ট ডিভিশানে পাশ করেছে তিয়াসা। অথচ স্কুলে স্ট্যান্ড করত বরাবর। স্টার মার্কস সহ অন্ত্যত চারটে বিষয়ে লেটার মার্কস পাওয়ার কথা; সেখানে কোনরকমে সেকেণ্ড ডিভিশান হতে হতে বেঁচে যাওয়া? পারল সে এইভাবে তার মায়ের মুখে চুনকালি মাখাতে? অঙ্ক ও সায়েন্স পরীক্ষার দিনে এমন অসুস্থ হয়ে পড়ল যে বেরোনোর আগে বমি-টমি করে একাক্কার। পরীক্ষা দিয়ে এসে জানালো যে তার নাকি এমন মাথা ঘুরছিল যে প্রশ্নপত্রই ঝাপসা দেখছিল। এ কি শুধুই নার্ভাসনেস??

অথচ কি ভীষন রকম চেষ্টা চরিত্র করে শহরের অন্যতম নামী স্কুলে মেয়েকে ভর্তি করিয়েছিলেন পূরবী। কো-এডুকেশান, তাই প্রথমে আপত্তি জানিয়েছিলেন অনিমেষ।

“সময় এগিয়ে চলেছে অনি, আর তুমি সেই গাঁইয়া ভূতই রয়ে গেলে! সো ব্যাক ডেটেড তোমার চিন্তা-ধারা।”

অনিমেষ পোস্ট অফিসে সহকারী বড়বাবু। পূরবী তাকে কতবার অনুরোধ করেছেন,

“তোমার রেজাল্ট ভাল, তুমি স্কলার, এম.বি.এটা করে নাও, তারপর কোন মাল্টি ন্যাশানালে জয়েন করো। পোস্টবাবুর কোন স্টেটাস আছে নাকি?”

কিন্তু অনিমেষ সেকথা কানে তোলেন নি। পোস্ট অফিসের চাকরীতেই তিনি নিজেকে অনেক সিকিওরড মনে করেন। তবে পূরবী যখন তিয়াসাকে নিজের মতন করে মানুষ করতে চেয়েছিলেন, তাতে তিনি বাধা হয়ে দাঁড়াননি। কিন্তু তাঁর আদরের কন্যাটি যে এমন একটি কাণ্ড করে বসবে, তা তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেন নি।

ব্যালকনি থেকে নিজের মেয়েকে দেখছিলেন আর ভাবছিলেন যে ছোটবেলা থেকে যে মেয়েটা এত রুগ্ন, সর্দি-কাশি, জ্বর-জ্বালা লেগেই আছে। দেখলে কেউ ওকে বারোর বেশি বলবে না। সেই মেয়ে হঠাৎ করে যৌবন ক্ষুধায় পরিপূর্ণ হয়ে গেল কবে আর কিভাবে? কল্লোলিনী সুন্দরীকে দেখে উপলব্ধি করলেন, ‘মেয়েরা বুঝি নদীর মত, নদী যেমন বর্ষার ছোঁয়ায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তেমনি মেয়েরাও পুরুষ মানুষের ছোঁয়া পেয়ে নব-যৌবন লাভ করে..!’

পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনোর পর বাবা-মায়ের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় তিয়াসাকে।“কি হয়েছে তোর? কেন এভাবে আমাদের নাম ডোবালি তুই?” তিয়াসা মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে ছিল, হঠাৎ অসুস্থ বোধ করতে থাকে। ডাক্তারকে কল দেওয়া হয়। তিনি নানারকম টেস্ট করে জানালেন যে তিয়াসা কনসিভ করেছে আর একেই ওর অল্প বয়স, তার ওপর শরীরে হিমোগ্লোবিন কম, তাই বারবার সে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তার শরীর মা হবার জন্যে উপযুক্তই হয় নি এখোনো। শুনেই পূরবী ঠাস করে এক চড় কষায়।

“ও! এই কারণে তুমি প্রশ্নপত্র ঝপসা দেখছিলে, এই কারণে তোমার বস্তির মেয়েদের মত রেজাল্ট! পারলে তুমি এটা করতে?”

অনিমেষ বুকে জড়িয়ে ধরেন মেয়েকে। তার মেয়ে কি সর্বোনাশ করে ফেলেছে তাই ভেবে তিনি কেঁদে ফেললেন।

“বল সোনা, কে তোর এই দশা করেছে? আমায় তার নাম বল। সেরকম হলে আমি তার সঙ্গেই তোর বিয়ে দেব...”

“ডোন্ট টক রাবিশ! পেটে বাচ্চা এলেই বিয়ে দিতে হবে? আজকাল এসব আকছাড় হচ্ছে। স্কুলে আমাকে প্রায়শঃই এমন কেস হ্যান্ডেল করতে হয়। ওয়াশ ইট আউট!”

শুনেই তিয়াসার চোখে জল এসে যায়। ‘আমি তো দেবার্চনকে ভালবেসেছি। সে কি অন্যায়? সেই কোন ছেলেবেলা থেকে ও আমার বন্ধু। মা স্কুল থেকে পাঁচটার আগে ফিরতেন না। আর বাবার আরো রাত হত। স্কুল থেকে ফিরে আমার যে বড়ো একা একা লাগত। সুবলা মাসী ছিল, কিন্তু তার সঙ্গে গল্প করে মজা নেই। তাছাড়া সে শুধু টিভি দেখে বসে বসে।’ হয় দেবার্চন চলে আসত তিয়াসার বাড়িতে না হয় তিয়াসা চলে যেত দেবার্চনের ঘরে। দেবার্চনের মা’ও চাকরী করেন। তিনিও রাত করে বাড়ি ফেরেন। তবে দেবার্চনের এক দাদা আছে, দেবজিৎ, তার থেকে পাঁচ বছরের বড়। কিন্তু সে খুব কম কথা বলে, সারাক্ষন কম্পিউটারে মুখ গুঁজে বসে থাকে।

‘অথচ দেবার্চন কত্তো লাইভলি! গীটার বাজিয়ে গান করে, ইচ্ছেমতন ছবি আঁকে। আমার সঙ্গে কবিতা রিসাইট করে। এছাড়া একসঙ্গে হোম-ওয়ার্ক করা তো আছেই। চার-পাঁচ ঘন্টার জন্যে দেবার্চনের ঘরটা আমার স্বর্গ মনে হত। সময় কখন কেটে যেত বুঝতেও পারতাম না।’

দেবার্চন ক্লাশ ফাইব থেকে তিয়াসার সঙ্গে একই স্কুলে, একই ক্লাসে পড়ত। দুই পরিবারের মধ্যে যাতায়াতে কোন বাধা ছিল না। তাই বন্ধুত্ব যে কবে প্রেমে রূপান্তরিত হল, তারা নিজেরাও বোঝে নি হয়তো। অবশ্য বন্ধুত্ব আর প্রেমের মধ্যেকার পার্থক্য কি তারা আদৌ জানে? তাদের মায়েরা এ বিষয়ে তাদের কিছু বলেন নি কখোনো। মোবাইলে তারা দেখেছে যে বিদেশে তাদের বয়সী ছেলেমেয়েরা এইভাবেই ফ্রেণ্ডশিপ করে, আউটিং-এ যায়। নীল আকাশের নীচে ও সবুজ ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে ডিপ কিস করে। সমুদ্রের বীচে দিন কিংবা রাতে বিকিনি পরে একে অন্যকে আদর করতে থাকে। সাদা ধবধবে বিছানায় নীল আলোকময় পরিবেশে একে অন্যের জামাকাপড় খুলে দেয়, তারপর চুম্বনে চুম্বনে দুজনের শরীরে শিহরণের খেলা চলতে থাকে। দেবার্চন ও তিয়াসার কৌতূহলী চোখ বারবার দেখেছে ছবিগুলো। তাদের অবুঝ মন উত্তেজিত হয়েছে। তারা ভেবেছিল বুঝি একটি ছেলে আর একটি মেয়ের মধ্যে বন্ধুত্ব হলেই এসব করা যায় কিংবা করতে হয়। তারা আরো বুঝতে চাইল যে এগুলো করলে কেমন মজা হয়? এইভাবেই একদিন তারা নারী ও পুরুষ হয়ে উঠল। একে অন্যের প্রতি আকর্ষন বাড়তেই থাকল, এমত অবস্থায় তাদের যৌন মিলন অবশ্যম্ভাবীই ছিল। কিন্তু প্রোটেকশান নেওয়ার কথা তাদের মাথায় ছিল না। ফলস্বরূপ আজ তিয়াসা প্রেগন্যান্ট।

সারারাত ধরে অনিমেষ ও পূরবী ঝগড়া করতে থাকেন। একে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপাতে থাকেন। “তুমি তো মা, তোমার কি মেয়েকে সাবধান করা উচিত ছিল না?”

“মানে? আমার দোষ নাকি? মেয়ে যে তোমার মতই আনস্মার্ট আগে বুঝিনি তো!”

“কি বলতে চাইছো তুমি?”

“আরে ফিজিকাল হলি তো হলি, প্রোটেকশান নিলি না? এটা বোকামো ছাড়া কি?”

“তুমি মা হয়ে এসব কাজকে সাপোর্ট করছো পূরবী?”

“আমি সাপোর্ট করি আর নাই বা করি...যুগের হাওয়া...নাথিং ডুয়িং...”

“বেশ। তাহলেও তো তোমার মেয়ের সঙ্গে ফ্রিলি আলোচনা করা উচিত ছিল।“

“তোমার ঐ রোগা পটকা মেয়ের মধ্যে এতখানি যৌনা লালসা যে লুকিয়ে আছে, তা কি আমি ভাবতে পেরেছিলাম?”

“তিয়াসা তোমারও মেয়ে পূরবী...”

“তোমারও...!”

“তাইতো লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে। আমি তোমায় বারণ করেছিলাম যে কোয়েডে পড়িও না...শুনতে যদি তখন...”

“কোন লাভ হত না। এত লোকের ছেলেমেয়েরা পড়ছে, তারা কি সবাই এসব করে বেড়াচ্ছে নাকি? আসলে তোমাদের বংশের রক্তের দোষ।”

“পূরবী, মুখ সামলে কথা বলো...”

“কেন কি ভুল বলেছি? তিয়াসার শরীরে তোমার বংশের রক্ত বইছে না? আর দেবার্চন? সে তো তোমারই নিজের ভাগনে!”

দেবার্চনও তিয়াসাকে যথেষ্ট ভালবাসত, তাই যখনই খবরটা পেল যে তিয়াসা কনসিভ করেছে, সে দাদাকে সব খুলে বলে। খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল সে। বুঝতে পেরেছিল যে মস্ত ভুল হয়ে গিয়েছে। তবুও সে কাপুরুষের মত পালিয়ে যায় নি। ফেস করল, দাদা তো তাকে এই মারে, সেই মারে। দেবজিৎ বাধ্য হয়েই সুমিত্রাকে সব জানায়। সুমিত্রাও শঙ্কর মাছের চাবুক দিয়ে মারতে থাকেন দেবার্চনকে।

“তোর বাবা এতবড় আর্মি অফিসার, দেশের জন্যে শহিদ হয়েছেন, আর তুই তাঁর ছেলে হয়ে কিনা মামাতো বোনের সঙ্গে...ছি! ছি! ছি! আমি অনি আর পূরবীর সামনে গিয়ে দাঁড়াবো কোন মুখে?”

তবুও আত্মীয় পরিজনের মধ্যে খবরটা ছড়িয়ে যাওয়ার আগে সুমিত্রাই প্রস্তাব দেন যে পদ্মনাভ’র বাংলোতে গিয়ে চুপিচুপি অ্যাবোরশানটা করিয়ে নিতে হবে।

যথাসময়ে জানাশোনা ডাক্তারের সাহায্যে বাড়ির মধ্যেই সব কাজ সারা হয়ে গেল। তিয়াসা কোন প্রতিবাদ করল না। রাতের বেলা শুধু দেবার্চনকে মেসেজ করলো, “ তোর আর আমার ভালবাসার টুকরোটা আজ খুন হয়ে গেল...”

কাঁদতে কাঁদতে বালিস ভিজিয়ে ফেলেছে তিয়াসা। অন্ধকার আকাশে তখন বিদ্যুতের ঝলকানি। জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সে। বৃষ্টির জল দাপটের সঙ্গে লাল মাটি নদীর বুকে নিয়ে গিয়ে ফেলছে। ঠিক তেমনি তার তলপেট নিংড়ে বিষাক্ত কালচে রক্তস্রাব তার সমস্ত শরীর ঘুলিয়ে দিয়ে নেমে যেতে থাকছে। বাইরের ঝড়ো হাওয়া তার চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিয়ে যায়। তার অন্তরের গভীরেও তো চলছে তেমনই এক উথাল পাথাল। তার পরিবারের কাছে আজ সে কলঙ্কিত কন্যা।

অন্যদিকে দেবার্চনও স্বস্তিতে নেই। তিয়াসার শরীর ও মনের কষ্ট তার হৃদয়কে বিদারিত করছে। তাই সে বারবার মেসেজ করে তিয়াসার লেটেস্ট খবর জানতে চাইছে। ওরা দুজনেই জানে যে এবার তাদের দুজনকে যেভাবে হোক আলাদা করে দেওয়া হবে। দুজনের মধ্যে এতটা দূরত্ব সৃষ্টি করে দেওয়া হবে যে চাইলেও তারা একে অপরকে ছুঁতে পারবে না কোনদিন। সুমিত্রা স্থির করেছেন দেবার্চনকে লন্ডনে ননদের কাছে পাঠিয়ে দেবেন। সে এখন থেকে ওখানেই লেখাপড়া করবে। আর পূরবী তার তিয়াসাকে নিয়ে ব্যাঙ্গালোর চলে যাবে। সেখানে তার স্কুলের একটা ব্রাঞ্চ আছে; তিয়াসা এবার তার চোখের সামনেই হায়ার স্টাডি করবে। দুজনের হোয়াটস অ্যাপ, ফেসবুক ইতিমধ্যেই ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। এবার হয়তো মোবাইলের সিমটাও চেঞ্জ করে দেওয়া হবে।

সেদিন রাতে ওদের দুজনের মনেই প্রশ্নের বাণ ছুটছিল। কয়েকশো কিলোমিটার দূরে থাকলেও তাদের শেষ ইচ্ছেটাও মিলে গিয়েছিল। একবার, অন্তঃত একবার ওরা চাইছিল হাতে হাত রেখে বাবা-মায়েদের মুখোমুখি হতে। যদি সেটা ওরা করতে পারত, তাহলে চিৎকার করে প্রশ্ন করত, “কি করেছি আমরা? ভালবাসা কি অপরাধ? বন্ধুত্ব কি অভিশাপ? আর যদি আমরা ভুল করেই থাকি, তার জন্যে কি শুধুই আমরা দায়ী? আমরা যে একা ছিলাম, বড্ডো একা ছিলাম, কেন তোমরা আমাদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারো নি? টিফিন খেয়েছি কিনা, হোম-ওয়ার্ক করেছি কিনা...ব্যস? এছাড়া কি আর কিছু তোমাদের বলার ছিল না? আমাদের কৌতূহলী মন আমাদের দমে যেতে দেয় নি, আমরা প্রশ্ন করেছিলাম, তোমরা এড়িয়ে গিয়েছিলে কেন? হরমোনাল সিক্রেসানের কারণ গুলো আমাদের কেন জানাও নি? কেন বোঝাওনি আমাদের যে সেক্স কি? কেন বলোনি যে মামাতো-পিসতুতো ভাইবোনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক সমাজ মেনে নেয় না, আদালত মেনে নেয় না? যে মুহুর্তে পিরিয়ড হয়েছিল কিংবা যে সময়ে পুরুষাঙ্গে পরিবর্তন এসেছিল, কেন বুঝতে পার নি যে আমরাও বড় হচ্ছি?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর তারা কোনদিনই পাবে না কারণ পুরুষ ও স্ত্রীর যৌন মিলন যে খুব স্বাভাবিক একটা ঘটনা, এটা ভালবাসার অঙ্গ মাত্র, এগুলো নিয়ে যে কোন কৌতূহলী প্রশ্ন অবান্ছিত, অযাচিত বা কলঙ্কিত নয়, সেই বিশ্বাসটাই তো সামাজিক পরিকাঠামোতে প্রতিষ্ঠা পায় নি এখনো।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.