ক্ষতিপূরণ

তখন সবে রাত সন্ধ্যার গন্ডি পেরিয়েছে, তিন্নীকে ঘুম পাড়িয়ে drawing room এ সাক্ষরের কাছে এসে বসলো মন, সাক্ষর খবরের চ্যানেলে ডুবে আছে তখন। মন পাশে এসে বসাতেও হুঁশ হলোনা তার। মন একটু বিরক্ত হয়েই বললো, " তিন্নীর play house এর ছুটি পড়তে চললো, আমার গানের স্কুলেও ছুটি পড়বে সামনের সপ্তাহে।" সাক্ষর খবরের চ্যানেলে মগ্ন, তাতে চোখ রেখেই বললো, " বাঃ, খুব ভালো।" এবারে আর রাগ সামলাতে পারলোনা মন, কিছুটা চিৎকার করেই বলে উঠলো, " তুমি থাকো তোমার টিভি, অফিস নিয়ে, আমি সামনের মাসেই মেয়েকে নিয়ে বাবার কাছে চলে যাবো।" বলে সে উঠতে যাবে এমন সময়েই সাক্ষরের হুঁশ হলো, সে তাড়াতাড়ি টিভি বন্ধ করে মনের হাতটা ধরে তাকে সামনে বসিয়ে দিলো, হেসে বললো, " বলো বলো তোমার বক্তব্য বলো। আমি শুনেছি এবারে মন দিয়ে।" মন মুখ বেকালো একটু তারপরে বললো, " আর কতোবার এক কথা বলবো? সেই বিয়ের আগের থেকে promise করেছিলে কাশ্মীর নিয়ে যাবে, আর আজকে বিয়ের সাত বছর হয়ে গেলো, এখনও তোমার সময় সুযোগ কোনটাই হলোনা। " তুলে তাকালো সাক্ষরের দিকে, তার চোখের হাসি দেখে সাক্ষরের যেন সমস্ত মন সাতরঙা রঙে রেঙে উঠলো...।

। । । । । এক মাস পরে । । । । সাক্ষর এবারে নিজেই লজ্জা পায়, সত্যিই তাই, মনের আর কোনকিছুর চাহিদা নেই, না সোনার গয়না না দামী বাড়ি-গাড়ী, কেবল ঐ ঘুরতে যাওয়া বাদে। যদিও বিয়ের পর থেকে সাক্ষর মনকে নিয়ে কোথাও তেমন একটা যায়নি যদিও দীঘা পুরী not included in the list.. মনের মুষরে পড়া মুখটা দেখে ভারী মায়া হলো সাক্ষরের, সে মনকে একটু কাছে টেনে নিয়ে বললো, " তিন্নীর জন্যে কয়েকটা ভালো সোয়েটার কিনে নিও, কাশ্মীরের ঠান্ডাটা কিন্তু বেজায় জাকিয়ে পড়ে।" মন মুখটা

তালতলা কলোনীর মোড়ের বাড়িটার সামনে উপচে পড়ছে ভিড়, বাড়ির পৌঢ় কর্তা মাথায় হাত দিয়ে দুয়ারে বসে আছেন, বাড়ির কত্রী বিছানায় শায়িত, তার মাথার কাছে বসে কয়েকজন মহিলা। এমনসময়েই পাড়া কাঁপিয়ে আসলো তিনটি শববাহী গাড়ি। একজন লোক, একজন স্ত্রীলোক আর একটি ছোট্ট একরত্তী শরীর।

পাড়ার সমস্ত মানুষ ভেঙে পড়লো তাদের প্রিয় সাক্ষরকে শেষবার দেখতে। পৌঢ় তার শতজীর্ণ শরীরটা নিয়ে ছুটে গেলেন একরত্তি নাতনীর মৃতদেহর দিকে। যেই কাঁধে নিজের সমস্ত দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন সেই কাঁধেই একমাত্র কমবয়স্ক ছেলের শব তুলতে নিজের জীবনের শেষ মুহূর্তের প্রতীক্ষা করছিলেন পৌঢ়.....। আর কল্পনা করছিলেন সেই চরম মুহুর্তের কথা.....। কাশ্মীর উপত্যকার পাহাড়ের ঢালের বিখ্যাত পাঁচ তারা হোটেলটা তখন আলোয় ঝলমল করছে, আকাশের টুকরো টুকরো মেঘের ফাঁকে চাঁদ যেন হারিয়েই গেছে, আকাশ থেকে ঝরে পড়া শুভ্র শীতল তুলোর ন্যায় তুষারকণাগুলো যেন সৌন্দর্যের নতুন ইতিহাস রচনা করতে চলেছে...। কাঁচেয় জানলায় দাঁড়িয়ে প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যের সবটুকু আহরণ করে নিতে চাইছে মন, অবাক কিন্তু অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে জানলার বাইরে, তিন্নী ঘুমিয়ে পড়েছে অনেক্ষণ, মন আর সাক্ষর দুজনেই দাঁড়িয়ে জানলায়, দুজনের মনেই যেন অদ্ভুত তৃপ্তি, দুজনেই ফিরে যেতে চাইছে তাদের জীবনের প্রথম রাতে, অপূর্ব পরিবেশের অপরিসীম মহিমায় ভরিয়ে দিতে চাইছে দুজন দুজনকে। মনের আজ কৃতজ্ঞতার শেষ নেই সাক্ষরের কাছে, এই পাঁচ তারার হোটেলে থাকার সামর্থ্য কখনোই নেই তাদের মন জানে কিন্তু শুধু মনের সমস্ত ইচ্ছাপূরণ করার জন্যে নিজের জমানো টাকা দিয়ে অনেক বারণ করা সত্যেও দুদিনের রুম বুক করেছে সাক্ষর। মনের জীবনের সবচেয়ে বড়ো উপহারটা তাকে দিয়েছে সাক্ষর। দুজনেই যখন স্বপ্ন পূরণের মাদকতায় বিভোর হঠাৎই বেজে উঠলো হোটেলের emergency alarm..কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘটে গেল নারকীয় কান্ড। ঝলমলে পাঁচ তারা হোটেলের সমস্ত আলো নিভে গেলো নিমেষে, মন আর সাক্ষর কিছু বুঝতে পারছেনা তখন, ঘুমন্ত তিন্নীকে কোলে নিয়ে কাঁপছে মন, ঘরের দরজা হুরমুর করে ভেঙে কারা যেন ঢুকে এলো সশব্দে, মন তিন্নীকে নিয়ে শোকেসের পেছনে বসে কাঁপছে থরথর করে, অন্ধকারের পাহাড় ঠেলে ঢোকা লোকগুলো এলোপাথারি গুলি ছুড়ছে তখন, চোখের আলোর ঝলকানিতেই সাক্ষরের দেহটা ঝাঁঝরা হয়ে লুটিয়ে পড়লো নিচে, মন আর পারলোনা সামলাতে, কোলের থেকে তিন্নীকে শোকেসের পেছনে রেখেই ছুটে গেল সে, পাগলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো সেই মানুষটার রক্তাক্ত শরীরের উপরে যে এএকটু আগেই তার এতো কাছে ছিলো। অন্ধকার থেকে এক মুহূর্ত দেরী হলোনা ঝলসে উঠলো আগুন, সাক্ষরের পাশেই পড়ে রইল মনের নিথর দেহটা। অন্ধকারের দাঁড়ানো লোকগুলোর মুখে তখন জয়ের হাসি, বীর বিক্রমে বেরিয়ে যাওয়ার আগেই কান্নার শব্দ কানে গেলো তাদের, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ, একজন অন্যজনের মুখের দিকে তাকালো তারা, কাজকে সম্পন্ন করতে খুঁজতে লাগলো শব্দের উৎস, দেখতে পেলো শোকেসের পেছনে ছোট্ট শরীরটাকে, "মা মা'' করে কাঁদছে তখন সে, একমুহুর্ত অপেক্ষা, নিমেষেই আবার গর্জে উঠলো বন্দুক, একটা গুলিতেই বন্ধ হয়ে গেলো কান্নাটা, ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে রইল একরত্তি ক্ষুদ্র শরীরটা। স্বয়ং বিধাতাও আজ লজ্জায় মুখ ঢাকলেন। এক ঘন্টায় আলোয় উজ্জ্বল হোটেল তখন শ্মশানভূমি। বাইরের শুভ্র তুষারের রঙ তখন রক্তাভ লাল, উপত্যকার চারদিকে থেকে তখন আর্তনাদে মুখরিত।
খবরের চ্যানেলে চ্যানেলে দামামা বাজছে তখন, breaking news: কাশ্মীর উপত্যকার অভিজাত হোটেলে জঙ্গী হানা, দশজন শিশুসহ একশোজন হোটেল নিবাসীর মৃত্যু, ক্ষতিপূরণ বাবদ পাঁচ লাখ টাকার ঘোষণা...।

ক্ষতিপূরণ!! সত্যিই কি ক্ষতিপূরণ হয় জীবনের? সত্যিই কি ক্ষতিপূরণ হয় ধর্মের জন্যে নির্বিশেষে শেষ করে দেওয়া জীবনের? সত্যিই কি ক্ষতিপূরণ হয় সেই শিশুর জীবনের যা প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেলো? সত্যিই কি ক্ষতিপূরণ হয় সেই বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কষ্টের যার জীবনের শেষ সম্বলটুকুও অকারণে ছিনিয়ে নেওয়া হলো?

জানিনা....সত্যিই জানিনা...।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.