বাপ-শালা মরলো – সে তো প্রায় মাস দেড়েকের ওপর হতে চলেছে। টাকাপয়সার হিসেব নিয়ে কলকাতার বড়-আপিশ থেকে কোন ‘বাবু’ এখনো এলো না তো! আসবে না নাকি শেষ অব্দি? কিন্তু তাও বা কী করে হয়? বাপ-শালা রেলে কাজ করতো। রিটারের আগে কেউ হুট করে পটকে গেলে পাওনা টাকা আর চাকরি নিয়ে রেলের বড়-আপিশের বাবুটাবু নিজেই নাকি এসে সব দিয়ে যায়? কেষ্ট মুদির মামাতো দাদার শউরো খুব নামকরা আমিন। তার কাছেই কেষ্ট শুনেছে। আমিন বলেছে যখন, ভুল হবার নয়। তা কই সেসব - অ্যাঁ!.

নবীনকিশোরের তিন সদ্য-বিধবা আর তাদের যথাক্রমে চার, তিন এবং তিন পুত্র, মোটমাট তেরোজনের আইনসংগত সদস্যের সন্তোষজনক দলটির প্রায় প্রত্যেকে কমবেশি উদ্বিগ্ন হয়ে ওইসব কথা ভেবে আসছিল। নবীনকিশোরের তিননম্বর বিধবার দুনম্বর ছেলে সুবলকিশোর এদের মধ্যে একমাত্র শিক্ষিত। সেজন্য মৃত নবীনকিশোরের ব্যাপারে তার ভাবনাও অন্যান্যদের থেকে বেশ কিছুটা আলাদা ছিল। সেও খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিল তবে সেটা অন্য ধরণের।

নবীনকিশোরের পারলৌকিক কাজের ফালতু খরচাটা করতে কেউই মন থেকে চাইছিল না। কিন্তু বাবাকে জীবদ্দশায় পরোয়া না করলেও এখন বাবার ভূতকে প্রায় সবাই যথেষ্ট ভয় পাচ্ছিল। কারণ যখন তখন দাবিমত টাকা আদায়ের জন্য বাবাকে সাধ্যমত গালাগালি থেকে মারধর পর্যন্ত করেছিল তারা। তাই বাবার ভূতের শান্তিবিধান করে সন্তুষ্ট করে বিদায় করার জন্য ভয়ে ভয়ে, তবে নমো নমো করে কাজকর্ম সারা হয়েছিল। তবে যারা বেশি ভয় পাচ্ছিল তারা অতিরিক্ত দক্ষিণার বিনিময়ে শ্রাদ্ধের পুরোহিতকে দিয়ে একবছরের মেয়াদে ‘প্রেতবন্ধন’ এবং ‘অঙ্গবন্ধন’ করিয়ে নিয়েছিল।

তেরোজন সদস্য মোটামুটি তিনটি প্রকাশ্য শিবিরে এবং বেশ কিছু গোপন উপশিবিরে বিভক্ত হয়ে অপেক্ষা করছিল নবীনকিশোরের মৃত্যুর পরবর্তী পাওনাগন্ডা কখন পাওয়া যাবে। অবশেষে আজ সকালের দিকে খবর এসেছে যে আজ বড়-আপিশ থেকে দুপুরের দিকে একজন আসছে, তবে কোন বাবু আসছে না এখানে। বাবুর বদলে নাকি একজন সাহেব (উচ্চপদস্থ কর্মচারী) আসবে। সবাই যেন বাড়িতেই উপস্থিত থাকে।

খানিকটা পুলকে বাকিটা উদ্বেগে নবীনকিশোরের ছেলেদের মধ্যে সাজো সাজো রব পড়ে গেল। পুলকের কারণ - আজকে টাকা আসছে, আর উদ্বেগের কারণ - টাকাগুলোর বাঁটোয়ারা কী ভাবে হবে? তাদের মধ্যে আদ্দেকের বেশি ভাটিখানার উদ্দেশে তক্ষুনি রওনা হয়ে গেল। প্রধানত সন্ধ্যের দিকেই এসব ব্যাপার জমে ভালো। তবে আজকের কথা আলাদা। তাছাড়া এখন শীতকাল। অতি উৎকৃষ্ট খেজুরের তাড়ির সময় এটা। তাড়ি-ভক্তরা খুব ব্যস্তভাবে সেদিকে রওনা দিল। দুপুরের পর তাড়িটা আবার দুষ্প্রাপ্য হয়ে যায়।

বিধবাদের বড়জন বিড়িতে, মেজজন দোক্তা তামাক আর ছোটজন গুড়াকুতে আসক্ত। ঘনঘন সেসব চলতে লাগলো। একমাত্র সুবলকিশোর অজানা কারণে কোন নেশাতে এখনও পর্যন্ত আসক্ত নয়। খানিক দূরের পুকুরপাড়ের একটা গাবগাছের নিচে হাঁটুতে থুতনি রেখে খুব চিন্তিতভাবে বসে রইলো। হেড-অফিস থেকে সাহেব আসার পর ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে শেষে ঠিক কী অবস্থা দাঁড়াবে কে জানে?


হেড-অফিস থেকে সাহেব অর্থাৎ অরণ্য এলো সেই বেলা একটার পর। দুপুর গড়িয়েছে। সেই সঙ্গে নেশাও জমে গেছে প্রায় সবারই। দেড়-দু’বিঘার উপর নবীনকিশোরের বাপকেলে বাস্তুজমি। মাঝখানে প্রায় গোলাকৃতি উঠান রেখে চারপাশে ইতস্তত এবং অপরিকল্পিতভাবে নবীনকিশোরের পুত্র-প্রবররা যে যার খুশিমত নিজেদের থাকার ঘর যেমন পেরেছে সেভাবেই করে নিয়েছে।

উঠানের একদিকে রাখা একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে অরণ্য বসেছে। সমবেত বুদ্ধি খাটিয়ে একটা প্লাস্টিকের টুলও জোগাড় করে এনে রাখা হয়েছিল, টাকা-পয়সার থলেটলে রাখার জন্য। এখন সেই টুলটার ওপর অরণ্য তার পাতলা ব্রীফকেসটা রেখে দিয়েছে। তাহলে টাকা-পয়সা ওটারই ভেতর রাখা আছে। কিন্তু ওইরকম রোগাপটকা চেহারার একটামাত্র বাশ্‌কোতে খুব বেশি টাকা তো ধরবে না। দু’হাজারটাকার নোট হলে অবশ্য আলাদা কথা। তাহলে মনে হয় সবগুলোই দু’হাজারটাকার নোটে আছে। কিন্তু দু’হাজারের নোট আবার ভাঙাতে বড়ই ঝামেলা হয়।

উঠানে মাদুর বা তালপাতার চাটাই পেতে অথবা মাটিতেই পাছা থেবড়ে যে যার ইচ্ছামত বসেছে। মৃতের পরিবারের সদস্য সমাগম এবং তাদের হাবভাব দেখে অরণ্য কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়েছে। তার অভ্যস্ত চোখ বুঝে নিয়েছে এরা প্রায় সবাই একেবারে অশিক্ষিত এবং বর্তমানে কমবেশি মাতাল অবস্থায় আছে। অবশ্য মাঝেমধ্যেই তাকে বিভিন্ন প্রতিকূল এবং কঠিন অবস্থার মধ্যে কাজ করতে হয়ই।


ভাটিখানা আর তাড়ির ঠেক থেকে দুপুরের আগে একে একে সবাই কোনক্রমে ফিরে এসেছিল। ফেরার পর নবীনকিশোরের পঞ্চমপুত্র মাধবকিশোর বর্তমানে বেহুঁশ হয়ে শুয়ে আছে তার ঘরের বারান্দায়। আর সপ্তমপুত্র কৃষ্ণকিশোর অবশ্য ঘরের বারান্দা পর্যন্ত পৌঁছতেই পারেনি, বারান্দার নীচে উঠানেই উলটে পড়ে আছে। আগ্রহী মাছিরা তার মুখের ওপর ভনভন করছে।

পরিবেশটাকে খানিকটা ভদ্রগোছের করার জন্য কৃষ্ণকিশোরকে উঠান থেকে তুলে অন্ততঃ তার ঘরের বারান্দায় তুলে দেবার একটা সমবেত চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সেটা কিছুতেই সম্ভব হয়নি। কারণ যারা কৃষ্ণকিশোরকে তুলে বারান্দার উপর নিয়ে যাবে, তুলে দিতে গিয়ে তারা নিজেরাই উলটে উলটে পড়ছিল। সকলের দিকে আলগা চোখ বুলিয়ে নিয়ে চিন্তিতভাবে অরণ্য বললো, -

-সবার ভোটার কার্ড আর রেশন কার্ড নিয়ে আসতে হবে।

-কত টাকা করে পেত্যেকের ভাগে পড়বে আগে সেটাই বলেন দেকি – জোরালো এক হেঁচকি তুলে গজকিশোর বলে ওঠে – ওসব কাট-ফাট পরে দেখলেও হবে। সেসব কোথায় কোনটা পড়ে আছে কে খুঁজতে যাবে এ্যাকন?

-সব্বার বড় ছেলে যে, সে তো লেয্য আইনে কিছু বেশি টাকা পাবে। - সবার বড় মদনকিশোর বলে ওঠে।

-সে আইনের মুখে আমি সাতবার মুতি, - কুসুমকিশোর গর্জে ওঠে, - ছোটবড় সকলের সমান সমান ভাগ চাই।

-ছোট বা বড় হিসেব কল্লে হবে না। যার বেশি অভাব তার টাকাটা একটু ধরে দিতে হবে।

-শালা – বানচোত! এটা তোর বাপের জমিদারী পেইচিশ নাকি রে?....

অকুস্থল থেকে সুবলকিশোর একটু দূরে আলাদাভাবে বসে ছিল। সে ছাড়া আর একআধজন বাদে নবীনকিশোরের তনয়বাহিনীর সব ক’জনই নেশাগ্রস্ত। দু’মিনিটের মধ্যেই সবাই যুযুধান হয়ে উঠলো। খিস্তি খেউড়ের বৃষ্টি শুরু হল। একপাল শকুন দাপাদাপি করতে লাগলো এক কল্পিত শবদেহ নিয়ে। দেখে শুনে অরণ্য বুঝলো এখানকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা খুব সহজ কাজ হবে না। কিন্তু তাকে যেভাবেই হোক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই হবে। সে প্রচন্ড জোরে ধমকে উঠলো,-

-চুপ চুপ! একদম চুপ সবাই! তোমরা কী পাগল হয়ে গেছ টাকা টাকা করে? এখনও কোনরকম কাগজপত্র তোমরা কেউ নিয়মমত হেডঅফিসে জমাই করলে না। কোনখাতে কতটাকা পাওনা হবে সেসব হিসেব পর্যন্ত শুরু হতেই পারলো না, আর তোমরা কিনা নিজেদের মধ্যে টাকা ভাগাভাগি নিয়ে এখনই লড়াই আরম্ভ করলে?

কয়েক মুহূর্তের মধ্যে জমায়েতটা অস্বাভাবিক ভাবে প্রায় চুপ হয়ে গেল। তারপর কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার দুলে ফুঁসে উঠতে লাগলো, এবার সম্পূর্ণ অন্যভাবে,-

-তাইলে বাপের টাকার হিসেব পয্যন্ত হয়নি এ্যাকোনো? তার মানে আপনি টাকাগুলো আনেননি সঙ্গে করে?

-কোন প্রশ্নই ওঠে না। তাছাড়া টাকা এখানে আনার কোন নিয়মই নেই। তাছাড়া টাকাপয়সার কোনরকম হিসেব হবার আগে তোমাদের প্রত্যেকের দরখাস্ত আর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর আর অন্যান্য দরকারী কাগজপত্র জমা করতেই হবে। টাকার হিসেব হবে তারপর। হিসেব হয়ে যাবার পর কোন টাকাই সরকারি নিয়মমত নগদে বা ক্যাশে কাউকে দেওয়া যাবেই না। প্রত্যেকের নামে পাওনা টাকার চেক পাশ হবে। তারপর ক্যাশ অফিসে গিয়ে সেই চেক নিয়ে আসতে হবে।

-টাকাগুলো তাইলে কেশ আপিশেই থাকে? সেখান থেকে বিলি হয়?

-হ্যাঁ, তবে তার আগে –

-আপনি কেশ আপিশে এক্খুনি ফোন করে বাপটার স-অ-ব টাকাগুলো একেনে আনতে বলুন। নাইলে আজ তোমার অবস্থা খুব খারাপ করে দোব কিন্তু!’ সুবোধকিশোরের কথাগুলো অন্য সকলের মনে ধরে খুব। যুগলকিশোর বলে ওঠে,-

-টাকা না দিয়ে বেরোতেই পারবে না তুমি এখান থেকে।

-য্যাতোক্ষণ না টাকা নিয়ে এসে একেনে বিলি হবে ত্যাতোক্ষণ তোমাকে একেনেই আটক থাকতে হবে। বিনয়কিশোর উদ্দীপ্ত হয়,-

-টাকা না মিটিয়ে এখান থেকে চলে যাবার কথা বললে মেরে ঠ্যাং ভেঙে দেব। ফোন লাগাও – কেশ আপিশে ফোন লাগাও। এক্ষুনি টাকা আনতে বল।

-হ্যাঁ, আগে টাকা ফেলবে, তারপর ঘরের ছেলে আস্ত হাত-পা নিয়ে ঘরে ফিরে যেতে পারবে।

অরণ্যের চোখে মুখে এতক্ষণ গভীর বিস্ময় ছিল। এবার ধীরে ধীরে সেখানে ধারালো হাসির আভাস ফুটে ওঠে। পকেট থেকে সরকারি সেলফোনটা বের করে সে বলে,-

-ঠিক আছে। তবে তাই হোক। তাহলে ক্যাশ অফিসে ফোন করে বলে দিচ্ছি টাকা আনার কথা।

-হ্যাঃ হ্যাঃ হ্যাঃ - পথে এসো চাঁদ! ঠেলায় পড়লে তবেই শালা বেড়াল গাছে ওঠে। এক্ষুনি লাগাও চাঁদু ফোন!


অফিসে ফোন করার আগেই হঠাৎ অরণ্যের ফোনটা বেজে ওঠে। আসলে বাজেনি, ফোনের রিংটোনটাই ‘প্লে’ করেছে অরণ্য। সবাই একেবারে চুপ হয়ে যায়। কেশ আপিশ থেকে নিগ্‌ঘাত ফোনটা করেছে। টাকা নিয়ে বেরিয়ে পড়ার আগে কিভাবে এখানে আসবে সেটা জানতে চায় মনে হয়। নাকি টাকা নিয়ে বেরিয়েই পড়েছে? মনে হয় কাছকাছি এসে এবার কোনপথে এখেনে আসবে সেইটা জানতে চায়? প্রত্যেকেই উৎকর্ণ হয়ে ওঠে, – সবশুদ্ধু কতটাকা নিয়ে আসছে জানা গেলে খুব ভালো হয়। কত করে ভাগে পড়বে তার আগাম হিসেবের বড়ই সুবিধা হয়। সকলের ওপর চকিত নজর বুলিয়ে নিয়ে রিংটোনটা থামিয়ে নকল ফোন রিসিভ করলো অরণ্য,-

-হ্যালো, অ্যাঁ থানা থেকে, বড়দারোগাবাবু বলছেন? হ্যাঁ হ্যাঁ বলুন, হ্যাঁ এদের বাড়িতেই আছি, অ্যাঁ, পুলিশ পাঠাচ্ছেন? বারোজন? পাঁচটা রাইফেলধারী? আর সাতটা গুন্ডা-পুলিশ রড নিয়ে আসছে? কিন্তু পুলিশ কেন? অ্যাঁ – হ্যাঁ, এরা একটু নেশাটেশা করেছে কিন্তু খুব ভালো ভালো ছেলে সব এরা! অ্যাঁ – হ্যাঁ – টাকা তো চাইছে এক্ষুনি, অ্যাঁ – ওদের থানায় যেতে হবে? সকলকেই? অ্যাঁ – ক্যাশ অফিসে ফোন করে এখানে টাকা পাঠাতে বারণ করে দিয়েছেন? তবে আর গুন্ডা পুলিশের রাইফেল আর লাঠি নিয়ে এখানে আসার কী দরকার? জিপে করে রওনা দিয়ে ফেলেছে? এ্যাই সেরেছে! এখানে তেমন কোন অসুবিধা এখনো তো হয়নি, আচ্ছা, এখন যদি হয় সেজন্য? আমি তো এবার চলে যাবো এখান থেকে – ও আমি না যাওয়া পর্যন্ত পুলিশ ফিরবে না? মিনিট কুড়ি? তা আচ্ছা –’

উগ্র লোভ আর নেশায় উত্তপ্ত মুখগুলো এখন ছাইবর্ণের হয়ে গেছে। দক্ষ চোখে পুরো পরিস্থিতিটা জরিপ করে নিয়ে অরণ্য বললো,-

-থানার বড়দারোগা মাত্র কুড়িমিনিট সময় দিলেন। তার মধ্যে যদি আমি বড়রাস্তার মোড়ে পৌঁছে না যাই তাহলে পুলিশের পুরো দলটাই ঢুকে যাবে এখানে। তারপর কী যে হবে কে জানে? গুন্ডা-পুলিশের তো আবার হাড়ভাঙা ধোলাইয়ের ট্রেনিং দেওয়া থাকে –, যাকগে তোমরা তাহলে যদি থানায় গিয়ে টাকা নিতে চাও তাহলে থানাতেই যাও।’


ছোট জমায়েতটা এবার নড়ে চড়ে ওঠে। খুব টলোমলো বা মোটামুটি টলোমলো পায়ে উঠে দাঁড়ায় সবাই। সমস্বরে অনুনয় করতে থাকে সাহেব যেন এক্ষুনি এখান থেকে বেরিয়ে পড়েন। কৃষ্ণকিশোরের একটা রিক্সা আছে। সে তো এখন বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে বারান্দার নিচে। দু’নম্বর বিধবার তিন’নম্বর ছেলে, তাড়িখোর অমলকিশোর জড়িয়েমড়িয়ে বলে,-

-মা কালীর দিব্যি! মাইরি শার, আমি কেষ্টোর রিশকায় করে আপনাকে দশ মিনিটের ভেতরেই বড়রাস্তায় তুলে দিয়ে আসবো।

অন্যরা সবাই বলাবলি করতে লাগলো, তাদের প্রত্যেককেই ভীষণ জরুরী কাজে যে যার মতো এখুনি বেরিয়ে পড়তেই হবে। সেজন্য শার যেন কিছু মনে না করেন। শার যেন ক্ষমা করে দেন। তারা কেউ থানায় যাবে না। শার যেমনটি বলবেন তেমনটিই করবে তারা। তাতে যদি টাকা পেতে দেরি হয় তো হোকগে। জমায়েতটা দ্রুত ভেঙে যাচ্ছে দেখে অরণ্য বাধা দেয়। প্রাথমিক দরকারি কাগজপত্র যা লাগবে সেগুলোর কথা এখনই ওদের মাথায় যেমন করেই হোক ঢোকাতেই হবে। ওরা এখন সবাই ‘গুন্ডাপুলিশে’র ঠ্যাঙানির ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালাবে।

-চুপ কর সবাই, কেউ যাবে না এখান থেকে। তাহলে ফের থানায় ফোন করে দেব। আগে আমার কথাগুলো ভালো করে শুনে নাও। প্রত্যেকের ভোটারকার্ড, রেশনকার্ড, দু’কপি করে ফটো, পঞ্চায়েত থেকে ফ্যামিলি সার্টিফিকেট নিয়ে হেডঅফিসে যাবে। তোমাদের মধ্যে একজনকে চাকরির জন্য বিবেচনা করা হবে। সেজন্য, এখন নয়, কিছুদিন পরে তার একটা আলাদা দরখাস্ত লাগবে, ফটো দশকপি লাগবে। আর কমপক্ষে স্কুলের আট-ক্লাস-পাশ সার্টিফিকেট লাগবে।

-চাকরিটা বড় ছেলে মানে আমি তো পাবো? – মদনকিশোর কোনমতে দাঁড়িয়ে পড়ে জিজ্ঞাসা করে নেয়।

-তুই কী চাকরি করবি রে? তুই তো মুখ্যু লোক! – টাল খেতে খেতে একজন বাধা দেয়। তারপর অন্যরাও লিপ্ত হয়ে যেতে থাকে তীব্র সীমাহীন এক জঘন্য বাদানুবাদে,-

-চোপ! তোরা কেউ পাবি না। আমি দিনকত ইশকুলে গিছিলাম, আমি করবো ....

-তুই নাম সইটাও পারিস না! আমি নামসই শিকিচি আমি করবো ....

-চোদ্দপুরুষে লেখাপড়ার চাষ নেই, সেই শালা কিনা চাকরি করবে ....

-তুইও তো বাপের জন্মে ইশকুলের ধারে যাসনি রে শুয়ারের বাচ্চা ....

-তাতে তোর বাপের কী রে খানকির বাচ্চা....

-হেই, আমি একে -চন্দর, তিনে -নেত্তর বলতে পারি, আমি করবো ....


অরণ্য খুব বিষন্ন মনে উঠে পড়লো। আবার সেইরকম ভাগাড়জীবিদের মত কলহ – মারামারি শুরু হতে চলেছে। একটা তফাৎ অবশ্য চোখে পড়েছে। ভাগাড়জীবিরা মানুষ নয়, তারা নেশাগ্রস্ত থাকে না। তাদের মধ্যে বিবেক জাতীয় কিছু থাকে না। এরা নেশাগ্রস্ত, দেখতে মানুষ, স্বভাবে মৃত-বিবেক, ভাগাড়জীবিদের মতই। প্রত্যেকেই প্রত্যেককে বাপ-মা তুলে কুৎসিত ভাবে গালিগালাজ করে যাচ্ছে। উঠান পেরিয়ে যাচ্ছে অরণ্য, এমন সময় বিধবা তিনজন এসে হামলে পড়লো তার সামনে। তাদের মধ্যে একজন বলে ওঠে,-

-ও বাবু গো, যাবার আগে পেংশানটা কার নামে হবে সেটা ঠিক করে বলে যাও!

-যে নবীনকিশোরের আইনসংগত বউ, তার নামেই পেনশন হবে।

-তবে তো আমার নামেই দিতে হবে। আসল পিকিতো বউ বলতে তো শুদু আমি, ওই দুটো তো ঢেমনি ছিল!

সঙ্গে সঙ্গে অন্য বিধবা দু’জন তীব্র আওয়াজে ছিটকে উঠলো। তারপর হিংস্র ভঙ্গিতে পরস্পরের ওপর কদর্য গালিগালাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগলো। প্রত্যেকেই তীক্ষ্ণ চিৎকার করতে লাগলো যে, সেই হচ্ছে আসল এবং প্রকৃত বউ, অন্য দু’জন ছিল রক্ষিতা।


নবীনকিশোরের বাস্তুর চৌহদ্দির বাইরে আসার পর একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ম্লান বিবর্ণ যুবককে দেখে অরণ্য থমকে গেল,-

-তুমি, – তুমি – সম্ভবত সুবলকিশোর, – তাই না?

খুব অস্পষ্ট ভাবে মাথা নেড়ে সে সম্মতি জানায়।

-তুমি এখানে এভাবে আলাদা দাঁড়িয়ে আছো যে, তোমার কিছু চাই না?

-আমি – আমার -

-বলেই ফেল, শুনে নিই তোমার চাহিদাগুলো। বেশি করে টাকা চাই, না চাকরি চাই? – নাকি দুটোই চাই?

এবার উলটো দিকে মাথা নাড়ে সুবল। তারপর চোখ তুলে তাকায়। তার করুণ চোখদুটোতে নিতান্ত অবাধ্য যত জল উপচে বেরিয়ে আসতে থাকে। ভাঙা ভাঙা স্খলিত স্বরে নবীনকিশোরের সেই একান্ত অবুদ্ধিমান অঙ্গজ কোনমতে বলতে পারে,-

-বাবা – বাবা –! ....বাবার কোনকিছুই আমার চাই না!’

________________________________

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.