আজ বেলা সাড়ে বারোটা বাজতে না বাজতেই সুমিতা খাওয়ার টেবিলে বসে পড়ল। কলেজের ফাইন্যাল পরীক্ষার শেষে এই নতুন রুটিন। বাইরে বেরোনোর মতো পোশাকেই তাড়াহুড়ো করে কয়েক গ্রাস মুখে তোলা, আর তারপরেই কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়া। বাবা-মা অবশ্য সমর্থনই করছেন মেয়ের এই আচরনকে, কারন সুমিতা এবং আরো কয়েকজন ছেলে-মেয়ে মিলে একটা ছোটখাটো দল গড়েছে, যে দলটি প্রান্তিক মানুষদের জন্য কাজে নিজেদের নিয়োগ করেছে। বিভিন্ন অনাথ আশ্রম, অসহায় মানুষদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া -এসব মহান কাজে তারা ব্রতী। কতটুকুই বা তাদের সামর্থ্য বা পুঁজি! তবুও স্বল্পতা নিয়েই তারা এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।


মায়ের বেড়ে দেওয়া ভাতের থালাটি সামনে টেনে সবে প্রথম গ্রাসটি মুখে তুলেছে, এমন সময়ে পাশের বাড়ির দত্ত কাকিমার প্রবেশ। বেশি কথা বলা কাকিমা বেশি কথা দিয়েই শুরু করলেন,"ওমা, তুই খেতে বসেছিস? এতো তাড়াতাড়ি কেন রে?" এই কারনেই দত্ত কাকিমাকে সুমিতা একদমই পছন্দ করে না। এতো কৌতূহল, এতো কথা, এতো উপদেশে সুমিতার বিরক্তি বেড়েই চলে। মায়ের জন্য কোন কড়া কথা বলাও যাবে না। মায়ের এক কথা,প্রতিবেশীদের সাথে মানিয়ে চলতে হয়। আবার কাকীমার গায়ে পড়া প্রশ্ন,"ডিম দিয়ে ভাত খাচ্ছিস যে! আজকে তোর বাবা বাজারে যায়নি? নাকি ভালো মাছ পেলনা?"সুমিতা মনে মনে বলল, " যাওনা, বাড়ির থেকে তোমার ভাগের মাছটা এনে আমার পাতে দাওনা।"


ইতিমধ্যে জলের গ্লাস হাতে মায়ের আসরে প্রবেশ, আর সঙ্গে সঙ্গে কাকিমার উপদেশ," খেতে বসার সাথে সাথেই জল দেবে দিদি, যদি গলা আটকায়।" সুমিতার মনে মনে বলা," হুঃ,আমার ভালো মন্দ আমার মায়ের চেয়ে উনি বেশি জানেন। কথায় বলে না 'মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি',সেরকম আর কি।" " শাড়িটা আরো একটু ভালো পড়তে পারতি রে সুমিতা"।কাকিমার স্নেহে একপ্রকার জল ঢেলে দিয়ে সুমিতা গম্ভীর মুখে জবাব দিল," আমি সাজগোজ করে আনন্দ করতে যাচ্ছি না।" সুমিতা জানে এমন কাঠ কাঠ গলার স্বরে কথা বলা মায়ের পছন্দ হবে না, কিন্তু আর কাঁহাতক সহ্য করা যায়? "মা আসছি" বলে বেরোতে গিয়েও মায়ের মিনতিপূর্ণ ইশারার দিকে তাকিয়ে বলেই ফেলল ," কাকিমা আসছি"।


বিয়ের পরে একমাত্র মেয়ে গেছে বিদেশে সংসার করতে, এখন কাকিমা এখানে ওখানে ঘুরে সময় কাটায়,আর হয়তো দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ভাবখানা এমন যেন সদা সুখী। সুমিতা ভাবে, মায়েরও বলিহারি ভদ্রতা।কি করে যে সহ্য করে এইসব অবান্তর কথা বলা মানুষদের সঙ্গ।সুমিতার চিন্তা অন্য খাতে বইতে শুরু করে। আজ ওরা দল বেঁধে যাবে অনাথ প্রতিবন্ধী শিশুদের একটি আশ্রমে। সেখানে ওরা বাচ্চাদের হাতে তুলে দেবে কিছু বই-খাতা,খাবার ইত্যাদি।নতুন এই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে সকলেই উৎসাহী।


নির্দ্দিষ্ট আশ্রমে পৌঁছে কর্মকর্তাদের সাথে পরিচয় পর্ব সেরে নিয়মানুযায়ী সুমিতারা গেল হলঘরে, যেখানে বাচ্চারা খেলছে। সুমিতা সবিস্ময়ে দেখল, বাচ্চাদের সাথে খেলায় মেতে রয়েছেন দত্ত কাকিমা। উনি এখানে? এবার সুমিতাই কৌতূহলীর ভূমিকা গ্রহণ করলো। সেখানকার কর্মীদের কথায় ঝরে পড়ল রাশি রাশি কৃতজ্ঞতা। " উনি তো কতো বছর ধরে বাচ্চাগুলোর সাথে সময় কাটানোর জন্য এখানে ছুটে আসেন। বাচ্চাদের হাঁটতে শেখান, ওদের সাথে খেলা করেন, ওদের গল্প বলেন। একদিন উনি না আসতে পারলে বাচ্চাগুলোর মন খারাপ হয়ে যায়। আমরাও ওনার উপর অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। ধরেই নিন না দিদি উনিই বাচ্চাগুলোর মা।"


গভীর লজ্জায় অধোবদন হলো সুমিতা। সুমিতা বুঝতে পারে, সুমিতার মা-ও জানেন না দত্ত গিন্নীর এই ভূমিকার কথা, জানলে সুমিতাকে তো মা বলতেনই। দত্ত কাকিমার প্রতি শ্রদ্ধায় সুমিতার মাথা নুয়ে এলো।সুমিতা উপলব্ধি করলো, মানুষকে ভালোভাবে না জেনে তার সম্পর্কে কিছু ভ্রান্ত ধারণা করা কত বড় অন্যায়।একজন মানুষের অন্তরের পরিচয় তখনই পাওয়া সম্ভব, যখন মানুষটিকে অন্তর দিয়ে অনুভব করা যায়।


bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.