অনুবাদ সাহিত্য

মূল হিন্দি রচনাঃ गलत फैसला

লেখিকাঃ सुमन बाजपेयी


সিদ্ধান্তটা দুজনে মিলেই নিয়েছিল...কারো দ্বারা বাধ্য হয়ে নয়...আনন্দের সাথে...চিন্তা-ভাবনা করেই, তাহলে কেন এমনটা হল? ও তো এটাও বলতে পারবে না যে কেউ ওকে ঠকিয়েছে, কেননা ঠকানোর সূত্রপাত তো ও নিজেই করেছিল। তাহলে কী যা হল তা ঠিকই হল...ও এটাই ডিজার্ভ করছিল? ও ভাবতে পারেনি নীলেশ ওর সাথে এমন করবে। যে সারাজীবন পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ভালোবাসার জন্য যতদূর যেতে হয় ততদূর যাবার জন্য প্রস্তুত ছিল, সেই নীলেশ যখন সত্যি সত্যি কিছু করে দেখানোর সময় এলো তখন ঘাবড়ে গেল। এ কেমন বিড়ম্বনা, যে নীলেশ এত দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধুত্বের হাত ধরে রেখেছিল, সে তখন ওকে ছেড়ে চলে গেল যখন ও নিজের হাতেই নিজের সংসার ভেঙে এসেছিল, যখন ও নিজের হাতেই বিশ্বাসের সমস্ত বন্ধন আর প্রেমের সমস্ত ডোর ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছিল।

একথা সত্য ও নীলেশকে ভালবাসত অনেক বছর আগে থেকেই মানে বিয়ের আগে থেকে। প্রথম দেখাতেই প্রেম বলা যেতে পারে। ঐ বয়সে যখন রঙবেরঙের স্বপ্ন চোখের পলকে সাজানো থাকে আর মনে এক রাজকুমারের ছবি আঁকা থাকে...কাউকে দেখলেই মন চঞ্চল হয়ে ওঠে আর মুখ শুকিয়ে যায়, সেই বয়সে ও নীলেশকে দেখেছিল। ওর চোখের চুম্বকীয় টান আর হাসির সঙ্গে ছড়িয়ে থাকা অজস্র রঙে ও তখনি বয়ে গিয়েছিল। পড়াশোনা শেষ করে চাকরির চেষ্টা করছিল...সংবেদনশীল বয়স...ও প্রেমে পড়ে গেছিলো।

আচমকাই হোক বা কোন সংযোগই হোক, ওদের আবার কয়েকবার দেখা হল...এমনিতেই, কখনো মেট্রোতে, কখনো কোন অফিসে, কখনো বাজারে তো কখনো রাস্তায়। নীলেশও চাকরির চেষ্টা করছিল। আসলে ও এক জায়গায় চাকরি করত কিন্তু কোন বড় কোম্পানিতে চাকরি খুঁজছিল। ও তো চাইত নিজে ব্যবসা করতে। ও খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিল। বড় বড় স্বপ্ন আর উঁচু জায়গায় পৌঁছানোর ইচ্ছে ওকে তাড়া করে বেড়াত, তাই ও কোন বড় কোম্পানিতে বড় পদ পাওয়ার চেষ্টা করছিল। অন্যদের ইম্প্রেস করার ক্ষমতা তো ওর মধ্যে ছিলই।

নিজেদের মধ্যে কথা বলে, একসাথে সময় কাটিয়ে দুজনেরই মনে হল ওরা একে-অন্যের সাথে খুশি। ওদের চিন্তাভাবনা, পছন্দ আর জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই একরকম ছিল। শুধু মেয়েটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিল না। খুব অল্পেই সন্তুষ্ট হত। শুধু এই ব্যাপারেই দুজনের বিচারধারা কখনো কখনো ভিন্ন হত, অন্যথায় দুজনেরই একসাথে থাকতে ভালো লাগত। কারো সঙ্গ ভালো লাগলে তার সঙ্গে সারা জীবন কাটানোর খেয়াল সহজেই মনে বাসা বাঁধে। ওর মনে এই খেয়াল নীলেশের আগে এসেছিল।

নীলেশ ওর থেকে একটু বেশিই প্র্যাক্টিকাল ছিল... ও আগে ভালভাবে সেটেল হয়ে তারপর প্রেমের ব্যাপারে ভাবতে চেয়েছিল। “তোমাকে আমার ভালো লাগে ময়ূরী, খুব ভালো, কিন্তু তোমাকে ভালবাসি একথা পুরো বিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারছি না । তোমার সাথে সময় কাটাতে ভালো লাগে, তোমার সাথে দেখা করতে ইচ্ছে করে, কিন্তু এটাই ভালোবাসা যখন মনে থেকে স্বীকার করতে পারব, তখন তোমাকে বলতে এক মুহূর্ত দেরি করব না”।

“কমিটমেন্ট করতে ভয় পাও?”- রেগে গিয়ে বলেছিল ময়ূরী। ও শুরু থেকেই বিন্দাস ছিল, এজন্য বলতে কখনো দ্বিধা করত না। “তুমি তো ভালো করেই জানো নীলেশ আমি যদি বা কিন্তু তে বিশ্বাস করিনা। হ্যাঁ অথবা না এই দুটো জিনিসই আমার কাছে অর্থ বহন করে। এজন্য সিদ্ধান্ত নিতে আমার সময় লাগে না। তুমি তো ভালোবাসা স্বীকার করতেই থতমত খাচ্ছ”।

“এমনটা নয় ময়ূরী। শুধু আমাকে একটু সময় দাও। অন্তঃত আমার কাছে যেন এত টাকা থাকে যাতে আমরা একটা বিলাসবহুল জীবনযাপন করতে পারি। সমস্ত সুখসুবিধা যাতে আমাদের কাছে থাকে। একটা বড় বাংলো, গাড়ি, চাকর-বাকর...”

“তার মনে দীর্ঘদিন পর্যন্ত তোমার কমিটমেন্ট করার কোন ইচ্ছে নেই। নীলেশ আমার খুব বেশি কিছু চাই না। আমরা দুজন এখন যা রোজগার করি তা যথেষ্ট। এরপর ধীরে ধীরে পরিশ্রম করে আমরা আরো উন্নতি করে ফেলব। কিন্তু তোমার প্ল্যানিং নিয়ে চললে পাঁচ-ছয় বছর লেগে যাবে, তোমার কি ধারণা ততদিন আমার বাড়ির লোক আমার বিয়ের জন্য অপেক্ষা করবে। ওরা তো এখন থেকেই চেল্লাচ্ছে”।

“আমাকে ভালবাসো একথা হলফ করে বলতে পারো আর আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারবে না”- ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করছিল নীলেশ।

“করতে পারি, কিন্তু তুমি এখনও আমাকে ভালবাসার কথা স্বীকার করো নি, কোন ভরসায় তোমার জন্য অপেক্ষা করব, কোন বিশ্বাসে বাড়ির লোকদের আশ্বস্ত করব যে তুমি মাঝ রাস্তায় আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না”।

ওদের মধ্যে অনেকক্ষণ তর্ক চলল, এরপর নীলেশকে নিয়ে ময়ূরীর মধ্যে যে ভাবনা ছিল তা হয়ত পালটে গেছিল। ও তো নীলেশকে ভালবাসত ...নীলেশ ত কখনো স্বীকার করেনি... হতে পারে ও হয়ত ক্ষণিকের সাথী হতে চেয়েছিল... এমনিতেও ওর উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলো ওকে যখন তখন ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখত। ময়ূরীর বাড়িতে বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। ও কোন না কোন বাহানা বানিয়ে বিয়ের কথা পাশ কাটিয়ে যেত এটা ভেবে যে নীলেশ কিছুদিন পর নিজে থেকেই বাস্তবের মাটিতে এসে পড়বে আর বড় বড় স্বপ্নের উড়ানে বিরতি দিয়ে ময়ূরীকে আপন করে নেবে।

বাড়ির লোকদের সাথে ও লড়াই করতে পারত কিন্তু নীলেশকে হারাতে প্রস্তুত ছিল না। অনেকবার ওর ইচ্ছে হত নীলেশকে বলতে যে ভালোবাসো তো এই অনুভূতিটাকে চেপে রেখো না, চেহারার ঝলকে প্রকাশ পেতে দাও। কিন্তু বলতে পারত না। আসলে এমনটাই হয় যখন কাউকে আমাদের ভালো লাগে তখন তার সমস্ত ভালোমন্দও আমাদের ভালো লাগে আর তাকে বিশ্বাস করা এই ভালোলাগারই পরবর্তী অধ্যায়। কিন্তু নীলেশ অনেকবার ওর মনে দুঃখ দিয়েছিল। ওর মনে যে অবিশ্বাসের জন্ম হয়েছিল, সেটা নীলেশ হয়ত বুঝতে পেরেছিল। “ কাউকে ভালবাসো কিন্তু তাকে বিশ্বাস করো না...এটা কি কখনো সম্ভব?”- একদিন নীলেশ ওকে বলেই ফেলেছিল। ও শুনে কেঁপে উঠেছিল। ওকে হারাবার ভয় ময়ূরীকে কাঁপিয়ে তুলেছিল। নীলেশ রেগে না যায়। ওকে ছাড়া ময়ূরী কিভাবে বাঁচবে।

“নীলেশ, আমার বিয়ে ঠিক করা হচ্ছে। মানব খুবি সাদাসিধে মানুষ। আইএএস অফিসার। ওর সাথে দেখা করেছিলাম। বুঝতে পারছি না কিভাবে ওকে রিজেক্ট করব। সবচেয়ে বড় কথা ওর কোন ডিমান্ড নেই। বাবা একজন সরকারী কর্মচারী। পণ দিতে পারবেন না”।

নীলেশের কাঁধে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল ময়ূরী।

“তাহলে হ্যাঁ বলে দাও”- নীলেশ দৃঢ় ভাবে বলল দেখে ও অবাক হয়ে গেল।

“আমি বলতে চাই তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমি তোমার উপর কোন জোর করতে চাই না। আমার তো স্বপ্নপূরণ করতে এখনো সময় লাগবে...”

“আর আমার স্বপ্নগুলোর কি হবে, যা আমি তোমাকে নিয়ে দেখেছি”।

“বি প্র্যাক্টিকাল ময়ূরী। আমি ত বলছি তুমি মানবকে বিয়ে করে নাও”।

হয়রান হয়ে গেছিল ময়ূরী। ভেঙে পড়েছিল... নীলেশ ওর ভালবাসাকে এভাবে অপমান করবে ও কখনো ভাবেনি। ওর প্রতি ভালোবাসা বুকে চেপে রেখে ময়ূরী মানবকে বিয়ে করে নিল। এত ভালো আর খোলা মনের স্বামী পাওয়ার পরেও ও নীলেশকে ভুলতে পারেনি। বারবার ওর একটাই খটকা লাগছিল নীলেশ কিভাবে ওকে আরেকজনের হাতে তুলে দিল। মানবের সাথে ও স্ত্রীধর্ম তো পালন করছিল কিন্তু মানবকে ভালবাসতে পারছিল না। নীলেশ ওকে প্রতারণা করার পরেও...

বিয়ের ছ’মাস হয়ে গেছিল। একদিন অফিসে নীলেশকে সামনে দেখে অবাক হয়ে গেছিল। বড় বড় দাড়ি, উস্কখুস্ক চুল, সবসময় ফিটফাট হয়ে থাকা নীলেশ আজ অন্যরকম লাগছিল। বেখেয়ালি ভাবে জামাপ্যান্ট পরেছিল। চোখমুখ একদম বিষণ্ণ ছিল। বুঝতে পেরেছিল যে, এখন ওর কোন চাকরি নেই। “তোমার থেকে আলাদা হবার পর আমি বুঝতে পারলাম আমি তোমাকে খুব ভালবাসি। আমার জীবনে তুমি ফিরে এস ময়ূরী”- শুনে যেমন ওর ভালো লেগেছিল তেমনি অবাকও লাগছিল। ঠাট্টা করছে না ত নীলেশ। প্রথমে বলল বিয়ে করে নাও আবার এখন বলছে ফিরে আসতে।

“এটা সম্ভব নয়”।

“কিছুই অসম্ভব নয়। আমি সব ভেবে নিয়েছি। দুদিন পর আমরা চিরতরে এই শহর ছেড়ে চলে যাব”।

“সারাজীবন যে নীলেশ প্র্যাক্টিকাল আপ্রোচ রাখত সে আজ এসব কি কথা বলছে। কোথায় যাব, কোথায় থাকব, আমার চাকরির কি হবে, তুমি তো আবার বেকার। আমি বিবাহিতা, মানবকে কি বলব, সমাজ কি বলবে। এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে নীলেশ”।

“তবু আমি পরশু স্টেশনে তোমার জন্য অপেক্ষা করব। তুমি আমাকে ভালোবাসো এজন্যই তুমি আসবে আমি জানি”

মানবকে একটা চিঠি লিখে রেখে ও চলে এসেছিল। একবার আবার ওকে ঠকালো নীলেশ। কমিটমেন্ট করা ওর স্বভাবেই ছিল না। এখন ও কি করবে... কোন মুখে ফিরে যাবে।

ও বাধ্য হয়ে ষ্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিল, নিজের উপর রাগ হচ্ছিল, গ্লানিতে ডুবে যাচ্ছিল। ট্রেন আসছিল, যাচ্ছিল। প্ল্যাটফর্ম খালি হচ্ছিল, আবার ভরে যাচ্ছিল, ভিড় আর চিৎকার চেঁচামেচির মধ্যেও ও নিজেকে একদম একা বোধ করছিল।

তখনই সামনে থেকে যখন মানবকে আসতে দেখল তো বিশ্বাস করতে পারছিল না।

“বাড়ি ফিরে চলো”- অধিকারের সাথে হাত ধরে মানব বলে উঠল।

ময়ূরীর মাথা নিচু হয়ে গেছিল। শরীর কাঁপছিল। কিভাবে ফিরবে বাড়িতে...

“তুমি একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছ, সেজন্য তো আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে পারি না। তোমার সাথে থাকার কথা দিয়েছি। কথা রাখতেও জানি”।

“কিন্তু...” চোখের জলে ভেজা মুখের গ্লানি দেখে মানব ভালবেসে ওর পিঠ চাপড়ে দিল।

“নীলেশ এক কপট ছিল। আসলে ও যখন তোমাকে ধোকা দিয়েছিল, তখনই তোমার মনে ওর জন্য অঙ্কুরিত প্রেমের চারা উপড়ে এসেছিল, শুধু ওর দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার বেদনা নিয়ে বেঁচে আছ আর সেই বেদনায় তোমাকে আজ এখানে নিয়ে এসেছে। ও শুধু তোমাকে ভালোবাসতে রাজি হয়েছিল বলে তুমি আর কিছুই ভাবনি। কিন্তু ঐ কাপুরুষ তোমার ভালোবাসার উপযুক্তই নয়”।

“আমিও তো তোমার উপযুক্ত নই, তোমার মত একজন ভালো মানুষকে আমি ধোকা দিয়েছি”।

“এটা ধোকা নয়, এটা ভুল। আর তুমি যাকে ভালবাসো তার ভুল তো ক্ষমা করে দিতেই পার। চলো বাড়ি চলো”- মানব শক্ত করে ময়ূরীর হাত ধরল। ময়ূরী ওই স্পর্শে বিশ্বাসের শক্তি অনুভব করল।

___________



bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.